১৯১৭ সাল। ব্রিটিশশাসিত ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড চেম্সফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন স্থাপন করলেন। কমিশনের প্রধান হিসেবে বসানো হল এম ই স্যাডলারকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন কেমন চলছে তার রিপোর্ট তৈরি করাই স্যাডলারের দায়িত্ব। যদিও কমিশনের আসল উদ্দেশ্য অন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরমহলে নজর রাখা। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের পর থেকেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্রিটিশ সরকারের চোখে বিপ্লবী তৈরির আখড়া। স্যাডলার একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী মিলিয়ে মোট ৬৭১ জনকে বিলি করেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে আরও দাবিদাওয়া আলাদা করে লিখে জানানো যাবে। স্যাডলার জানতেন, উত্তরপত্রে কড়া নজর থাকবে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের।

উত্তরদাতাদের মধ্যে একজনের উত্তরপত্র ছিল বেশ দীর্ঘ। পঠনপাঠনের সমস্যা ছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যময় পরিবেশের দিকেও আঙুল তুলেছিলেন। উত্তরপত্রে লেখা ছিল, “যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক করে তোলার কথা ভাবা হয় এবং যথাযথ হস্টেলের ব্যবস্থা করা হয় তা হলে ‘ডেমোক্র্যাটিক ক্লাস’ বা গণতান্ত্রিক শ্রেণির (আমি তাদেরই গণতান্ত্রিক শ্রেণি বলে অভিহিত করছি, যাদের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বলা হয়) কথা ভাবতেই হবে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যে লাগোয়া হস্টেল রয়েছে, তাতে তথাকথিত উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের মৌরসিপাট্টা চলছে। সেই সঙ্গে যোগ দিয়েছে কায়স্থ ও বৈদ্য ছাত্রেরা। কোনও গণতান্ত্রিক শ্রেণির ছাত্রকেই ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ ছাত্র এক ঘরে মেনে নেয় না বা একসঙ্গে খেতে বসলেও আপত্তি জানানো হয়।” উত্তরদাতা বছর কুড়ির এক লেকচারার মেঘনাদ সাহা। মাত্র দু’বছর আগে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন এবং স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এসেছেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টে মেঘনাদ সাহার মতোই পিছিয়ে পড়া বা ‘নিচু জাত’-এর ছাত্রদের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। কিন্তু তাঁর ও মেঘনাদের দৃষ্টিভঙ্গির বুনিয়াদি পার্থক্য ছিল, যা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক। ব্রজেন্দ্রনাথ তাঁর রিপোর্টে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য আলাদা আর্থিক তহবিল গড়ার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। শীলের রিপোর্টে যুগ্গি, বারিক, সুবর্ণবণিক, নমঃশূদ্র, সাহাদের ‘ডিপ্রেসড ক্লাস’ বা কোথাও ‘লোয়ার কাস্ট’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে মেঘনাদের রিপোর্টে এরা প্রত্যেকেই এক ছাতার তলায়, গণতান্ত্রিক শ্রেণি। নিজের রিপোর্টে পৃথক তহবিল গড়ে তোলাকে একদমই প্রশ্রয় দেননি মেঘনাদ। তিনি সবার সমান অধিকারের পক্ষে। মেঘনাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের বর্তমান ভর্তুকিপুষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার সরাসরি বিপক্ষে। তিনি সেই সময়েই বুঝেছিলেন, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের বিভেদ টেনে এবং ভর্তুকি দিয়ে কোনও এক বিশেষ শ্রেণির উন্নতির সম্ভাবনাকে মেরে ফেলায় দেশের সত্যিকারের উন্নতি সম্ভব নয়। 

গবেষণাগারে সহকর্মীদের সঙ্গে (ডান দিকে মেঘনাদ সাহা)

২৮ বছর পরে, দেশভাগের সময়েও মেঘনাদ সাহার গলায় ধ্বনিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টেরই সুর। তখন তিনি আর ২০ বছরের লেকচারার নন। প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। কিন্তু ল্যাবরেটরির বাইরে এসেও তিনি শুনিয়েছিলেন তাঁর সাম্যের গান। স্বাধীনতার বছর দুই আগে সায়েন্স অ্যান্ড কালচার পত্রিকায় মেঘনাদ লেখেন, “দেশভাগের ফলে ভারতে থাকা মুসলমানরা হিন্দুরাজের পদদলিত হয়ে থাকবে এবং সংখ্যালঘু শ্রেণিতে পরিণত হবে বলেই মনে হয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকেও একটা কড়া জাতীয়তাবাদের রেখা দিয়ে ভাগ করে দেওয়া হবে, যা সংখ্যালঘু শ্রেণির মধ্যে ডেকে আনবে সীমাহীন দারিদ্র্য।” পরের বছর ফের একই পত্রিকায় লেখেন, “সত্যিকারের স্বাধীনতা পেতে হলে, অশিক্ষা থেকে মুক্তি পেতে হলে, রোগ-জরা-ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে যেতে হবে।” ‘আওয়ার ন্যাশনাল ক্রাইসিস’ শিরোনামের সেই প্রবন্ধে মেঘনাদের মূল বক্তব্য ছিল, সবাইকে কর্মযজ্ঞে শামিল করতে হবে, তা না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না। 

 বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারারের ভূমিকায় অথবা পরবর্তী কালে প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-সংঘটকের ভূমিকায়, সবাইকে একই সম্ভাবনার সুযোগ করে দেওয়া, জাতি-ধর্ম ভুলে যোগ্যতা অনুযায়ী সবাইকে সমান কর্মযজ্ঞে শামিল করা, যা সাম্যবাদের গোড়ার কথা, তা-ই ছিল মেঘনাদ সাহার জীবনের মূল জীবনদর্শন। কিন্তু তাঁর এই জীবনদর্শনের উৎস কোথায়? উত্তর জানতে পৌঁছে যেতে হবে বিশ শতকের গোড়ার শেওড়াতলি গ্রামে, মেঘনাদ সাহার জন্মস্থলে। অধুনা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরের সেই গ্রাম ব্রিটিশ শাসনের সময় তখন সভ্যতার আলো থেকে বহু দূরে। সেখানেই ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর মেঘনাদ সাহার জন্ম। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ১০ কিলোমিটার দূরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। যাওয়া-আসার দুস্তর সমস্যা। তাই বিদ্যালয়ের কাছাকাছি বসবাসকারী ডাক্তার অনন্ত দাসের বাড়িতে আশ্রয় নেন কিশোর মেঘনাদ। বাড়ির গোয়ালঘর দেখাশোনা, বাসন মাজার মতো কাজ মেঘনাদকে করতে হত। তবেই জুটত খাবার, মাথা গোঁজার ঠাঁই। যদিও কাজগুলো মনের আনন্দেই করতেন তিনি। কারণ, তার বদলে মিলত পড়াশোনার সুযোগ। কিন্তু অনন্ত দাসের বাড়িতে ছিল জাতপাত নিয়ে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি। মেঘনাদ ‘নিচু জাত’-এর ছেলে। তাই বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ নিষেধ। নির্দেশ ছিল, নিজের বাসনপত্র গ্রামের পুকুর থেকে নিজেকেই ধুয়ে মেজে আনতে হবে। বাড়ির বাসনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললেই কেলেঙ্কারি। পড়াশোনার জন্য সব মুখ বুজে মেনে নিলেও সংবেদনশীল মেঘনাদের মনে গ্রামের দিনগুলি দাগ কেটে গিয়েছিল।

নিজের কৈশোরের অভিজ্ঞতা দিয়েই তিনি বুঝেছিলেন, জাতিভেদ, অসাম্য আসলে সমাজের এক গভীর অসুখ। জাতিভেদ প্রথার কদর্য দিকটা আরও ভাল ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে এসে। তিনি তখন শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত সাইকেলে চড়ে গৃহশিক্ষকতা করে বেড়ান। বাকি সময়টা ডুবে থাকেন গণিতে। মেধা বৃত্তি পাওয়ায় তখন সহপাঠীদের সম্ভ্রমের পাত্র মেঘনাদ। 

কিন্তু এক বার সরস্বতী পুজোর দিন বদলে গিয়েছিল সব কিছু। পুজোমণ্ডপে অঞ্জলি দেওয়ায় মেঘনাদের উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল ব্রাহ্মণ ছাত্ররা। ব্যাপারটা এ রকম যে, তুমি যতই মেধাবৃত্তি পাও, আসলে তো ছোট জাত। তাই ব্রাহ্মণদের সঙ্গে এক আসনে বসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারো না। মেঘনাদের ব্রাহ্মণ সহপাঠীদের ভাবগতিক এমনই ছিল। এই ঘটনাই জাতিভেদের বিরূদ্ধে আজীবন লড়াই করার বারুদ ভরে দিয়েছিল মেঘনাদের বুকে, যার ছাপ পড়েছিল তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মতাদর্শে। সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছিল বৈদিক ধর্মের প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলিকে ব্যবহার করে হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা সামাজিক বিভেদের প্রতি বিদ্বেষ। সেই বিদ্বেষ এমনই জায়গায় পৌঁছেছিল যে তিনি পিতৃদত্ত নাম পর্যন্ত বদলে নিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি, স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের কিউরেটর ডেভিড ডিভরকিনকে লেখা এক চিঠিতে মেঘনাদ সাহার বড় ছেলে অজিত সাহা জানিয়েছিলেন, যে দিন তাঁর বাবা জন্মেছিলেন, সারা দিন ধরেই প্রচণ্ড ঝড়-জলের তাণ্ডব। আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ঝড়-জলের দেবতা দেবরাজ মেঘরাজ ইন্দ্র। তাই দেবরাজ ইন্দ্রের নামানুসারে নবাগত শিশুর নাম রাখা হয়েছিল মেঘনাথ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুদের বৈদিক ধর্মীয় আচরণের গোঁড়ামি মেঘনাথকে এতটাই বিরক্ত করে তুলেছিল যে, তিনি নিজের নাম পাল্টে রেখেছিলেন মেঘনাদ। যিনি ইন্দ্রজিৎ। দেবতা নন, রাক্ষসদের প্রতিনিধি। সেই থেকে গোটা বিশ্বের কাছে তিনি মেঘনাথ নন, মেঘনাদ নামে পরিচিত হন। তাঁর চোখে মেঘনাদ ইন্দ্রজিৎ সমাজের অপমানিত অংশের প্রতিনিধি, যাঁকে অন্যায় ভাবে বধ করেছিল ব্রাহ্মণ সমর্থিত এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র। শুধু বিজ্ঞান বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, নিজের নাম বদলেও মেঘনাদ প্রমাণ করেছিলেন তিনি আসলে ডেমোক্র্যাটিক ক্লাসের প্রতিনিধি, যাদের পিছিয়ে পড়া বলা হয়, জোর করে পিছিয়ে রাখা হয়।

১৯১৫ সালে যখন স্নাতকোত্তর পাশ করেন মেঘনাদ সাহা, তখন বিশ্ব জুড়ে পদার্থবিদ্যায় নতুন নতুন আবিষ্কারের ঘটনা তাঁর মধ্যে এক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল। ছাত্রাবস্থায় সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। যোগ্য সহপাঠীর উপস্থিতিও মেঘনাদকে অনেকটাই উৎসাহ জুগিয়েছিল। পরের বছরই নব্য প্রতিষ্ঠিত রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে লেকচারার পদে যোগদান। শুরু হয় পড়ানোর পাশাপাশি নিজের গবেষণা। মেঘনাদ সাহার বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম দিকের বিষয় ছিল তাত্ত্বিক ও ফলিত জ্যোতির্বিজ্ঞান। একাধিক বিষয়ে গবেষণা করলেও তিনি বিখ্যাত হন তাপজনিত আয়নন বা thermal ionization বিষয়ক তত্ত্বের জন্যে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে মেঘনাদ সাহার বিজ্ঞান গবেষণা নির্ভেজাল পদার্থবিদ্যা ও শুষ্ক গাণিতিক সমীকরণের সমাহার। কিন্তু ছোটবেলা থেকে জাতপাতের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সামাজিক বিভাজনের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ যে সাহার তাপজনিত আয়ননের গবেষণার মূলে নিহিত ছিল, তা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানের ইতিহাসের গবেষক আভা শূর। ২০১১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ডিসপার্সড রেডিয়েন্স— কাস্ট, জেন্ডার অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মেঘনাদ সাহা সূর্য বা কোনও নক্ষত্রে স্থিত পদার্থগুলির পরমাণুর আয়ননের ঘটনা ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর জাতপাত বিরোধী সমাজভাবনার প্রেরণায়। নক্ষত্রের মধ্যকার পরমাণুগুলি প্রচণ্ড তাপ ও চাপে যেমনটা ব্যবহার করে, তা তাদের নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ী। নিজস্ব ইচ্ছে অনুযায়ী। নক্ষত্রের প্রভাবে নয়। অধ্যাপক সাহার চিন্তাভাবনায় গোটা সমাজটাই একটা নক্ষত্র, যে সব সময়ই তার মধ্যকার পদার্থের পরমাণুগুলিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু পরমাণুগুলি নিজের ইচ্ছে মতোই জীবন কাটাবে, যেমনটা কাটিয়েছিলেন মেঘনাদ। শেওড়াতলির অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রাম থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া, আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা, আরও পরে ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির সভ্য নির্বাচিত হওয়া— তাঁর নিজের জীবনটাই যেন নক্ষত্রের প্রচণ্ড তাপ ও চাপের সম্মুখীন হওয়া এক পরমাণুর গল্প, যে কিনা চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিধিনিষেধে প্রভাবিত হয়নি। বরং তাঁর স্বাধীন ইচ্ছে, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই বেছে নেওয়ার প্রত্যয় প্রভাবিত করেছে গোটা সমাজকে। তবে এই সমস্ত কিছুই খুব সহজে হয়েছিল, এমনটা নয়।

তাপ আয়নন বিষয়ক গবেষণা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আনকোরা লেকচারারকে ভবিষ্যতের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়ার মঞ্চ তৈরি করে দিলেও পদে পদে এসেছিল বাধা, যা ক্রমশই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল এক নতুন সত্তার দিকে— রাজনীতিক মেঘনাদ সাহা। ১৯২০ সালে ইম্পিরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অধ্যাপক আলফ্রেড ফায়োলারের গবেষণাগারে কাজ করতে যান মেঘনাদ। উদ্দেশ্য, নিজের তাপ আয়নন তত্ত্বকে হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখা। সেখানে থাকাকালীন জ্যোতির্বিদ হিলবার্ট হল টার্নার মেঘনাদকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট উইলসন অবজ়ারভেটরির প্রধান জর্জ এলারি হেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তখন একমাত্র মাউন্ট উইলসন অবজ়ারভেটরির গবেষণাগারেই মেঘনাদের তত্ত্বকে পরীক্ষা করে দেখার মতো যন্ত্রপাতি ছিল। ১৯২১ সালের ৯ জুলাই, হলকে চিঠি লিখে মেঘনাদ জানান যে, তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপ আয়নন বিষয়ক গবেষণা প্রমাণ করে দেখার ক্ষমতা নেই। হল যদি তাঁকে সেই সুযোগ দেন, তা হলে তিনি নক্ষত্রের অন্দরমহলের পরিবেশ নিয়ে আরও কাজ করতে পারবেন। হলের কাছ থেকে কখনও উত্তর পাননি মেঘনাদ। ১৯৮৯ সালের মে মাসে ডিভরকিন সায়েন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকায় এক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। সেই প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, সেই সময়ে হলের হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন হেনরি নরিস রাসেল। সেই চিঠিতে মেঘনাদের তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে মাউন্ট উইলসন অবজ়ারভেটরির আগামী কয়েকটি গবেষণা প্রকল্পের উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সাহাকে সশরীরে উপস্থিত থেকে সেই কর্মকাণ্ডে শামিল হতে কেউই আমন্ত্রণ জানাননি। এর পরেও রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সাহা। সামান্য একটি কোয়ার্টজ়ের স্পেকট্রোগ্রাফের জন্য অর্থ সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তিনি। যথারীতি সেই সাহায্যও আসেনি। পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকা এই ঘটনাগুলি মেঘনাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, তিনি যতই প্রতিভাধর হন না কেন, আসলে এক পরাধীন দেশের বিজ্ঞানী।  

কলেজে পড়ার সময়ে জাতিভেদের শিকার হওয়া, সেই স্মৃতি পিছনে ফেলে বিজ্ঞানী হিসেবে কেরিয়ার গড়ার পথেও পদে পদে পশ্চিমি বিজ্ঞানীদের নিস্পৃহ মনোভাবের সম্মুখীন হওয়ার  সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশের প্রকৃত অবস্থার কথা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উপলব্ধি করা। ছোটবেলার অন্ধকার শেওড়াতলার গ্রাম্য জীবন, কলেজে পড়ার সময়ে খাস কলকাতা শহরে কুসংস্কারের ছায়া তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে, বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতি ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নতি হওয়া সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে দেশের নিচু তলার মানুষের দুর্দশা তাঁকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল ১৯১৩ সালে প্রিয় শিক্ষক প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রেরণায় গড়ে তোলা বন্যাত্রাণ প্রকল্পের দিনগুলি। 

মেঘনাদ বুঝেছিলেন এই সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য দেশকে আগে প্রস্তুত করতে হবে। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না। দেশে শিল্প গড়লে তবেই তা ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আবার বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের ফলাফলে সমৃদ্ধ হবে শিল্প। তবে এই বিশাল কর্মকাণ্ড তখনই সম্ভব হবে, যখন সম্পদের বণ্টনে সমতা আসবে। দেশের সম্পদ বণ্টনের দায়ভার বিজ্ঞানীদের কাঁধে থাকে না, থাকে দেশচালক আমলাদের হাতে। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলীয়ান দেশচালকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন মেঘনাদ। ধীরে ধীরে সেই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তোলার দিকে ঝুঁকছিলেন তিনি।

১৯৩৫ থেকে ’৫১— এই ১৬ বছর রাজনীতিক ও বিজ্ঞান প্রশাসক মেঘনাদকে আত্মপ্রস্তুতির মঞ্চ গড়ে দেয়। সায়েন্স অ্যান্ড কালচার পত্রিকার হাত ধরে দেশের বিবিধ সমস্যার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান নির্দেশ এবং ১৯৩৮ সালে তৎকালীন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষচন্দ্র বসুকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসের জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে যার সূত্রপাত। 

এর পরে ঘটে দেশভাগের মতো ঘটনা। ভিটেহারা মানুষদের দুরবস্থা সামনে থেকে দেখেন তিনি। কলকাতায় তখন লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ভিড়। শরণার্থীদের সাহায্যার্থে একাধিক সম্মেলন, আলোচনাচক্রে যোগ দিয়ে মানুষের দুর্দশার কথা আরও বেশি করে উপলব্ধি করেন অধ্যাপক সাহা। এই সমস্ত ঘটনাই তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়। ১৯৫১ সালের সাধারণ নির্বাচনে মেঘনাদ সাহা নির্দল প্রার্থী রূপে দাঁড়িয়ে বিপুল জয় পান। উল্লেখযোগ্য হল, মেঘনাদ সাহার নির্বাচনী ইস্তাহারে তাঁকে ‘সাম্যবাদী’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। তাঁর প্রচারচিহ্ন ছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দুই প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, কোদাল ও বেলচা। সেখানেও তিনি তথাকথিত নিচুতলার মানুষেরই প্রতিনিধি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ, প্রাবন্ধিক মেঘনাদ সম্পর্কে জানার সবচেয়ে ভাল উপায় তাঁর নিজের লেখাগুলিই। দীর্ঘদিন ধরে মেঘনাদ সাহার সুযোগ্য শিষ্য শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় তাঁর মাস্টারমশাইয়ের লেখাগুলি সযত্ন সঙ্কলন ও সম্পাদনা করেছেন। রাজনীতিক হিসেবে তাঁর ভূমিকা জানার ক্ষেত্রে জ্যোতির্ময় গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে লেখা শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়েরই বই ‘মেঘনাদ সাহা ইন পার্লামেন্ট’ একটি আকরগ্রন্থ। 

কিন্তু কেমন ছিলেন ব্যক্তি মেঘনাদ? তাঁর ছাত্র ব্রজেন্দ্রকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা থেকে জানা যায়, স্পষ্টবক্তা হিসেবে ‘কুখ্যাতি’ ছিল মেঘনাদের। আসলে কাজের জায়গায় কোনও রকম কুঁড়েমি তিনি পছন্দ করতেন না। ছাত্ররা তাঁকে ভয় পেত। কিন্তু কড়া শিক্ষকের ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক ছাত্রদরদি নরম মনের মানুষ। ব্রজেন্দ্রকিশোরের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন কলকাতায় জাপানি বোমাতঙ্ক ছড়িয়েছে, অধ্যাপক সাহার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন তিনি। সকালে চা খেয়ে পড়াশোনা, গবেষণার কাজ শুরু করায় অভ্যস্ত ছিলেন ব্রজেন্দ্রকিশোর। কিন্তু অধ্যাপক সাহার বাড়ির রান্নার লোক অনেকটাই দেরি করে আসতেন। ছাত্রের অসুবিধের কথা ভেবে নিজে হাতে চা তৈরি করে খাওয়াতেন তিনি। তবে হঠাৎ করে রেগে যাওয়াও ছিল মেঘনাদের স্বভাবের একটি অঙ্গ। আসলে, অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী মানুষটি সারা জীবনই বঞ্চনা ও গঞ্জনার শিকার— যা প্রভাব ফেলেছিল তাঁর স্বভাবেও। এমনকি নিজের বিবাহেও সহ্য করতে হয়েছিল গঞ্জনা। 

মেঘনাদ সাহার বউমা বিশ্ববাণী সাহার লেখা থেকে জানা যায়,  ১৯১৮ সালে রাধারাণী রায়ের সঙ্গে বিবাহ হয় মেঘনাদের। বিয়েতে তাঁর পাঞ্জাবির তলা দিয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি দেখা যাচ্ছিল। পাত্রের দুর্দশা দেখে বিয়েতে প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলেন রাধারাণীর ঠাকুমা। আসলে গবেষণায় মগ্ন মানুষটি তখনও জীবনে বিশেষ টাকাকড়ি করে উঠতে পারেননি। কিন্তু তা বলে বিদ্যাচর্চায় খামতি থাকেনি। গবেষণাগার থেকে ফিরেও বইয়ের জগতে ডুবে যেতেই পছন্দ করতেন। বাড়িতে ছিল নিজস্ব লাইব্রেরি। রবীন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়রের ভক্ত ছিলেন। 

মেঘনাদ সাহার তৃতীয় কন্যা চিত্রা রায় জানিয়েছেন, অধ্যাপক সাহা যখন গবেষণার কাজ সেরে বাড়িতে ফিরতেন, শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অব এররস’ থেকে পড়ে শোনাতে হত তাঁকে। অধ্যাপক সাহার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে জায়গা পেয়েছিল বিশ্বসাহিত্যের বিশাল সম্ভার— যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ম্যাক্সিম গোর্কি, নুট হামসুন, লিয়ো টলস্টয়ের লেখা বইপত্র। অধ্যাপক সাহার এই সাহিত্যপ্রেম দানা বেঁধেছিল ইলাহাবাদে থাকাকালীন। ইলাহাবাদে সেই সময়ে একটা বাংলা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যমণি ছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। এ ছাড়াও ছিলেন যোগেনচন্দ্র গুপ্ত। এঁদের সান্নিধ্য অধ্যাপক সাহার কাছে ছিল বিজ্ঞান ও রাজনীতির বাইরে এক ঝলক মুক্ত বাতাসের মতো। সাহিত্য পাঠ ও চর্চা ছাড়াও দেশবিদেশের পত্রিকা সংগ্রহে তাঁর উৎসাহ ছিল। বাড়ির ছোটদের ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক ম্যাগাজ়িন থেকে বিভিন্ন ছবি দেখাতেন, অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি পড়ে শোনাতেন। ছোটদের জন্য কলমও ধরেছিলেন কয়েক বার, যা প্রকাশিত হয় যোগেনচন্দ্র গুপ্তের ‘শিশুভারতী’ পত্রিকায়। সাহিত্য ছাড়াও অধ্যাপক সাহা উৎসাহী ছিলেন ভাষাতত্ত্ব চর্চায়। বিদেশি ভাষা শেখার প্রতি তাঁর আকর্ষণের সূত্রপাত ঢাকার স্কুল থেকে। ছাত্রাবস্থায় ঢাকা ব্যাপটিস্ট মিশন আয়োজিত এক পরীক্ষায় তিনি সংস্কৃত, বাংলা ও ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। ইন্টারমিডিয়েটে জার্মান ভাষার সঙ্গে পরিচয়। এর পরে সারা জীবনই যখন সুযোগ পেয়েছেন বিভিন্ন ভাষা চর্চা করে গিয়েছেন। রমাপ্রসাদ চন্দ্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিরজা শঙ্কর গুহর সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতির ভাষা চর্চা করতেন নিয়মিত। সেই বিষয়ে একাধিক বই সংগ্রহ করাটাও তাঁর নেশা ছিল। 

অধ্যাপক সাহার বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। এক বার পাড়ার ছেলেরা তাঁর বাড়িতে সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে তিনি তাদের নিজের ঘরের বিশাল বইয়ের সম্ভার দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এই ভাবেই সরস্বতীর আরাধনা করি। চাঁদা তুলে পুজোয় বিশ্বাস করি না।’ আসলে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন সরস্বতী পুজোয় ব্রাহ্মণ সহপাঠীদের অপমান তিনি ভুলতে পারেননি। 

ধীরে ধীরে প্রশাসকের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া মেঘনাদ সাহার তাত্ত্বিক বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষতি করেছিল বলে বিজ্ঞান মহলের একাংশের ধারণা। যদিও দেশের মানুষের স্বার্থে মেঘনাদ বারবারই চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীর গ্ল্যামারকে ঝেড়ে ফেলে ‘আইভরি টাওয়ার’ থেকে নেমে আসতে এবং বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের কাজে ব্যবহার করতে। তাপ আয়ননের মতো গবেষণাপত্র আর তিনি প্রকাশ করেননি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান গবেষণা থেকে ক্রমশ দূরে সরে গিয়েছেন। 

‘দেশ’ পত্রিকাকে (১৯৯৩, ৯ অক্টোবর সংখ্যা) দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পণ্ডিত ডেভিড ডিভরকিন জানিয়েছিলেন, মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল প্রাইজ়ের জন্য মনোনীত করার চেষ্টা করেছিলেন ১৯২৭-এর পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী আর্থার কম্পটন। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণায় ভাটা পড়ার কারণেই হোক বা দেশীয় বিজ্ঞানীদের বিরোধিতায়, নোবেল প্রাইজ় তিনি পাননি। তাঁর জীবনযাপনের দিকে চোখ রাখলে বোঝা যায়, নোবেল পুরস্কারের মুখাপেক্ষীও ছিলেন না তিনি। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল বিজ্ঞানের হাত ধরে জাতিভেদ, অসাম্যকে জয় করা এবং তথাকথিত উঁচু তলার মানুষদের তৈরি করা বিভাজন রেখাকে মুছে ফেলা। আমৃত্যু সেই কাজটাই করে গিয়েছেন মেঘনাদ নিষ্ঠার সঙ্গে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিজ্ঞান সংগঠক মেঘনাদকে না পেলে ভারত বিজ্ঞান গবেষণায় সাবালক হয়ে উঠত না। কংগ্রেসের চরকা কাটার নীতির বিরোধিতার কারণে দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল না, যা বাধা সৃষ্টি করেছিল মেঘনাদ সাহার কর্মকাণ্ডে। স্বাধীনতার পরে, ভারত সরকারের পারমাণবিক শক্তি কমিশনেও তাঁর মতামত অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সংগঠক হিসেবে নিজের কাজ করে গিয়েছেন তিনি। এশিয়া মহাদেশের প্রথম সাইক্লোট্রন যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করা, প্রথম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ তৈরিও তাঁর সাহসী পদক্ষেপের পরিচয় বহন করে। এ ছাড়াও দেশীয় উপাদানে নিজের বিটা স্পেকট্রোমিটারও তৈরি করেছিলেন অধ্যাপক সাহা, যার সাহায্যে ভারতীয় খনিজ পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা জরিপ করা, এ দেশে জীববিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্রিক বিজ্ঞান বা নিউক্লিয়ার সায়েন্সের প্রয়োগ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়। 

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আচমকাই মৃত্যু এসে থামিয়ে দিয়েছিল এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। ছাত্র ব্রজেন্দ্রকিশোরের লেখায় আছে, ‘ড. জ্ঞান ঘোষের ফোনে অধ্যাপক সাহার অসুস্থতার খবর পাই। ওয়েলিংটন নার্সিংহোমে পৌঁছে জানতে পারি সব শেষ।’ 

বিজ্ঞানে ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে মেঘনাদ স্থান দিয়েছিলেন দেশকে, জাতিকে, দেশের অর্থনীতিকে। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, তিনি সময়ের আগে জন্মেছিলেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত হয়ে উঠতেই পারেনি তৎকালীন ভারত। তাই বিজ্ঞান বা রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী। একটা বিষয় লক্ষ করার মতো, ভারতীয় বিজ্ঞানের তিন নক্ষত্র প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে আচার্য হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু মেঘনাদ সাহা আজও শুধুই অধ্যাপক সাহা। এ ক্ষেত্রেও তিনি ডেমোক্র্যাটিক ক্লাসের প্রতিনিধি, যাদের ‘পিছিয়ে পড়া’ বলা হয়, জোর করে পিছিয়ে রাখা হয়।

 

ঋণ: ড. চিত্রা রায়

‘ডিসপার্সড রেডিয়েন্স, কাস্ট, জেন্ডার অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া’: আভা শূর

‘মেঘনাদ সাহা: দ্য সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড দ্য ইনস্টিটিউট বিল্ডার’: শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় 

ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্ট্রি অব সায়েন্স, ২৯ (১), ১৯৯৪

দেশ পত্রিকা—১৯৯৩, 

৯ অক্টোবর সংখ্যা