ঠান্ডা, তবে কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় ব্রজদা বললেন, ‘‘খুকি, তুইও তোর বাবাকে চিনলি না! আমি বললাম আর আমার কথায় বিশ্বাস করে জামাই আর তুই থেকে গেলি!’’ শুনেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল খুকি মানে ব্রজদার মেয়ে, ‘‘এখন কী হবে বাবা? তোমার জামাইয়ের চাকরি গেলে তো আমাদের পথে বসতে হবে!’’
ব্রজদার জামাই ছিলেন সেনা অফিসার। সেটা সম্ভবত ১৯৭১-এর নভেম্বর। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বা বাংলাদেশ যুদ্ধ তখন হব-হব। তার কিছু দিন আগে ব্রজদার জামাই ছুটিতে সস্ত্রীক শ্বশুরবাড়ি এসেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগে ব্রজদার মেজাজ রোজই বেশ ফুরফুরে। কিন্তু কয়েক দিন কাটতে না কাটতেই এক দুপুরে অফিসে বসে ব্রজদা মেয়ের ফোন পেলেন। এ পাশ থেকে শুনলাম, ব্রজদা বলছেন, ‘‘জামাইয়ের ছুটি তো সবে শুরু হল। এখনই চলে যেতে হবে কেন?...আরে না, না, টেলিগ্রাম এলেই যেতে হবে নাকি! চুপটি করে বসে থাক। আমি মানেক শ-কে বলে সব ম্যানেজ করে দেব।’’
শ্যাম মানেক শ তখন ভারতের চিফ অব দ্য আর্মি স্টাফ। পরে ফিল্ড মার্শাল হয়েছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনীর জয়ের নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয় শ্যাম মানেক শ বা শ্যাম বাহাদুরকে।
বাস্তবে আমাদের ব্রজদা যে গল্পের টেনিদা, ঘনাদাদের চেয়ে কোনও অংশে কম যেতেন না, তার বড় নিদর্শন এই ঘটনা। নির্বিকারে বারফাট্টাই মারতেন অবলীলায়।
ব্রজদা সে দিন বাড়ি ফিরতেই ওঁর মেয়ে বলল, ‘‘বাবা, তুমি মানেক শ-কে বলে দিয়েছ তো!’’
ব্রজদার আশ্বাস, ‘‘আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও সব নিয়ে কিছু ভাবিস না। মানেক শ-র সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছে। জামাইকে এখন যেতে হবে না।’’
কিন্তু তিন দিন পর ফের বাড়ি থেকে খুকির ফোন অফিসে। তড়িঘড়ি বেরিয়ে যাওয়ার আগে ব্রজদা বলে গেলেন, ‘‘জামাইয়ের অফিস থেকে আবার নাকি টেলিগ্রাম এসেছে। এ বার না গেলে জামাইয়ের কোর্ট মার্শাল হবে।’’
ব্রজদা বাড়ি পৌঁছনোর পর সে দিন যা হয়েছিল, সেটা পর দিন অফিসে এসে উনি নিজেই বললেন। খুকির সে কী কান্না। আভা বৌদি রেগে আগুন, ‘‘ছি ছি ছি, মেয়েকেও মিথ্যা বললে! যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে আর তুমি মানেক শ-র কথা বলে জামাইকে থেকে যেতে বললে!’’ মেয়েকে তখন বুকে টেনে সান্ত্বনা দিচ্ছেন ব্রজদা। ব্রজদার জামাইয়ের অবশ্য সে যাত্রা চাকরি যায়নি।
ওই এক বারই ব্রজদার বুলিতে কারও বিপদ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। না হলে ব্রজদা যে সব বোলচাল দিতেন, সেগুলো ছিল নিছক কল্পনা আর মধুর হাস্যরসের অনবদ্য ও অননুকরণীয় এক ককটেল। যাতে না মজে কারও উপায় ছিল না। ব্রজদাকে মিথ্যুক বা গুলবাজ বললে তাই অন্যায় হবে। ব্রজদা কল্পনা ও অসত্যকে মিশিয়ে অনন্য ভঙ্গিতে পেশ করতে পারতেন। যাতে কাউকে আঘাত করা বা কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকত না। 

ব্রজদা। ব্রজরঞ্জন রায়। পেশায় ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক। আনন্দবাজারের খেলার পাতার প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত। বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ শুধু নন, অবিভক্ত বাংলার শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকও। রূপদর্শী ছদ্মনামে গৌরকিশোর ঘোষ যাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘ব্রজবুলি’। গৌরদার আর একটা বই পরে বার হয়— ‘ব্রজদার গুল্পসমগ্র’।

ব্রজদার মৃত্যুর দু’বছর আগে, ১৯৭৯-তে গৌরদার আখ্যান অবলম্বনে তৈরি পরিচালক পীযূষ বসুর ‘ব্রজবুলি’ মুক্তি পেয়েছিল। নামভূমিকায় ছিলেন উত্তম কুমার। ছবিতে ব্রজদা বলছেন, চার্লি চ্যাপলিন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এতটাই যে, চ্যাপলিনের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চিঠি চালাচালি হয়। আবার ব্রজদা এক সাহেব পালোয়ানকে কুস্তিতে ধরাশায়ী করছেন, ব্যাটে-বলে এমসিসি-কে নাস্তানাবুদ করছেন বলে দেখানো হয়েছে ছবিতে। শুধু কি তা-ই! ব্রজদা নাকি একটি ছবি প্রযোজনা-পরিচালনা-সঙ্গীত পরিচালনা ও সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু তৈরি করার পর ছবিটা মুক্তি পাক, সেটা নিজেই চাননি। পাছে অন্যদের ভাত মারা যায়! ‘ব্রজবুলি’-তে অবশ্য ব্রজদার নাম ছিল ব্রজলাল কারফরমা। আর সাংবাদিক নয়, সেখানে ব্রজদা ছিলেন সওদাগরি অফিসের করণিক।

তবে আনন্দবাজারে এক যুগেরও বেশি ব্রজদার সহকর্মী ছিলাম বলে মনে হয়েছে, সেলুলয়েডের পর্দার ব্রজদার চেয়েও আমাদের ব্রজদা ছিলেন বেশি বর্ণময়।

নতুন কেউ তখন আনন্দবাজার পত্রিকা বা তৎকালীন হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের ক্রী‌ড়া বিভাগে যোগ দিলে ব্রজদা তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘‘তুমি কী পাশ?’’ তার পর বলতেন ওঁর নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা। আমাকে বলেছিলেন, উনি দু’টি বিষয়ে এমএসসি। তার মধ্যে একটি কেমিস্ট্রি (ঘটনা হল, ব্রজদা এমএসসি-তে ভর্তি হলেও শেষমেশ পরীক্ষা দেননি)। এই প্রসঙ্গেই বলেছিলেন, ‘‘জানিস, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে বেঙ্গল কেমিক্যালের ফিনাইল আর সাবানের ফর্মুলা আমিই দিয়েছিলাম!’’

জ্যোতি বসু তখন পশ্চিমবঙ্গের প্রবল দাপুটে বিরোধী নেতা। ব্রজদা মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘‘তোরা তো খুব ‘জ্যোতিবাবু জ্যোতিবাবু’ করিস। আরে এই জ্যোতি তখন পুঁচকে ছোঁড়া। এক বার বেচাল দেখে এমন টেনে থাপ্পড় কষিয়েছিলাম না! তার পর থেকে আমাকে খুব মেনে চলে। ট্যাঁ-ফোঁ করে না।’’

বন্ধু শ্যামসুন্দর ঘোষ সেই সময়ে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের ক্রীড়া সাংবাদিক (পরবর্তী কালে দ্য স্টেটসম্যান-এ)। বেশ কয়েক দিন এই রকম শোনার পর শ্যাম পাল্টা দিলেন, ‘‘ব্রজদা, আপনি কার সম্পর্কে কী বলছেন? আপনি বললেই আমি বিশ্বাস করব! জানেন, জ্যোতি বসু আমার মামা হন, নিজের মামা! মামু বলে ডাকি। আর আপনি ওনাকে থাপ্পড় মেরেছিলেন! এখনই ফোন করে জিজ্ঞেস করব ওনাকে?’’ ব্রজদা একটু থমকালেন। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তার পর সপ্রতিভ ভাবে বললেন, ‘‘তা জিজ্ঞেস করেই দ্যাখ না। আমার ওই থাপ্পড় কি জ্যোতি ভুলতে পারবে?’’

আনন্দবাজার পত্রিকা আর হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এর ক্রীড়া সাংবাদিকদের একই ঘরে বসার ব্যবস্থা ছিল। শ্যাম টেলিফোন টেনে নিয়ে একটা অস্তিত্বহীন নম্বর ডায়াল করে বলতে লাগল, ‘মামু, আমি শ্যাম। আমাদের ব্রজদা বলছিলেন, উনি নাকি তোমাকে এক বার থাপ্পড় মেরেছিলেন?...ও, এই রকম কিছু হয়নি! আচ্ছা মামু, ভাল থেকো।’’ এর পর রিসিভার ক্রেডেলে রেখে ব্রজদার উদ্দেশে শ্যাম বললেন, ‘‘কী হল ব্রজদা? এই তো আপনার সামনেই আমি মামুকে ফোন করলাম। উনি বলছেন, আপনাকে উনি চেনেনই না!’’ ব্রজদা তবু অবিচল, ‘‘আরে বোকা ছেলে! থাপ্পড় খাওয়াটা কি কোনও গৌরবের কথা? লজ্জায় বলতে পারছে না। বুঝতে পারলি না!’’

এর কয়েক বছর পর হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডেই আমার এক অনুজপ্রতিম সাংবাদিক যোগ দিল। সে আবার রবীন্দ্রানুরাগী। ওর সঙ্গে ব্রজদা রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হঠাৎই বললেন, ‘‘জানিস, ওর (রবীন্দ্রনাথ) সব কবিতা আমার পছন্দ হয় না। একটা সময়ে পর পর খারাপ লিখছে। তখন ওর থুতনি ধরে, দাড়ি নাড়িয়ে বলেছিলাম, এ সব কী কবিতা হচ্ছে!’’ আমার ওই অনুজ সাংবাদিক তখন ব্রজদাকে বলে, ‘‘দেখুন, আমার বাবা সম্পর্কে খারাপ কথা বলুন, সহ্য করব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে উল্টোপাল্টা বলবেন না!’’ ব্রজদা অবশ্য নির্লিপ্ত, ‘‘ও, তুই রাগ করলি বুঝি!’’

এমনিতে ব্রজদার বুলি শুনে রাগ করার উপায় ছিল না। সম্ভবত আটাত্তরের সেই প্রবল বন্যা। কলকাতা ও বিভিন্ন জেলা ভেসে গিয়েছে।

জলমগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা। এক দিন ব্রজদা অফিসে এসে বললেন, ‘‘তোরা তো শহরের ছেলে। বেশ আছিস। আমাদের খড়দহে এমন অবস্থা যে, তোর বৌদি খাটের উপর বসে রান্না করছে। আর নীচে জলের মধ্যে দিয়ে কেউটে সাপ যাচ্ছে। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা!’’

আর এক বার এক ক্রিকেট লিখিয়েকে বললেন, ‘‘ক্রিকেটটা ভালই খেলতাম। তোমরা তো এখন অমুকের ছক্কা, তমুকের বাউন্ডারি নিয়ে বিশ্লেষণ করো। জানো, এক বার আমার একটা ড্রাইভ এত জোরালো ছিল যে, বল আকাশ থেকে দু’টুকরো হয়ে পড়ল। একটা টুকরো এক ফিল্ডার ধরল, আর এক টুকরো বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে গেল। আম্পায়ার আমাকে আউট দিলেন না। অর্ধেক বল লুফলে তো আর ব্যাটসম্যানকে আউট করা যায় না!’’ পীযূষ বসুর ব্রজবুলি-র ছবির চিত্রনাট্যে এটাই ছিল।   

তবে ব্রজদার কথায় এক বার আমি রাগ করব না হাসব, তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। আনন্দবাজার পত্রিকায় আমার চাকরি পাকা হওয়ার বছর দেড়-দুয়েকের মধ্যে আমি বিয়ে করি। তবে ছুটি পেয়েছিলাম মাত্র দু’দিন। ব্রজদা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘হ্যাঁ রে, তোর ফুলশয্যা হয়েছিল?’’ এমন প্রশ্নের মুখে পড়ে আমি তো অবাক। ব্রজদা বললেন, ‘‘আসলে আমার হয়নি তো। তাই, তোকে জিজ্ঞেস করলাম।’’ কিন্তু হয়নি কেন? ‘‘আরে, হবেটা কী করে? বিয়ের পর দিনই বাপুজির টেলিগ্রাম, ‘চলে এসো জলদি। স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন রূপ নিয়েছে। তোমার আসাটা দেশের জন্য জরুরি।’ ব্যস। চলে গেলাম। ফিরলাম মাস দুয়েক পর। এ বার তুই-ই বল, কোনটা বড়? ফুলশয্যা, নাকি দেশকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করা?’’

তবে সত্যি সত্যিই নেতাজির সঙ্গে ফৌজি পোশাকে ব্রজদার ছবি দেখেছি। তা ছাড়া, সিনিয়রদের কাছে শুনেছিলাম, সাংবাদিক হিসেবে ব্রজদার যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। জওহরলাল নেহরু, ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, লোকসভার স্পিকার অনন্তশয়নম আয়েঙ্গার, সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম কারিয়াপ্পা। সকলেই এক নামে ব্রজদাকে চিনতেন, ফার্স্ট পার্সনে সম্বোধন করতেন। গাঁধীজি খড়দহে এক শিষ্যের বাড়িতে এলেই ডেকে নিতেন আভা বৌদি আর ব্রজদাকে। এর মধ্যে কল্পনা বা অসত্যকথনের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু ব্রজদার দাবি ছিল, খড়দহের ওই বাড়িতেই আভা বৌদিকে ডেকে গাঁধীজি নাকি বলেছিলেন, ‘ব্রজ বেটাকো বঙ্গালকা চিফ মিনিস্টার হোনেকে লিয়ে বোল।’ ব্রজদার কথায়, ‘‘তোর বৌদি তো আহ্লাদে আটখানা। কিন্তু আমি বললাম, ফুঃ, ও সব চিফ মিনিস্টার-ফিনিস্টার হওয়া কি আমার পোষায়?’’

এমনটা সম্ভবত ব্রজদার গুল্পই। তবে এটা ঘটনা যে, সাংবাদিক ব্রজরঞ্জন রায় খোদ মুখ্যমন্ত্রীকেও রেয়াত করতেন না। এক বার জাতীয় শ্যুটিংয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে শোনেন, প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করবেন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। ব্রজদার সোজাসাপটা প্রশ্ন, ‘‘বিধান ডাক্তার আবার শ্যুটিংয়ের কী বোঝে?’’ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত তৎকালীন আইজি হীরেন সরকার, পুলিশ কমিশনার হরিসাধন ঘোষ চৌধুরী, ডিসি (সদর) পি কে সেনরা কিন্তু রা কাড়েননি। কারণ, প্রশ্নটা করেছেন কিংবদন্তি সাংবাদিক ও ক্রীড়া সংগঠক ব্রজরঞ্জন রায়। তিনিই ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া ও শক্তি সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার কোনওটার সভাপতি, কোথাও সচিব আবার কোনওটার ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। জিমন্যাস্টিক্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার সচিব ছিলেন টানা ১৩ বছর।

ব্রজদাই সম্ভবত বাংলা সংবাদজগতের প্রথম ক্রীড়া সাংবাদিক, যিনি স্বয়ং খেলোয়াড় ছিলেন। পুরোদস্তুর খেলেছেন ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, খো খো। ১৯৫২ সালে ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ভারতের জিমন্যাস্টিক্স দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্রজদা। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ১৯৬২-তে জিমন্যাস্টিক্স টিম নিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরেও যান। এই সব বিদেশ সফরের সঙ্গে মিশেছিল পড়াশোনা। আনন্দবাজারের ক্রীড়া বিভাগে কাজের অবসর সময়ে ব্রজদা ডুবে থাকতেন পেপারব্যাক থ্রিলারে। সব মিলিয়ে, যুগের চেয়ে এগিয়ে থাকা একটা মানসিক গঠন তৈরি হয়েছিল ব্রজদার। বাংলার ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে ব্রজদাই প্রথম বলেন, খেলার মাঠে মেয়েরা শাড়ি নয়, স্কার্ট পরে নামবে এবং এই ব্যাপারে প্রচারও করেন লাগাতার।

আনন্দবাজারে চাকরি পেয়ে যখন ব্রজদার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হল, জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হওয়া মানুষটি সেই সময়ে অবসরের পর এক্সটেনশনে। কিন্তু অফিসে আসতেন নিয়মিত। ব্রজদার কাছ থেকে জেনেছিলাম, ১৯২৮ সালে বিনা মাইনের রিপোর্টার হিসেবে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৩২-এ চাকরি হয়, বেতন তখন মাসে ৩০ টাকা। গোড়া থেকেই খেলার পাতার দায়িত্বে। এবং কী নিষ্ঠার সঙ্গেই যে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন!

আনন্দবাজারে চাকরি পাওয়ার পরেই শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে ব্রজদা জানতে চান, খেলার সঙ্গে যুক্ত বহু শব্দ তো ইংরেজি, বাংলায় সেগুলো কী ভাবে লেখা হবে? রবীন্দ্রনাথ ব্রজদাকে বলেছিলেন, বাংলায় খেলার এমন সহজ পরিভাষা তৈরি করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন। ১৯৩৪ সালে মুঙ্গেরে ভয়াবহ ভূমিকম্প কভার করতে আনন্দবাজার থেকে গিয়েছিলেন ব্রজদা আর ফোটোগ্রাফার বীরেন সিংহ। ব্রিটিশ রাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ওই ভূমিকম্প নিয়ে আনন্দবাজারের নির্ভীক সংবাদ পরিবেশনের কথা বহু বছর পরেও আলোচনা হত। ব্রজদাই ছিলেন কাণ্ডারী। মুঙ্গেরের ভূমিকম্প কভার করতে যাওয়ার স্মৃতিচারণার সময়ে ব্রজদা আমাকে বলেছিলেন, ‘‘ওটা ছিল সাংবাদিকতার পেশায় পাওয়া আমার সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চারাস অ্যাসাইনমেন্ট। বহু ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছিল। সব সময়ে মাথায় রাখবি, এক জন সাংবাদিকের পক্ষে এমন কাজ পাওয়া গর্বের।’’

হাস্যরস ও নিজেকে নিয়ে কৌতুক ব্রজদার জীবনের অন্যতম প্রতিপাদ্য হলেও অদ্ভুত একটা মূল্যবোধ তৈরি করেছিলেন তিনি। আদেখলাপনা দেখিনি ওঁর মধ্যে। ‘ব্রজবুলি’-র শ্যুটিং শুরুর আগে আনন্দবাজারের নিউজ রুমে এক দিন খোদ উত্তম কুমার এসে হাজির। নিষ্ঠাবান উত্তমবাবু ব্রজদাকে দেখে তাঁর চালচলন বুঝতে চেয়েছিলেন, মানুষটাকে জানতে চেয়েছিলেন। তখন কিউবিকলের যুগ নয়, রিপোর্টারদের কাজ করার লম্বা হলঘরে বসলেন উত্তম কুমার। সেখানেই ডাকা হল ব্রজদাকে। নানা গল্প ও গুল্পে আমাদের মশগুল করলেন ব্রজদা। স্বভাবোচিত ভঙ্গিতে হাত মুঠো করে সিগারেটে টান দিচ্ছেন। কথাবার্তায় কোনও উচ্ছ্বাস, আবিলতা নেই। উত্তম কুমারের মতো ব্যক্তিত্বের সামনেও আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে সহজ ও সাবলীল আমাদের ব্রজদা। উত্তম কুমার একটু দূরে বসে ওঁকে লক্ষ্য করছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটানোর পর চলে গেলেন সিনেমা বিভাগে, সেবাদা মানে, সেবাব্রত গুপ্তের ঘরে। ‘ব্রজবুলি’ মুক্তি পেতে সেবাদাই ব্রজদাকে ছবিটা দেখাতে নিয়ে যান।

এর পর উত্তম কুমার আবার এক দিন আমাদের অফিসে এসেই দেখা করলেন ব্রজদার সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘সিনেমা কেমন দেখলেন? ঠিক হয়েছে তো!’’ ব্রজদার সাফ কথা, ‘‘আমাকে আর একটু স্টাডি করলে না কেন? সিগারেটটা ঠিক মতো ধরে টানতে পারোনি। আমার মতো হয়নি।’’

পঁচাত্তর বছর বয়সে ১৯৮১-র ৯ ডিসেম্বর চলে গেলেন ব্রজদা। মুকুলদা, মুকুল দত্ত আনন্দবাজার সংস্থার তরফে ব্রজদার শেষকৃত্যের পুরো দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন। ব্রজদাকে মুকুলদা ডাকতেন ন’দা বলে। মুকুলদা বলেছিলেন, ‘‘ন’দার চলে যাওয়াটা আমার কাছে প্রচণ্ড কষ্টের। আমি গিয়ে দাঁড়াতে পারব না। সব কাজ তোমাকেই করতে হবে।’’ ব্রজদার শেষকৃত্যের সমস্ত খরচ বহন করেছিলেন আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ।

‘ব্রজবুলি’ ছবিতে ব্রজদার সেই অবাক করে দেওয়া সংলাপ আছে, ‘‘আমি চার বার শহিদ হয়েছি।’’ চিরপ্রাণবন্ত মানুষটার দেহ প্রাণহীন হয়ে গিয়েছে— এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ব্রজদার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে সে দিন বার বার মনে হচ্ছিল, এই তো, এখনই হঠাৎ তড়াক করে উঠে পড়ে ব্রজদা বলবেন, ‘‘কী রে, কেমন দিলাম? কেমন শহিদ হয়েছিলাম দেখলি তো!’’