সময়টা ১৯৩৫ সাল। দেবকী বসুর বাড়ির বৈঠকখানায় আড্ডা জমেছে। অনেকের সঙ্গে সে দিন সেখানে উপস্থিত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আড্ডার বিষয় সাম্প্রতিক বাংলা সিনেমার কাহিনি। শরৎচন্দ্র বললেন, “এখন যে গল্প আমাদের দেশের ছবিতে খুব চলছে সে গল্প আর খুব বেশিদিন চলবে না।” দেবকীবাবু মানতে রাজি নন। শরৎবাবু আরও বিস্তারিত করলেন, “তোমাদের পৌরাণিক উপাখ্যান আর চলবে না। ছবিতে নয়, স্টেজেও নয়।” সে দিন দেবকী বসু শরৎচন্দ্রের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। কারণ, তিনি দেখেছেন, ধুনদিরাজ গোবিন্দ ফালকে থেকে ভি শান্তারাম সকলে পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে ছবি করেই ভারতীয় চলচ্চিত্র দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছেন। এ যেন এমন এক অমোঘ ফর্মুলা, যা ব্যর্থ হয় না। তাই সে দিন তিনি শরৎচন্দ্রের মতের বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন বাংলা তথা ভারতীয় ছবির দর্শকমনের যে প্রতিফলন, তার বাস্তব অবস্থার দিকে তাকিয়ে। 

১৯৩২ সালে দেবকী বসুর পরিচালনায় দু’টি ছবি মুক্তি পায়। একটি নির্বাক ছবি ‘নিশির ডাক’ ও অন্যটি বাংলা সিনেমার প্রথম সার্থক সবাক চলচ্চিত্র ‘চণ্ডীদাস’। কথা বলা সিনেমাটি দেখে বাঙালি হতচকিত, মুগ্ধ, বাক্যহারা হয়ে গিয়েছিল। ছবি দেখে উত্তেজিত কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে লিখেছিলেন, “পরিচালক তরুণ চিত্র কবি/ তোমার প্রসাদে বাণী মুখর হল মূক্‌ বোবা ছবি/ যে ছায়ালোকের কুহু ও কেকার ভাষা ছিল ইঙ্গিত/ তব গুণে গুণী শুনি তাহাদের অপরূপ সঙ্গীত।” ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে প্রথম সিলভার জুবিলি হয়েছিল সেই ছবি। দেবকীবাবুর খ্যাতি তুঙ্গে পৌঁছেছিল। 

দুর্গাদাস ও উমাশশী অভিনীত ‘চণ্ডীদাস’ সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালিকে প্রথম উপহার দিয়েছিল সংলাপে, গানে, নেপথ্য সঙ্গীতের আবহে ভরা এক আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্র। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বাঙালির গর্বের হাতি মার্কা ‘নিউ থিয়েটার্স’ স্টুডিয়ো। যার কর্ণধার ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। মনে রাখা দরকার, ওই বছরেই (১৯৩২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিচালিত একমাত্র সিনেমা ‘নটীর পূজা’ ছবিটিও মুক্তি পেয়েছিল। হিন্দু উচ্চবর্ণ সমাজের ধর্ম ভাবনা থেকে দেবকীবাবু সরে এসেছিলেন অন্ত্যজ জনের প্রেম বিরহের দুনিয়ায়। এখানেই ছিল ‘দেবকীনন্দন’-এর সাফল্যের চাবিকাঠি। ভারত জুড়ে ভক্তি আন্দোলনের যে ভাবধারা বিপ্লবী শ্রীচৈতন্যদেবের হাত ধরে বঙ্গদেশে এসে পৌঁছেছিল, সেই ধারাস্রোতের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার দর্শকদের। উচ্চবর্ণের চণ্ডী ঠাকুরের সঙ্গে নিম্নবর্ণের ধোপানি রামির প্রেমকথা ভাসিয়ে দিয়েছিল সে কালের বাঙালি সমাজকে। তারা শুনেছিল চণ্ডীদাসের বর্ণাশ্রম বিরোধী সেই অমর উক্তি, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। 

‘সোনার সংসার’ ছবির সেটে ছায়া দেবী, মেনকা দেবী, রামপিয়ারির সঙ্গে  

অষ্টম গর্ভের সন্তান

দেবকী ছিলেন এমন এক জন চলচ্চিত্রকার যিনি বাংলা নির্বাক ও সবাক যুগের সন্ধিক্ষণে কাজ শুরু করেন। ফলে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল দুই আঙ্গিকের শিল্পশৈলী ও প্রযুক্তির যাবতীয় সীমাবদ্ধতাকে নিয়েও সার্থক মেলবন্ধন ঘটানোর। রবীন্দ্রনাথ যেমন গান, অবনীন্দ্রনাথ যেমন চিত্রকলা, শিশির ভাদুড়ি যেমন নাটক ও উদয়শঙ্কর যেমন নৃত্যকলাকে গড়ে দিয়েছিলেন— দেবকীবাবু তেমনই ভারতীয় চলচ্চিত্র ভাষার প্রথম উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। যে কাজটা ইউরোপ ও আমেরিকার সিনেমার জন্য জর্জেস মেলি, ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ, জন ফোর্ড, পুডভকিন, আইজ়েনস্টাইনরা করেছিলেন। তাই দেবকীকুমার বসু হলেন বাংলা চলচ্চিত্রাচার্য। বাংলা সিনেমার শতবর্ষে এ সত্য মেনে নেওয়া ভাল।

দেবকীকুমার বসুর জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৬ নভেম্বর (মতান্তরে ২৫) বর্ধমানের অকালপৌষ গ্রামে। যা ছিল তাঁর মামার বাড়ি। তাঁর মায়ের নাম গোপীসুন্দরী দাসী, বাবা মধুসূদন বসু। পেশায় অ্যাডভোকেট মধুসূদন কাজের সূত্রে বর্ধমানে আসেন। কাইগ্রাম বা কৈগ্রাম-এ ছিল তাঁর বসতবাড়ি। তিন ভাই (প্রিয়কুমার, সুকুমার ও দেবকী) ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি মায়ের অষ্টম গর্ভের সন্তান বলে নাম রাখা হয়েছিল ‘দেবকীনন্দন’। মা ছিলেন মহীয়সী, নম্র স্বভাবের। মায়ের কারণেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। এ ছাড়া বর্ধিষ্ণু জমিদার বংশ ও তাঁদের রাধাবিনোদ ঠাকুরের প্রভাবও তাঁর মানস জগতে ছায়া ফেলেছিল।

নাট্যপ্রেমে ও গাঁধীর টানে

কাইগ্রামের স্কুলেই দেবকীবাবুর পড়াশোনার শুরু। ছেলেবেলায় তিনি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ অনায়াসে বলে যেতে পারতেন, যা শুনতে গ্রামের মানুষ তাঁদের বৈঠকখানায় ভিড় করত। এর পরে তিনি বর্ধমান শহরের খোসবাগানের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পড়া শেষ করে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে থেকে আইএ পরীক্ষা দেন এবং ইতিহাস ও ইংরেজিতে লেটার নম্বর পান। পরিচয় হয় নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে। তাঁর পরিচালনায় ১৯১৯-এ ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে ‘সোহরাব রুস্তম’ নাটকে সেনানায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এর পরে ‘মেবার পতন’ নাটকে মহব্বৎ খাঁয়ের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পান। দেবকী বসু লিখেছেন, “যখন অভিনয়ের জন্য মঞ্চে প্রবেশ কচ্ছি, আমার পায়ের স্যান্ডেলের ফিতেটা যে কোন ফাঁকে খুলে গেছে তা লক্ষ্যও করিনি। শিশিরবাবু হঠাৎ থামতে বললেন। আমাকে কোন কিছু বলবার বা করবার সুযোগ না দিয়েই হাঁটু গেড়ে নিজেই আমার খোলা ফিতেটা লাগিয়ে দিলেন। জানি না এমন নাট্য শিক্ষক ভবিষ্যতে আর কোন ছাত্র পাবে কিনা।”

বিএ পড়া শেষ না করেই দেবকীবাবু কলেজ ছাড়েন গাঁধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিতে। এই সময়ে তিনি বর্ধমানের শক্তিগড়ে ‘শক্তি’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করতে শুরু করেন। যদিও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লেখার ফলে তিনি রাজরোষে পড়েন। তাঁকে ধরে দেওয়ার জন্য বর্ধমান মহারাজাকে আদেশ দেয় ইংরেজ সরকার। কিন্তু মহারাজের সাহায্যেই পুলিশের চোখ এড়িয়ে তিনি বর্ধমান থেকে পালিয়ে যান। এই অস্থির জীবনের মধ্যেই ১৯২০ সালে দেওঘরের মিশনারি স্কুলে শিক্ষাপ্রাপ্ত লীলাবতী সেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। লীলাবতী ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার কেদার সেনের নাতনি। তাঁদের আট সন্তান— জয়া, ছায়া, দিলীপ, গীতা, আরতি, দেবকুমার, তপতী, ভারতী। 

জমিদার বাড়ির কুলাঙ্গার

ছাত্রজীবন থেকেই দেবকীবাবুর মধ্যে বিদ্রোহী ভাব দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন তাঁর ছেলে দেবকুমার। “জমিদার বংশে জন্ম নিলেও বাবা জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন। কলেরা দেখা দিলেও জাত বিচার না করে বাবা আর্তের সেবায় বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে বেড়াতেন। এর ফলে তাঁকে পরিবার থেকে ‘জমিদার বাড়ির কুলাঙ্গার’ বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিয়ের পরে তাঁর সাংসারিক জীবন মসৃণ ছিল না। সংসার চালাতে  গামছা ফেরি করেছেন, কয়লার ব্যবসা করেছেন। কখনও বিভিন্ন রেল স্টেশনে সাহেবদের সঙ্গী হয়ে ম্যাজিক ল্যান্টার্ন প্রোজেক্টর দিয়ে ছবি দেখিয়ে বেড়িয়েছেন।”  

এ ভাবেই আনুমানিক গত শতাব্দীর বিশের দশকের শেষের দিকে ‘শক্তি’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের কাজে যুক্ত দেবকীবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বাংলা সিনেমার আদিযুগের বিখ্যাত প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের (ডিজি) সঙ্গে বর্ধমান শহরেই। ডিজি লিখেছেন, “দেখলাম একটি ছেলে বসে আছে। বাবরি চুল, আস্তে আস্তে কথা বলে। ইনিই হচ্ছেন দেবকীকুমার বসু... ছেলেটির এত নম্র স্বভাব, বুঝলাম ইনি ফাঁকিবাজি লোক নন...ইনিও বুঝলাম আমাকে ছাড়বার পাত্র নন... বল্লেন, আপনার সঙ্গে আমি কলকাতায় যাব। আমি রাজি হয়ে সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে এলাম।” এই ভাবে ধীরেন্দ্রনাথ আবিষ্কার করেছিলেন দেবকীকে। কলকাতায় তখন দেবকীবাবু থাকতেন ডিজি-র ২১ নং মোহনলাল স্ট্রিটের বাড়িতে।  

সিনেমার প্রতি আকর্ষণ দেবকী বসুর মধ্যে হঠাৎ উদয় হয়নি। মেয়ে গীতা লিখেছেন, “আমার পিতা ছাত্রাবস্থায় অধ্যায়নের সাথে সাথে শিল্পের প্রতি এক গভীর টান অনুভব করেন। ছবির নির্বাক যুগের আগে বিদেশীদের সাথে স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে কালো পর্দায় লণ্ঠন জ্বালিয়ে ছবি প্রতিফলন করার নেশায় ডুবে গিয়েছিলেন। ঠান্ডা শিঙাড়া খেয়ে কত দিন স্টেশনেই কম্বল মুড়ি দিয়ে রাত কাটিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।” ছায়াছবিকে ঘিরে দেবকী বসুর আগ্রহ গড়ে উঠেছিল এই ভাবেই। গীতা যে ঘটনার কথা লিখেছেন তাতে জানা যাচ্ছে, চলমান ছবি দেখানোর পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে এই ম্যাজিক ল্যান্টার্ন পদ্ধতিতে স্থিরচিত্র দিয়ে গল্প দেখানো হত। সেই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় ছিল দেবকী বসুর। ফলে এ কথা বলাই যায় যে, তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার পথ সেই ম্যাজিক ল্যান্টার্নের যুগ থেকে নির্বাক যুগ পার হয়ে সবাক চলচ্চিত্রের যুগ অবধি বিস্তৃত। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে আর কোনও পরিচালকের এই অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নেই। তিনি বাংলা, হিন্দি, মরাঠি ও তামিল ভাষায় ছবি করেছিলেন। 

নির্বাক থেকে সবাক

ডিজি-র সান্নিধ্যে কলকাতায় এসে দেবকীকুমারের নির্বাক বাংলা সিনেমার জগতের সঙ্গে পরিচয় হয়। ‘কল্লোল’ পত্রিকার সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাস ও প্রমথেশ বড়ুয়া তখন ডিজি-র ব্রিটিশ ডমিনিয়ান ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। ডিজি লিখেছেন দেবকীকে কলকাতায় এনে, “দীনেশবাবু, প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে আলাপ করিয়ে জমিয়ে দিলাম।” সেই কোম্পানি নির্বাক বাংলা ছবি তৈরি করত। সে সব ছবির গল্প খুঁজতে ডিজি, দীনেশরঞ্জন ও প্রমথেশ মিলিত হতেন টেরিটি বাজারে মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়ের ম্যাডান কোম্পানির ইংরেজি ছবির ডিস্ট্রিবিউশন অফিসে। এখানে বসেই পড়া হত নানা গল্প। ডিজি-র কথায়, “দীনেশবাবু গল্প শোনালেন কিন্তু দুঃখের বিষয় গল্পটি আমার পছন্দ হল না। দেবকীবাবু লিখবার জন্য ইতিপূর্বে অনেকবার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এবার দেবকীবাবুকে গল্প লিখতে দিলাম।” 

১৯৩০-এ দেবকীবাবু ডিজি-র ব্রিটিশ ডমিনিয়ান ফিল্ম কোম্পানির জন্য নিজের লেখা কাহিনি ও চিত্রনাট্য থেকে তৈরি করেন তাঁর প্রথম নির্বাক ছবি ‘পঞ্চশর’। এই ছবিতে তিনি ডিজি-র সঙ্গে অভিনয়ও করেন। পরের বছর ১৯৩১ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিটের প্রযোজনায় তিনি নিজের গল্প ও চিত্রনাট্য থেকে তৈরি করেন তাঁর দ্বিতীয় নির্বাক ছবি ‘অপরাধী’। তাঁর তৃতীয় নির্বাক ছবি ‘শ্যাডোজ় অব ডেড’ মুক্তি পায় সেই বছরেই। চতুর্থ ও শেষ নির্বাক ছবি ‘নিশির ডাক’। মনে হয় এর পরেই তাঁর মনে সবাক ছবি তৈরি করা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়। ‘চণ্ডীদাস’ ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে দেবকী বসু দেখা করেন বীরেন সরকারের সঙ্গে। বীরেনবাবু তাঁকে পাঠান চিত্রগ্রাহক নীতিন বসুর কাছে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকারের সম্মান লাভ

এই ভাবেই শুরু হয়েছিল দেবকী বসুর প্রচেষ্টা। বীরেন সরকার তখন নিউ থিয়েটার্স শুরু করলেও ব্যবসা তেমন জমছিল না। ফলে সিনেমার ব্যবসা আদৌ চালানো যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন তিনি স্বয়ং। কিন্তু দেবকী বসুর ‘চণ্ডীদাস’ সব কিছুকে বদলে দিয়েছিল। সে কথা স্বীকার করেছেন বীরেনবাবু নিজে, “দেবকীবাবুর কাছে আমরা গ্রেটফুল বোথ ইন বেঙ্গল অ্যান্ড হিন্দি মার্কেট। তিনিই আমাদের ওভারঅল এস্টাবলিশ করে দিয়ে গেছেন।”

এর পরে নিউ থিয়েটার্সের জন্য দেবকী বসু পরপর ছবি করতে থাকেন। বাংলায় চণ্ডীদাস (১৯৩২) ও হিন্দিতে ‘পুরাণ ভগৎ’ (১৯৩৩)। এই দু’টি ছবি প্রথম নিউ থিয়েটার্সের হাতি মার্কা লোগোকে জনপ্রিয় করে দেয় সারা ভারতে। দেবকীবাবুই বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমায় নতুন প্রযুক্তির অবতারণা করেছিলেন। বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিটের হয়ে ‘অপরাধী’ নির্বাক ছবি করতে গিয়ে তিনি প্রথম চিত্রগ্রহণের কাজে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার চালু করেন। ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে প্রথম আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার শুরু করেন আর ‘পুরাণ ভগৎ’-এ ভারতীয় সিনেমায় নেপথ্যে থেকে অভিনেতাদের জন্য গান গাওয়া বা প্লে-ব্যাক প্রযুক্তির ব্যবহার করেন। ১৯৩৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানির হয়ে দেবকী বসু তৈরি করেন ‘সীতা’ ছবিটি। সেই বছরেই হিন্দি ভাষার এই ছবি ভারতীয় সিনেমাকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে। ‘সীতা’ই প্রথম ভারতীয় ছবি, যা কোনও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয় ও পুরস্কার পায়। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অনারারি ডিপ্লোমা’ পুরস্কার পায়। দেবকী বসুই প্রথম ভারতীয় পরিচালক যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে নিজের ছবির জন্য পুরস্কার নিয়েছিলেন। 

প্রসঙ্গত, ছবিটি ‘মুসোলিনি কাপ’ পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিল। আজ ফিরে দেখলে দেখা যাবে ১৯৩৪ সালে ‘সীতা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মুসোলিনি কাপ’-এর জন্য লড়েছিল রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির ‘ম্যান অফ অ্যারঁন’, ফ্র্যাঙ্ক কাপরার ‘ইট হ্যাপেন্ড ওয়ান নাইট’, জর্জ কিউকারের ‘লিটল উয়োম্যান’ ও জেমস হোয়েলের ‘ইনভিজ়িবল ম্যান’-এর মতো ছবির সঙ্গে।

১৯৫৯ সালে নবম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেবকী বসু আবারও হাজির হয়েছিলেন তাঁর ‘সাগর সঙ্গমে’ ছবিটি নিয়ে। এই ছবি সে বছর ‘স্বর্ণভল্লুক’ বা গোল্ডেন বেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। প্রতিযোগিতা বিভাগে তাঁর ছবির পাশাপাশি আকিরা কুরোসাওয়া ‘দ্য হিডেন ফোর্ট্রেস’ ও সিডনি ল্যুমেট ছিলেন ‘দ্যাট কাইন্ড অফ উয়োম্যান’ ছবি নিয়ে। এঁদের মতো আরও অনেক জগদ্বিখ্যাত পরিচালকের ছবি দেখানো হয়েছিল সে বছরের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে। দেবকী বসু আঞ্চলিক ছবির জগৎ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার এক জন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিকের অনেক আগেই। ১৯৫২ সালে ইডেন গার্ডেনে প্রথম যে চলচ্চিত্র উৎসব হয়, তার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন দেবকী বসু। সে কালের টালিগঞ্জের ইন্দ্রলোক স্টুডিয়োয় বিদেশি অভ্যাগতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফ্র্যাঙ্ক কাপরা। উৎসবের উদ্বোধন করেছিলেন দেবকী বসু। ভারতের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর আত্মিক যোগ ছিল। 

চটি-জুতো খুলে সুচিত্রা সেনের সিনেমা দেখতেন দর্শক

দেবকীকুমার বসু সারা জীবনে মোট চারটি নির্বাক ও বত্রিশটি সবাক ছবি তৈরি করেছিলেন। তার মধ্যে একুশটি বাংলা, বারোটি হিন্দি, একটি মরাঠি (‘আপনা ঘর’), তামিল একটি (‘রত্নদীপম’) ও উর্দু একটি (‘দুলারি বিবি’)। তাঁর নিজের প্রযোজনা সংস্থার নাম ‘চিত্রমায়া’। দুঃখের বিষয়, সংরক্ষণের অভাবে পাঁচটি বাংলা ও একটি হিন্দি ছাড়া তাঁর বাকি ছবিগুলি আমরা আর কোনও দিনও দেখতে পাব না। 

‘চণ্ডীদাস’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সীতা’ ও ‘সাগরসঙ্গম’-এর পরে অন্য যে ছবিটি বাংলার দর্শককে মোহিত করেছিল, সেটি ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ (১৯৫৪)। শোনা যায়, এই ছবি তৈরির সময়ে শুটিং চলাকালীন পুরো ইউনিট নিরামিষ খাবার খেতেন। বাড়ি থেকে তাঁর মেয়ে গীতা সকলের জন্য রান্না করে পাঠাতেন। দেবকীবাবুর যুক্তি ছিল, বৈষ্ণবসাহিত্য নিয়ে ছবি হচ্ছে, সকলেরই উচিত খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারেও সাত্ত্বিক থাকা। তাঁর নাতি দেবাশিস বসু জানালেন, “ছবিমুক্তির পর বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রে সুচিত্রা সেনকে দেখতে দর্শক চটি-জুতো খুলে রেখে প্রেক্ষাগৃহে ঢুকতেন। ছবিটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বিষ্ণুপ্রিয়াকে সৃষ্টি করেছিলেন সুচিত্রা সেনের মধ্য দিয়ে।’’

সুচিত্রা সেন জানিয়েছিলেন, “প্রত্যেক দিন তো বটেই, এমনও হয়েছে, এক দিনেই বেশ কয়েক বার। দেবকীবাবু আমার কণ্ঠে শুধু এক বার শুনতে চাইতেন কয়েকটা শব্দের একটি নাম, ‘হ্যাঁ, বিষ্ণুপ্রিয়া’।’’ সুচিত্রার নিজের বয়ান হল, “দেবকীবাবু ছিলেন সেই জাতের শিল্পী, যিনি সুরে, রসে, অনুভবে সৃষ্টির একটি বিশেষ ছন্দোময় পরিমণ্ডল গড়ে তুলতেন। আমি বলতে পারি আমার শিল্পীজীবনের সূচনায় যথার্থ অভিনয়ের কিছু অনুভব অবশ্যই দেবকীবাবুর নিকট পেয়েছি।” এই ছবি সুচিত্রা সেনের জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন দেবকীপুত্র চলচ্চিত্রকার দেবকুমার বসু। তাঁর মতে, “সুচিত্রা সেন যে অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন, তা সম্ভব হয়েছিল বাবার এই ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করার জোর থেকেই।” 

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

স্ত্রীর সঙ্গে দেবকী বসু।

পারিশ্রমিকের অঙ্ক আড়াই লক্ষ!

ছবিতে চৈতন্যদেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বসন্ত চৌধুরী। তাঁর অনুভবে “দেবকীকুমারের শিল্পসত্তার যে পরিচয় আমি ওই ছবিতে পেয়েছি তার ভিত্তিতে বলতে পারি, দেবকীকুমার মনে প্রাণে বৈষ্ণব সাধনার রসে আপ্লুত ছিলেন।” উত্তমকুমারকে তিনি ডাকতেন ‘মিস্টার উত্তমকুমারবাবু’ বলে। দেবকীবাবুর দু’টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। ‘চিরকুমার সভা’ ও ‘নবজন্ম’। উত্তমকুমার লিখেছেন, “দেবকীবাবুকে আমি শুধু সার্থক চিত্রস্রষ্টা হিসেবেই চিনিনি, জেনেছি খাঁটি দার্শনিক হিসেবেও।” দেবকীকুমার বসুর সঙ্গে সেই সময়ে যাঁরাই কাজ করেছেন, তাঁরাই মুগ্ধ হয়েছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্বে। তিরিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশক দেবকীবাবু মহীরুহের মতো অবস্থান করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের দুনিয়ায়। ছবি পিছু তাঁর পারিশ্রমিক ছিল আড়াই লক্ষ টাকা! সে যুগে যা ছিল কল্পনার অতীত।

মেনকা সিনেমার পাশে তাঁর করা সাধের বাড়িটি আজও আছে। সেই বাড়িতে এক কালে চলচ্চিত্র, সাহিত্য, রাজনীতির গণ্যমান্য মানুষের আনাগোনা ছিল। কলকাতায় এলে পৃথ্বীরাজ কপূর এই বাড়িতেই উঠতেন। পরবর্তী কালে রাজ, শশী কপূরদেরও আস্তানা ছিল এই বাড়িই। স্ত্রী, পুত্রকন্যা নিয়ে ভরা সংসার ছিল দেবকীবাবুর। বাবার নানা কথা ধরা দেয় দেবকুমার বসুর স্মৃতিতে, “দিনের পর দিন দেখেছি উত্তমকুমার আসতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন বাবার সঙ্গে। সত্যজিৎ আসতেন। ঋত্বিক আসতেন। বাবার মৃত্যুর পরে ওঁকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্র করেন মৃণাল সেন। তার জন্য বাবার একটি বড় ছবি, যেটা আমাদের বাড়িতে টাঙানো ছিল, সেটা চেয়ে এক দিন ফোন করলেন। আমি বললাম, অসুবিধে নেই, দারোয়ান দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। উনি বললেন, না, আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব। এমনই ছিল শ্রদ্ধা।” 

শিল্পের জগতে চলচ্চিত্রের স্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে ১৯৫৮ সালে জব্বলপুরে নিখিল ভারত সাহিত্য সম্মেলনে ভাষণ দিতে উঠে দেবকী বসু বলেছিলেন, “...সাহিত্যের যিনি দেবী তিনি শুধু বাগ্‌দেবীই নন, তিনি বীণাপাণিও। সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলার যিনি মাতৃস্বরূপা, তিনি চলচ্চিত্রের বিমাতা নন।” সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের সম্পর্কও তাঁকে বুঝে নিতে হয়েছিল। এর মধ্যেকার বিরোধের সমাধানে তাঁর মতের সমর্থন তিনি পেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। দেবকীবাবু এক বার রবীন্দ্রনাথের ‘তপতী’ নাটক থেকে ছবি করার জন্য রবীন্দ্রনাথের অনুমতি চেয়েছিলেন। কবিকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ছবির প্রয়োজনে কাহিনির কিছু রদবদল করে দেওয়ার জন্য। এতে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু দেবকীবাবুর অনুরোধ রেখে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “চলচ্চিত্র চোখের সামনে দ্রুত চলে যায়, বই পড়ার মত প্রয়োজন হলে পিছনের পাতা খুলে আবার তাকে পড়া যায় না। দ্রুত দেখার সাথে তাকে দ্রুত বুঝেও নিতে হয়। ছবির জন্য গল্প উপন্যাস নাটকের নিশ্চয়ই স্থানে স্থানে পরিবর্তন করে নিতে হবে।” 

সে দিন নিজেকে ধন্য মনে করেছিলেন দেবকীকুমার। সাহিত্যে যে সব অপূর্ব গল্প-উপন্যাস আছে, তাকে চলচ্চিত্রে বদলানো উচিত নয় বলে সে কালে অনেকেই মনে করতেন। জব্বলপুরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাহিত্যিকদের তিনি বলেছিলেন, “চলচ্চিত্রেও একটা সৌন্দর্য্য আছে। সাহিত্যিকদের সেদিকে দৃষ্টি দেবার জন্য আবেদন করছি আমি।” বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের চিত্রস্বত্ব কিনে রেখেছিলেন দেবকীবাবু। কিন্তু পরে খুশিমনে সেই স্বত্ব তুলে দিয়েছিলেন সত্যজিতের হাতে। ছবি তৈরি হওয়ার পরে দেবকীবাবুকে বিশেষ শোয়ে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন সত্যজিৎ। ছবি দেখার পর দেবকী বসুর মন্তব্য ছিল, “পরাজয় যে এত মধুর হয়, তা আগে জানতাম না।” ভারতীয় সিনেমায় প্রমথেশ যুগের পরে সূচনা হয় দেবকী যুগের। ১৯৫৫য় ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পায়। দেবকী যুগের অবসানেই শুরু হয় সত্যজিৎ যুগ। 

আজন্ম বৈষ্ণব ভাবধারায় নিমগ্ন দেবকীকুমার তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সেই মানবতার সাধনাই করে গিয়েছেন। তাঁকে অনেকে বৈষ্ণব চলচ্চিত্রকার বলে থাকেন। তাঁর শেষ কাজ ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তৈরি ছবি ‘অর্ঘ্য’। ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘পূজারিণী’, ‘দুই বিঘা জমি’, ‘অভিসার’ এবং ‘পুরাতন ভৃত্য’ এই চারটি কবিতার চলচ্চিত্র রূপ দেন তিনি। এর দশ বছর পরে ১৯ নভেম্বর ১৯৭১, দেবকীকুমার বসু আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর  চলে যাওয়ার মুহূর্তটিও বড় অদ্ভুত। 

কন্যা গীতা দত্ত লিখেছেন, ঘটনার দিন দেবকীবাবু ফোন করে জানান যে, বেলুড় মঠের এক জন বড় সাধু মারা গিয়েছেন, যিনি গীতাকে খুব স্নেহ করতেন। তার পরে বলেন, “এভাবে সবাই যাবে, তোমার বাবাও একদিন যাবে।” কথাটা শুনতে ভাল লাগেনি গীতার। তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাত্রেই ফোন আসে, দেবকীবাবুর শরীর ভাল নেই। সকলের সঙ্গে গীতাও পৌঁছে যান বাবার কাছে। দেবকীকুমারের শেষ মুহূর্তটি আসার অপেক্ষা। পুত্রবধূ শিপ্রার কোলে মাথা রেখে তাঁর চলে যাওয়ার পরে সকলে আবিষ্কার করলেন, টেবিলে পড়ে রয়েছে একটি ছেঁড়া পাতা। তাতে লেখা, “সব মানুষ সমান, মানুষ কেন, সকল জীবজন্তুও মানুষের মত সমান। এ শুধু সামাজিক কথা নয়। নিজের অন্তরতম সত্তার কথা। এই আমি যেন অন্য কেউ। জীবন্ত সব এক, এই ব্রহ্ম বুদ্ধি।” বৈষ্ণব ভাবধারা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল এই পৃথিবীর প্রাণিজগতের সবচেয়ে পুরনো এক উপলব্ধিতে। যার প্রথম উচ্চারণ ছিল  ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।

ঋণ: দেবকুমার বসু, 

দেবাশিস বসু