সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ঘনাদা

নিবাস ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেন। বাক্যবাগীশ। বিশ্বচারী। দুষ্টু লোকের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অপরাজিত। অধুনা নিরুদ্দেশ। তাঁর অভাবে ডুবছে বাঙালি। তড়িঘড়ি অনুসন্ধানে নামলেন বিশ্বজিৎ রায়

1
অলঙ্করণ: দেবাশীষ দেব

শ্রীঘনশ্যাম দাস। রোগা লম্বা শুকনো হাড়-বার-করা বাঙালি বাক্যবাগীশ মানুষটির বয়স আন্দাজ করা অসম্ভব। ‘পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চান্ন যে কোনও বয়সই  তাঁর হতে পারে।’

দুনিয়াময় টহলদারিই নাকি তাঁর কাজ। ‘পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেখানে তিনি যাননি,  হেন ঘটনা ঘটেনি যাঁর সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই’।

সেই সব আশ্চর্য দেশের আশ্চর্য ঘটনা বলবার জন্য ঘনাদা মাঝে মাঝে মেসে টঙের ঘর থেকে নীচে দোতলার আড্ডা ঘরে নামতেন। তাক লাগানো কাহিনি বলেই ফের টঙের ঘরে।  সঙ্গে উঠে যেত সিগারেটের টিন।  সিগারেট কার? যে খায় তার।

সেই টঙের ঘর আর নেই। নেই তার ঘনাদাও।     

খবরটা শুনেছিলাম। এমন যে ঘটবে তা অবশ্য এক রকম জানাই ছিল। বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেন আর সেই মেসবাড়ি দুই এখন তাদের দখলে। 

তারা কারা? ঘনশ্যাম দাস মানে ঘনাদার সঙ্গে সেই আদ্যিকাল থেকে যাদের লড়াই, সেই তারাই, ক্ষমতালোভী অর্থলোভীর দল বাড়িটি ভেঙেছে। টঙের ঘরকে মিশিয়ে দিয়েছে মাটিতে। আর তিনিও মানে এক এবং অদ্বিতীয় ঘনাদা তারপর থেকেই নিরুদ্দেশ। 

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বাঙালি লেখকেরা সে সময় এমন ঘন ঘন রাজনৈতিক জার্সি বদল করতেন না। ছোটোখাটো লাভ-লোকসানের জন্য পালটি খাওয়া রপ্ত হয়নি। সাধারণ মানুষ বাঙালি লেখকদের নিয়ে হাল আমলের মতো ‘সুশীল-দুঃশীল’ রসিকতাও করতেন না। সেই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দেখে ক্ষমতালোভী ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার জন্য গড়ে উঠেছিল, ‘ফ্যাসিস্ট-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। প্রতিষ্ঠিত লেখকেরা এই সংঘ থেকে প্রকাশিত পুস্তিকায় জানাচ্ছিলেন তাঁরা কেন লেখেন। প্রেমেন্দ্রও লিখলেন। প্রেমেন্দ্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ঘনাদার কীর্তি-কাহিনির লেখক।

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কল্লোল যুগ  বইতে বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা আছে। সাউথ সুবার্বন ইস্কুল। প্রেমেন ‘ক্লাসের মধ্যে সব চেয়ে উজ্জ্বল, সব চেয়ে সুন্দর, সব চেয়ে অসাধারণ’।  তা প্রেমেন কিন্তু কেবল বইমুখো নয়। পড়ার বইয়ের বাইরের বইতে তার আনন্দ, চারপাশ দেখতেই তার উৎসাহ। মোটা মোটা বাঁধানো খাতায় প্রেমেন্দ্রের গল্প কবিতা লেখা চলে।

১৯২২। পুরী থেকে প্রেমেন্দ্র লিখছে অচিন্ত্যকে, ‘সমুদ্রে খুব নাইছি। ... ঝিনুক কুড়োচ্ছি।’ দিন যায়। প্রেমেন্দ্র পড়াশোনায় নানামুখী। সাহিত্য করেন, তবে বিজ্ঞানে আগ্রহ গভীর। কৃষিবিজ্ঞান পড়েছেন শ্রীনিকেতনে, ঢাকায় ডাক্তারি পড়তে গেছেন। সেই সব পড়া টাকা-পয়সা উপার্জনে কাজে লাগেনি, সাহিত্য নির্মাণে কাজে লেগেছে। সারাজীবন খুব মন দিয়ে পড়েছেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ইতিহাস আর দেখেছেন অ্যাটলাস।

সেই প্রেমেন্দ্র ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংঘ থেকে প্রকাশিত পুস্তিকা, ‘কেন লিখি’-তে জানালেন ‘প্রাণের দায়ে’  লেখেন। ‘পণ্যময় জীবনের’ কথা ফাঁস করে দেওয়ার জন্য লেখেন।

পরের বছর ১৯৪৫-এ প্রকাশিত হল দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী আলপনা। সেখানেই ‘মশা’ গল্পে ঘনাদার দেখা পাওয়া গেল। বাঙালি পাঠক  টের পেলেন এই লোকটি বিশ্বচারী। সাখালীন দ্বীপে কাজে গিয়েছিলেন।  সেখানে নিশিমারার সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হল।  নিশিমারা যমদূত হিংস্র মশা তৈরি করছেন—  সভ্য মার্কিন মুলুকের লোকের বিরুদ্ধে মশা দাগবেন নিশিমারা। 

প্রেমেন্দ্র মিত্র

একদম হাল আমলে যেমন মার-পাল্টা মারের সন্ত্রাস চলে, এও ঠিক তেমনি। ঘনাদা নিশিমারার সন্ত্রাস দমন করলেন। পাঠক বুঝলেন, পরাধীন ভারতে বাঙালির হাল যাই হোক না কেন, প্রেমেন্দ্রর ঘনাদা পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় যেতে পারে। আর সেখানকার দুষ্টু বিজাতীয় লোকের সঙ্গে মেসবাড়িতে থাকা, ধার করে সিগারেট খাওয়া এই লোকটি পাঞ্জা লড়ে, জিতেও যায়। যাদের সঙ্গে ঘনাদা পাঞ্জা লড়ে তারা লোভী,  ‘পণ্যময় জীবনের’ জন্য অন্য মানুষকে, এমনকী মানব সভ্যতাকে তারা শেষ করে দিতে পারে। ঘনাদার সিগারেটের ধোঁয়ার সামনে বসে বনমালী নস্কর লেনের মেসে চোখ গোলগোল করে সেই গল্প শোনে শিশির, শিবু, গৌরেরা। শিশিরের কাছ থেকে যত সিগারেট ধার নেন ঘনাদা, তার হিসেবও থাকে - ২৩৫৭, ২৩৫৮— ঋণ করে ঘি খাওয়ার কথা বলেছিলেন চার্বাক, ধার করে সিগারেট খান ঘনাদা।

প্রেমেন্দ্ররা কী করতেন? বাড়িতে বৈঠকখানা থাকার মতো সম্ভ্রান্ত তাঁরা কেউ নন। কালীঘাটের গঙ্গার ঘাটে, হরিশ পার্কের বেঞ্চিতে বসে তর্ক চলত। কারও কারও মেসবাড়ি ভরসা। প্রেমেন্দ্র নিজে একসময় থাকতেন ভবানীপুরে গোবিন্দ ঘোষাল লেনের এক মেসে। পুরো একটা সিগারেট একা খাওয়া নিষেধ ছিল। টাকা নেই বলে একটাতে সবাই মিলে ভাগ করে টান, নাহলে কেটে কেটে খাওয়া।

স্বাধীনতার আগে প্রেমেন্দ্রদের জীবনে টাকা নেই,  নিশ্চিন্ততা নেই কিন্তু সাহিত্যের ইচ্ছে প্রবল। সেই সাহিত্য জীবনকে নানা ভাবে দেখবে, আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়বে। কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন, ‘আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের/ মুটে মজুরের/ আমি কবি যত ইতরের/ আমি কবি ভাই কর্মের আর ঘর্মের’।

মনে হতে পারে এ ভদ্রলোক কবির রোম্যান্টিকতা, নিজের অবস্থান থেকে বাইরে এসে খেটে খাওয়া মানুষদের সঙ্গে এক হওয়ার কল্পনা। প্রেমেন্দ্র সারাজীবন ধরে নানা রকম লিখেছিলেন। সব সময় যে মুটে, মজুর, কাঁসারির কথা লিখেছেন, তা নয়। কিন্তু মুটে মজুর কাঁসারিকে ইতর বলে দাগিয়ে দিতে চায় যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতার চেহারাকে নানাভাবে চিনিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

ঘনাদার বৃত্তান্তও আসলে সেই ক্ষমতাকে চিনিয়ে দেওয়ার বৃত্তান্ত। স্বাধীনতার আগে ঘনাদার চলা শুরু, স্বাধীনতার পরেও তিনি সমানে প্রেমেন্দ্রর হাত ধরে আশির দশক পর্যন্ত চলমান।  ক্ষমতা তো আর বসে থাকবে না। তাদের মারলে তারাও পালটা দেবে। তাদের তো এক চেহারা নয়, নানা চেহারা।  ঘনাদা তো সেই চেহারাগুলোকে চিনিয়ে দিতেন।

‘চোখ’ গল্পের কথা মনে নেই?  সামুদ্রিক ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়ার লোভে দুষ্টু মানুষ নির্মম ভাবে তাদের হত্যা করেছে।  রাশিয়া আলাস্কা আর ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরে সামুদ্রিক ভোঁদড় শিকারের জন্য উপনিবেশ বসিয়েছিল।  লোভী মানুষেরা প্রাণী-বংশ শিকার করে লোপাট করে দিতে পারে, আর এ তো কলকাতার পুরনো কয়েকটা বাড়ি দিয়েছে। দিয়েছে টঙের ঘর সহ বনমালি নস্কর লেনের মেসটাকে মাটিতে মিশিয়ে। পুরনো বাড়ি নিপাত যাও। ক্ষমতাশালী প্রোমোটার, ভালো-ভাষায় যাদের বলে ডেভলপার, তারা টাকার দাপে তো গোটা কলকাতাটাকেই অন্য রকম করে দিতে চায়।  সুতরাং বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ি গায়েব, ভাঙা পড়েছে।  ঘনাদা নিরুদ্দেশ। বিশ্বায়ন চলছে।  আলো পড়ছে। কর্পোরেট নাচছে। কলকাতা মলে মলে সাজছে। সিগারেট ধার করে খাওয়ার দিন গেছে। ক্রেডিট কার্ড বল ও ভরসা। আর বাঙালির সাবেকি চিহ্নগুলো ক্রমশই ফরসা।

লেনগুলো খুলে যাচ্ছে ফ্লাইওভারের মুখে। ভেতরের দোতলা তিনতলা ভেঙে মাল্টিস্টোরিড। লোভ যে কত দিক থেকে খাচ্ছে— এক দিকে টাকা এক লহমায় ডবল রি-ডবলের স্বপ্নবিক্রি, অন্য দিকে সেই টাকা নিয়ে কত লোকের ফস্টি-নষ্টি, লোভী গরিবের টাকা রিয়েল এস্টেটে। সুতরাং ‘টঙের ঘর’, ‘টঙ’ এসব শব্দ উধাও। টঙ সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যাওয়া বং-সংস্কৃতি। ঘনাদার টঙের ঘর তো বিশ শতকের, তার আগে উনিশ শতকে  বিবেকানন্দের উত্তর কলকাতার বাড়িতেও একটা টঙের ঘর  ছিল। সেখানে বিবেকানন্দের বন্ধুরা এসে জমাটি আড্ডা বসাতেন। ধূমপানে, গানে, গল্পে ভরপুর। এই সব উনিশ-বিশের টঙ একুশে নেই। আছে সাঁইত্রিশ, আটত্রিশ তলার  ঝলমলে আলো।  অমুক সিটি, তমুক সিটি। সুতরাং বনমালী নস্কর লেনকে তো এই ক্ষমতাশালী বিশ্বায়ন মারবেই।

আর তিনি? ঘনাদা? এত বচ্ছর ধরে দেশ-বিদেশের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর? সত্যি নিরুদ্দেশ?

বিশ্বাস হতে চায় না। বনমালী নস্কর লেনের কাছাকাছি এসে দেখি গান বাজছে। হাসন রাজার গান। কী ঘর বানাইলা তুমি শূন্যেরও মাঝার!  এ গান তো এখানে বাজার কথা নয়, কেন বাজছে প্রথমটা বুঝতে পারিনি। পরে চোখ খুলে গেল। বাড়ি ফিরে ফেসবুক খুলতেই দেখি ‘ঘনাদা গ্যালারি’ বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। ‘পত্রপাঠ’  গ্রহণ করলাম। টঙের ঘর ভেঙেছে তো কী   হয়েছে? ‘ঘনাদা গ্যালারি’তে অন্তর্জালে শূন্যের মাঝারে ঘনাদা তাঁর ছবি-ছাবা দিয়ে কি ঘর বুনেছেন?  সেখানে লেখা রয়েছে ‘কোনোরকম ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এই Ghanada  Gallery পেজ নির্মিত হয়নি। শুধুমাত্র ঘনাদা-প্রেমীদের একত্রিত করাই এর লক্ষ্য।’  হক কথা।

প্রশ্ন হল, আমি কেন ঘনাদাপ্রেমী? মনের মধ্যে বাজতে থাকে, ঘনাদাপ্রেমী না হয়ে যে উপায় নেই। ঘনাদা আসলে কে ? ঘনাদা তো আমার আপনার মতো বাঙালির সামনে একখানা আয়না।  এই আয়নায় মুখ রাখলে টের পাবেন আমুদে ‘খাই খাই’ বাঙালির ছবি, সেই বাঙালি জিভে দিয়েই বলে দিতে পারত ইলিশটা গঙ্গার, না রূপনারায়ণের।  বিকেল হলে খেত কবিরাজি কাটলেট।  আড্ডা জমলেই রামভুজ হাজির করত মেসের আড্ডাঘরে রকমারি সুখাদ্য।  খেতে খেতে চলত দড়ি টানাটানি।  এক দিকে ঘনাদা, অন্য দিকে শিশির-গৌর-শিবুর দল। কে কাকে টেক্কা দিতে পারে !

ঘনাদা অবশ্য কোনও দিনই হারার পাত্তর নন।  ঘনাদাকে জব্দ করার জন্য শিবুরা একবার অভয় দাসকে নিয়ে এসেছিল।  অভয় দাস ম্যালেভাষা জানেন।  তা তিনি এসে তো বাংলার ধার ধারলেন না, ম্যালে চালালেন।  ভাবা গিয়েছিল ঘনাদার বুকনি স্তব্ধ হবে, কোথায় কী ? ঘনাদা, অভয়বাবুর কথার জবাব দিলেন চীনে ভাষায়।

এই বহুভাষাবিদ ঘনাদা যে শুধু মেসবাড়ির অনুচরদেরই হারাতেন তা নয়, দক্ষিণ কলকাতার লেকের ধারের বেঞ্চেও তাঁকে মাঝে মাঝে বসতে দেখা যেত। তখন ওই গাছতলায় তাঁর আশেপাশে যাঁরা এসে জুটতেন তাঁরা মাঝবয়সি।  সাম্রাজ্যবাদ, বাজার-দর, বেদান্ত-দর্শন সবই তাঁদের আলোচ্য বিষয়।

ভবতারণবাবু, হরিসাধনবাবু, রামশরণবাবু ঘনাদার বাক্যজাল শুনতে ভালোই বাসেন।  শুধু মাঝে মাঝে টেক্কা দিতে চান ইতিহাসের অধ্যাপক শিবপদবাবু এবং অবধারিত ভাবে পরাজিত হন। ইতিহাসে আর বিজ্ঞানে ঘনাদার দখল মারাত্মক।  বড় রাস্তাগুলো দিয়ে নয়, গলিঘুঁজি দিয়ে তিনি অনায়াসে আনাগোনা করতে পারেন। সাধে কি ঘনাদাকে ঘিরে বাঙালি কিশোরদের জন্য বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে উঠেছিল! শুধু তথ্য নিয়ে তো ঘনাদার কারবার নয়। সেই তথ্যকে খেলিয়ে কী ভাবে গল্প ফাঁদা যায়, সেটাই দেখার। ইনফর্মেশন আর নলেজ যে আলাদা, বাঙালি সেটা দিব্যি বুঝত।

১৯৪৫-এ দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকীতে হাফহাতা গেঞ্জি-ধুতি পরা ধূমায়িত সিগারেটওয়ালা মধ্যবয়সি ঘনাদা— কিন্তু ঘনাদার চেহারা তো একরকম নয়। ঘনাদাপ্রেমী শুভেন্দু দাশমুন্সী ‘ঘনাদাকে  কেমন দেখতে ?’ নামে মজাদার এক গদ্য লিখেছিলেন। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈল চক্রবর্তী, বলাইবন্ধু রায়, ধীরেন বল, অহিভূষণ মালিক, সুধীর মৈত্র কত জন যে ঘনাদাকে কত ভাবে এঁকেছেন! ‘ঘনাদা গ্যালারি’-তে  সেই নানা ঘনাদার সমাবেশ। কোনও ঘনাদার নাক বোঁচা,  কোনও ঘনাদার নাকই সব। কোনও ঘনাদা চশমা চোখো, কোনও ঘনাদা চশমা হারা। তবে রূপ তার যেমনই হোক গুণ তার একই রকম। ইতিহাসের পাতায় আর বিজ্ঞানের মাথায় এক ও অদ্বিতীয় ঘনাদা। তাঁর রূপে অহিভূষণ মালিকের মন এতই ভুলেছিল যে তিনি প্রায় ঘনাদার মতো করে তাঁর নোলেদাকে এঁকেছিলেন।

অহিভূষণের আঁকা নোলেদা আর ঘনাদা দুজনের ফেস কাটিং-এ যে কী মিল! নোলেদাও ঘনাদার মতো সাহেবদের  গো-হারান হারায়। এক বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ পড়া  সাহেব নোলেদার কাছে বাংলা জানার গর্ব করেছিল। ব্যাস আর যায় কোথায়! নোলেদা তাকে চলতি বুকনিতে ‘পটল তোলা’-র মানে শুধোলেন।  সাহেব পণ্ডিত বাক্যিহারা। কাউন্ট কার্নেরাকে তো ভাষা দিয়েই কাত করেছিলেন ঘনাদা।  সে ভাষা মানুষের ভাষা নয়, তিমির ভাষা।   সমুদ্রের তলায় ডুবে যাওয়া জাহাজ পোর্টো পেড্রো।  সেখানে আছে তাল তাল সোনা। সেই সোনা চান কাউন্ট কার্নেরা। কিন্তু চাইলেই তো হবে না? জাহাজটা কোথায় ডুবেছে জানা চাই।  তা জানে লোম্যান। লোম্যানের সাংকেতিক ম্যাপ উদ্ধার করতে পারে কেবল ঘনাদা।  তাই লোম্যানকে বন্দি করে ম্যাপ হাতিয়ে কার্নেরা কৌশলে ঘনাদাকে ডেকে আনলেন।  ঘনাদা ম্যাপের মানে উদ্ধার করলেন, জলে ডুব দিয়ে সোনা দেখেও এলেন।  কার্নেরা কিন্তু এত করেও সোনা পেলেন না।  শেষ চালটা ঘনাদা যে মোক্ষম চেলেছেন!  ঘনাদা শুধু মানুষের ভাষা নয়, তিমির ভাষাও জানেন যে!  সেই তিমিদের ডেকেছেন তিনি। আর ঘনাদার ডাকে হাজারে হাজারে রাক্ষুসে তিমি হাজির কার্নেরার জাহাজের চারপাশে।  সোনার লোভে জলে আর ডুবুরি নামানোর উপায় নেই। রাক্ষুসে তিমির হাত থেকে বাঁচতে জাহাজ অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। লোভী মানুষ সামুদ্রিক ভোঁদরদের শেষ করে দেয়, ঘনাদা রাক্ষুসে তিমি দিয়ে লোভী মানুষদের নাকাল করে।

বাইরে আবার হাসন রাজার গান।  মন বলছে ঘনাদা হারিয়ে যাওয়ার, হেরে যাওয়ার লোক নয়।  ঠিক ফিরবে কোন চেহারায়, কী ভাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।  তবে কোনও একটা চেহারায় ফিরবেই।  জাতি হিসেবে সততা আর বাক্যবিলাসী কল্পনাই তো বাঙালির পরম ধন।  ঘনাদা সৎ, বাক্যবিলাসী।  দেশ দেখার দিলদরিয়া রোম্যান্টিকতায় বিশ্বাসী।  খেয়ে-দেয়ে যে জীবন কাটাতেন তাতে উপভোগ্যতা আছে। টাকার গরম নেই। এই বাঙালি কি এত সহজে নিরুদ্দেশ হতে পারে! একদমই না।  সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে পাক দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। হাসন রাজার গান। শূন্যের মাঝারে ঘনাদা আছেন—  যে কোনও দিন ফ্যাৎফ্যাৎ সাঁইসাঁই করে নেমে আসতে পারেন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন