সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রানু-কাহিনি

হতে পারতেন গায়িকা। হলেন লেখিকা। স্বামী বুদ্ধদেব বসুর পাশেও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলও কুশীলব তাঁর জীবন-নাট্যে। নানা ঝোড়ো দুর্যোগের বাঁকে প্রতিভা বসুর জীবন, ইতিহাসেরও এক অভিযাত্রা লিখছেন ঋজু বসু

protiva bose

সে-ও এক ভয়ংকর ঝড়ের রাতের গল্প। মফস্সল শহরের একটি মেয়ের ঝড়ের রাতের অভিসার।

পটভূমি নিউ ইয়র্ক। প্রবল তুষারঝড়ের ভ্রুকুটিতে কাকার বাড়িতে বেড়াতে এসেও ঘরবন্দি অনেক দূরের ছোট বিশ্ববিদ্যালয় শহরের তরুণী এক ছাত্রী। দিনের পর দিন বেরোতে না-পেরে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। একদিন বিকেলে জোর করেই ট্যাক্সিতে উঠে বেরিয়ে পড়ল শহরের অন্য প্রান্তে বন্ধুর বাড়ির পার্টিতে যোগ দিতে। সে-রাতে ফেরার পথেই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। শোঁ-শোঁ হাওয়া, কনকনে ঠান্ডা আর জনহীন শহরে কোনওমতে ট্যাক্সি খুঁজে পেয়েছিল মারিয়া। কিছুটা ভয় কাটাতেই আপাদমস্তক মুড়ি দেওয়া স্টিয়ারিংয়ে মগ্ন ট্যাক্সিচালক ছেলেটির সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করছিল। ছেলেটি ছাত্র। ট্যাক্সি চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার রেস্ত জোটাচ্ছে। এটুকু জেনে মনটা প্রফুল্ল হতেই মারিয়া আবিষ্কার করল মেঘমন্দ্র স্বরের সেই ট্যাক্সিচালক এক কালো মানুষ!

প্রতিভা বসুর কথা ভাবতেই তাঁর ‘রূপান্তর’ নামের গল্পটির কথা মনে পড়া হয়তো সঙ্গত হল না। আবার এই ২০২০তে মনে পড়াটা ঠিক অসঙ্গতও বলা যাচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড়-অতিমারি-লকডাউনের টাটকা বাস্তবতা। সেই সঙ্গে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে উত্তাল ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-আন্দোলনে গর্জমান আমেরিকার ছায়া। ৫০-৫৫ বছর আগের গল্প, কেমন সমসময়ের আরশি হয়ে ওঠে। আজকের আমেরিকাকে পড়তে বুঝতেও এ যেন চাঁদমারিতে অব্যর্থ শরসন্ধান। ১৯৬০-এর দশকে বক্তৃতা-অধ্যাপনার কাজে স্বামী বুদ্ধদেব বসুর আমেরিকা-সফর। প্রতিভাও তাঁর সঙ্গী। জৌলুস-বিত্তের আড়ালে আমেরিকার ভিতরের এক আমেরিকা কিন্তু তাঁর চোখ ও বোধকে ফাঁকি দিতে পারেনি।

‘নিগ্রো’ শব্দটি তখনও যুগের লব্জ। মারিয়া চরিত্রটিকে যত্নে ফুটিয়ে তুলতে তুলতে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই জমাটি গল্পকার প্রতিভা জানিয়ে দিচ্ছেন, মেয়েটির মনের তলার একটি খবর। মারিয়ার ভীষণ বিদ্বেষ ‘নিগ্রো’দের উপরে।

‘তাদের সে ভয় করে, ঘেন্না করে। অত ভাল মারিয়া অমন হৃদয়বতী, সত্যবাদী, সচ্চরিত্র, সমাজসেবিকা, এই একটা ব্যাপারে তার মায়া মমতা ধর্ম সমস্ত পাশবিক হয়ে ওঠে। যদি কোনও উপায়ে এদের দেশ থেকে উচ্ছেদ করতে পারত সকলের আগে সেই মহৎ কাজটা সেরে নিত।’

কত দূর দেশের, কত দিন আগের একটি চরিত্র, তবু আমাদের কী ভীষণ চেনা মনে হয়। ঝড়ের রাতে আমেরিকার এই সাদা-কালোর গল্প বলার মধ্যে প্রতীকী ব্যঞ্জনা আছে। এমন প্রবল ঝড়ের রাতেই তো খানখান হয় কত মানুষের আজন্মলালিত সংস্কার।

 

আজি ঝড়ের রাতে

ঝড় প্রতিভা বসুর জীবনে বারবার এসেছে। ‘রূপান্তর’ গল্পটিতে আমেরিকার তুষারঝড়ের বর্ণনা, উচ্চকিত না-হয়েও অমোঘ। ফুলেফেঁপে ওঠা হাডসন নদীর তীরে ট্যাক্সিচালকের সাবধানী স্টিয়ারিং চালনাতেই তা স্পষ্ট।

কালোমানুষটির ট্যাক্সিতে মারিয়াও তো ভয়ে কাঁটা ছিল অন্য ঝড়ের আশঙ্কায়! ঘটল উল্টোটা। সে নামার পর তুষারঝড়ে বেসামাল মেয়েটিকে নদীর ঢালে গড়িয়ে পড়ার সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটিই বাঁচায়। পৌঁছে দেয় বাড়ির অন্দরের উষ্ণ নিরাপত্তায়।

এতকালের সঞ্চিত বিদ্বেষটাকে প্রাণপণে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়েও হেরে যায় মারিয়া। নারীর গভীর মমতায় টনটন করে ওঠে ভিতরটা। সে টের পায়, ‘তার দেহেমনে স্বাদ জাগিয়েছে এই প্রথম পুরুষ।’

এর ঢের পরে মাঝসত্তরে পৌঁছে যখন প্রতিভা ‘জীবনের জলছবি’ লিখছেন, তখনও স্পষ্ট ছোটবেলার এক দুর্জয় ঝড়ের ছবি। বাবা আশুতোষ সোম এগ্রিকালচারাল অফিসার। ফরিদপুরের মাদারিপুরে সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন। তখনও পাকা কোয়ার্টার পাননি। টিনের চালের এক অস্থায়ী ডেরায় ঝড়ের রাতে ঘরের ছাদটা বারবার সরে যেতে দেখেছিল বালিকা রানু তথা প্রতিভা। চাল সরে যেতেই অপরূপ টকটকে আকাশের দৃশ্য। ভয়ের ছবি, কিন্তু মুগ্ধতারও।

জীবনে বদল আনা এমন ঝড়ের মুখোমুখি বহু বার হয়েছেন প্রতিভা। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে। বড় মেয়ে মিমির (মীনাক্ষী) বর জ্যোতির (জ্যোতির্ময় দত্ত) চোখে প্র.ব. নিছকই এ কালের নন, একটি ক্লাসিক চরিত্র। ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের কবিতা-ভবনে বিশ শতকের নাগরিক বাঙালি আধুনিকতা সৌধের, প্রতিভাও এক জন স্থপতি। আবার সেই চাঁদের হাট মিলিয়ে যেতেও দেখেছেন। সুখসমৃদ্ধির শিখর থেকে প্রিয়জনের চরম দুর্বিপাকে তলিয়ে যাওয়ার সাক্ষী প্রতিভা। চরম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, পুত্রশোকের হতাশার খাদ ছুঁয়েও যিনি কলম ধরেছেন। ঘরদুয়ার, পাতানো ছেলেমেয়ে, সাহায্যকারিণী, পুষ্যি কুকুরদের আগলে রাখছেন। গ্রিক ট্র্যাজেডির নারীর মতোই দুঃখের ঝড় বয়ে প্রতিভা বারবার উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।

 

জমিদারি থেকে কলোনির গলি

সাবেক ঢাকার মফস্সলি জীবনেই অসম্ভব স্নেহশীল বাবার সাহচর্য এ মেয়ের জন্য গোটা দুনিয়ার জানালা হাট করে খুলে দিয়েছিল। আশুতোষ সোম সত্যি এক আশ্চর্য মানুষ! বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’-এর রাজেনবাবুর মধ্যে তাঁকেই দেখতেন কাছের জনেরা। খুব ছোটবেলায় চুঁচুড়ায় খুড়তুতো দিদি লিলিদির বিয়ের আগের কনেদেখা অনুষ্ঠানের অশ্লীলতায় কুঁকড়ে গিয়েছিল রানু। আশুবাবু তখনই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, মেয়েকে কখনওই এ ভাবে বিয়ে দেবেন না। “খুব ভাল একটা ছেলেকে মাস্টার রেখে দেব, তার সঙ্গে লাভ ম্যারেজ হবে।” 

পরে ঢাকার অসম্ভব মেধাবী তারকা-সাহিত্যিক কিন্তু লক্ষ্মীর সাধনায় অপটু যুবক বুদ্ধদেব বসু রানুকে বিয়ের কথাটা পাড়ার পরে লাজুক আশুবাবু আকাশ-বাতাস দেখছিলেন। হবু পাত্রের জীবিকা নিয়ে অনিবার্য প্রশ্নসমূহ মেয়ের মাকেই করতে হয়েছিল। জামাইয়ের আর্থিক সঙ্গতির থেকে আত্মপ্রত্যয়টুকুই প্রতিভার বাবার কাছে বেশি নম্বর পেয়েছিল।

বিক্রমপুরের হাঁসাড়ার জমিদার ঘরের মেয়ে, মা-বাবা-পিসি-মামি-ঠাকুমাদের আদরের বলয়ে সুরক্ষিত রানু সোমের সেই পৃথিবীটাই পরে মহাঝড়ের মুখোমুখি হয়। দেশভাগের পরে সর্বস্ব খুইয়ে আশুবাবুর পরিবার আশ্রয় নিয়েছে রিফিউজি-পাড়ায়। বিজয়া দশমীর পরের সকালে গা-ভরা গয়নায় প্রজাপত্তনিদের মাঝে জমিদার-গিন্নি দিদার ছবিটা মনে পড়েছিল প্রতিভার। সেই বৃদ্ধার জীবন তখন শেষ হচ্ছে শতচ্ছিন্ন দারিদ্রে, মাদার টেরিজ়ার নির্মল-হৃদয়ে।

বিজয়গড়ের কলোনির কাদা ছপছপে গলিতে কোনও এক সন্ধ্যায় প্রতিভার দরমা-ঘেরা টালির চালের বাপের বাড়িতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাজির হন পক্ককেশ পুরু ফ্রেমের চশমাধারী বিশ্ববরেণ্য সত্যেন বসু। ঢাকার হারানো দিনের গল্পে জীবন্ত হয় অতীত। যেন এক মহাকাব্যিক ক্রান্তিকাল দেখছে পৃথিবী!

 

টাক মাথা ও বাবরি চুল

“দিলীপ রায়ের টাক মাথাটা ফাটাতে পারিনি, এ বার তোর বাবরি চুলের মাথাটা আর আস্ত রাখব না।”

কবেকার ঢাকায় বনগ্রামের মোড়ের কাছের এই সংলাপ আজীবন খোদাই হয়ে গিয়েছিল প্রতিভার বুকে। সেই বাবরি চুলের অধিকারী যুবকটি একমেবাদ্বিতীয়ম কাজী নজরুল ইসলাম। রাত দশটায় রানু সোমের বাড়িতে গান-আড্ডার এক আনন্দঘন সন্ধ্যার শেষে হেঁটে হেঁটে তাঁর ডেরায় ফেরার সময়ে আক্রান্ত হন তিনি।

রানুর বাবার কাছে ছকে-বাঁধা স্কুলজীবনের থেকেও গুরুত্ব পেত ঝোঁক অনুযায়ী সৃষ্টিশীল উৎকর্ষের চর্চা। কিন্তু লখনউয়ের উস্তাদ গোল মহম্মদ খান কিংবা মেন্টর দিলীপকুমার রায়ের কাছে কিশোরী রানুর সঙ্গীত-শিক্ষা ভাল চোখে দেখতেন না পড়শিরা। তবলার শব্দে রাতভর ঢিল পড়ত বনগ্রামের সেই বাড়িতে। নজরুল ইসলামও সেই ক্ষুদ্রমনা বঙ্গ পল্লিসমাজের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন। লাঠিধারী হামলাবাজদের ঠেকালেও রানুকে গান তোলানোর অপরাধে নজরুল জখম হন। আশুবাবু হট্টগোল টের পেয়ে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনেছিলেন। নজরুল তখনও হাসি-ঠাট্টায় সব-কিছুতে প্রলেপ দিতে চাইছেন। তাঁর শুশ্রূষাতেই গোটা পরিবারটির বিনিদ্র রাত কেটেছিল।

রমনায় বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর বাড়ির জলসায় দিলীপ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ রানু ওরফে প্রতিভার জীবনের একটি বাঁক। ঢাকায় তাঁর গানের গুণেই সুবিদিত রানু সেখানে ডাক পেয়েছিলেন। শুধু তো গান শেখা নয়, প্রতিভা বসু পরে লিখেছেন, মার্জিত শিক্ষিত পরিপূর্ণ তরুণ দিলীপ রায়ের সান্নিধ্যেই প্রথম ‘কালচার’ শব্দটির অর্থ অনুধাবন করেন তিনি। বহু ভাষাবিদ, সংবেদী পণ্ডিত দিলীপ রায়ের সঙ্গে তুলনীয় বুদ্ধদেব বসু ছাড়া আর কাউকেই দেখেননি তিনি। সেই দিলীপ রায়ের সূত্রেই ঢাকার এক আটপৌরে বিকেলে প্রতিভার জীবনে আনন্দ, হাসি, গান, সুরের প্রতিমূর্তি ঝোড়ো যুবক নজরুল ইসলামের ছায়া পড়েছিল।

বয়সে প্রায় দু’দশকের বড়, রূপে-গুণে তখনকার বাংলাদেশ মাতানো তিন জন যুবকের একজন নজরুল। রানুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আভাস আছে প্রতিভা বসুর ‘আয়না’ গল্পটিতে। পরমা আর ইউসুফ, গানের টানে জড়িয়ে পড়া দুই অসমবয়সি নারীপুরুষ। নজরুল তখন বিবাহিত। কলকাতায় কর্মময় ব্যস্ত জীবন। স্বাভাবিক নিয়মেই যোগাযোগের সেতু আলগা হয়েছিল। তবে নজরুলের ট্রেনিংয়ে গান রেকর্ড করতে কলকাতায় গিয়েছিলেন রানু। দুঃখের কথা ইউটিউবে রানু সোম বা গায়িকা প্রতিভার হদিশ নেই। কিন্তু ‘কিন্নরকণ্ঠী কোকিলকণ্ঠী রানুমণিকে কবিদা’ লেখা নজরুলের গানের বইয়ের উৎসর্গ বাক্যটি প্রতিভা বসুর শিল্পী-জীবনের স্মারক। নামী গাইয়ে রানু সোম যে কোনও দিন তাঁকে পাত্তা দেবেন, সাহিত্যের তরুণ তুর্কি বুদ্ধদেব বসুও তা আশা করেননি।

 

রবীন্দ্রনাথ, ওরে বাবা!

কলকাতায় বুদ্ধদেবের সঙ্গে ভাব ও বিয়ের পরে ১৯৩৪-এর জুলাইয়ে ঢাকার পাট চুকল প্রতিভার। এর পরেই নববধূকে জোড়াসাঁকোয় নিয়ে গিয়েছিলেন বুদ্ধদেব। তখনই তাঁকে দেখে হতচকিত রবীন্দ্রনাথ। “একে তো আমি চিনি। সেই গাইয়ে কন্যাটিকেই তুমি বিয়ে করলে তাহলে...” আশৈশব হিন্দুস্তানি পরিচারকদের রামলীলা, মুকুন্দ দাসের যাত্রাপালা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, টপ্পা-ঠুমরির সুরে লালিত কিশোরী রানু সোমের গান-জীবনের একটি দিকচিহ্ন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যও বটে। চমকপ্রদ ভাবে তা ঘটে শৈলশহর দার্জিলিংয়ে। এখানেও অনুঘটক দিলীপকুমার রায়। রানুর দিদার শরীর খারাপের জেরে সোম-পরিবার তখন বছরখানেক দার্জিলিংয়ে ছিল। রবীন্দ্রনাথ এক মাসের জন্য পাহাড়ে যাচ্ছেন শুনে তিনিই রানুকে লেখেন, এই সুযোগে যতটা সম্ভব শিখে নিতে। শুনে রানুর জবাব, রবীন্দ্রনাথ, ওরে বাবা! এটা জানতে পেরে পরে রবীন্দ্রনাথের ঠাট্টাও সইতে হয় প্রতিভাকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সমর সেন, কামাক্ষী প্রসাদ, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু ও মীনাক্ষী

মন্টু ওরফে দিলীপ রায়ের প্ররোচনায় রবীন্দ্রনাথের তরফেই বৈকালিক চা-পানের ডাক এল মফস্সলি কিশোরীর কাছে। বিশ্বকবির বৌমা প্রতিমাদেবীর লেখা চিঠি, খামের কোণে মনোগ্রাম ‘রঠ’। রোজ ভোরে একেবারে সূর্যোদয়ের সময়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল প্রতিভার। জিমখানা ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে রবি-ঘনিষ্ঠ কলকাতার সম্ভ্রান্ত মহিলামহলের সঙ্গেও গাইতে হয় তাঁকে। যদিও সে অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি। পরে রবীন্দ্রনাথের উপরে ঈষৎ অভিমানে তাঁকে খানিক এড়িয়ে চলেন কিশোরী রানু। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মালঞ্চ’র পাণ্ডুলিপি কপি করে দিতে বলেছিলেন। ‘‘আমার খুব বানান ভুল হয়,’’ বলে সেই আর্জিও ফিরিয়ে দেন রানু। পরে শুনে বুদ্ধদেব স্তম্ভিত, এমন সুযোগ ছাড়লে!

প্রতিভা-বুদ্ধদেবের প্রথম সন্তানের নাম ‘মীনাক্ষী’ রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথই। যদিও ‘উজ্জয়িনী’ বেশি পছন্দ ছিল প্রতিভার। হালকা রাগ-উত্তেজনায় রবীন্দ্রনাথের পা নাচানোর ছবিটি আমৃত্যু প্রতিভার চোখে লেগে ছিল। তখন বুদ্ধদেবের সূত্রে তাঁরা শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের নিমন্ত্রিত অতিথি। ‘‘তোমার স্ত্রী কি তাঁর সব গান তোমাকেই উৎসর্গ করল,’’ বলে রবীন্দ্রনাথের মৃদু বকুনি শুনছেন বুদ্ধদেব।

 

রানু কেন গান করো না

‘জীবনের জলছবি’-তে কত কথা লিখলেও নিজে কোথায় বসে লিখতেন, তা লেখেননি প্রতিভা। মীনাক্ষী ভাবছিলেন, সত্যি মা যে কী ভাবে অত তাড়াতাড়ি লিখে ফেলতেন! বাড়ির নিয়ম ছিল লেখার সময়ে বাবাকে বিরক্ত করা যাবে না। কিন্তু তাঁর ছোটবেলার মায়ের স্মৃতি, রান্নাঘরে ডাল চাপিয়ে পিঠে এক ঢাল চুল খুলে তাঁর ফোল্ডিং ডেস্ক খুলে বসে পড়েছেন প্রতিভা। কাগজে-কলমে খসখস চলছে। অনেক সময়ে লিখে বা অনেকটা লিখে গল্পটা পছন্দ হত না প্রতিভার। তখন কাটাকুটি না করে ফের প্রথম থেকে গল্পটা লিখতেন। মীনাক্ষী বলছিলেন, “মায়ের আলমারিতে এমন অনেক না-হওয়া গল্পের পাতা জমে ছিল।”

তবে স্ত্রীর সাহিত্য-প্রতিভা নিয়ে নির্মোহ সম্ভ্রম ছিল বুদ্ধদেবের। বাংলা সাহিত্য নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন, ‘অ্যান একর অব গ্রিন গ্রাস’-এ সেটাই লিখেছেন। বুদ্ধদেব, সুধীন দত্তেরা বলতেন, এমন চমৎকার সংলাপ আর ক’জন পারে লিখতে। তবে স্ত্রীর গান ছাড়া নিয়ে গ্লানিও বহন করেছেন খুবই।

 বুদ্ধদেব  হঠাৎ হঠাৎ বলতেন, আচ্ছা রানু, তুমি তো আজকাল আর গান করো না।

উত্তরে প্রতিভা বলেছিলেন, কার জন্য গাইব, কেউ তো শুনতে চায় না।

বুদ্ধদেব বলেছিলেন, গান তো মানুষ নিজের জন্যই গায়।

প্রতিভা বলেন, গানের তো ওই দোষ, সে শ্রোতা চায়।

প্রতিভা পরে বিস্তারে লিখেছেন, শুধু শ্রোতা নয় গানের চর্চায় সহশিল্পী, তবলা-এসরাজ-তানপুরাও লাগে। রেওয়াজের নানা ঝক্কি। বিয়ের পরেও কিছু দিন তা বজায় ছিল। কলকাতার উচ্চকোটিতে কিছু অনুষ্ঠান, আকাশবাণীতে রেকর্ডিং। সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন তখন। হেমন্তের সঙ্গে বন্ধুত্বও জীবনভর বজায় ছিল। কিন্তু স্বামী বুদ্ধদেবের ঝোঁকটাই প্রতিভাকে সৃষ্টিশীলতার অন্য দিগন্তে টেনে আনল। বুদ্ধদেব শুধু রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে ভালবাসতেন। প্রতিভার চ্যালেঞ্জ সব্যসাচী সাহিত্যিক-সম্পাদক স্বামীর সহধর্মিণী হয়ে ওঠা।  

 

বিষয় তো ওই প্রেম

গানের সুবাদেই বরেণ্যতম গুণিজনের সান্নিধ্যে এসেছিলেন রানু ওরফে প্রতিভা, যা তাঁর ‘পরম পাওয়া’। কিন্তু বারবার বলেছেন, গান ছাড়তে একফোঁটা কষ্ট হয়নি তাঁর। বরং তাঁকে বিদ্ধ করেছে অন্য একটি কষ্ট, পুরুষশাসিত সমাজে লেখক হিসেবে প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া। “না-পাওয়ার একটাই কারণ, আমি মেয়ে।”

বুদ্ধদেব সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় কেন মেয়েদের কবিতা নেই? শুনে কবিতা লিখে নিঃশব্দে তা নিজের বাড়ির ঠিকানায় ডাকে পাঠিয়েছেন প্রতিভা। সম্পাদক বুদ্ধদেবের কাছে তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। স্বামীর সঙ্গে যৌথ ভাবে লেখার প্রস্তাব পেয়ে লিখতে গিয়েই আচমকা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মনোলীনা’র জন্ম। আর পিছনে ফিরতে হয়নি। নাভানা প্রকাশনার কর্ণধার বিরাম মুখোপাধ্যায় বলতেন, প্রতিভার লেখা তাঁদের লক্ষ্মী। তবু তখনও শুনতে হচ্ছে, বুদ্ধদেব বসু আজকাল বউয়ের নামে লিখে দিচ্ছেন।

অভিযোগ অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। তাঁর ‘প্রতিভূ’ গল্পটির একটি চরিত্রের মাধ্যমে প্রতিভা যেন তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগেরই মুখোমুখি হয়েছেন। গল্পে এক লেখিকাকে জনৈক পাঠিকার প্রশ্ন, ‘তোমার তো ঐ একটাই বিষয়, প্রেম! তুমি তো একজন মেয়ে, তোমার হাত দিয়ে কী করে, এই সব অসংগত অন্যায় ভালবাসার গল্প বেরিয়ে আসে?... মনে হয় তোমার জীবন খুব মসৃণ নয়, সত্য করে বলো দেখি কত পুরুষের সঙ্গে প্রেম করেছ?’

প্রথম উপন্যাস ‘মনোলীনা’-র প্লটেই, স্বামীসন্তানকে ছেড়ে প্রেমিকের সঙ্গী হওয়া একটি মেয়ের টানাপড়েন গাঁথা। যামিনী রায তা পড়ে বুদ্ধদেব-প্রতিভার বাড়িতে চলে আসেন। প্রতিভার অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি এঁকেছেন। ‘বিচিত্র হৃদয়’ গল্পটিতে মা ও মেয়ে দু’জনেই একজন পুরুষের প্রেমে আচ্ছন্ন। ‘মাধবীর জন্য’, ‘সুমিত্রার অপমৃত্যু’, ‘সমুদ্রহৃদয়’ পাঠকমহলে অবিস্মরণীয়। প্রতিভার কাহিনি থেকে একের পর এক হিট ফিল্মের জন্ম। ‘পথে হল দেরি’, ‘আলো আমার আলো’, ‘অতল জলের আহ্বান’...

আনন্দ পুরস্কারের মঞ্চে প্রতিভা বসু

সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিন্দিত তিনি। রাসবিহারীর বাড়িতে এক বিকেলে ভয়ানক উত্তেজিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবেশ। নাম উচ্চারণ করছেন না এমন কাউকে তিনি এ বার পিটিয়েই ঠান্ডা করবেন! জানা গেল, ‘শনিবারের চিঠি’র কোনও লেখায় নাকি প্রতিভার নামে অশ্লীল উক্তি করা হয়েছে।

ঢাকায় গান শেখার জন্য বাড়িতে ঢিল পড়ার মতো এ সব নিন্দেমন্দকেও প্রতিভা ভবিতব্য বলেই মেনে নিয়েছিলেন। লেখার বিষয়ের জন্য নিন্দা, বাড়ির বৈঠকী আড্ডা, সাহিত্য সভায় নামী পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে আড্ডার জন্যও তুমুল নিন্দিত তিনি।

 

ও-দুটি চোখের তাৎক্ষণিকের...

সাহিত্যিকদের আড্ডায় তখন স্ত্রীদের বড় একটা দেখা যেত না। অজিত দত্ত ও বুদ্ধদেব বসু একই ঠিকানায় সপরিবার উপর ও নীচতলায় থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্রদের পরিমণ্ডলে কদাচিৎ তাঁদের স্ত্রীদের দেখা যেত। রাসবিহারীর কবিতাভবনে পরে কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়দের আনাগোনা। জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তীদেরও দেখা গিয়েছে। বসু দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান দময়ন্তীর (রুমি) জন্মের আগে থেকেই বাড়িতে থিয়েটারেরও ধুম লাগে। নিউ থিয়েটার্সের আর্ট ডিরেক্টর সৌরেন সেনও তখন থেকেই বসু দম্পতির পরম সুহৃদ।

নিয়মিত আগন্তুক পুরুষকুলের মধ্যে সুভদ্র, পরিশীলিত গৃহকর্ত্রীটির প্রতি মুগ্ধতা ছিলই! কিন্তু কবিতাভবনের অতিথিদের মধ্যে প্রতিভার নিজেরও বন্ধু বলতে বয়সে ছোট চার জন যুবক। তাঁরা হলেন কবি-অধ্যাপক নরেশ গুহ, কবি অরুণকুমার সরকার, অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র এবং অধ্যাপক  নিরুপম চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের আনাগোনা শুরু ১৯৫০-এর দশকের কাছেপিঠে।

নিছকই বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী নন। আলাদা মানুষ হিসেবেই তাঁদের বন্ধুতা, ভালবাসা প্রতিভা অর্জন করেন। মীনাক্ষী লিখেছেন, একবার দল বেঁধে চাইবাসায় বেড়ানোর সময়ে নিরুপম রোজ পাশের ঘর থেকে প্রতিভাকে ডাকে চিঠি লিখছেন। “এই দলের সকলেরই মার প্রতি ছিল প্লেটনিক প্রণয়রঞ্জিত অনুরাগ।”

‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু তাঁর স্ত্রীর এই চৌম্বক আকর্ষণকে কী চোখে দেখতেন? তাও পরখ করা হয়েছে। শ্রীযুক্তা প্রতিভা বসুর উদ্দেশে লেখা, অরুণ সরকারের ‘জন্মদিনে’ কবিতাটি ছাপাতে দ্বিধা করেননি বুদ্ধদেব। বু.ব. সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’তেও তা ঠাঁই পেয়েছে।

সিন্দুক নেই; স্বর্ণ আনিনি,

এনেছি ভিক্ষালব্ধ ধান্য

ও-দুটি চোখের তাৎক্ষণিকের

পাব কি পরশ যৎসামান্য?

এ কবিতা তখন বসুদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অনেকেরই মনের কথা।

 

কবিতাভবন-কথা

পরে প্রতিভার বড় নাতনি তিতিরের (কঙ্কাবতী দত্ত) কিশোরীবেলায় সাহিত্যিক-সাংবাদিক সন্তোষকুমার ঘোষ মজা করতেন মিমি-রুমিদের সঙ্গে, দিদা-নাতনির আকর্ষণের মাঝে তোমরা নিতান্তই ‘মধ্যপদলোপী সমাস’। শুধু কাব্যসাহিত্য নয়, আখরোট কাঠের কাশ্মীরি ট্রেতে পটভর্তি চা, হালকা ফুলআঁকা পেয়ালায় স্বহস্তে ছেঁকে দেওয়া গৃহকর্ত্রীটি স্বয়ং কবিতাভবনের সংস্কৃতির প্রতীক। কখনও থাকত বহুবিশ্রুত মাংসের শিঙাড়া। বুদ্ধদেব বসুর সপ্তাহভর স্বাদবদলের মেনু চার্টে লেখা থাকত। ছক-ভাঙা গেরস্থালির মধ্যে প্রতিভার লক্ষ্মীঠাকুর জলবাতাসা পেতেন, আবার রবিবাসরীয় হেঁশেলে রাঁধা বিফের ঝোলও স্বাগত।

বৌদ্ধিকচর্চায় একনিষ্ঠ ভোলাভালা স্বামীকে একফোঁটা ব্যতিব্যস্ত না করেই এই মসৃণ জীবনচক্র অটুট রাখতেন প্রতিভা। দরকারে বই বাঁধাই থেকে সুচারু নকশায় ছেলেমেয়েদের জামাকাপড় স্বহস্তে তৈরি করেছেন। গয়নায় মোহ নেই। বহু পারিবারিক সঙ্কটে, প্রতিভার গল্প সিনেমায় বিক্রির টাকা বা জমানো আধুলির সঞ্চয়ও ত্রাতা হয়েছে। তাঁর বুদ্ধিতেই নাকতলা, বৈষ্ণবঘাটা, শান্তিনিকেতনে বাড়ি ওঠে বসুদের।

বৈষ্ণবঘাটার বাড়ি বিক্রির টাকা দুঃসময়ের অবলম্বন হয়। পোষ্য কুকুরের থেকে সংক্রমণে ইঞ্জেকশন নিতে গিয়ে তখন চলচ্ছক্তি হারিয়েছেন প্রতিভা। চলছে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। মিমি-রুমিদের চোখে তাঁদের মা একজন সর্বাঙ্গসুন্দর মানুষ। ৯১ বছরের দীর্ঘ জীবন শেষ হওয়ার আগে নাকতলার বাড়িটিও ফ্ল্যাটবাড়িতে ভেঙে তিন সন্তানের পরিবারকে ভাগ করে দিয়েছেন। সন্তানেরা কোনও ঝক্কিই টের পাননি।  

 

ট্র্যাজেডির রঙ্গমঞ্চ

যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্যে বুদ্ধদেবের  ছাত্র, প্রতিভার অত্যন্ত স্নেহের অধ্যাপক অমিয় দেব বলেন, প্র.ব.র হার না-মানা জীবনীশক্তির কথা। দশ হাতে সংসার-সাহিত্য সামলানো প্রতিভা ইঞ্জেকশন-বিভ্রাটে শয্যাশায়ী হন ১৯৭২-এ। সে দুর্যোগ না-কাটতেই ’৭৪-এর মার্চে অকস্মাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে চলে গেলেন বুদ্ধদেব। তার পরও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিভা। বাম আমলের গোড়ার নিত্য লোডশেডিংয়ে ঘরে ২১টা মোমবাতি জ্বেলে নাছোড় লেখালিখি, গল্প সিরিজ় সম্পাদনা চলছিল পুরোদমে। কিন্তু ৪২ বছর বয়সে পুত্র পাপ্পার (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার শুদ্ধশীল বসু) ডায়াবিটিসে মৃত্যু আবারও তছনছ করে দিল জীবন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের অসম্ভব কাছের মানুষ ছিলেন পাপ্পা। স্বাতী বলেন, “পাপ্পার ঘটনার পরও প্রতিভা বসুর কাছে গিয়েছি। আমাদের বিয়েরও আগে, রাসবিহারীর কবিতাভবনে প্রতিভা-বুদ্ধদেবের মধ্যে অন্তর্লীন বোঝাপড়া দেখে মুগ্ধ হতাম। প্রতিভা বসুর সাহিত্য বা সংসারচালনা, আমি তো দু’টিরই ভক্ত। পাপ্পার মৃত্যুর পর ওঁর কষ্ট হৃদয়বিদারক। ভাবলে, এখনও কেঁদে ফেলি।”

১৯৭৮-এর আনন্দ পুরস্কার প্রাপক প্রতিভার মূল্যায়নে আনন্দবাজারে লেখা হয়, পুরুষ ও নারীর ঘরোয়া জীবনই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য। এ কালে নারীবাদের পাঠের নিরিখে তাঁর কাহিনির মেয়েদের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। শেষ দিকের একটি প্রবন্ধে এই নিয়ে অভিমানাহত লেখিকা বলেছেন, তবু বেশির ভাগ মেয়েই তাঁকে সুখদুঃখের সঙ্গী ভাবেন। 

কৈশোরে ঢাকার দাঙ্গা, দেশভাগের সাক্ষী প্রতিভা বিশ্বাস করতেন, হিন্দু-মুসলমানের প্রেমেই সমস্যার সমাধান। তাঁর বহু কাহিনিতে এসেওছে ভিনধর্মে প্রেমের এই প্লট।

পুত্রশোকের নিদারুণ আঘাত থেকে লেখায় ফেরার পরে এই সরল শুভঙ্কর জীবনবোধও কি ঈষৎ টাল খেয়েছিল?

 

‘শেষ নাহি যে’

মহাভারত নিয়ে প্রতিভার প্রবন্ধ পড়ে উত্তেজিত হয়ে তাঁকে বই লেখার জন্য অগ্রিম ধরান, প্রকাশক-কন্যা দময়ন্তী। সেই ‘মহাভারতের মহারণ্যে’ বুদ্ধদেবের ‘মহাভারতের কথা’-র অভিজ্ঞানকেও সপাটে প্রশ্ন করে। প্রতিভার মহাভারত-পাঠে আর্য-অনার্যের টানাপড়েন, শিবনারায়ণ রায়, নবনীতা দেবসেনদেরও প্রাণিত করেছে। ৮২ বছরের লেখিকা দেখছেন, সত্য-মিথ্যা, ধর্ম-অধর্ম কিচ্ছু নেই। আসলে মরাল না-থাকাটাই যেন মহাভারতের মরাল। মহাভারতের ধর্মযুদ্ধকেও ঘোর অধর্ম ভেবেই স্থিত হয়েছেন প্রতিভা। গোটা প্লটটাই যেনতেন ভাবে যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলাভ, রাজ্যজয়কে বৈধতা দেওয়ার ছক।

‘জীবনের জলছবি’র এক জায়গায় লিখেছেন, ‘...সত্য মিথ্যারও তো কোনও অর্থ খুঁজে পাই না। মনুষ্য সমাজে নিরাপদে বাস করতে গেলে যখন যা প্রয়োজন তখন তাই সত্য। যখন যার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল সেটাই মিথ্যে হয়ে গেল।’

জীবনের উপান্তে এসে এই বোধ খুব স্বস্তির নয়। তবু ২০০৬-এ চলে যাওয়ার দিন পনেরো আগেও টেলিফিল্মের জন্য লিখেছেন প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথের ‘নিরন্তর আনন্দধারা’, শ্রীঅরবিন্দের ‘অতি মানসের’ খোঁজ করেছেন শেষ পর্যন্তই। কাছের জনেরা বলেন, বুদ্ধদেবের তুলনায় সহজে নিজের জীবনবীক্ষা ভাঙতে পারতেন প্রতিভা। হয়তো সে-জন্যই নিজের জীবনের আগলে-রাখা টুকরোগুলো বারবার এলোমেলো অগোছালো হলেও হাল ছাড়েননি। 

আবার গুছিয়ে, সাজিয়ে রাখায় হাত দিয়েছেন শেষ পর্যন্ত।

ঋণ: জীবনের জলছবি, ব্যক্তিত্ব বহু বর্ণে (প্রতিভা বসু),বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর সারস্বত গোষ্ঠী (মীনাক্ষী দত্ত), ‘আমার নাই বা হল পারে যাওয়া’(জ্যোতির্ময় দত্ত), আনন্দবাজার পত্রিকা, বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসুর বিভিন্ন বই, শৌনক চক্রবর্তী

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন