জগৎসংসার জুড়ে পুরুষপ্রকৃতির লীলাখেলা। পুরুষ নিষ্ক্রিয়। সেই নিষ্ক্রিয় পুরুষের ক্রিয়াশীল শক্তিই হল প্রকৃতি। প্রকৃতি – তিনিই যে মহামায়া – এই মহাবিশ্বকে মায়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুইয়ে মিলে জগৎ। একটি ছাড়া অপরটি অর্থহীন। দুর্গা সপ্তশতীতে রয়েছে মা অম্বা ভবানীর স্তুতি। মা অম্বা ভবানী – জগতের সর্বাত্মিকা শক্তি – তিন পৃথক শক্তির সমন্বয় – মহাকালী, যিনি এই জগতের সৃষ্টিকর্ত্রী - মহালক্ষ্মী, যিনি সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী এবং মহা সরস্বতী, যিনি জ্ঞানদাত্রী। একই মাতৃশক্তিরই এই তিন রূপ। শুধু কি তাই! এই শক্তিই তো প্রপঞ্চ মায়ার জালে বেঁধে রাখেন এই বিশ্বকে। তাই তিনি বিভিন্ন রূপে প্রতিভাত হন আমাদের কাছে। আমরা সেই পুরাকাল থেকেই জেনে এসেছি শিব ও শক্তিকে। শক্তিপীঠ নিয়েও যে কাহিনী তা শিব ও শিবের শক্তি সতীকে নিয়েই।

পুরাণকথা অনুসারে বলে নিই সতীর দেহত্যাগের কাহিনি। প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন দক্ষ। দক্ষের কন্যারূপে জন্মেছিলেন সতী। সতী পতিরূপে বরণ করেছিলেন মহাযোগী শিবকে। কিন্তু দক্ষ প্রজাপতি শিবকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাই তিনি যখন এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করলেন, শিব এবং সতী রইলেন অনাহুত, অনিমন্ত্রিত। পিতা এতবড় যজ্ঞের আয়োজন করেছেন – সকল আত্মীয়স্বজন, দেবদেবীরা আমন্ত্রিত হয়েছেন সেখানে – দক্ষকন্যা সতীর মন বড় ব্যাকুল হল পিতৃগৃহে যাওয়ার জন্য। তিনি স্বামী শিবের কাছে অনুমতি চাইতে গেলেন। শিব ত্রিকালজ্ঞ – তাঁর কিছুই অজানা ছিল না, তিনি সতীকে মানা করলেন, ‘না, দক্ষযজ্ঞে তোমার না যাওয়াই সমীচীন হবে। প্রজাপতি দক্ষ, হলেনই বা তোমার পিতা – কিন্তু তিনি তো আমাদের আমন্ত্রণ জানান নি। তাই অনাহুতের মত সেখানে গিয়ে অসম্মানিত হওয়া নিশ্চই আমাদের পক্ষে মঙ্গল হবে না’।

কিন্তু সতীর মন মানল না শিবের এই প্রবোধবাক্যে। কতদিন বাদে আবার সকলের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হবে, সতীর যে বড় ইচ্ছে করছে মা, বোনেদের সঙ্গে প্রাণের কথা, মনের কথা বলতে। বাবা কি আর অত নিষ্ঠুর হবেন যে, একবার গিয়ে পড়লে আপ্যায়ন করবেন না। হলামই বা অনিমন্ত্রিত। সতী পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন শিবকে, ‘তুমি না হয় নাই গেলে কিন্তু আমাকে যেতে বাধা দিও না। কতদিন বাদে আবার সকলকে দেখতে পাবো বল তো’! সতীর পীড়াপীড়িতে শিব শেষপর্যন্ত মত দিতে বাধ্য হলেন, বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যাও’।

শিবের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে সতী তো আনন্দে উৎফুল্ল। বাপের বাড়ি যাচ্ছেন, সুতরাং মন খুশি খুশি। বাপের বাড়ি পৌঁছে তিনি দেখলেন এলাহি আয়োজন। আমন্ত্রিত অতিথিদের দ্বারা যজ্ঞস্থল পরিপূর্ণ। সেই পূর্ণ যজ্ঞস্থলে গিয়ে দাঁড়ালেন সতী। কিন্তু এ কি! পিতা দক্ষ প্রজাপতি তো তাঁকে দেখেও দেখলেন না, মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন। সতীর মন হতাশা আর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। মন দুলতে লাগল কোন অঘটন ঘটার আশংকায়। তবে কি স্বামী শিবই ঠিক বলেছিলেন! সতীর কি এখানে অনাহুত আসা উচিত হয় নি? সতীর আশংকা মিথ্যে ছিল না কারণ কিছুক্ষণ পরই দক্ষ সতীকে শুনিয়ে শুনিয়ে শিবনিন্দা শুরু করলেন। সভায় অভ্যাগত অতিথিরা উপস্থিত, উপস্থিত আত্মীয়স্বজনরা। এদের মধ্যে দক্ষের শিবনিন্দা সতীর কানে যেন গরম সীসা ঢেলে দিল। সতীর বিশ্বাস করতে দ্বিধা হল যে এই তাঁর পিতা! এতদিন এই পিতারই ছত্রছায়ায় তিনি বড় হয়েছেন। এত নীচ, এত হীন প্রবৃত্তি দক্ষ প্রজাপতির যে পত্নীর সামনে পতির সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া! সেই পতি, যিনি দেবাদিদেব –  যিনি নিষ্কলুষ, নিরহংকার, মহাযোগী। এমন পতি লাভ জন্ম জন্মান্তরের তপস্যাতেও হয় না – সেই পতির এমন নিন্দা!

না, কিছুতেই সহ্য করব না। কিছুতেই না। শিবের পত্নী সতী – জ্বলে উঠলেন রাগে ক্ষোভে দুঃখে বেদনায়! হে অগ্নি, হে হুতাশন, প্রজ্বলিত কর তোমার শিখা! ঘিরে ধরো আমায় তোমার ঐ লেলিহান শিখার নাগপাশে। আমি সতী, শিবের স্ত্রী সতী – স্বামীনিন্দা যেন আমাকে আর সহ্য করতে না হয়। আমি নিজেকে আহুতি দিলাম  - এ দেহ নশ্বর, একদিন এর বিনাশ হবেই। আজই হোক সেই অন্তিম দিন, হ্যাঁ আজই! যজ্ঞস্থলে সকলে শিহরিত হল সতীর ভয়ংকরী মূর্তিতে। কিন্তু কে যাবে বাধা দিতে অমন তেজস্বী নারীকে – যে নারী নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করে নিয়েছে। নিজের সম্মান, পতির সম্মান রক্ষায় যে নারীর কাছে প্রাণ তুচ্ছ। নিজের সম্মানহানির চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। সতী প্রাণত্যাগ করলেন রাজসভায়। অভ্যাগতরা সে দৃশ্যে চোখ ঢাকলেন – কেঁপে উঠলেন অমঙ্গল আশঙ্কায়।

শিব – দেবাদিদেব মহাদেব – তাঁর কাছে পৌঁছল সে সংবাদ!

ধ্যানস্থ যোগী উন্মিলীত করলেন তাঁর চক্ষু। কি নিদারুণ রুদ্র তেজ সে চোখে। যেন ভস্ম করে ফেলবেন সৃষ্টি। কি সে রূপ! প্রচণ্ড ক্রোধে নিজের চুল ছিঁড়ে তিনি সৃষ্টি করলেন ভয়ানক যোদ্ধা বীরভদ্রকে! তিনি তাঁর সহচর ভূত প্রেতকে নিয়ে অবতীর্ণ হলেন দক্ষের যজ্ঞস্থলে। তাঁর তাণ্ডবে ধ্বংস হল যজ্ঞ। দক্ষের মস্তক ছেদন করে ফেললেন তিনি। প্রজাপতি দক্ষ, চূর্ণ করলাম তোমার দর্প। তুমি শিব নিন্দা করেছিলে না? এবার দ্যাখো শিবের শক্তি!

দেবতারা ত্রাহি ত্রাহি রবে অস্থির হয়ে উঠলেন। কাতর হয়ে স্তুতি করতে শুরু করলেন দেবাদিদেবের। শান্ত হোন, শান্ত হোন। দক্ষের প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হবেন না। দয়া করে ফিরিয়ে দিন ওর প্রাণ। দেবতাদের স্তুতিতে শিবের ক্রোধ প্রশমিত হল, তিনি নিজে এলেন যজ্ঞস্থলে। অনুচরদের বললেন, কেটে আন একটি ছাগমুণ্ড। তারপর সেই ছাগমুণ্ড বসিয়ে দিলেন দক্ষের ধড়ে। বেঁচে উঠলেন ছাগমুণ্ডধারী দক্ষ। ক্ষমা চাইলেন দক্ষ নিজ কৃতকর্মের জন্য শিবের কাছে।

কিন্তু সতী, প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্ত্রী সতী – তাঁকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। শিব তুলে নিলেন সতীর প্রাণহীন দেহ। চলতে শুরু করলেন – উদ্দেশ্যহীন, সন্ধান করে ফিরতে লাগলেন কোন নির্জন স্থান, যেখানে তিনি নিজেকে আবার শান্ত, সমাহিত করতে পারবেন। এবারে দেবতারা শরণাপন্ন হলেন শ্রীবিষ্ণুর। শান্ত করুন দেবাদিদেবকে, তা না হলে সৃষ্টি যে রসাতলে যাবে। বিষ্ণু তখন সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড করে দিতে লাগলেন। সেই খণ্ডিত দেহাংশ ভারতবর্ষের যেখানে যেখানে পতিত হল সেখানেই গড়ে উঠল সতীপীঠ বা শক্তিপীঠ। এরকম একান্নটি শক্তিপীঠ রয়েছে। অম্বাজীতে পড়েছিল দেবীর হৃদয়।

এই হল অম্বাজীর মাহাত্ম্য। একান্ন সতীপীঠের অন্যতম এবং এই সতীপীঠে দেবীর হৃদয়পদ্মের অধিষ্ঠান।

রাজস্থানের আবুরোড থেকে অম্বাজীর দূরত্ব বেশি নয়, প্রায় কুড়ি কিলোমিটার। অবশ্য অম্বাজীর বিশাল মন্দির দেখার আগে দর্শন করতে হয় গব্বর হিল বা গব্বর পাহাড়ের ওপর যেখানে দেবীর হৃদয় পতিত হয়েছিল, সেইস্থানে গড়ে ওঠা মন্দির। গব্বর হিল থেকে অম্বাজী মন্দিরের দূরত্ব সাড়ে চার বা পাঁচ কিলোমিটার।

আবুরোড থেকে গাড়ি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম অম্বাজির উদ্দেশ্যে। পাহাড় কেটে রাস্তা। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। যাত্রাপথের দৃশ্য সুন্দর, তবে বর্ষার পর সে পথের সৌন্দর্য নিশ্চই আরো মোহময় ওঠে। পাহাড়গুলোতে মার্বেল পাথরের আধিক্য। মার্বেল পাথরকে বলা হয় আরস। এই আরস থেকেই অম্বাজীর ওই অঞ্চলের নামকরণ – আরাসুরি। গতবারের বর্ষায় প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আবুরোড থেকে অম্বাজী পর্যন্ত রাস্তা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার নিদর্শন এখনও রয়েছে – শিকড়সুদ্ধ উপড়ে পড়েছে বড় বড় গাছ। রাস্তা এমনিতে বেশ নির্জন। খুব যে গাড়ির ঢল রয়েছে তা নয়। আমরা যখন বেরিয়েছি তখন বেলা প্রায় এগারোটা। কাজেই সূর্যের রোদ চড়েছে বেশ। চারপাশের পাহাড় এখন রুক্ষ, শুষ্ক – পাহাড়ের গায়ে নেই শ্যামলিমার আভাস। চতুর্দিক যেন এক শূন্যতার ভার বহন করে চলেছে। এই রুক্ষতারও এক সৌন্দর্য আছে – ধূসর হলদেটে রঙে প্রকৃতি যেন পরেছে রুদ্র সন্ন্যাসীর বেশ।

কিছুদূর গিয়ে পাওয়া গেল রাজস্থান-গুজরাত সীমান্ত। সেখান থেকে খানিকটা গেলেই গব্বর হিল। আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর আরাসুর পর্বতে অবস্থিত এই পাহাড় এবং বৈদিক যুগের পবিত্র নদী সরস্বতীর উৎসস্থল এর নিকটবর্তী। প্রায় ষোলশো ফিট উচ্চতা এই পাহাড়ের। এই পাহাড়ের চূড়ায় দেবী সতীর হৃদয় পতিত হয়েছিল। এখানে একটি ছোট মন্দির আছে। মন্দিরে ওঠার জন্য রয়েছে নশো নিরাব্বইটি সিঁড়ি। তবে রোপওয়ের খুব ভাল ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। কাজেই সিঁড়িভাঙার প্রয়োজন নেই। রোপওয়ের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হয় না। রোপওয়ের কেবল কার থেকে চোখে পড়ে গব্বর হিলের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দৃশ্য। গব্বর হিলের ওপরে মন্দিরে সদাই জ্বলছে দীপ, যা কখনো নেভানো হয় না। গব্বর কথাটির অর্থ আসলে গর্বা বা গর্ভদীপ।

যেখানেই মন্দির, সেখানেই জীবিকার সংস্থান। ছোট ছেলেমেয়েরা বিক্রি করছে পুজোর সামগ্রী – ফুল, মালা, হাতে বাঁধার জন্য রঙিন সুতোর বিনুনি। বড় গরিব ওরা – দুটো পয়সার জন্যে মন্দিরে সকাল সন্ধে পড়ে থাকা। এই রুক্ষ ভূমিতে কি–ই বা আছে, না চাষবাস, না কলকারখানা; তাই এই ছোট্ট ছোট্ট শুকনো মুখগুলো ঘুরে বেড়ায় মন্দির চত্বরে – দুটো পয়সার আশায়!

গব্বর হিলে মূল মন্দির দর্শন করে গেলাম সাড়ে চার কি পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী অম্বাজীর বিশাল মন্দিরপ্রাঙ্গণে। এই মন্দিরের গঠন শৈলীও অপূর্ব। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্তসমাগম হয় এখানে। ভাদ্রপদের পূর্ণিমায় এখানে বিরাট মেলা বসে। মন্দির চত্বর বিশাল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থারও খুব কড়াকড়ি। কোন মূর্তি নেই মন্দিরে। পূজিত হয় প্রতীক শ্রী বিশ্ব যন্ত্র। এই প্রতীকও থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে। মন্দিরে ফটোগ্রাফি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

মন্দির দর্শন করে চলে আসছি, মন্দিরের বাইরে সার দিয়ে ভিক্ষা চাইছে ভিক্ষোপজীবিনীরা। একজনকে দিয়ে রক্ষে নেই, সঙ্গে সঙ্গে আরো দুতিনজন ছুটে আসছে। কেন বাদ যাবে তারা? চোখের সামনে থেকে যেন একটা পর্দা সরে গেল। এরাও তো দেবীরই শক্তির অংশ, তবে কেন এই দুর্দশা! অদূরেই মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া ঝকঝক করছে আর সেই মন্দিরেরই বহির্দ্বারে ভিক্ষোপজীবিনীর দল। কি চরম বৈপরীত্য! মনে মনে ভাবি আমার কাছে যা বৈপরীত্য, মায়ের কাছে তো তা নয়! তিনি তো সকলেরই মা – ধনী-নির্ধন, সৎ-অসৎ, পাপী-তাপী সকলের। এই মায়ার সংসারে মহামায়া যেমন খুশি তাঁর লীলা করুন – আমি সামান্য মানুষ, সে লীলার স্বরূপ উপলব্ধি করার সাধ্য কোথায় আমার?

অম্বাজী মাতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে রওনা হই। অম্বাজী মন্দির থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে কামাক্ষীদেবী মন্দির। এই মন্দিরে তন্ত্রসাধনার বিভিন্ন দেবীর মূর্তি রয়েছে। এই মন্দিরের বাইরেও দুপুর রোদ্দুরে দুটি ছোট মেয়ে ফুল বেচছে। বড় মায়া হল মেয়ে দুটিকে দেখে। জিগ্যেস করলুম, স্কুলে যাও? ঘাড় নেড়ে বলল, যায়। দিলুম ওদের হাতে দশ টাকা। ফুলের দাম। কোন সকালে সংগ্রহ করে আনা ফুল তখন প্রায় শুকিয়ে গেছে। মেয়েগুলোরও শুকনো মুখ। হয়তো খাওয়াই হয় নি সকাল থেকে। বেলা বাড়ছে, রোদ চড়ছে; এই সময় ভক্তসমাগমও নেই কামাক্ষী মন্দিরে। আমরা ছাড়া আর দু এক জন। মেয়ে দুটির কথা ভেবে কষ্ট হল। কে জানে কোথায় কত দূরে এই রুক্ষ পাহাড়ে ওদের গাঁও। 

অম্বাজী মন্দির থেকে আট কিলোমিটার দূরে কোটেশ্বর মহাদেবের মন্দির। সরস্বতীনদীর উৎসস্থলের খুব কাছেই মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরের শান্ত, নির্জন পরিবেশ মনকে মুগ্ধ করে। বাহুল্য বা বৈভবের আস্ফালন নেই এখানে। দেবাদিদেব যেন ধ্যানমগ্ন। মনে মনে ভাবি, পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে একেবারে ঠিক জায়গাটিই বেছে নিয়েছেন শিব তাঁর সাধনার গূঢ় তত্ত্বে অবগাহন করার জন্যে। মন্দির চত্ত্বরে একপাশে দেখলাম হয়তো পাশের কোন গাঁও থেকে আগত মানুষজন প্রিয়জনের পারলৌকিক কাজ সমাপন করছে। তাদের সাদামাটা পুজোপাঠ যেন মন্দিরের পরিবেশের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেছে। মহাদেবের কাছে সমাজের এই সহজ সরল মানুষগুলোই যে বেশি আপন!

দেবদর্শন তো নয়, দেবতাই যেন ছলতে আসেন মানুষের রূপ ধরে। ব’লে যান, ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছো ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’। দেবদর্শন, দেবীদর্শন সাঙ্গ হল, এবার ‘মন চল নিজ নিকেতনে’।