মনে করুন সময়টা ১৯৪০-এর আশেপাশে। সুদর্শন তরুণ বোম্বাইয়ের এক নম্বর টকি কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন। প্রথম ছবিতেই নায়ক। তাঁর বিপরীতে ওই ফিল্ম কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা প্রোডিউসার সাহেবের স্ত্রী। তিনি সিনেমা রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী। উল্লিখিত দিনে তাঁরা শহরের বাইরে জঙ্গলের দিকে রওনা দিয়েছেন, আউটডোর শুটিংয়ের জন্য। নির্জন সর্পিল পাহাড়ি পথ, মোটরগাড়িতে শুধু হিরো আর হিরোইন। হিরোইন সম্পর্কে রটনা— তিনি গভীর জলের মাছ। আপাতত পাশে পাথর হয়ে বসে থাকা নায়কের দিকে মোহ মোহ ইশারায় চাইছেন। এক সময়ে বেশ স্পষ্ট করে প্রলোভনের হাতছানিটি নাড়লেন।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত একটি উপন্যাসে নাকি সেই বিশেষ দিনটির ঘটনাক্রম হুবহু বিবৃত হয়েছে। ঔপন্যাসিকের ভাষায়, ‘দেবী সরল ভাবে বলিলেন, আগামী ২৭শে আমার জন্মদিন, বাইশ বছর পুরবে।’ নতুন নায়ক তখনও ক্যামেরা ছাড়া অভিনয় করতে শেখেননি। তাই মুখে যদি ঘোর অবিশ্বাস ফুটে ওঠে, সেই ভয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেবী তখন হিরোইন সাজছেন পনেরো বছর হয়ে গিয়েছে। বয়স কম করে পঁয়ত্রিশ। সাংঘাতিক সেই দিনটিতে যুবাটির জন্য আর কী কী বিপদ ওত পেতে ছিল, ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে সেই রূপের ঈশ্বরী কিন্তু সে দিন মোটেও মিথ্যে কিছু বলেননি।

এই যেমন তাঁর বিষয়ে তথ্যপ্রমাণাদি জানাচ্ছে, দেবিকা রানি অন্তত ছিয়াশি বছর বেঁচেছিলেন। সেই হিসেব মতো তাঁর জন্ম ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ। প্রথম মঞ্চাবির্ভাব জন্মশহর ওয়াল্টেয়ারে, চার বছর বয়সে। নারদ মুনির চরিত্রে আশ্চর্য রঙিন অভিনয় করে সবাইকে তাজ্জব করে ছেড়েছিলেন। কয়েক বছর বাদেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে পড়তে আসা এই নাতনিটিকে আলাদা করে লক্ষ করলেন। সুকুমার বিদ্যা, চারুশিল্প, নাচ-গানে তুখড়। গুরুদেব তখনই বোনপোকে বলেছিলেন, ‘তোমার কন্যেটি সূর্যমুখীর কুঁড়ি। ওর জন্য রোদ্দুরের বন্দোবস্তে ফাঁকি দিও না যেন।’ সেই মাহেন্দ্র ক্ষণেও কিন্তু ওই আপনাতে বুঁদ ছোট্ট মেয়েটির প্রকৃত বয়স একুশ! তাঁর জীবনে যে শৈশব বা কৈশোর কোনও কালেই ছিল না। তাই সেই পর্যায়ের বয়সোচিত গল্প তেমন একটা মেলেও না। আবার প্রথমোক্ত সেই বিষাক্ত আউটডোরের অনেক অনেক দিন বাদে, প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে জীবনসায়াহ্নে যখন এই দেবী আরামকৌচে গা ডুবিয়ে, ওয়াইন গ্লাসে বেপরোয়া চুমুক দিচ্ছিলেন, সে দিনও তাঁর বয়স একুশই! বার্ধক্য তাঁর নখের আর ঠোঁটের কড়া রঙের কাছে ধমক খেয়ে ফিরে গিয়েছিল। ঠিক চোখে দেখলে, জন্মানো থেকে মৃত্যু অবধি এই অভিনেত্রীর বয়স ছিল ২১ বছর ১১ মাস। ২২ পুরতে দিন কয়েক বাকি! আজীবন, আমরণ উদ্ভিন্নযৌবনা। পাশ্চাত্যের ‘ফরএভার টোয়েন্টিসেভেন’ নামে প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীগোষ্ঠীর অনেক আগে, আমাদের বলিউডের এই ড্র্যাগন-লেডিও ‘ফরএভার টোয়েন্টিওয়ান’!  যৌবনকে এমন উদগ্র ভাবে শাসন করতে পারলে তবেই না দেবিকা রানি হওয়া যায়!

স্বামী রোয়েরিখের ইজেল-ক্যানভাসে দেবিকা 

 

অন দ্য টপ অব দ্য ওয়র্ল্ড

হ্যাঁ, তার জন্য খাঁটি রাজরক্তও লাগে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রস্তুত ছিল একই সঙ্গে অগাধ বিত্ত আর অপার বিদ্যার দুর্লভ সাহচর্য। তাঁর পিতা কর্নেল মন্মথনাথ চৌধুরীকে কে না চেনে! এক দিকে তিনি দেশের অন্যতম বৃহদায়তন এস্টেটের জমিদার, অন্য দিকে ভারতের প্রথম শল্যচিকিৎসক। বাবা ও মা দু’দিক দিয়েই রবি ঠাকুরের আত্মীয়া দেবিকা। কাকা তো খাস ‘বাংলার বীরবল’ প্রমথ চৌধুরী। বাড়ির প্রায় প্রত্যেকের নামেই এই শহরে রাস্তা আছে। রবীন্দ্রনাথের কাছেই সঙ্গীতশিক্ষার দীক্ষা আর বাড়িতে শিখতেন ম্যানার্স। ঘড়ি ধরে ঘুম থেকে উঠে শারীরচর্চা, নিঃশব্দে টোস্ট চিবিয়ে খাওয়া, দুপুরে স্কুল, সন্ধেবেলা পিয়ানো, নৈশাহারের পরে ‘গালিভার্স ট্রাভেল’ পড়া। রবিবারে বাবার সঙ্গে দেখতেন 

এমন ঘরানার ছবি, যা থেকে মানুষ তার রসটুকু নিংড়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। সব নির্বাক, বিদেশি ছবি। নিজেই বলেছেন, ‘সিনেমাটা এতটাই জেনে ফেলেছিলাম যে মাধ্যমটির প্রতি অনীহাই এসে গিয়েছিল। এক সময় তো মা-বাবা ‘পিকচার’ দেখতে যেতেন, আমি পিয়ানো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম। ভারী গম্ভীর ছিলাম। কথা বলতাম না বেশি, কেউ একনাগাড়ে কথা বললে বিরক্ত লাগত। বরং জানলার ধারে বসে পাহাড় দেখতাম। মনে হত, এক ছুটে ওর চূড়ায় উঠে যাই। ওপরে উঠে সারা পৃথিবীটাকে দেখি। তখন থেকেই ইচ্ছেটা টানত। টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ডে পৌঁছতে চেয়েছিলাম।’ 

পরের বছরই তিনি লন্ডন চলে যান। সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশ। দেবিকা রানি সায় দিয়েছেন, ‘তখন ভারতবর্ষে ভদ্রঘরের মেয়ে অভিনেত্রী হওয়ার কথা ভাবলেও তা পাপ বলে গণ্য হয়। লন্ডনে কিন্তু তা শ্লাঘার বিষয়। এই খোলা হাওয়াই আমাকে প্রাণিত করেছিল। বারুদে অগ্নিসংযোগ হল ওদেশে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার সময়।’ ড্রামাটিক আর্টসে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে শুনলেন, ক্লিয়োপেট্রার চরিত্রে অডিশন দিতে হবে। নাটকে মিশর সম্রাজ্ঞী বলছেন, ‘আই হ্যাভ ইমমরটাল লংগিংস ইন মি... আই অ্যাম ফায়ার অ্যান্ড এয়ার।’ উচ্চারণ করতে গিয়ে দেবিকার বুকের কোথাও ধক করে উঠল। এ সংলাপ বলছে কে? ক্লিয়োপেট্রার চরিত্রের গভীরে এ যে নিখাদ তাঁর নিজ অন্তরের ধ্বনি! দেখেশুনে পরীক্ষকরা বলেছিলেন, তোমাকে হলিউড ডাকবে।

 

হরতন, রুইতন, 

ইস্কাপনের বিবি 

এ বার নিজে উপার্জন করে মর্জি মতো বাঁচার শখ হল তাঁর। টেক্সটাইল ডিজ়াইনিং শিখে ইংল্যান্ডের স্টুডিয়োয় কাজ করছিলেন। এক দিন সেখানেই কাচের দরজা ঠেলে ঢুকলেন ওভারকোট চাপানো এক সুদর্শন ভদ্রলোক। হিমাংশু রায় তত দিনে ‘দ্য লাইট অফ এশিয়া’ আর ‘সিরাজ়’ ছবি দু’টি তৈরি করে ফেলেছেন। নায়ক-প্রযোজক রূপে প্রচণ্ড নাম হয়েছে তাঁর। দুম করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি অভিনয় করবেন? ফিল্মে?’ পরের প্রস্তাবটা আসতেও দেরি হল না। ‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’

প্রথম স্ত্রী মেরি হেনলাইন ও শিশুকন্যা নীলিমাকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন হিমাংশু। লেডিজ় ম্যান, উয়োম্যানাইজ়ার বলে খ্যাত চলচ্চিত্রকার তখন শুধু দেবিকায় মত্ত। তার সলতে পাকানোর পর্ব চলছে। হিমাংশু ‘আ থ্রো অব ডাইস’ ছবিটি তোলার সময়ে দেবিকাকে সেট ডিজ়াইনিংয়ের তালিম দিলেন। তার পরেই বললেন, ‘উঁহু। তোমাকে আরও প্র্যাকটিকাল কাজ শিখতে হবে।’ জার্মানির উফা স্টুডিয়োতে তখন নীরব ছবিকে সবাক করার মহাযজ্ঞ চলছে। হিমাংশুও সেখানে। একই সঙ্গে ওই তাবড় স্টুডিয়োয় দেবিকা কস্টিউম, আর্ট ডিরেকশন, প্রোডাকশন... সব রকমের খুঁটিনাটি আয়ত্ত করেছিলেন। পরে যদিও তাঁর নিখুঁত প্লাক করা বিখ্যাত ভ্রু তুলে বলেছেন, ‘বিয়ের পর ওই জার্মানিতে নাকি আমাদের হানিমুন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিস্টার রায় জানতেন কাজ, কাজ আর কাজ। আমি মারলিন দিয়াত্রিচের ব্যক্তিগত আর্টিস্টের কাছে মেকআপ করা শিখলাম। মারলিন তখন ‘ব্লু এঞ্জেল’ ফিল্মটায় শুটিং করছিলেন। আমি সে ছবি হতে দেখেছি।’ যিনি সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তাঁর কলম সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। ‘দ্য ব্লু এঞ্জেল’-এর মারলিন! মানে ক্যাবারে নর্তকী লোলা লোলা! তা হলে কি ‘নটি লোলা’রই প্রভাব পড়েছিল আপনার অভিনয়ে? উত্তরে কুন্দফুলের মতো একরাশ হাসি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেবিকা। ‘শুধু তাই কেন হবে? মনে রেখো, যে কোনও শিল্প জীবনযাপনেরই অঙ্গ। আমার অভিনয়ে, জীবনে সামগ্রিক ভাবেই পাশ্চাত্য ভাবনার অনেকখানি অবদান। তাই যেই না উফা’র দিনগুলো শেষ হল, টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স আমাকে নিয়ে নেওয়ার জন্য সে কী ঝোলাঝুলি। বেশ কয়েক বছরের চুক্তি করিয়ে নিতে চাইল তারা। হিমাংশু রায় না করে দিলেন। বললেন, আমরা যা শিখেছি নিজের দেশকে দেব।’ স্বামীকে বেশ ভয় পেতেন দেবিকা। প্রায় ষোলো বছরের তফাত ছিল তাঁদের। আলগা টানের বাংলায় এক বার বলেওছিলেন, ‘সেই আমলে বাপের বয়সি লোকই বলতে পারো। ওহ্ কী শাসনই না করতেন!’

ভারতে ফিরে বম্বের উপকণ্ঠে মালাডে বম্বে টকিজ় স্থাপন করলেন হিমাংশু। ইউরোপ থেকে মহারথী কলাকুশলীদের ডেকে আনলেন তাঁর স্বপ্নের ফিল্ম সিটিতে। খোদ ‘দ্য লাইট অফ এশিয়া’র পরিচালক ফ্রান্জ় অস্টেন ছবি পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। অবশ্য তার আগেই ভারতীয় সবাক ছবি ‘কর্ম’ মুক্তি পেয়েছে। ইংরেজিতে সে ছবি দেখে ধন্য ধন্য করেছে হলিউড। জয়নগরের রাজার ভূমিকায় হিমাংশু রায় যে দাপট দেখাবেন, সে তো প্রত্যাশিত। কিন্তু সীতাপুরের রানির ভূমিকায় উনি কে? প্রথম বার দেবিকাকে পর্দায় দেখে বিদেশি পত্র-পত্রিকা ফেটে পড়ল প্রশংসায়! ‘ডিভা’, ‘ভারতের স্ক্রিন গডেস’ তকমা দেওয়া হল তাঁকে। কেউ বললেন অজন্তার গুহাচিত্র, কেউ লিখলেন তাঁর ভেলভেটের আঁখিপল্লব, কেউ আরও এগিয়ে গিয়ে বললেন, এর আলোয় তো হিমাংশু রায় চাপা পড়ে গিয়েছেন! আর তাঁর ইংরাজি উচ্চারণ? মনে হবে যেন পিয়ানোয় ঝঙ্কার উঠল।

 

বিম্বোষ্ঠী রতিমনোহর ললিতচকিতকামিনী

‘কর্ম’ ছবির সেই অলৌকিক চুম্বন মোটেও ভারতীয় পর্দার প্রথম লিপলক ছিল না। তার আগেই ১৯২৯-এ ‘প্রপঞ্চ পাশ’ (আ থ্রো অব ডাইস) সিনেমায় সীতা দেবী ও চারু রায় ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন। কুড়ির দশকে ‘পতিভক্তি’ ছবিতে ললিতা পওয়ারকেও এমন দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল।

‘কর্ম’ ছবির বিখ্যাত চুম্বন

আসলে সে সময়ে তো ছবির দেশকাল বিভাজন ছিল না। ছবি হত ছবি। স্থানভেদে তার চরিত্র ও কাহিনি বদলাত শুধু। সিনেমার উৎকর্ষের কাছে সামাজিক বাধানিষেধ এতটুকু পাত্তা পেত না। বিদেশি ছবি মাতাতেন চটুল মেজাজের ফ্ল্যাপার গার্লস। তাঁদের ছোট করে ছাঁটা চুল বব কাট, হাঁটুঝুলের স্কার্ট। আর সে সময়ে ভারতে তোলা সিনেমায় থাকত বৈভব, রাজপ্রাসাদ আর আশ্লেষ মেশানো রাজা-রানি রোম্যান্স। সেই ছকেই ‘কর্ম’ সোনা ফলাল বক্স অফিসে। ষাট মিনিটের কিছু বেশি সিনেমাটির চার মিনিটই হিমাংশু-দেবিকার চুম্বন। বহু দিন ভারতীয় পর্দার দীর্ঘতম চুম্বনদৃশ্য ছিল সেটি। দুই দশক আগে ‘রাজা হিন্দুস্তানি’তে গাছের নীচে আমির-করিশ্মাকে দেখে অস্বস্তিতে পড়েছেন যাঁরা, শুধু ১৭টি চুম্বন দেখার লোভে বিশেষ সিনেমা দেখতে আজও হলে ঢোকেন যাঁরা, ‘কর্ম’ দেখলে তাঁদের মনের সব কালো ছোপ বুঝি বা দূর হয়ে যেত। সে ছিল জীবন্ত আরব্য রজনী। সেখানে যে ভাবে সংস্কৃত শ্লোক এসেছে, মাচায় উঠে শিকার এসেছে, রাইফেলের গর্জনের পরে পশুর বদলে গ্রামবাসী বিটারকে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছে, ঠিক সে ভাবেই দীর্ঘায়ত সেই চুম্বন এসেছে। ছবির কাহিনিকল্পে ওই দৃশ্যটি আদ্যন্ত জরুরি। সাবিত্রী যে ভাবে সত্যবানকে যমের দুয়ার থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন, ভালবাসার রশি বেঁধে সে ভাবেই মৃতপ্রায় মহারাজকে জীবনে ফেরাচ্ছেন রানি। সাপের বীণের দোলায় তাঁর শরীরে জাগ্রত হচ্ছে আদিম রিপু। সে দৃশ্য যে নিপুণতায় অভিনেত্রী ফুটিয়ে তুলেছেন, যে ভাবে অভিনয়ের খাতিরে নিজের দেহলতাটি ব্যবহার করেছেন, তাকে বিশুদ্ধ শিল্প ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। 

তাই ওই দৃশ্যকে সেন্সরের কালিতে দাগিয়ে সরিয়ে রাখলে বড় ভুল হয়ে যায়। চলচ্চিত্র মাধ্যমে কামেন্দ্রিয় দ্বারা প্রিয়তমের প্রাণসঞ্চারের যে কৌশল বারবার দেখা গিয়েছে তার পথিকৃৎ ওই চারটি মিনিট। এবং প্রণিধানযোগ্য, ওই অংশে হিমাংশু কিন্তু প্যাসিভ অ্যাক্টিং করেছেন, দৃশ্যের রাশ পুরোপুরি দেবিকার হাতে। তিনিই কর্ত্রীর ভূমিকায়। শ্লীল-অশ্লীলের নিক্তিতে এই রমণীর আবেদনকে মাপা অসম্ভব। কারণ সাহসিকতা ও নান্দনিকতার অপূর্ব ওই মিশেলে তিনি আজ অবধি একমেবাদ্বিতীয়ম।

 

চলচ্চিত্রং চলচ্চিত্তং 

কালকূট-ভাষিণী

‘বোল্ড’ অভিধায় তিনি সার্থকনামা। কারণ শিল্পের খাতিরে যেমন বেড়া উপড়েছেন, তেমনই নিজের ইচ্ছা বা প্যাশনকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করেননি। তাঁদের দাম্পত্য কাছ থেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার, হিমাংশু রায়ের অগ্রজপ্রতিম সহযোগী নিরঞ্জন পাল। ঘনিষ্ঠ বৃত্তে তাঁর সখেদ মন্তব্য, ‘কর্ম’য় তাঁদের জুটিটি মনে হয়েছিল স্বপ্ন! বাস্তবে তা নাকি দুঃস্বপ্ন। নিরঞ্জন-পুত্র অভিনেতা-ফিল্মলিখিয়ে কলিন পল কৈশোরের স্মৃতিচারণায় বলেছেন, মনে হত যেন প্রফেশনাল সম্পর্ক তাঁদের। 

হিমাংশুর নিয়ন্ত্রণের নাগালের অনেক ঊর্ধ্বে দেবিকার সাহস, তাঁর মনন। তাই কিছু দিনেই স্বামীর শেকল কেটে দিলেন তিনি। ‘কর্ম’র পর প্রযোজনায় ন্যস্ত হতে নায়কের ভূমিকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন হিমাংশু রায়। মাইনে দিয়ে আর্টিস্ট নিয়োগ করলেন। লেখক-বন্ধুকে বলেছিলেন, ভাল চেহারার গাধা পেলেও পিটিয়ে ঘোড়া করে নিতে পারেন। সেই উপহাসই তাঁর সর্বনাশ ডেকে আনল। ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবিতে দেবিকা রানির বিপরীতে নায়ক হলেন নজ়ম-উল-হাসান। লখনউভি তরুণের ডালিম ফাটা রং, দেখার মতো লাবণ্য। স্বামীর অজ্ঞাতসারে দেবী মজলেন। একই স্টারকাস্টে পরের ছবি ‘জীবন নইয়া’র শুটিং শুরু হল। সেই ছবি ও হিমাংশু রায়কে অকূল পাথারে ফেলে দেবিকা ও নজ়ম-উল কলকাতা পালিয়ে গেলেন!

ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন স্টুডিয়োর সাউন্ড রেকর্ডিস্ট শশধর মুখোপাধ্যায়। তিনি ও হিমাংশু কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলে গিয়ে যুগলকে ধরলেন। দেবিকা তখন প্রায় মনস্থির করে ফেলেছেন, বম্বে টকিজ়কে বিদায় জানাবেন। নিউ থিয়েটার্সের অফার আসছে রোজ। মুখুজ্জে মশাই তাঁকে বোঝালেন, তিনি আর্টিস্ট ভাল। কিন্তু হিমাংশু ছাড়া কেউ তাঁকে ঠিক ব্যবহার করতে পারবে না। দেবিকা ফেরত এলেন, নজ়ম-উলের কেরিয়ারটি খতম করা হল। হিমাংশু রায়ের দাম্পত্যের ছেঁড়া তারও আর জুড়ল না। স্ত্রিয়াশ্চরিত্রমে বেকুব বনে মিস্টার রায় হন্যে হয়ে ‘নিরাপদ নায়ক’ খুঁজতে লাগলেন। আবার উদ্ধারকর্তা মুখুজ্জেবাবু। তাঁর শ্যালক সেখানেই ল্যাবে চাকরি করছিল। রাতারাতি তাকে ধরে এনে ‘জীবন নইয়া’র নায়ক করে দেওয়া হল। শুধু প্রিয়দর্শন ছোকরার ‘কুমুদলাল কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায়’ গোছের ভালমানুষ নামটা কেটে লেখা হল অশোক কুমার।

দ্বিতীয় স্বামী স্বেতস্লাভ নিকোলাই রোয়েরিখের সঙ্গে 

গুঞ্জন, এ ছাড়াও অন্তত বার তিনেক তাঁর মনে রং ধরেছিল। তারই একটির বিশদ বিবরণ মেলে সেই পূর্বকথিত উপন্যাসে। সেই আউটডোরের কাহিনি। সেখানে পৌঁছে, যুবক-যুবতীর উপযুক্ত ক্রীড়াভূমিতে দেবী মিহি কণ্ঠে নায়ককে প্রস্তাব দিলেন, পাশের জঙ্গলটা ঘুরে আসা যাক। কিছু দূর যেতেই কাকচক্ষু সরোবর মিলল। নায়িকার চোখে সহসা বিদ্যুৎ— ‘আমি স্নান করব। আপনি করবেন?... কাপড়চোপড় কিনারায় থাকবে।’ নায়ক বহু কষ্টে ‘না’ বলে তপ্ত মুখে অন্য দিকে তাকালেন। পিছন থেকে জলের শব্দ জানান দিল,  ‘...বৃন্দাবনের গোপিনীর ন্যায় লজ্জা সরম তীরে রাখিয়া জলে নামিয়াছেন।’ সে দিনের পরেও দুর্যোগ বাকি ছিল। বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ করে দেবী আবার ফাঁদ পাতলেন। বসের বাড়িতে গিয়ে তরুণ দেখল, দ্বিতীয় কোনও আমন্ত্রিত নেই, গৃহিণীর বেশবাস লঘু ও সংক্ষিপ্ত। তার অপেক্ষায় পানপাত্র ও সবুজাভ একটি বেডরুম। 

পরের ঘটনা পারম্পর্যে আসে প্রত্যাখ্যাতা স্ত্রীর মন্ত্রণায় বসের রণমূর্তি ধারণ। বাঙালি হিরোটি সেই পঙ্কিল পরিবেশ থেকে বেরিয়ে কী ভাবে ভারতবর্ষের ম্যাটিনি আইডল হয়ে উঠল, শ্যালক-ভগ্নিপতির চমৎকার রসায়ন— এই সব সহজ ক্লু রেখেছেন বরেণ্য ডিটেকটিভ-সাহিত্যিক। ফলে ছায়াপথের আলো-অন্ধকারে হেঁটে চলা তরুণটিকে চিনে নিতে খুব কষ্ট বোধহয় হয় না।

দাদামণি হওয়ার পর অশোক কুমার পরে এক বার বলেন, ‘জীবনপ্রভাত’, ‘বচন’, ‘ইজ্জত’, ‘অনজান’ প্রমুখ দশটি ছবি একসঙ্গে করায় দেবিকা রানির সঙ্গে তাঁরও নাম জুড়েছিল কিছু লোক। সে সব ভুল কথা। বয়সে বছর তিনেকের বড় বস-পত্নীকে বরাবর সমীহ করতেন তিনি। এ কথাটি শুনে কেন কে জানে মারাত্মক চটে গিয়েছিলেন দেবিকা। আবার নিজেই মিষ্টি করে বলেছেন, ‘আমার চারদিকে কতজনই ঘুরঘুর করত। আমি অত খেয়াল রাখতাম না। সেই যে কলেজজীবনে এক প্রফেসর খেপে উঠেছিলেন। তারপর এক আইরিশম্যান তো জোর করে আমার ড্রাইভার হয়ে গেলেন।’ দুর্জনে বলে, এঁদের সকলের সঙ্গেই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ প্রেম করতেন দেবিকা। যার জন্যই নার্ভাস ব্রেকডাউনে ও ভাবে অকালে মারা গেলেন হিমাংশু রায়।

পঞ্চাশ পেরোনোর আগে হিমাংশু রায় অসুস্থ হতেই বম্বে টকিজ়ের রাশ ধরে নিয়েছিলেন দেবিকা। যে দিন তাঁর স্বামী মারা গেলেন, সে দিনের আশ্চর্য কাহিনি শুনিয়েছেন সে কালের এক মরাঠি অভিনেত্রী। থমথমে বম্বে টকিজ়ে‌ শুয়ে আছেন নিথর হিমাংশু। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এই অনুজ অভিনেত্রী ভাবছেন, দেবিকার সামনে কী ভাবে যাবেন। কর্ত্রীর ঘরের বন্ধ দরজা ঠেলতে দেখলেন, দেবিকা কয়েক জন যুবাপুরুষের সঙ্গে খিলখিল করে হাসছেন। কিছু পরে ঘরের বাইরে এলেন। পরিচিতদের কাঁধে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকলেন।

 

নয়নে রত্ন, চলনে বসন্ত

দেবিকা সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বললেন, ‘আবেগকে কখনও প্রশ্রয় দেবে না। ‘অচ্ছুৎ কন্যা’ নাকি মহাত্মা গাঁধীর দেখা একমাত্র সিনেমা। পর্দায় সেই প্রথম সমাজের অমন চেহারা দেখে তিনি নাকি কেঁদেছিলেন। কিন্তু সিনেমা শেষে আমাকে কিছুতে সই দিলেন না। কারণ, আমি খদ্দরের পোশাক পরতাম না। আমি তাঁর খুব ভক্ত ছিলাম। কিন্তু আমার খারাপ লাগেনি। চোখে জল যেন না আসে। সেটি  হলেই তোমার নজরের ধার কমে যাবে।’ 

এই দার্ঢ্যের বলেই বম্বে টকিজ়কে সামলে দিলেন তিনি। তার আঁতুড়ে তৈরি করে নিলেন ভবিষ্য-কিংবদন্তিদের। হিমাংশু রায়ের জীবদ্দশায় সরস্বতী দেবী, পান্নালাল ঘোষ, অনিল বিশ্বাসরা সঙ্গীতের মধ্যগগনে উঠেছিলেন। দেবিকার লক্ষ্য ছিল স্টারডমের দিকে। ফলব্যবসায়ীর ছেলে ইউসুফ খানের ম্যানারিজ়ম দেখেই হিরে চিনেছিলেন। দিলীপ কুমার নামে তাকে নামিয়ে দিলেন ফিল্মে। মুমতাজ জাহান বেগম দেহালভি-কে ডাকলেন মধুবালা। তাঁর গ্রুমিংয়ে ক্রমে সিনেমায় এলেন মুমতাজ়, শান্তি, স্নেহপ্রভা, লীলা চিটনিস, ডেভিড, রাজ কপূরের দল। ‘বম্বে টকিজ় সিনেমা শেখার ইউনিভার্সিটি ছিল। স্থির করেছিলাম, হলিউডের সঙ্গে পাল্লা দেব। কিন্তু যেদিনই দেখলাম সেটি আর হওয়ার নয়, ছেড়ে দিলাম সিনেমা তৈরি।’ বম্বে টকিজ় ভেঙে ফিল্মিস্তান গড়ে আলাদা হয়ে গেলেন অশোক কুমার, শশধর মুখোপাধ্যায়, জ্ঞান মুখোপাধ্যায়রা। আর দেবিকা রানি দিগ্বিজয়ী রুশ চিত্রকর নিকোলাস রোয়েরিখের ছেলে স্বেতোস্লাভকে বিয়ে করে আবার সকলকে চমক দিলেন। হাতে হাত ধরে তাঁরা কুলু উপত্যকার মর্মরপ্রাসাদে বাস করতে গেলেন। বাণপ্রস্থ নয়। সেও যৌবনেরই নতুন উপবন। দেবিকার বয়স তখন চল্লিশও হয়নি। 

 

মায়াবন বিহারিণী হরিণী

গহন স্বপন সঞ্চারিণী

বম্বে টকিজ়ও ফুরিয়ে যায়নি। তাকে পাওয়া যেত কর্ণাটকের টাটাগুনি বাগানে। সেখানে যেই না গাড়ি ঢুকত, সেই একই কায়দায় লম্বা সেলাম দিত পাঠান দ্বারপাল। তেমনই অনেকখানি জমি, যে দিকে দু’চোখ যায় সবুজ। সুগন্ধী গুল্মের চাষ হচ্ছে এখানে। অনেক ছোট-বড় বাড়ি। সবচেয়ে বড় অট্টালিকাটি যেন হিরে-জহরতে সাজানো। সেও এক স্টুডিয়ো। তবে ছায়াছবি নয়, জলছবির। আঁকিয়ের স্টুডিয়ো। পাশে অগোছালো এক ঘরে কাজে বুঁদ ভারতীয় সিনেমার প্রথম দাদাসাহেব ফালকে বিজয়িনী। তাঁর স্ফূর্তি অফুরান। এক হাতে শিল্পী-স্বামীর ব্যবসায়িক কাজকর্মের খেয়াল রাখেন, অন্য হাতে কর্ণাটকের চিত্রকলা পরিষদের দেখভাল করেন, ভারত সরকারের হয়ে সিনেমা সেমিনারের পৌরোহিত্য করেন। প্রকৃতি বিষয়ে দু’-একটি তথ্যচিত্রও তুলেছেন। বড় উচ্চাঙ্গের সে সব ছবির শৈলী। অনেকটা তাঁর দুর্বোধ্য হৃদয়ের মতো। তবে ইদানীং তাঁর চাঞ্চল্য স্থির হয়েছে। তার কৃতিত্ব নাকি বাদামি রঙের উড়ন্ত শ্মশ্রুগুম্ফের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গ্রিক ভাস্কর্য-প্রতিম ওই রাশিয়ান স্বামীর। কিন্তু পরিসমাপ্তি এসেছিল হিচককের সিনেমার মতোই। অনেকেই দোষ দিয়েছিল, কর্ম তথা কর্মফলকে। কাউকেই সে ছাড়ে না! তাই নিঃসন্তান দম্পতি যখন নিজেদের ত্রিশ আর চল্লিশের দশকের স্মৃতিতে আপাদমস্তক মুড়ে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিলেন মহাশূন্যের দিকে, তখন শোরগোল উঠছিল ভূ-ভারত জুড়ে। রোয়েরিখ-দম্পতির সাত রাজার ধন গিলতে এগিয়ে এসেছে রিয়েল এস্টেটের কারবারিরা। গাঁধী-নেহরু পরিবারের বন্ধু হওয়ায় জনতা সরকারের রোষে পড়েছেন তাঁরা। তাঁদের কব্জা করে রেখেছে খলচরিত্র সেক্রেটারি মেরি জয়েস পুনাচ্চা। তীব্র ব্রঙ্কাইটিসের রোগিণী দেবিকা, তাঁরই ঠোঁটে সিগারেট ধরিয়ে আগুনশলাকা জ্বালিয়ে দিচ্ছে সে!

কিন্তু সেই দুঃসময়ও কি আদৌ তাঁকে স্পর্শ করতে পেরেছিল? বোধহয় না। তাঁর গলায় ভাঁজ পড়েছিল, তবু অক্ষুণ্ণ ছিল তাঁর দুর্ধর্ষ টোনাল কোয়ালিটি। যে কোনও সময় বুঝি ‘ম্যায় বন কি চিড়িয়া’র ছটফটে গায়কি আবার অবলীলায় ধরে নেবেন। তিনি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না, তবু তাঁর চলনে তখনও ছলকে উঠত বসন্ত। ছোট্ট বাচ্চার সঙ্গে দেখা করতে হলেও মুখে মেকআপ ঘষতেন। সন্ধেবেলা হলে বলতেন, ‘অমিতাভ ছেলেটি কি মাচো দেখেছ?’

তাঁর স্বমূর্তি উদ্ঘাটন করেও ঔপন্যাসিক লিখে রেখেছেন, কোনও কাজের জন্য কারওকে দোষ দেওয়া চলে না। সবই নিয়তির খেলা। আর এ তো ছিল স্বয়ং দেবী আফ্রোদিতি-র যৌবনলীলা, তার রহস্য দেবা না জানন্তি! তো, আমরা রোজের মানুষ, ডাল-ভাত-মুরগির মাংসের জীবনচশমায় দেবিকা রানির মোহিনী মায়ার মর্মোদ্ধার করতে পারব নাকি? ওই অগ্নিগোলকের দিকে সোজা তাকালে চোখে ঝিলমিল লেগে যাবেই, তার জন্য কি সূর্যের দোষ ধরা চলে? তাই আপাতত আমাদের এটুকু বুঝলেই চলবে, গ্রহণ না থাকলে আবার চাঁদ কিসের?

ঋণ: গল্পসমগ্র: শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়