• বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বাইজি থেকে মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতের এক মহীরুহ

গজ়ল, ঠুমরি, দাদরার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী জদ্দনবাই। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতের এক প্রতিষ্ঠান।

main
মা-মেয়ে। নার্গিসের সঙ্গে জদ্দন

সুরের আকাশে তখন রাশি রাশি নক্ষত্রের সমাগম! এক দিকে তাবড় তাবড় উস্তাদ, অন্য দিকে কিন্নরীকণ্ঠ বাইজি। গওহরজান তখনও বাইজি সমাজে মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী। তবে আগ্রার মালকাজান, ইলাহাবাদের জানকিবাই ছপ্পনছুরি, বারাণসীর হুসনাজান, ওয়াজিরজান কিংবা লখনউর লাডলিজান তখনও মেহফিল মাতাচ্ছেন। তাঁদের চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। বাইজিদের দাবি মিটিয়ে মেহফিলে হাজির করানোটাও মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। তাই সঙ্গীতরসিক শ্রোতাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হত তাঁদের আসরে আনতে। এমনই প্রেক্ষাপটে কলকাতার সঙ্গীতের আসরে আত্মপ্রকাশ এক নবাগতা বাইজির। যেমন রূপসি, তেমনই তাঁর দাপুটে গলা। তাঁর ঠুমরি, দাদরা, গজ়লে মেতে ছিল সে কালের বাবুসমাজ। তিনি জদ্দনবাই।

দমদমে মল্লিকবাড়ির এক শরিকের একটি বাগানবাড়ি ছিল। সেখানে মাঝে মধ্যেই বসত সঙ্গীতের আসর। তেমনই এক আসরের আয়োজন করছেন মল্লিকবাবু। কিন্তু সে বার বহু চেষ্টা করেও গওহরজানকে মেহফিলে আনতে পারলেন না। অন্য একটি আসরের জন্য গওহর গিয়েছেন কলকাতার বাইরে। ইতিমধ্যেই কলকাতার সঙ্গীতমহলে বেশ নাম করেছেন জদ্দন। গওহর কিংবা মালকার মতো মোহময়তা না থাকলেও জদ্দন আসর মাতাতেন তাঁর কণ্ঠের জাদুতে। বন্ধু আশুবাবুর মুখে জদ্দনের ভূরিভূরি প্রশংসা শুনে মল্লিকবাবু তাঁকে মেহফিলে আমন্ত্রণ করলেন বটে, কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে একটা সংশয় ছিলই। আদৌ অতিথিদের গান শুনিয়ে মন ভরাতে পারবে তো জদ্দন? 

আসরের রাতে একে একে উপস্থিত হলেন সঙ্গীতরসিকেরা। নাচঘরের মেঝেতে পাতা পারস্যের দামি কার্পেট। ঘরের ঠিক মাঝখানে বসে গান গাইবেন জদ্দন। চার পাশে অতিথিদের বসার আয়োজন। ভিক্টোরিয়ান আসবাবে সুসজ্জিত নাচঘরের ঠিক মাঝখানে দেওয়ালে সুবৃহৎ বেলজিয়াম কাচের আয়না। তত দিনে শহরে পৌঁছে গিয়েছে বৈদ্যুতিক আলো। কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে বেলজিয়াম কাচের রঙিন ঝাড়। দেওয়ালগিরির জোরালো আলোয় ঝলমল করছে মল্লিকবাবুর শখের নাচঘরটি। ফুলদানিতে রাখা গোছা গোছা রজনীগন্ধা আর আতরের সুগন্ধ এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। হঠাৎ এক মোসাহেব খবর দিলেন জদ্দন এসেছেন। একটু পরেই অতিথিদের নাকে এল দামি রুহি-গুলাবের সুবাস। সেই সঙ্গে আসরে প্রবেশ করলেন জদ্দনবাই। ফর্সা গায়ের রং, কিছুটা লম্বা অথচ সুশ্রী মুখে স্মিত হাসি। পরেছিলেন হিরে, পান্নার গয়না। তাঁকে দেখেই হইহই করে উঠলেন আশুবাবু। মল্লিকবাবু অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলেন।

 

রাত দশটা নাগাদ আসরে সকলকে ‘আদাব’ জানিয়ে সারেঙ্গীবাদক ও তবলচিকে ইশারা করে জদ্দন ধরলেন একটি খেয়াল। ‘রূপ যৌবন গুণ ধরো রাহত হাম’... এমন দাপুটে গলা সে কালের বাইজিদের মধ্যে বড় একটা শোনা যায়নি। অথচ কী অনায়াসে সুর বিস্তার করতেন তিনি। গান শুনতে শুনতে কেমন আনমনা হয়ে পড়লেন মল্লিকবাবু। এর পরে জদ্দন ধরলেন একটি ঠুমরি। পরে একে একে দাদরা, গজ়ল গেয়ে ভোররাতে ভৈরবীতে তিনি ধরলেন ‘লগ্‌ত কলজেয়া মে চোট’ গানটি। শ্রোতারা সুরের মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। অনেকেরই মনে হল, আসরটি যেন বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল! অথচ তার রেশ ছিল দীর্ঘস্থায়ী। আর মল্লিকবাবু? নিজের সংশয়ের কথা ভেবে তিনি বেশ লজ্জিত বোধ করেন। জীবনে বহু বাইজির গান শুনলেও এমন তৃপ্তি তিনি আগে কখনও পাননি। তাঁর চোখের কোণে তখন জল!

জদ্দনবাই

এমনই একের পর এক আসরে গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছিলেন জদ্দন। গত শতকের কুড়ি এবং তিরিশের দশকে গজ়ল, ঠুমরি, দাদরার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী ছিলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী জীবনে তিনিই হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী, কাহিনিকার, প্রযোজক এবং সঙ্গীত পরিচালক। 

তাঁর সমসাময়িক ছিলেন বারাণসীর বিদ্যাধরীবাই, বড়ি মতিবাই, কৃষ্ণাবাই, কমলেশ্বরীবাই, রাগরানি দুর্গাবাই, রসুলনবাই, কাশীবাই, সিদ্ধেশ্বরী দেবী এবং কেশরবাই কেরকর। তবে সেই সময়ে আরও দু’জন জদ্দনের খোঁজ পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন লখনউয়ের ছোটি জদ্দন এবং জদ্দনজান। 

জদ্দনবাইয়ের জন্ম ১৮৯২ সালে ইলাহাবাদের চিলবিলায়। তাঁর মা দিলীপাবাই সে কালের নামকরা এক বাইজি। প্রথমে মায়ের কাছেই তালিম শুরু হয় জদ্দনের। শোনা যায়, প্রথম প্রথম আসরে গজ়ল গাইলেও তাঁর গায়কি ছিল অপরিণত। দিলীপাবাই সে কথা বুঝতে পেরে মেয়ের তালিমের ব্যবস্থা করেন গ্বালিয়রের ভাইয়া গণপত রাও সাহেবের কাছে। তাঁর মৃত্যুর পরে বোলবানাও ঠুমরির প্রবাদপ্রতিম মওজুদ্দিন খানের কাছে। এ ছাড়াও জদ্দন তালিম নেন ছড্ডু খান এবং লাভ খান সাহেবের কাছে। 

এর পরে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জদ্দনের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ জুড়ে। রাজশাসিত স্টেটগুলির মেহফিলে মাঝেমধ্যেই তাঁর ডাক পড়ত। এর মধ্যে বিকানের, রামপুর, গ্বালিয়র, কাশ্মীর, ইনদওর এবং জোধপুরে তাঁর আসরের স্মৃতি আজও ইতিহাসের পাতা থেকে উঁকি দেয়। পরবর্তী সময়ে বেতারেও নিয়মিত গান গাইতেন জদ্দন। 

তাঁর জীবনের বড় একটা অংশ কলকাতায় কাটিয়েছেন জদ্দন। সে কালের শোভাবাজার রাজবাড়ি, চোরবাগান শীলবাড়ি, পোস্তা রাজবাড়ির পাশাপাশি বহু সঙ্গীতরসিকের বাড়িতে বসেছে তাঁর গানের আসর। জদ্দন প্রথমে থাকতেন বৌবাজারে, পরে বেলেঘাটায়। এ শহরের আনাচকানাচে মিশে আছে তাঁর কত স্মৃতি। গওহরজানের সঙ্গে জদ্দনের সুসম্পর্ক ছিল। যদিও গওহর ছিলেন তাঁর চেয়ে প্রায় কুড়ি বছরের বড়। অবসরে একে অপরের বাড়ি যেতেন, গান, রাগ-রাগিণী, কবিতা, সাহিত্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে অলোচনাও হত। সে সময়ে জদ্দন থাকতেন বৌবাজারে। প্রবাদপ্রতিম শিল্পী লালচাঁদ বড়ালের ছোট ছেলে রাইচাঁদ মাঝেমধ্যেই সেখানে আসতেন জদ্দনের সঙ্গে সঙ্গত করতে। আসলে ঠুমরির সঙ্গে তবলা বাজানোর কিছু নিয়ম আছে। এক বার বারাণসীতে এক শিল্পীর ঠুমরিতে সঙ্গত করতে গিয়ে মাত্রাগত পদ্ধতি নিয়ে রকমফের দেখা দেওয়ায় রাইচাঁদ প্রায় ঠিকই করেছিলেন, ঠুমরির সঙ্গে তবলা বাজাবেন না। এই নিয়ে জদ্দনের সঙ্গে তাঁর মতান্তর হয়েছিল। তাই জদ্দনের সঙ্গে সঙ্গত করে রাইচাঁদ সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলতে চাইছিলেন। 

তেমনই একদিন রেওয়াজ চলছে, হঠাৎ দরোয়ান এসে খবর দিল গওহরজান এসেছেন। শুনেই চমকে উঠলেন রাইচাঁদ। তাঁর মনে পড়ে গেল পুরনো একটি ঘটনা। যা ভেবে তিনি অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করলেন। হঠাৎই তবলা ছেড়ে তিনি পাশের ঘরে গিয়ে বসলেন। সে ঘরেই ছিলেন জদ্দনের স্বামী মোহনবাবু। দু’জনে কথাবার্তা চললেও রাইচাঁদের কান দু’টি সজাগ ছিল পাশের ঘরে গওহরের সঙ্গে জদ্দনের কী কথাবার্তা হচ্ছে, তা শোনার জন্য। মনে মনে রাইচাঁদ ভাবছিলেন, গওহরজান বিদায় নিলে আবার ঘরে গিয়ে তবলা নিয়ে বসে শুরু করবেন রেওয়াজ। এমন সময়ে হঠাৎ পাশের ঘর থেকে গওহরজানের গলা ভেসে এল। তিনি জদ্দনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘গান-বাজনা হচ্ছিল বুঝি? অসময়ে এসে বিরক্ত করলাম না তো?’’ জদ্দন বললেন, ‘‘না না, একটু রেওয়াজ করছিলাম।’’ তখন গওহর বললেন, ‘‘তা থামল কেন? আমিও তা হলে একটু গান করি।’’ এতে জদ্দন উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘‘সে তো খুব ভাল কথা। তবে একজন মেহমান আছেন, আমি তার সঙ্গে সঙ্গত করছিলাম। তিনি বলছিলেন, দীপচন্দী সাতমাত্রা আর গত আটমাত্রা। ঠুমরির সঙ্গে মাত্রার ব্যবহার যতক্ষণ বুঝতে পারছেন না, বাজাবেন কী করে?’’ এ কথা শুনে গওহর বললেন, ‘‘উনি তো ভুল বলেননি।’’ এর পরে জদ্দন বললেন, ‘‘তাঁকে ডাকলে তোমার আপত্তি নেই তো?’’ গওহরের উত্তর, ‘‘না না, তাঁকে ডাকো।’’

এ বার রাইচাঁদকে সেই ঘরে আসতে অনুরোধ করলেন জদ্দন। শুনে রাইচাঁদ কী করবেন ভেবে পেলেন না। একবার ভাবলেন পিছনের দরজা দিয়ে পালাবেন। ইতিমধ্যেই জদ্দন ঘরে ঢুকে বললেন, ‘‘কই রাইসাহেব, আপনার সঙ্গে আমার সহেলির পরিচয় করিয়ে দিই।’’ কথা শেষ করতে না করতেই জদ্দন প্রায় হাত ধরে টেনে রাইচাঁদকে সে ঘরে নিয়ে এলেন।

তাঁকে দেখেই গওহরজান চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘আরে খোকাবাবু, তুমি এখানে? আমােক দেখে তুমি পালিয়ে গেলে কেন?’’ রাইচাঁদ কেমন একটু আড়ষ্ট হয়ে ছিলেন। বললেন, ‘‘শিখছিলাম, তাই।’’ জদ্দন বেশ অবাক হয়েই গওহরকে বললেন, ‘‘রাইসাহেবকে তুমি চেনো নাকি?’’ গওহর সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘‘উনি তো লালবাবুর ছেলে।’’ 

এর পরেই রাইচাঁদ গওহরকে বললেন, ‘‘সে দিনের ঘটনার জন্য লজ্জায় পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম।’’ গওহর কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চাইলেন, কোন ঘটনা। রাইচাঁদ মনে করিয়ে দিলেন, তাঁর মামার বাড়ি অর্থাৎ জোড়াসাঁকোর মল্লিকবাড়িতে বিয়ে উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে অন্দরমহলে গওহর গান গাওয়ার সময়ে তাঁর মা এমন একটি কাণ্ড বাধিয়েছিলেন... আসলে ঘটনাটিতে গওহর অপমানিত হয়েছিলেন। সে কথা শুনে গওহর হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘‘এই দ্যাখো, তুমি আবার সে দিনের কথা মনে রেখেছ?’’ রাইচাঁদ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। গওহর একটু উদাস হয়েই বললেন, ‘‘ও সব কথা আমরা মনে রাখি না। মনে রাখলে বাইজিদের চলে না।’’ এর পরেই জদ্দন সেই অস্বস্তিকর পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে গানের আসর শুরু করলেন। আর তবলায় সঙ্গত করলেন রাইচাঁদ। কঠিন পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর।

তবে তাঁর সমকালীন শিল্পীদের চেয়ে জদ্দনবাইয়ের রেকর্ডের সংখ্যা ছিল অনেক কম। কলম্বিয়া, টুইন, মেগাফোন এবং ব্রডকাস্ট রেকর্ড কোম্পানি থেকে তাঁর কিছু রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলির বহুসংখ্যক কপিও বিক্রি হয়েছিল। তাঁর গাওয়া গানগুলির মধ্যে ‘তোড় লাই রাজা, যমুনয়াকে’, ‘লগ্‌ত করেজবা মে’, ‘নুক্তাচি হ্যায় ঘ্যমে’, ‘কানহা তেরা’, ‘গ্যয়া বালম পরদেশী’, ‘রূপ যৌবন গুণ ধরো রাহত হাম’, ‘দেব দেব সৎসঙ্গ’, ‘জেরা নয়নো সে নয়না মিলা’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। 

তাঁর সময়ের প্রেক্ষিতে জদ্দন ছিলেন অনেকটাই প্রগতিশীল এবং সাহসী প্রকৃতির। তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী, অথচ সহানুভূতিশীল এক শিল্পী। পরবর্তী কালে গওহর ছাড়াও বহু বাইজির দুঃসময়ে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে  অভাবী, গরিব মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

জদ্দনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। তিন বার বিয়ে করেছিলেন জদ্দন। তাঁর প্রথম স্বামীর নাম ছিল নরোত্তম দাস ক্ষেত্রী। ধর্মান্তরিত হয়ে তাঁর নাম হয়েছিল নাজির মহম্মদ। তাঁদের একটি ছেলে হয়, যাঁর নাম আখতার হুসেন। এর পরে জদ্দন বিয়ে করেন ইরশাদ মীর খানকে। তাঁদেরও একটি ছেলে হয়, যাঁর নাম আনোয়ার হুসেন। তাঁর তৃতীয় স্বামী মোহনচন্দ উত্তমচন্দ ত্যাগী। তিনি ‘মোহনবাবু’ নামে বেশি পরিচিত। মোহনচন্দ এক ধনী পরিবারের সন্তান। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। সেই মতোই ইংল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল মোহনবাবুর। সেখানে গিয়ে মেডিসিন নিয়ে পড়বেন বলে ঠিক করেছিলেন। সেই সময়ে দেখা হয় জদ্দন বাইয়ের সঙ্গে। মেলামেশা এবং ঘনিষ্ঠতা খানিক বাড়তেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেছিলেন জদ্দন বাই নিজেই। সঙ্গে সঙ্গে রাজিও হয়ে যান মোহনবাবু। জদ্দনের আগের দু’টি বিয়ের কারণে মোহনবাবুর পরিবার জদ্দনের সঙ্গে তাঁর বিয়েতে মত দেয়নি। জদ্দনবাইকে বিয়ে করার জন্য মোহনবাবু নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন। তবে শুধু ধর্মই নয়, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েও বিয়ে করেছিলেন জদ্দনবাইকে। মোহনের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তবে কোনও কিছুকে তোয়াক্কা না করেই তিনি জদ্দনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে তাঁর নাম হয় আবদুল রাশিদ। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল সুখের। তাঁদের মেয়ে রসিদা ফাতিমা। তিনি পরবর্তী কালে হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী নার্গিস। 

৩৮ নম্বর বদন রায় লেনের বাড়িটায় এক সময়ে থাকতেন সপরিবার জদ্দন। সাজিয়েছিলেন তাঁর সুখের সংসার। সেখানেই ছিল তাঁর শখের সুসজ্জিত নাচঘরটি। শোনা যায়, তাঁর বাড়িতে ছিল একটি পোষা বাঘ। তাই সচরাচর তাঁর বাড়িতে কেউ প্রবেশ করত না। রাতে বাঘের ডাকে আশপাশের অনেকেরই ঘুম হত না। তাই সে অঞ্চলে লোকে তাঁকে ‘গর্জনবাই’ বলে ডাকত। এ বাড়িতেই ১ জুন ১৯২৯ জন্ম হয় রসিদা ফাতিমার। তাঁর ছোটবেলা কেটেছিল এই কলকাতায়। তিনি ভাল সাঁতারু ছিলেন। ১৯৩৩-৩৪ নাগাদ জদ্দন কলকাতা ছেড়ে মুম্বই পাড়ি দেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই একটু একটু করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলাতে থাকে। তিরিশের দশক থেকেই নাচঘরের রোশনাই ক্রমশ নিভু নিভু। কমতে থাকল সমঝদার পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যাও। এর পাশাপাশি যৌথ প্রচেষ্টায় শুরু হয়েছে সঙ্গীত সম্মেলনের এক নতুন অধ্যায়। তাই রাজশাসিত কিছু স্টেটে এবং নাচঘরে সীমিতসংখ্যক শ্রোতার সামনে গান গেয়ে অর্থ রোজগারের পথ ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছিল। তা ছাড়া দ্রুত বদলে যাচ্ছিল শ্রোতাদের রুচিও। 

ইতিমধ্যেই সবাক হয়েছে চলচ্চিত্র। কলকাতায় জদ্দনের সঙ্গে পরিচয় হয় লাহৌরের চলচ্চিত্র প্রযোজক হাকিম রামপ্রসাদের। তিনি জদ্দনকে তাঁর নতুন ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। ফলে ১৯৩২ সালে জদ্দন লাহৌরের প্লে আর্ট ফটোটোন কোম্পানিতে যোগ দেন। পরের বছর মুক্তি পায় ‘রাজা গোপীচন্দ’ ছবিটি। এতে জদ্দন মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। সে সময়ে জদ্দনের বয়স চল্লিশ। পরে জদ্দন করাচির এক চিত্রসংস্থার ‘ইনসান ইয়া শয়তান’ ছবিতেও অভিনয় করেন। এ ছাড়া 

‘প্রেম পরীক্ষা’, ‘সেবাসদন’ ছবিতেও অভিনয় করেন।

দেশের প্রথম মহিলা সঙ্গীত পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম জদ্দন। ১৯৩৪ সালে তিনি শুরু করেন তাঁর নিজের চলচ্চিত্র সংস্থা সঙ্গীত মুভিটোন। ‘তলাশ-এ-হক’ ছবির কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন স্বয়ং জদ্দন। এর পরে একে একে ‘হৃদয় মন্থন’, ‘ম্যাডাম ফ্যাশন’, ‘জীবনস্বপ্না’, ‘মোতি কা হার’, ‘অঞ্জুমান’, ‘দারোগাজি’ ছবিগুলি মুক্তি পায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জদ্দনের নাম। 

নিজের জীবদ্দশাতেই জদ্দন মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতের এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল। তাঁর আদবকায়দা, কথাবার্তা এবং ব্যক্তিত্ব তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। উর্দু, ফারসি, আরবি ছাড়াও হিন্দি ও বাংলা ভাষায় তিনি ছিলেন সাবলীল। অবসরে সাঁতার কাটতেন, লং ড্রাইভে যেতেন এবং টেনিস খেলতেন। কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মীমাংসায় জদ্দন ছিলেন দক্ষ। 

কলকাতা ছাড়ার পরে গান গাওয়া আর অনুষ্ঠান করাও কমিয়ে দিয়েছিলেন জদ্দন। মুম্বইয়ে স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, নিজের মেয়ের জীবন সুরক্ষিত করতেই জদ্দন কলকাতা ছেড়েছিলেন। মা হিসেবে জদ্দন ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। তিনি কখনও চাননি যে, মেয়ে বাইজি হোক। মুম্বইয়ে মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। সব সময়ে তাকে চোখে চোখে রাখতেন। এমনকি তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ নার্গিসের সঙ্গে দেখাও করতে পারত না। এই নিয়ে একটি ঘটনা শোনা যায়। 

একবার সেলিম নামে নবাবের পরিবারের এক সদস্য মুম্বইয়ে জদ্দনবাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন নার্গিসের সঙ্গে দেখা করার জন্য। গিয়ে দেখেন জদ্দনবাই সুপুরি কাটছেন। জদ্দন তাঁকে দেখে অভ্যর্থনা করলেও অত্যন্ত ভদ্র ভাবে জানালেন, নার্গিস অসুস্থ। ডাক্তার তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন। তবে সেলিমও নাছোড়বান্দা! এর পরে জদ্দন এ কথা সে কথা বলতে বলতে সেলিমকে বলেন, দেশের সব রাজা নবাবদের তিনি আপাদমস্তক চেনেন। অতএব...

সে যাত্রা দেখা না হলেও পরে সেলিম নার্গিসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জদ্দনের চোখের আড়ালে, তবে বাড়িতে নয় স্টুডিয়োয়।

নানা কারণে ১৯৪৯ সালটা জদ্দনের জীবনে ছিল বড়ই বিয়োগান্তক। হঠাৎই মোহনবাবু মারা গেলেন। তার কয়েক মাস পরেই চলে গেলেন জদ্দন। সুরের আকাশে যেন এক নক্ষত্র পতন ঘটল!

আর বেলেঘাটার বদন রায় লেনের সেই বাড়িটি? অমিত ধরের একটি লেখা থেকে জানা যায়, জদ্দনের সেই শখের বাড়িটিতে এখন প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এক সময়ে তৈরি হয় কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের ভোকেশনাল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর হ্যান্ডিক্যাপড। জদ্দনের মেয়ে নার্গিস বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়কে দান করেছিলেন। তবে সেই দানে একটি শর্ত ছিল। বাড়িটি প্রতিবন্ধী কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। পরবর্তী কালে সেই বাড়িতেই প্রাথমিক ভাবে গড়ে ওঠে বি সি রায় পোলিয়ো হাসপাতাল। পরে রোগীর চাপ বাড়ায় বাড়িটির উল্টো দিকে হাসপাতালের নতুন ভবন তৈরি হয়। আর পুরনো বাড়িটি হয় পোলিয়ো হাসপাতাল কর্মীদের থাকার জায়গা। ১৯৭৬ সালে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক কলকাতায় প্রতিবন্ধীদের একটি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার জায়গা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বাড়িটি তাদের দেয় বিনা ভাড়ায়।

ঋণ: নগরনটীকথা: রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়, গন্ধর্বকন্যা গওহরজান: উমানাথ সিংহ, স্কিন রাইটিং অ্যান্ড ফেমিনিস্ট রিরাইটিং: দ্য লস্ট ফিল্মস অব জদ্দনবাই: দেবশ্রী মুখোপাধ্যায়

কৃতজ্ঞতা: সুব্রত দত্ত

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন