আট চিত্রকরের দল হরাইজ়ন। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে শেষ হল তাঁদের ১১তম প্রদর্শনী। সকলেই চান, প্রদর্শনীর জন্য নিজস্ব সৃষ্টিকে যতটা সম্ভব আকর্ষক করার। সব সময়ে তা হয় না। নিজের কাজের নির্বাচনই ঠিকঠাক হয়ে ওঠে না। উৎকৃষ্টের পাশে দুর্বলতর কাজও স্থান পায়। একটি আনুভূমিক রেখার জমিতে সবাই দাঁড়ালেও কারও কাজে সে ব্যতিক্রম থেকেই যায়। এখানেও সামান্য হলেও তা টের পাওয়া গিয়েছে। 

তেলরঙে সিদ্ধহস্ত দীপক মুখোপাধ্যায় অ্যাক্রিলিককে বেছে নিয়েছেন। তাতে সেই স্টাইল বা টেকনিকে, উপস্থাপনায় কিন্তু বদল আসেনি। উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বলতার প্রভেদ রেখে বর্তমান কাজের নাটকীয়তায় নিঃসন্দেহে সে মুনশিয়ানা প্রকাশিত। ‘পেন্টেড বাফেলো’ ও ‘দি আউল’-এ টুকরো রঙের ও আপাত অন্ধকারের ব্যবহার বড় মায়াবী। বিষয়কে এক পাশে রেখে, বাকি অংশের রহস্যাবৃত আচ্ছন্নতার মধ্যেও নাটকীয় বহিঃপ্রকাশ। যা রক্তিম টকটকে লাল বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পটভূমির অহঙ্কার। ‘ইন ডেঞ্জার’ নিঃসন্দেহে সুররিয়্যালিজ়মকে প্রতিভাত করলেও বিপন্নতার দিকটি চমৎকার ফুটিয়েছেন। দীপক বরাবরই ইজিপশিয়ান কিছু অনুষঙ্গের প্রতি দুর্বল। সে সব চিত্রখণ্ড থেকে এই অনুপ্রেরণা পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজে অবয়বী ছবিতেও ব্যবহৃত। এখানে ‘মায়া’, ‘কম্পোজ়িশন’ কাজগুলি লক্ষ করলে বোঝা যায়। তাঁর ছবির বিশেষত্ব হল, যে মুহূর্তকে তিনি উপস্থাপন করছেন, তার পাশাপাশিই চকিতে কৌতূহল তৈরি হয়, যেন পরের স্টেজটাও দেখা যাবে। তাঁর ছবি তৈরির দক্ষতা ও তাকে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট মাত্রায় বেঁধে রেখেও ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ জাতীয় ধাঁধায় দর্শককে দ্বিমাত্রিকতার রং-রেখাচ্ছন্ন ছোটগল্পের বাস্তব-অবাস্তবকেই উপলব্ধি করিয়েছেন। বরাবরই দীপকের ছবির রিয়্যালিজ়ম রোমাঞ্চকর। 

মিশ্র মাধ্যম এবং কোলাজ-কেন্দ্রিক ন’টি কাজে সঞ্চিতা সেনগুপ্ত বড্ড জটিল আবহে প্রায় হারিয়ে গিয়েছেন। অনুভূতিময় জায়গাগুলিতে অন্য রূপবন্ধ, কাগজ, লেখা, চিরুনির দাঁতের টানটোন, কোলাজ, স্প্যাচুলার ব্যবহার— সব একাকার হয়ে, ছবির আকর্ষণই হারিয়ে যাচ্ছে। যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয় বিচ্ছুরিত বর্ণ ছবিকে থিতু হতে দেয় না। স্পেসকে এ সব কাজে গুরুত্ব দিয়ে, এক জায়গায় থামতে হয়। পাশাপাশি পরিমিতিকেও বুঝতে হয়। 

মৃণ্ময় দাস টেক্সটাইল মিশ্র মাধ্যমে ‘মোলা’ পদ্ধতি ও বাংলা কাঁথার সংমিশ্রণে একাধিক আস্তরণে ‘কাট এমব্রয়ডারি’ টেকনিকে কাজ করেছেন। সরু নলের অন্তর্গত ব্যবহার-সহ অন্যান্য ফাইবার, মেটাল থ্রেড, সুতো, তুলো নিয়ে করা কাজগুলিতে একটি অন্য মাত্রা এনেছেন। বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বাহাদুরি চোখে পড়ে। 

সমাজের প্রতি এক বার্তা দিয়েছেন উদয় দেব। গ্রাফিক্স, সচিত্রকরণ, কার্টুনে দক্ষ শিল্পী এখানে পলিটিক্যাল মেসেজের কথাই যেন ব্যক্ত করেছেন। খুবই প্রতীকী কাজ। ছোট বাক্স-বাঁধাই রচনা। যন্ত্রণা, বিদ্রুপ, জেহাদ, স্যাটায়ার, বিদ্রোহ— সবই একটি ভাবনার ক্যাপসুলে এনে বিন্যস্ত করেছেন। কিছুটা কনসেপচুয়াল, চরম বাস্তব। মাধ্যম ইনস্টলেশন বললেও বহু কিছু ব্যবহার করেছেন। প্রতীকী অভিঘাতের ভিতরে দেখা ‘ইমেজ ফাইভ’ সমাজের এক 
কদর্য মুখোশ।

লোকশিল্পের ঘরানা মাথায় রেখে নিজস্বতা তৈরি করতে চেয়েছেন প্রদীপ ভৌমিক। আঙ্গিকের দিক থেকে কিছুটা মুগ্ধতা বোঝা গেলেও হঠাৎ যেন থেমে গিয়েছে কোথাও তাঁর কাজ। ‘রিলেশন উইথ নেচার ফাইভ’ বেশ মজার। সবই বোর্ডে টেম্পারা। মোটা 
রেখার প্রাধান্য জমিতে যেন বর্ণকে বলছে— ‘প্রবেশ নিষেধ’। এমনিতে মন্দ নয়। 

নির্মলকান্তি চক্রবর্তী রূপ ও রেখার মাধ্যমে সাজানো গোছানো জ্যামিতিক রচনায় কাঠামো, জীবন ও প্রকৃতিকে একটি ছন্দে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু অন্ধকার পটভূমিতে যেন পুজো-প্যান্ডেলের মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়। সমতলীয় রচনা  যেন আপাত সচিত্রকরণের বৃহৎ ক্যানভাস। ছোট ছোট ড্রয়িং, রেখার বিভাজন, গাছপালা, পাখি, কড়ি, ফুলদানি ইত্যাদির ডিজ়াইনধর্মিতা ছবিকে আলঙ্কারিক ও ফ্ল্যাট করেছে। 

বিশ্বজিৎ মিত্র বেশি মাত্রায় পরিমিত ও অসম্পূর্ণ। সেই অতিরিক্ত শূন্যতায় সচিত্রকরণের ধারণাই স্পষ্ট হয়। 

অলয় ঘোষালের কাজগুলি কার্টুন নয়, কার্টুনধর্মিতাকে গ্রহণ করা আধুনিকতা। উপসর্গগুলি ব্যঙ্গকে ছাড়িয়ে রচনার অন্যতম গুণ হয়ে ওঠে। অ্যাক্রিলিক, কালো লাইন, সামান্য মিশ্র মাধ্যম। বক্তব্যপ্রধান সচিত্রকরণের মতো ড্রয়িংকে পেন্টিং কোয়ালিটির পটভূমিতে অন্যান্য রূপবন্ধের সমন্বয়ে দেওয়া তাঁর এই মেসেজের নিহিত ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও মজা উপভোগ্য।