রক্ষেকালীকে বললুম—‘‘চলো, যাবে তো?’’ ঘরের কাজকম্ম, রান্নাবাড়ির পাট চুকিয়ে দুপুরে বোকাবাক্স দ্যাখে আর বিকেলে যায় কাছেপিঠের পাড়া বেড়াতে। দু’একটা বই দেখতে যায় ন’মাসে-ছ’মাসে। এ ছাড়া বিশেষ কোনও প্রমোদের ব্যাপারে ওর আগ্রহ নেই।

     প্রশ্ন করলে, ‘‘কোথায়?’’

‘‘বাহ্! আজকের প্রোগ্রাম দেখতে মানে শুনতে যাবে না! সাহানার রবীন্দ্রসঙ্গীত—’’

একটু ভেবে নিয়ে বললে, ‘‘নাহ্! আপনি বরং যাও।’’

‘‘বলি, কেন যাবে না তুমি, অ্যাঁ? বাংলা প্রোগ্রাম! তা ছাড়া তুমি নিজেও তো পাকশালে গুনগুন করো—’’

মাঝেমধ্যে নিজের মনে ওঁকে গুনগুন করতে শুনেছি। বেসুরো বলা যাবে না। সুরের ছোঁয়া আছে।

‘‘নাহ্ গো দাদাবাবু! তুমি ঘুরে এসো।’’

‘‘তোমার না যাওয়ার কারণটা কী শুনি?’’

জবাব দিতে গিয়ে একটু যেন লজ্জাই পেল মা কালী। আমতা আমতা করে চোখ নামিয়ে জানান দিলে, ‘‘ঘুম পায়।’’

হে ঠাকুর, রক্ষে করো! তুমি আর যা-ই করে থাকো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জয় করে, নোবেলজাতীয় অজস্র সম্মানের অধিকারী হয়ে, হে প্রাণের ঠাকুর—কোটি কোটি অন্তরে স্থায়ী বসত অধিকার করেও কোন  গুমো-হাবড়া কামারথুবার রক্ষেকালী ওরফে বিমলা মালের হৃদয় জিততে অপারগ হয়েছ।

ওর জবাবের খেই ধরে আরও একটি ছোট ঘটনা মনে পড়ল। আমাদের রক্ষেকালী বেচারি নাহয় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। কিন্তু এই দ্বিতীয় ঘটনাটির সঙ্গে ভারী বিচক্ষণ বিদ্বান, রীতিমতো লেখক ও এক কালের বিদগ্ধ সম্পাদক—যাঁর সময়ে ইংরেজি ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া’ বাজারে একেবারে সুপারহিট হয়েছিল, সেই ‘পঞ্জাব কা শের’ সম্প্রতি প্রয়াত খুশবন্ত সিংহ! নানান পুরস্কার জিতে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ তখনকার ‘বম্বাই’তে মুক্তি পেয়েছিল। প্রেসের সম্মানিত নিমন্ত্রিতদের মধ্যে এই সিংহ মশাইও ছিলেন। ওঁকে জিজ্ঞেস করা হল—কেমন দেখলেন ছবি? কেমন লাগল? কিন্তু ওঁর জবাব শুনে তো উপস্থিত অনেকেরই মূর্ছা যাওয়ার দশা—‘‘ভালই হবে! কেননা ভারী সুন্দর ঘুম হয়েছে ঘণ্টা দুয়েক।’’

এ জাতীয় হতভাগ্য মূর্খদের ভিড়ে আমাদের দেশ যেন গিজগিজ করছে। তুমি তো হে ঠাকুর— তথাকথিত ইস্কুলের গণ্ডিও পার করোনি। তবু এ দেশের তাবড় শিক্ষিত বিদ্বান ব্যক্তিও বলতে গেলে তোমার হৃদয়মথিত চিন্তাভাবনা, শিক্ষাদীক্ষা, দর্শন, আনন্দ-বেদনাময় অনাবিল অগণন সৃষ্টির গহন গভীরে ডুব দিয়েও তলের নাগান পাননি! তুমি যে কী অথবা তুমি যে কে, তাই আমাদের মতো নগণ্য অন্ধ ভক্তরা বোঝার বা জানার ব্যর্থ চেষ্টার শেষে তোমার অফুরন্ত ভাণ্ডারের সামান্য প্রসাদ পেয়েই তৃপ্ত হয়েছি, ক্লান্ত হয়েছি, আবেগে ঝাপসা হয়ে এসেছে দু’চোখ বারেবারেই। তোমার সৃষ্টি তো হে চিরপ্রণম্য, অকূল পাথার! এত গান, কবিতা,গদ্য, পত্রাবলী, এ ছাড়া আরও কত রচনা যে তোমার অপছন্দের তালিকাভুক্ত হয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ছিন্নভিন্ন নিশ্চিহ্ন হয়েছে, তার হিসেব আর কে রেখেছে?

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের আপন অপছন্দ রচনাসমূহের কোনও তালিকা আমাদের জানা নেই বটে! কারণ সে সব কাটাছেঁড়া করা লেখা নিশ্চয়ই নিশ্চিহ্ন হয়ে চলে গেছে মহাকালের গহন গহ্বরে। কিন্তু তার বদলে আমরা যাঁকে পেয়েছি, তিনি আর এক রবীন্দ্রনাথ। একেবারেই সম্পূর্ণ রূপে অন্য ভিন্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  পূর্ণতই ‘মহামানব’ গোত্রের এই মানুষটির সৃষ্টিপথে হেঁটে যাওয়ার জন্য মুম্বই নগরীর একমাত্র প্রতিষ্ঠান তথা রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রচর্চার একমাত্র যে শিক্ষায়তনটি বিগত প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একাগ্র একনিষ্ঠায় আপন দায়িত্ব পালন করে চলেছে, সেই ‘সাহানা’ সম্পর্কে দুটি কথা জানানো দরকার। আরও দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষায়তন সম্পর্কে আমরা অনেকেই ওয়াকিবহাল। ‘প্রাঙ্গণ’ ও ‘রবিগীতিকা’। এদের সঙ্গে সাহানার বেশ তফাত। এরা সঙ্গীত শেখালেও নিয়মিত ‘স্কুল’ নেই এদের। নিয়মিত রবীন্দ্রচর্চা নিয়ে তেমন আগ্রহ আছে বলেও শুনিনি। যা কিনা ‘সাহানা’য় প্রায় পাঠক্রমেরই অন্তর্গত। এ ছাড়া সাহানার অন্যান্য  বৈশিষ্ট্য হল, শুরু থেকেই এই গোষ্ঠী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের নিজস্ব প্রথার অনুগামী—অন্তত দুটি বিষয়ে তো বটেই। শান্তিনিকেতনের মতোই শুধু সাহানা গোষ্ঠীই একমাত্র একই সঙ্গে ‘নববর্ষ’ ও ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উদযাপন করে। যেন রবীন্দ্রের জন্মের সঙ্গেই নবীন সূর্যোদয়, যেন নতুন বছর শুরুই হল—ঠাকুরের জন্ম হল বলে! যদিও এমন কোনও ধারণা সাহানা কর্তৃপক্ষের তরফে কেউ আমাকে দেননি। এ একান্ত ব্যক্তিগত ও আপন পছন্দের ইচ্ছা-ভাবনা বলতে পারেন।

শান্তিনিকেতনের প্রথামতোই ছাত্র ছাত্রীদের ডিপ্লোমা দেওয়া হয় প্রতি বছর সমাবর্তন উৎসবে। সঙ্গে ছাতিম পাতার বদলে থাকে একটি ছোট্ট বীণা। মরাঠি-গুজরাতি অধ্যুষিত এক শহরের এই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষায়তনে অদ্যাবধি এমন ‘ডিপ্লোমা’ পেয়েছেন প্রায় দেড়শো ছাত্রছাত্রী। এটি খুব কম কথা নয়! বাঙালি হিসেবে বেশ গর্ব করে ঘোষণা করার মতোই ঘটনা! আরও উল্লেখ্য—এ বছরের শুরুতে প্রতিবারের মতোই এদের নববর্ষ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হল, যাকে বলে চোখ ও মন ভরানো অনুষ্ঠানে। প্রেক্ষাগৃহ একেবারে উপচে পড়ছিল দর্শক-শ্রোতার ভিড়ে। সেই সংখ্যার তুলনায় প্রেক্ষাগৃহটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তন হলেও বাঙালি-অবাঙালির ঠাসা ভিড় দেখে মনে হতেই পারে—বুঝি আমরা বঙ্গদেশের খুব কাছাকাছি কোনও শহরেই আছি!

এ বার আসুন, রবীন্দ্রনাথের নবীন পথ-পরিক্রমায় ফিরে যাওয়া যাক। যে সব রচনার কোনও একটি শব্দ বা পঙক্তি, ছত্র অথবা স্তবক হয়তো তাঁর মনমতন হয়নি, তক্ষুনি তা কেটেকুটে অন্য শব্দ বা স্তবক লিখে ফেলতেন। কোনও পৃষ্ঠায় হয়তো একাধিক কাটাকুটির পর তবেই পদ্য বা গদ্যটি ঠাকুর মশাইয়ের পছন্দ হত। চিরসুন্দরের পূজারি কবি সেই বিক্ষিপ্ত কাটাকুটি ভর্তি পাতাটিকে কী আশ্চর্য সুন্দর করে সাজিয়ে, তুলে দিলেন চিরকালের হাতে। সেই সব কাটাছেঁড়া অংশগুলি অবলীলায় চোখ জুড়ানো ডিজাইনে রূপান্তরিত হল। যেন মডার্ন আলপনা বা রঙ্গোলি-র ডিজাইন!

যত দূর জানি, পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠায় এই কাটাকুটিগুলি ক্রমশই চিত্তাকর্ষক ডিজাইনের রূপে প্রথম ধরা দিয়েছিল ১৯২৪-এ—কবি যখন  রীতিমতো পরিণত বয়স্ক, ষাট অতিক্রান্ত। ভাবুন, যে বয়সে আমরা সাধারণ নশ্বর মানুষ রিটায়ার করে দাওয়ায় বসে গুড়ুক গুড়ুক তামাক খাই—সেই বয়সে এই মহামানবটি কিনা নিজেকে সহসা ‘ডিজাইনার’ তথা ‘শিল্পী’ হিসেবে আবিষ্কার করলেন। ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ রচনাকালেই তিনি বাতিল শব্দের কাটাকুটি দিয়ে পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা ভরিয়ে তুলতে থাকেন। যদিও কবির ড্রইংয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল বালক বয়সেই এবং তা গৃহশিক্ষকের কাছে। অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্কেচও তাঁকে যথেষ্ট আকর্ষণ করত। তবু আমার ব্যক্তিগত ধারণা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের ভেতরকার শিল্পীকে প্রথম আবিষ্কার করেন ওই ‘পূরবী’ রচনা-কালেই। তেষট্টির বৃদ্ধ কবি আপন আনন্দে নিজেকেই নবরূপে আবিষ্কার করলেন সেই প্রথম। তার পর ক্রমশ এই ‘নবীন রবি’ উঠেপড়ে কাগজে-রঙে-রেখায় আপন শিল্পকে ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন।