• চৈতালি বিশ্বাস
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জ্বলবার মন্ত্র দিলে মোরে

প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সঙ্গীতধারার মেলবন্ধনের পাশাপাশি দিলীপকুমার রায়-এর গানে ধরা পড়েছিল উপমহাদেশের লোকায়ত সুরও। বাংলা গানের নতুন বয়ানও তৈরি করেন তিনি।

Dilip Kumar Roy

১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর। মনের আনন্দে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছেন মানুষটি। আশা, সেই অর্থ সমর্পণ করবেন গুরুর পায়ে। সেই ফাঁকে আরও একবার দর্শন ঘটবে। আরও একবার ঋষি অরবিন্দ তাঁর দিকে চেয়ে হাসবেন। প্রাণ জুড়োবে। গুরুর অসুস্থতার কথা জানা নেই তাঁর।

দিলীপ সকালে গঙ্গাস্নানে এসেছেন কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে। স্নান সেরে মন্দিরে প্রণাম করছেন। সকাল সাড়ে সাতটায় রেডিয়োর খবরে শুনতে পেলেন অপ্রত্যাশিত সংবাদ। ঋষি অরবিন্দ দেহত্যাগ করেছেন।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্ত চলাচল কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি কি ঠিক শুনলেন! তাঁর সাধনমার্গের পথপ্রদর্শক আর নেই? দুঃখে, অসহায়তায় আত্মহারা ততক্ষণে। কোনও মতে চেপে বসলেন পুদুচেরির (তখন পন্ডিচেরি) প্লেনে। এসে দেখলেন, গুরুর দেহ তখনও শায়িত রয়েছে আশ্রমের ঘরে। একবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন দ্রুত।

দিলীপকুমার রায়। 

মনে সেই যে নিদারুণ আঘাত লাগল, সেই ক্ষত আর কোনও কিছুতেই শুকোল না। অরবিন্দের নশ্বর দেহের অনুপস্থিতি ভুলতে পারলেন না। মন অশান্ত হল। সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটল তাঁর বিগত তিরিশ বছরের ঠিকানাস্বরূপ আশ্রমের সঙ্গে। শ্রীমার প্রতি এক নিদারুণ অভিমান থেকে দূরে সরে গেলেন। চললেন স্বেচ্ছানির্বাসনে।   

১৯২৮ সাল। 

‘হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা’— ঋষি অরবিন্দের প্রতি প্রগাঢ় এই বিশ্বাসে নিজের পূর্বজন্ম ভুলে চলে এলেন মানুষটি। পৈতৃক ভিটেবাড়ি বেচে দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন তত দিনে। সব টাকা দান করেছেন আশ্রমে। স্থির করেছিলেন ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে হবে। সাধনার মধ্য দিয়ে সে পথে যাত্রা করতে গেলে আগে নিঃস্ব হতে হয়। উজাড় করতে হয় সব কিছু। আমার নিজস্ব কিছু আছে— এই ভাবনা মুছে ফেলতে হয়। নিজস্ব কিছু থাকলে তো তাঁর হওয়া যায় না! তাঁর অর্থাৎ জগৎপিতার হতে চেয়েই যে এত কিছু। 

অথচ সে পথে হাঁটার জন্য হাত ধরেছিলেন যে গুরুর, সেই প্রাণের মানুষ ঋষি অরবিন্দ সহসাই চলে গেলেন। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল দিলীপের। পুদুচেরির আশ্রমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন নিমেষে। বেরিয়ে এলেন সেখান থেকে। 

এই বৃদ্ধ বয়সে নিরাশ্রয়, অর্থহীন তিনি কোথায় যাবেন?  

তিনি দিলীপকুমার রায়। নাট্যকার  দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র। কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী।

নিরাশ্রয় দিলীপকে আশ্রয়স্থলে পৌঁছে দিলেন তাঁকে গুরু হিসেবে বরণ করা ইন্দিরা দেবী। তৎকালীন মাদ্রাজে নিজের ভগিনী ও ভগ্নিপতির কাছে নিয়ে গেলেন। তার পর মহারাষ্ট্রের বিশিষ্ট ধনী চুনিলাল মেহতা দিলীপকুমারকে আহ্বান জানালেন পুণেয় তাঁর বাংলোয় অতিথি হয়ে থাকার জন্য। ইন্দিরা, তাঁর শিশুপুত্র প্রেমলকে নিয়ে দিলীপকুমার আশ্রয় নিলেন সেখানে।

‘হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা’— এ বিশ্বাসে কখনও ছেদ পড়েনি। গুরু থেকে শুরু করে শিষ্যার হাত ধরে ক্রমশ ঈশ্বরকে উপলব্ধির সাগরে পাড়ি দিয়েছেন। সে পথে বৈতরণী হয়েছে অজস্র গান, সুরধ্বনি। 

দিলীপকুমারের কণ্ঠভাব আর সুরের মাদকতায় অনেক ভক্ত-অনুরাগীর দল জুটে গেল পুণেয়। ক্রমে ক্রমে সেখানে তিনি হয়ে উঠলেন ‘দাদাজি’। বাংলার ঘরোয়া ‘মন্টুদা’ ঢাকা পড়ল ঘন শ্মশ্রুতে।

উমা বসুর সঙ্গে, ডান দিকে বন্ধু নিশিকান্তর সঙ্গে।

পিতার যথা-সর্বস্ব

১৮৯৭ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতায় জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা সুরবালাকে হারায় বালক দিলীপকুমার। তার পর থেকে পিতা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাছেই বেড়ে ওঠা বালক দিলীপ আর বালিকা মায়ার। পিতা আদর করে দুই ছেলেমেয়েকে দেখিয়ে বলতেন— এই হল যথা আর এই আমার সর্বস্ব। 

ছোট থেকেই বাবার কাছে লেখনী আর সুরের শিক্ষা পেয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক পরিবেশ। পিতামহের মতোই ওস্তাদি হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন। পিতার গাওয়া বাংলা গান তাঁকে আকৃষ্ট করত না। মাঝে ঘটল ছন্দপতন। দিলীপের যখন মাত্র ষোলো বছর বয়স, পিতৃবিয়োগ ঘটল। এর পরেই ধীরে ধীরে বাংলা গানকে হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের সমকক্ষ করার ঝোঁক চাপে দিলীপের মাথায়। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণির স্নাতক হয়ে পড়তে গেলেন বিদেশে। সেখানে গণিতের পাশাপাশি শিক্ষা করলেন পাশ্চাত্য সঙ্গীতের। শিখলেন পিয়ানো বাদন। বার্লিনে সঙ্গীতের সূত্রে ভ্রমণের পাশাপাশি জার্মানি ও ইতালিতে সঙ্গীতশিক্ষা ও ভাষাশিক্ষা। সাক্ষাৎ হল রোমা রল্যাঁ, বার্ট্রান্ড রাসেল, হারমান হেসের সঙ্গে। সুইৎজ়ারল্যান্ডের লুনাগোতে আমন্ত্রিত হয়ে বক্তৃতা করতে গেলেন ভারতীয় সঙ্গীত বিষয়ে। তত দিনে নিজেকে গড়েপিটে মজবুত করে নিয়েছেন। এ বার সিদ্ধান্ত নিলেন দেশে ফেরার। ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে আবিষ্কারের পথে পা রাখলেন গবেষক দিলীপকুমার।

দেশে ফিরে বাংলা গানের জন্য যা তিনি সংগ্রহ করলেন, তা খনি থেকে হিরে সংগ্রহের চেয়ে কম কিছু নয়। গানপাগল তরুণ ভারতের বিভিন্ন সুরের দোরে দোরে হানা দিলেন। এমনকি বাইজিদের কাছেও গিয়েছেন গান শুনতে, তা আত্মস্থ করতে। বাংলা গানের মধ্যে কী করে মীড়, গমক, তান এনে তাকে পাশ্চাত্য সুরের মিশেলে পরিবেশন করা যায়— সেই অভিনব পরীক্ষায় মেতে উঠলেন দিলীপ। প্রয়োজনে মেশালেন কীর্তনের আখর রীতি, যা দিয়ে কথাকে ভেঙে-গড়ে পল্লবিত করা যায়। রেকর্ডে গেয়ে যাওয়া ‘বৃন্দাবনে লীলা অভিরাম’ গানটির ‘ওরা জানে না, তাই মানে না’র পল্লবিত সুর যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দিলীপকুমার বলতেন, ‘‘আই সিং হোয়াট আই ফিল।’’ এই অনুভবেই তিনি গেয়ে গিয়েছেন— ‘যদি দিয়েছ বঁধুয়া’, ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, ‘জীবনে মরণে এসো’ গানগুলি।

 

সুরের উত্তরাধিকার

দিলীপকুমারের গানের এক নিজস্ব ঘরানা ছিল, যাকে সঙ্গীতবোদ্ধারা চিহ্নিত করেন ‘দৈলিপী ঢং’ নামে। তাঁর গায়নভঙ্গিকে আত্মস্থ করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। ঢেউ তোলা সুরহিল্লোল, তার সঙ্গে গানের কথার সুগভীর-অর্থবহ বিন্যাস— যার চলনে এক আধ্যাত্মিক ভাবনার ছাপ সুস্পষ্ট। দিলীপের গান যখনই পরবর্তী সময়ে গাইতে গিয়েছেন কেউ, তাঁকে নকলনবিশির দোষে দুষ্ট হতে হয়েছে। ওই তান-সমন্বিত ভাবপ্রবণ গায়কিকে অনুসরণ করে গাইতে গিয়েও খেই হারিয়েছেন অনেকে। আবার স্বকীয়তা বজায় রেখে দিলীপকুমারের গান গাওয়া অনেকটা সে গানের মূলভাবকে হত্যা করার মতো অপরাধেরই শামিল। খুব সফল ভাবে তাঁর গান গেয়েছেন সাহানা দেবী, ইন্দিরা দেবী, উমা বসু, মঞ্জু গুপ্ত, এম এস শুভলক্ষ্মীর মতো হাতে গোনা কয়েক জন শিষ্যাই। হ্যাঁ, শিষ্যা— ছাত্রী নন। কারণ, তিনি যে সাধনপদ্ধতি দিয়ে গিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মকে, তা শুধু তাল-লয়-সুর আর কথায় নিবদ্ধ গানের অন্ধ অনুকরণ নয়। সে গানের মূল আকর তার ভাববিহ্বলতা। গানের মধ্যে গিয়ে প্রেমাস্পদকে নিজের করে পাওয়া।

কেমব্রিজে গণিতের পড়াশোনা শেষ না করেই ইউরোপে চলে গেলেন কণ্ঠস্বরের তালিম নিতে। দেশে ফিরলেন দিলীপ। পণ্ডিত ভাতখণ্ডের সঙ্গে দেখা করে তাঁর অনুপ্রেরণায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সঙ্গীতবিশারদদের থেকে রাগের ভিন্ন রূপ এবং গানের সুর সংগ্রহ করলেন। সেগুলি লিপিবদ্ধ করলেন। এত সংখ্যক আর নিখুঁত স্বরলিপি দিলীপকুমার ছাড়া আর কেউই ভারতে রেখে যাননি। 

অতুলপ্রসাদ, নজরুলের বহু গান তিনিই গেয়ে পরিচিত করেন। বাংলা বেসিক রেকর্ড বার করার ক্ষেত্রে নজরুল ও দিলীপের ভূমিকা বাংলা গান ভুলবে কী করে?

 

গুরুর সান্নিধ্য

এমনও একটা সময় এসেছে যখন দিলীপ স্থির করতে পারেননি— জীবন থেকে ঠিক কী চান। তাঁর মনে হয়েছে, ঈশ্বরকে পেতে গেলে কঠিন যোগ দরকার। সে পথ একমাত্র দেখাতে পারেন অরবিন্দ। সে মোক্ষপ্রাপ্তির পথে কখনও নিজের শহর ছেড়ে আশ্রমিক জীবনযাপন করেছেন, কখনও গায়ে রুদ্রাক্ষ আর গৈরিক বসন তুলে নিয়েছেন। কখনও মোহমুক্তি ঘটিয়েছেন প্রিয়জনের কাছ থেকে। প্রেম, বাসনা, কামনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টায় ছেড়ে গিয়েছেন সম্ভাবনাময় কর্মজীবন, পৈতৃক সম্পত্তির বিলাস। কিন্তু একমাত্র যা তাঁর আত্মার উত্তরাধিকার— সেই গান, তা ত্যাগ করতে পারেননি কখনও। অরবিন্দও জানতেন প্রবল আবেগি মানুষটির প্রাণবায়ু সঙ্গীত। তাই এর মাধ্যমেই সাধনা করে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

অরবিন্দের সঙ্গে দিলীপকুমারের পত্র বিনিময়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য সেতু। যেখানে দিলীপ ছিলেন অবাধ্য ছাত্রের মতো। কখনও ঝগড়া, কখনও অভিমান, কখনও অভিযোগ— প্রতি মুহূর্তে অরবিন্দ প্রশ্রয় দিয়েছেন দিলীপকে।

ইন্দিরা দেবী এক জায়গায় লিখছেন, একবার চিঠিতে ঋষি অরবিন্দের প্রতি তাঁর দাদাজির অভিযোগ ছিল যে, তাঁর গান সম্ভবত গুরুদেবকে আকর্ষণ করে না। তাই তাঁর গানের সময়ে অরবিন্দ ধ্যানমুদ্রিত ছিলেন। এর জবাবে অরবিন্দ দিলীপকে চিঠি লিখলেন— ‘‘দিলীপ তোমার এই সন্দেহ সম্পূর্ণ অকারণ। তোমার সংগীতে আমার আগ্রহ নেই এমন হতেই পারে না। বরং আমার আগ্রহ এত প্রবল যে আমার ঘুমের সময়টুকুতেও আমি তোমার ‘সরস্বতী’ সংগীতটি সংশোধন করতে বসেছিলাম, যাতে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে গানটি তৈরি থাকে।... যে বোধ কেবলই মানসিক এবং বাক্যাতীত তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তোমার গান সম্বন্ধে অন্ততঃ আমার এই অনুভূতিই হয়েছে আর এই জন্যই তোমার গান সম্পর্কে কিছু লেখা সবসময়েই আমার কাছে একটু কঠিন মনে হয়। শ্রী অরবিন্দ—২৩/৩/৩৩’’

তাঁর গুরু চেয়েছিলেন এই প্রবল সম্ভাবনাময় আবেগকে একটি যথার্থ মার্গে চালিত করতে। তাই পাশ থেকে যেমন দিলীপকুমারকে যোগ সাধনা শিখিয়েছেন, তেমনই দিলীপের বাংলা ছন্দের লেখা সংশোধনও করে দিয়েছেন হাতে ধরে। উৎসাহ দিতে দিলীপের লেখা বাংলা ছন্দের মতো ছোট ছোট ইংরেজি কবিতা লিখে পাঠাতেন। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ‘রামের সুমতি’র ইংরেজি অনুবাদ করার সময়ে তা-ও গুরুকে দিয়ে পড়িয়ে নিয়েছেন দিলীপ। কেউ কেউ মনে করেন, প্রথম দিকে দিলীপ যে কাঁচা ছন্দে গান রচনা করতেন, সেই মানুষটিই পরবর্তী কালে ছন্দে অভাবনীয় উন্নতি ঘটাতে পেরেছেন আদতে গুরুর সান্নিধ্যে এসেই। 

রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে লিখেছেনও সে কথা— ‘‘তার পর তোমার কবিতার কথা বলি। পরিণাম দেখে ভয় পেয়েছিলাম। ইতিপূর্বে পদ্যজাতীয় তোমার অনেক লেখাই দেখেচি। বারবার মনে মধুকোষের পথ তুমি পাওনি, তুমি ছন্দে পঙ্গু। তা নিয়ে আমি মাঝে মাঝে বিচার করেছি, সেটা নিশ্চয়ই শ্রুতিসুখকর হয়নি। অপ্রিয় কথা বলবার অপ্রিয় দায় তুমি আমার উপর আবার চাপাতে এসেচ মনে ক’রে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলুম। কিন্তু এ কি ব্যাপার হে? হঠাৎ ছন্দ পেলে কোথা থেকে? গুরুমশায়গিরি করবার জো রাখনি। অকস্মাৎ তোমার কান তৈরি হয়ে গেল কি উপায়ে? আর তো তোমার ভয় নেই।...এক এক বার ভাবি তুমি আর কারোর কাছ থেকে লিখিয়ে নাওনি তো?’’ (দেশ সাহিত্যসংখ্যা, ১৩৮৩, পৃষ্ঠা ২৭-২৮)

 

সাধনার শান্তিজলে

তখন গান সংগ্রহে লখনউ, বারাণসীতে উস্তাদ, বাইজিদের দোরে দোরে ঘুরছেন। সে সময়ে তাঁর গানের সখা হলেন সাহানা দেবী। 

সাহানা দেবীর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, চিত্তরঞ্জন দাশের পরিবারের মেয়ে তিনি। কাশীর একটি বড় পরিবারে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। সেখানে তাঁকে গাইতে বা নাচতে দেওয়া হত না। তাঁর প্রতিভার সমঝদার কেউ ছিলেন না। এক সময়ে তিনি অসুস্থ অবস্থায় পালিয়ে আসেন। নিজের সংসার ছেড়ে শান্তিনিকেতনে রবি ঠাকুরের কাছে আশ্রয় নেন। কিছু দিন পরে চলে আসেন পুদুচেরি আশ্রমে। সেখানে তাঁর পুরনো গানের সঙ্গী দিলীপকুমারের সঙ্গে প্রাণ খুলে গান গাইতে লাগলেন। এক নতুন আলোকপথের সন্ধান পেলেন যেন! নতুন করে গান শিখতে শুরু করলেন আসরে গাওয়ার জন্য। সাহানা দেবী এক জায়গায় লিখছেনও সে কথা— ‘‘...আমার বিয়েরও অনেক পরে দিলীপের সংস্রবে এলে তাঁর কাছে তাঁর আসরে গাইবার জন্য এবং তা ছাড়া এমনিও বহু গান শিখি। ...দিলীপের গান গাওয়া বা তোলা সহজ নয়। অনেক সহজ কারুকার্য, আলোছায়ার দোলা দরকার তার গান গাইতে হলে। সেসব একত্রে পাওয়া কঠিন।’’

আর দিলীপকুমারের গান সম্পর্কে বলছেন, ‘‘তোমাদের দিলীপদার গান শুনে মন ভরে না! তাঁর কণ্ঠ সর্বদাই গুনগুনিয়ে ওঠে। পঁচিশ বছর ধরে ওই কণ্ঠের গান সদাসর্বদা শুনছি... তাঁর গান বড় কঠিন।’’

‘দিলীপকুমার জন্মশতবর্ষ’ প্রবন্ধে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখছেন— ‘‘...তবে আমার মনে হয় ওঁদের দু’জনের মধ্যে একটা গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেটা অশরীরী প্রেম। যাকে বলে Platonic love। দিলীপকে আমি যতদূর জানি, বিবাহবন্ধন তাঁর জন্য নয়। তিনি চিরপলাতক। আর একনিষ্ঠতাও তাঁর হৃদয়ে ছিল কিনা সন্দেহ।’’

তবে প্রেমের কোনও ঘাটতি ছিল না তীর্থঙ্কর দিলীপকুমারের হৃদয়ে। যিনিই এসেছেন, তাঁকে ঈশ্বরভাবে অভিভূত হয়ে আশ্রয় দিয়েছেন তাঁর গানের সুরে, সাধনার শান্তিজলে। যেমন ইন্দিরা দেবী।

১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্দিরা দেবী সংসার ছেড়ে চলে এলেন শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমে। সেখানে দাদাজির চরণে শরণ চাইলেন। ‘দিলীপকুমার রায়ের আশ্রমজীবন’ প্রবন্ধে নীরদবরণ লিখেছেন— ‘‘...ইন্দিরা দিলীপের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন এবং ক্রমশ তাঁর একান্ত অনুরক্ত হয়ে পড়েন। এমনকি তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করবার জন্য দিলীপকে প্রায় জোর-জবরদস্তি করেন। দিলীপ সে আবেদন গুরুর কাছে নিবেদন করেন এবং বলেন যে, তাঁর নিজের গুরু হবার কোনও ইচ্ছা নেই কিন্তু ইন্দিরা নাছোড়বান্দা। একমাত্র গুরুই তাঁকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারেন; অন্ততপক্ষে গুরুর মতামত তিনি জানতে চান। বিস্ময়ের কথা যে গুরু বিনা দ্বিধায় সম্মতি দিলেন। দিলীপ অবাক, আমরাও তাই।’’

ইন্দিরার এক লেখায় জানা যায়, দাদাজি তাঁকে বলেছিলেন— ইন্দিরা, শৈশব থেকে ঈশ্বরকে চেয়েছি। কেবল ঈশ্বর এবং গুরুর কারণেই আমার জীবনধারা। তুমি যদি কেবল ঈশ্বরের জন্যই বাঁচতে পারো, তবে তুমি এই পথে এসো। অন্যথায় ফিরে যেয়ো।

উত্তরে ইন্দিরা বলেছিলেন— দাদা, আমি ফিরে যাব না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমার প্রেম নিঃশর্ত ভালবাসার চাহিদাহীন, অধিকারবোধহীন। আপনার জীবন ঈশ্বরে উৎসর্গীকৃত আর আমি বেঁচে থাকব আপনার মাঝে ঈশ্বরকে পাব বলে।

জীবনের শেষ দিন অবধি ইন্দিরা তাঁর দাদাজির হাত ছেড়ে যাননি। 

 

বাংলা গানে বিপ্লব

১৯৩৭ সাল। দিলীপকুমার রায় পুদুচেরি থেকে কলকাতায় এসে গ্রামোফোন রেকর্ডে দু’খানা গান গেয়ে সাড়া ফেললেন। ‘রাঙ্গা জবা কে দিল তোর পায়ে’ আর ‘ছিল বসি যে কুসুমকাননে’। গান দু’টি টপ্পা ও কীর্তনাঙ্গ ছাঁদের। দৈলিপী ঢং প্রদর্শন সে গানকে শ্রোতৃসমাজে সমাদর তো দিলই, বিপণনও মন্দ হল না। তা দেখে উৎসাহিত হয়ে দিলীপ দ্বিতীয় গানের রেকর্ড করলেন। এ বারের গান দু’টি হল ‘এই পৃথিবীর পথের পরে’ এবং ‘জ্বলবার মন্ত্র দিলে মোরে’। তৃতীয় রেকর্ডে গেঁথে গেল বাংলা গানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান ‘সেই বৃন্দাবনের লীলা অভিরাম’। 

এ সময়ে দিলীপকুমার কলকাতায় পাবলিক কনসার্ট করছেন। তখনও টিকিট কেটে গান শোনার চল ছিল না বাংলায়। দিলীপকুমারকে এই নতুন সুরদ্বীপ যাত্রার কলম্বাস বলা চলে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট করে গুরুর আশ্রমের সাহায্যে প্রণামী হিসেবে টাকা পাঠিয়েছেন তিনি। অথচ মানুষটির সুরপ্রতিভা, লেখনী সব ছাপিয়ে পরিচয় প্রতিষ্ঠা পেল সাধক হিসেবে। শেষের দিকে দুই দশক দিলীপকুমার সচেতন ভাবেই ভক্তিগীতি ছাড়া কিছু গাইতেন না। তাঁর বৈরাগী ভাবমূর্তি গ্রাস করল সুরকার ও গায়কের প্রাণপ্রতিষ্ঠাকে। স্মৃতিচারণায় দিলীপকুমার লিখছেন— ‘‘১৯২৮ সালে আমি যোগজীবন বরণ করি। তারপর লক্ষ করি যে, ওস্তাদি সংগীতের অজস্র তানকর্তব ও কণ্ঠের কসরতে আর আমার মন তেমন ভিজে উঠছে না। ...ওস্তাদি গানের সুখবিলাস আমাদের অন্তরে খানিকটা আবেশ জাগালেও সে-আবেশ স্থায়ী হতে পারে না এই জন্যে যে, সে কিছুতেই ভুলতে পারে না যে সমঝদার শ্রোতার সাড়া তার চাইই চাই। কিন্তু ভজনকীর্তনের বেলায় গুণী রূপান্তরিত হন পরম ভাগবতে।’’

স্বরলিপি মেনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া এবং স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার পন্থা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দিলীপকুমারের বিরোধ সর্বজনবিদিত। শেষ জীবনে দিলীপ যদিও মেনে নেন ভুল তাঁরই ছিল। প্রকাশ্যে তিনি কোনও দিন রবীন্দ্রগান করেননি, হয়তো গায়নের স্বাধীনতা পাননি বলেই। তিনি অতুলপ্রসাদ, নজরুলের গান গাওয়ায় মনোনিবেশ করেন। হিমাংশু দত্তের বহু গানের তিনিই প্রথম গায়ক। আশ্রমজীবনে কবি নিশিকান্তকে দিয়ে গান লিখিয়ে তাতে সুর করে বাংলা গানে অন্য এক স্পন্দন তৈরি করেন। দ্বিজেন্দ্রলাল ও অতুলপ্রসাদের বেশির ভাগ গানের স্বরলিপি দিলীপেরই করা। ১৯২২ সালে বিদেশ থেকে ফিরে তিনি গোটা ভারত পরিক্রমা করেন সুরের সন্ধানে। সে ইতিহাস লিপিবদ্ধ ‘ভ্রাম্যমাণের দিনপঞ্জিকা’য়। 

১৯৪৭ সালে হিন্দি সিনেমায় মধ্যযুগের মীরার ভজনে দিলীপকুমারের সুরে গেয়েছিলেন এমএস শুভলক্ষ্মী। পল্লবিত হল এক নতুন কুঁড়ি। স্বয়ং শুভলক্ষ্মী তাঁর গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লিখেছেন— ‘‘গান করেন... তা হল এক স্বতন্ত্র আত্মার আবেদন বিশ্ব আত্মায় বিলীন হবার জন্য।’’

তিনি এলাহাবাদে ছপ্পন ছুরি জানকী বাইয়ের কাছেও গান শিখেছিলেন। এক আসরে জানকী বাইয়ের গানের পরে বাড়ির কর্তা তরুণ মন্টুকে গাইতে বললে ভ্রুভঙ্গি করে বাইসাহেবা বলেছিলেন— ‘‘অ্যাইসা?’’ অর্থাৎ বাঙালি ভদ্রলোকের ছেলে গান গায়, এটা বিশ্বাস করতে হবে? অতঃপর গান গাইলেন দিলীপ। জানকী বাইয়ের তেরছা ভ্রু সোজা হয়ে গেল। জানালেন শেখার আমন্ত্রণ।

শোনা যায়, দিলীপকুমারের কণ্ঠে অতুলপ্রসাদের ‘রূমক-ঝুমক-ঝুম’ গানটি শুনে মোতিবাই বলেছিলেন— আমিও আপনাকে শেখাতে পারি, যদি আপনি আমাকে এই গানটি শেখান।

গানের বিষয়ে তাঁর উদার মন কোনও প্রথাগত ধ্যানধারণার তোয়াক্কা করেনি কোনও দিনই। তাই তো একজন উমা বসু, একজন ইন্দিরা দেবী, একজন সাহানা দেবীর সুর আমরা শুনতে পাই সে সময়ে, যখন কোনও ভদ্রবাড়ির মেয়েরা গান গাইছেন— এটা ভাবাই যেত না। নারীর ক্ষমতায়নের সোপান সেই কত যুগ আগেই রচনা হয়েছে। 

এমন মানুষের গানের অমূল্য সম্ভারকে আমরা আত্মস্থ করতে পারলাম না। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি, সন্দেহ নেই।

 

বিরহে প্রেম উদ্দীপন

প্রেমাস্পদের খোঁজে আজীবন পাগল হয়ে ছুটেছেন মানুষটি। যে কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে গান লিখছেন শ্রীচৈতন্যের জন্য— ‘‘প্রেমে গড়া তনু, প্রেমে গড়া মন যা’র/ প্রেমে গড়া প্রাণ নয়নে প্রেমের ধার।’’— সেই প্রেম শেষ অবধি তাঁর সঙ্গে থেকে গিয়েছে। তাঁর একমাত্র প্রেম তাঁর সঙ্গীতসাধনা। সুরের মধ্য দিয়েই বারবার ঈশ্বরকে ছুঁয়ে এসেছেন। থেকেছেন জীবনে, যাপনে। তিনি সাধক। যাঁকে এই পৃথিবী সুরকার, গীতিকার, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, অনুবাদক, সুর সংগ্রাহক নামেও চেনে। তিনি আত্মভোলা। চরম অভিমানী। অননুমেয় এক মরুঝঞ্ঝার মতো যাঁর প্রতিভার ব্যাপ্তি।

আমাদের তাঁকে মনে রাখা হয়নি, চেনা হয়নি। আমরা ভুলে গিয়েছি এই বাংলায় এমন একজন মানুষ ছিলেন, ‘বাঙালি কাঁকড়ার জাত’ এই প্রচলিত গল্পটিকে যিনি মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন প্রতি পদে। নিজের খ্যাতির জন্য নয়, নিজের নামের জন্য নয়, আজীবন খনি থেকে মণিমাণিক্য সংগ্রহ করেছেন অপরকে নতুন আলোয় প্রকাশিত করবেন বলে। আমরা হতভাগ্য! আমরা তাঁকে মনে রাখিনি। আমরা তাঁর মতো প্রাণখোলা, খেয়ালি মানুষকে ধরে রাখতে পারিনি এই বাংলায়। যে জন্মমাটি থেকে রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-আলো শুষে নিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলা সঙ্গীতাকাশের মহীরুহ, সেই বাংলায় তাঁর গায়কির পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করা গেল না? 

দিলীপকুমার রায়কে চিনতে গেলে প্রথমেই চিনে নিতে হয় তাঁর সময়কে। সে সময়ে আকাশে জ্বলজ্বল করছেন বিবিধ নক্ষত্র। রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গাঁধী, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, শরৎচন্দ্র, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, অরবিন্দ— কে নেই সে সময়ে! সমসাময়িক এই মহান ব্যক্তিত্বরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ঔজ্বল্যে ভাস্বর। তার মাঝেও বরাবর দিলীপকুমার থেকে গিয়েছেন অনন্য।  

একদিন পুদুচেরির আশ্রমে প্রবেশ করেছিলেন এক নারীর হাত ধরে। তিনি সাহানা দেবী। যোগসাধনায় আত্মমগ্ন হবেন বলে যিনি দিলীপকুমারকে গুরু মেনে, সব ছেড়ে আশ্রম জীবন কাটাতে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে। সাহানা দেবী শেষ দিন পর্যন্ত রয়ে গেলেন সেই আশ্রমেই। দিলীপকুমার আশ্রম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন আর এক নারীর হাত ধরে, যিনি মীরাবাইয়ের প্রতিস্পর্ধীসম প্রতিফলিত হলেন কৃষ্ণপ্রেম নিয়ে। কৃষ্ণসাধনার শেষ স্তরে উন্নীত ইন্দিরা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে দিলীপকুমার যাত্রা করলেন পুণেয়। সেখানে তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠল হরেকৃষ্ণ মন্দির। যেখানে শেষ দিন অবধি থেকেছেন তিনি।

দিলীপকুমার আত্মপরিচয়ে লিখেছিলেন— ‘‘প্রেম আমার সাধন জানি,/ আমার জীবন মানি/ বন্ধনে মণিমুক্তোতারা প্রেম/ বিরহে প্রেম উদ্দীপন, মিলনে প্রেম উন্মাদন।’’

 পুণেয় হরেকৃষ্ণ মন্দিরে দিলীপকুমারের সমাধি বেদিতে উৎকীর্ণ এই পঙ্‌ক্তি।

ঋণ: ‘দিলীপকুমার রায়: এক উপেক্ষিত বাঙালি’:  সংকলন ও সম্পাদনা সুধীর চক্রবর্তী

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন