কে এস রাধাকৃষ্ণন ভারতীয় সমকালীন শিল্পকলার জগতে এক বিশেষ নাম। বিশেষত ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে তাঁর পরিধির পরিচয় নতুন করে দেওয়ার নয়। কেরলের ভূমিপুত্রের কাজ ও তাঁর ভাস্কর্য বিষয়ক শিল্পশিক্ষার জ্ঞান অনুভব করেছিলেন কলাভবনের তৎকালীন দুই ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ ও শর্বরী রায়চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে রাধাকৃষ্ণন বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা এবং একের পর এক কাজে তাঁর উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি দিল্লি প্রবাসী। অবিরল ভাস্কর্য নির্মাণের দক্ষ এক কারিগর।

সম্প্রতি ‘এফেমেরা’ নামে তাঁর একক প্রদর্শনীটি শেষ হল এ এম আর্ট মাল্টি ডিসিপ্লিনস গ্যালারিতে। আয়োজনটি রাধাকৃষ্ণনের মধ্যস্থতা ও পরিকল্পনায় সম্পন্ন করেন অয়ন মুখোপাধ্যায়। প্রদর্শনীটির বিশেষ দিকটি হল, এটি একটি মাত্র কাজের প্রদর্শনী। শুধু একটি ডিজ়াইন ফরম্যাটের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রাধাকৃষ্ণন ‘কনসেপ্ট অব সিঙ্গল ডিসপ্লে’কে আসলে এক নতুন চেহারায় উপস্থিত করেছিলেন এ প্রদর্শনীতে। গ্যালারির সব কালো দেওয়ালের মাঝে একটিই কাজ, একটিই ন্যারেশন, অনেকটা ফোরডি অবজেক্টের মতোই। অবশ্য কাজ হিসেবে এক কথায় এটিকে বলা যায় ‘স্কাল্পচার বেস্ড ইনস্টলেশন’। অবশ্যই কনসেপচুয়াল। তাঁর অন্যান্য কাজেও আত্মগোপন করে থাকে ভিন্ন সব গল্প।
দ্য সিঙ্গল কনসেপ্টে কালো প্রায় অন্ধকার কক্ষের মাঝখানে ঈষৎ বঙ্কিম একটি রক বা আপাত নিম্নগামী এক সলিড ফর্ম, যার প্রয়োজনীয় জ্যামিতির সমান্তরাল অধ্যায় রচনা করছে গোটা পর্বটি। কী এই পর্ব? খুব সূক্ষ্ম ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে দর্শককে। এই উঁচু ব্রোঞ্জের সমতলীয় কাঠামোর পিছনে সরু রডের বাঁকানো মাথায় স্ট্রিট লাইটের আদলে ধাতব কভারের নীচে পনেরো ওয়াটের জ্বলন্ত বাল্ব। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন আবহের মাঝে অসাধারণ নাটকীয় ও কাব্যিক একটি আলো মাত্র প্রতিফলিত করছে সমগ্র ন্যারেশনকে! এই ফোরডি স্ট্রাকচারের গোটাটাই ব্রোঞ্জ। তার উপর পাঁচটি নৌকা ইতস্তত ছড়ানো। বাঁকানো ভাবে রাখা। এই নৌকার মধ্য থেকে গজিয়ে ওঠা সরু সরু শাখা প্রশাখার মতো ফর্মগুলি ঊর্ধ্বগামী এবং হাত-পা ছড়ানো। উল্লসিত বা আন্দোলনরত এক দঙ্গল মানুষ বুঝি এ ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে উদ্যত। এই বিভ্রম মিশে যায় সমগ্র নাটকীয় মুহূর্তের সঙ্গে রহস্যময় আলো-আঁধারের এমন ব্যাখ্যায়।

যেন সমুদ্রতটে পড়ে থাকা, দাঁড়িয়ে থাকা, বেঁকে উপরে ওঠা এই নৌকার চারপাশের তট, চকচকে আলো পড়া সোনালি বালুতটের মতো! রাধাকৃষ্ণন গোটাটাই একটি ফিলজ়ফিক্যাল সারফেসের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। এটি একটি জার্নি— স্ট্রিট লাইটের নীচে যেমন পতঙ্গরা উড়তে উড়তে শেষে মারা যায়। এই কৃশ কাঠামোর মধ্যে সন্নিবেশিত সংগঠনের যে অবিশ্বাস্য ছন্দ, তা যেন নাট্যকল্প ও কাব্যিক চেতনার নির্যাসে পুষ্ট। এই যাত্রা অনির্দেশের দিকে, যা চিরস্থায়ী নয়। ওই পিপীলিকারা যেমন মরিবার তরে যায়... আলোর বলয়কে কেন্দ্র করে!

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

এই প্রদর্শনীতে একটিই সংগঠিত ভাস্কর্যের মধ্যে পাঁচখানি নৌকার অবস্থানের বিবর্তিত রূপ। সমুদ্রতটে পড়ে থাকা বা গমনোদ্যোত ওই নৌকাসমূহ কিংবা গুচ্ছ মানবের এক ভয়ংকর নীরব উল্লাসের মধ্যেও অন্তরালে থেকে যায় এই সমগ্র বিন্যাস ও ভাবনার নিবিড় ন্যারেশন। যে লিরিক্যাল কোয়ালিটির অনুরণন এই আধো অন্ধকার কক্ষের ধাতব বালুতটে কোনও এক সূক্ষ্ম সঙ্গীতের মতো আচ্ছন্ন করে, তা উদ্ভূত হচ্ছে ওই নিঃসীম নির্জনতা থেকে। গল্পকে অনুসরণ করে সেও চলে যাচ্ছে অজানা যাত্রাপথে, যা একই ভাবে অনির্দেশের সঙ্গে অস্থির সময়ের দিকের আশ্চর্য এক যাত্রা!

আলোর বিস্তারের চতুর্দিকে তৈরি হয়ে যাচ্ছে আরও এক সমতল প্রতিবিম্ব ও রূপবন্ধের ছায়া, যা কম্পোজ়িশনাল ল্যান্ডস্কেপেরও এক আশ্চর্য আভাস দিচ্ছে। কাজটির দু’টি দিক। নির্দিষ্ট এক অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে একটি কাজ, অন্যটি ডায়মেনশনাল অবস্থান। ঘুরে দেখার মতো। একটি মাত্র কাজ নিয়ে এমন ন্যারেটিভ তৈরি করে, রাধাকৃষ্ণন রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন এই প্রদর্শনীতে।

কেননা কাজটিতে কবিতার নির্যাস আছে। দৃশ্যকল্পের ভিতরে যেন একটি জার্নির স্মৃতিও অনুভূত হয়। নাটকীয়, স্থির, কিন্তু ভীষণ রকম প্রাণবন্ত!