সে দিন বারাণসীতে গণপত রাও সাহেবের বাড়িতে হঠাৎই এসে উপস্থিত গ্বালিয়র ঘরানার রহমত খান সাহেব। কিছুটা উত্তেজিত হয়েই গণপত রাওকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মওজ্জুদ্দিন কোথায়? বেশ কিছু দিন ধরে মওজ্জুদ্দিন নামের এক যুবকের গানের সুখ্যাতি শুনছেন তিনি। আর তাই সেই যুবকের গান শুনতেই বারাণসীতে তাঁর আগমন। এ কথা শুনে গণপত রাও স্মিত হেসে বললেন, মওজুদ্দিন তো সেখানেই থাকেন, তাই তার গান শোনা কোনও সমস্যা নয়। রহমত খান এ কথা প্রায় অগ্রাহ্য করেই বললেন, তিনি তখনই মওজুদ্দিনের গান শুনতে চান! 

রহমত খান সাহেবের ইচ্ছে বলে কথা! সে কথা অমান্য করার সাধ্য কারও ছিল না। অগত্যা ডাক পড়ল মওজুদ্দিনের। কিছুক্ষণ পরেই খান সাহেবের সামনে উপস্থিত হলেন মওজুদ্দিন। রহমত খান সাহেবকে আদাব জানিয়ে তিনি একটা গান ধরলেন। মওজুদ্দিন কোনও দিন রাগ-রাগিণীর সময়ের ধার ধারতেন না। সে দিনও মালকোষের একটি অস্থায়ী অন্তরা ধরলেন দিনের বেলায়। রহমত খান তাঁর গলা শুনেই ‘শাবাশ’ বলে উঠলেন। এর পরে ফরমায়েশ করলেন ভৈরবী শোনাতে। মওজুদ্দিন ধরলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান ‘বাজুবন্ধ খুল খুল যায়’। হারমোনিয়ামে সঙ্গত করেছিলেন গণপত রাও সাহেব। তিনি ‘...চকিতের মধ্যে পুরিয়ার রং দেখিয়ে দিলেন।... মৌজুদ্দিন তাঁর অনবদ্য গায়কি দিয়ে পুরিয়া ও অন্য রাগের বাহার আরম্ভ করে দিল।’ গান শেষ হওয়ার আগেই রহমত খান গানের তারিফ শুরু করে দিলেন। গান শেষ হয়ে গেল, তবু রহমত খানের তারিফ শেষ হল না! 

কিছুক্ষণ পরে প্রত্যক্ষদর্শীরা অদ্ভুত এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন। ছাদের খোলা হাওয়ায় রহমত খান সাশ্রুনয়নে খোদার উদ্দেশে বলেছিলেন, আমাকে মওজুদ্দিনের মতো গুণ দিলে না কেন? কখনও বা কাতর চোখে গণপত রাও সাহেবের দিকে চেয়ে বলেছিলেন, ‘এখন থেকে যদি গলা সাধি, আমি কি মওজুদ্দিনের মতো গাইতে পারব না?’

এর পরে গণপত রাও সাহেব মওজুদ্দিনকে বলেছিলেন, রহমত খানের পা জড়িয়ে ধরে বলতে, সে তাঁর গান শুনতে চায়। মওজুদ্দিন তেমনটাই করেছিলেন। আশ্চর্যের কথা, যাঁকে বহু রাজা মহারাজা অনুরোধ করেও গান গাওয়াতে পারেননি, সেই রহমত খান মওজুদ্দিনের কথায় বিনা সঙ্গতে গান ধরেছিলেন। একটি হলক তান দিয়ে তোড়ী ধরলেন। মওজুদ্দিন এমন তান আগে শোনেননি। তিনিও তারিফ করে উঠলেন। গান শেষে সকলের প্রশংসা শুনে রহমত খান গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি ছেলেমানুষের মতো মওজুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কি সত্যিই ভাল গান করেন? এ কথা শুনে মওজুদ্দিন রহমত খানের হাঁটু ছুঁয়ে খোদার নামে কসম খেয়ে বলেছিলেন, ‘উস্তাদ! আমি জিন্‌দেগিভর চেষ্টা করলেও ত আপনার গলার কাজ টাকার এক দামড়ি করে উঠতে পারব না।’ এ কথা শুনে রহমত খানের মুখ প্রশান্তিতে ভরে উঠেছিল। মওজুদ্দিনের মাথায় হাত রেখে তিনি দোয়া পড়তে লাগলেন। 

 

ছোট থেকেই যা শুনতেন, দ্রুত তা তুলে নিতে পারতেন

মওজুদ্দিন খান তখন কাঁপিয়ে দিচ্ছেন সারা দেশ! যেমন তাঁর গলার জোর, তেমনই অসাধারণ তাঁর গায়কি। বন্দিশি বা বোল-বনাও ঠুমরিতে সে সময় তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই। তিনি পেয়েছিলেন এক আশ্চর্য সুরেলা কণ্ঠ। তাঁর গান যেমন শ্রোতাদের সম্মোহিত করে রাখত, তেমনই শ্রোতাদের চোখে জলও আনতে পারত। তাঁর গান শুনে গওহরজান, মালকাজান কিংবা গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর চোখেও দেখা যেত জল।

সঙ্গীত জীবনে খ্যাতির শীর্ষে থাকাকালীনও তাকে নিয়ে জল্পনা এবং রটনার শেষ ছিল না। তাঁর সমসাময়িকরা লিখেছিলেন ‘‘...তাঁর বাপ-মা আত্মীয় বলতে কেউ নেই। ডালকামণ্ডির তরফা-ওয়ালিরা তাঁকে গান গাইয়ে নেয়, সকালে জিলাবি ও লুচি হালুয়া খেতে দেয়।’’ শোনা যেত, তাঁর নাকি প্রথাগত কোনও সঙ্গীতের তালিমও ছিল না। ‘‘...সে না জানে রাগ কাকে বলে, না জানে তাল। অথচ রাগ ও তালে গান করে। মাত্র এক বার শুনেই একটা গোটা গান আয়ত্ত করে ফেলে।’’

তবে কী ছিল মওজুদ্দিনের আসল পরিচয়? হিমাচল প্রদেশের নাহনে মওজুদ্দিনের জন্ম ১৮৮২ সালে মতান্তরে ১৮৭৪-এ। তাঁর বাবা গুলাম হুসেন খান ও তাঁর কাকা রহমত হুসেন খান ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতশিল্পী। মওজুদ্দিনের মা জেবুন্নিসা পাতিয়ালা ঘরানার সুলাহ খানের মেয়ে। তিনি গানের তালিম পেয়েছিলেন তাঁর প্রপিতামহের কাছে। সে সময়ে বারাণসীর মহারাজা প্রভুনারায়ণ সিংহের সভাগায়ক ছিলেন রওশন আলি খান। তিনিই মওজুদ্দিনের বাবা সেতারি গুলাম হুসেনকে বারাণসীতে নিয়ে আসেন। গুলাম হুসেন তাঁর স্ত্রী জেবুন্নিসা, দুই পুত্র মওজুদ্দিন ও রহিমুদ্দিনকেও সঙ্গে এনেছিলেন। মওজুদ্দিনের বয়স তখন চার অথবা পাঁচ।

সে সময়ে বারাণসী সঙ্গীতের এক পীঠস্থান। এক দিকে যেমন প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের আনাগোনা, অন্য দিকে সমঝদার শ্রোতা, সঙ্গীতগুণী এবং পৃষ্ঠপোষকের অভাব ছিল না। জেবুন্নিসার কাছেই মওজুদ্দিন ও তাঁর ভাই রহিমুদ্দিনের সঙ্গীত শিক্ষা শুরু। পরে জগদীপ মিশ্রের কাছে মওজুদ্দিনের তালিম শুরু হয়। জগদীপ মিশ্র মনে করতেন, মওজুদ্দিনের কণ্ঠস্বর খেয়াল কিংবা ধ্রুপদের চেয়ে ঠুমরি, দাদরা, চৈতি, হোরির উপযুক্ত। এর পরে ভাইয়া গণপত রাও সাহেব এবং ভাগীরথী বাইয়ের কাছে মওজুদ্দিন ঠুমরির তালিম পান। এরই মধ্যে তিনি হারমোনিয়াম বাজানোয় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। শোনা যায়, পরবর্তী কালে তিনি লখনউয়ের সাদিক আলি খানের কাছে ঠুমরির তালিমও পেয়েছিলেন।

ছোট থেকেই মওজুদ্দিন যা শুনতেন, দ্রুত তা তুলে নিতে পারতেন। সে সময়ে বারাণসীর দুই প্রখ্যাত সঙ্গীতরসিক রায় লালন ও রায় চখ্খনের গণেশবাগের বাড়িতে প্রায়ই বসত সঙ্গীতের আসর। সেখানে যোগ দিতেন প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পীরা। আসতেন শহরের বিশিষ্ট জনেরা। এমনই এক আসরের কথা শুনে মওজুদ্দিন তাঁর কয়েক জন নিকট বন্ধুকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। তখনও আসর শুরু হয়নি। বিনা নিমন্ত্রণে ভিতরে প্রবেশ যে নিষেধ, সে কথা তাঁরা জানতেন। তাই বাগানে একটি গাছের নীচে বসে তাঁরা ঠিক করলেন গান শুনবেন। এমন সময়ে এক বন্ধু মওজুদ্দিনকে বললেন, একটি গান ধরতে। মওজুদ্দিন খালি গলায় ধরলেন, ‘হাঁ রে ননদিয়া, পান খায়ে...’ তাঁর সুরেলা অবেগ ভরা কণ্ঠস্বর অচিরেই আসরের দেওয়াল পেরিয়ে শ্রোতাদের কানে পৌঁছল। আবেগে বিস্ময়ে আপ্লুত লালন সাহেব আসর ছেড়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। মওজুদ্দিনকে দেখে তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ ভাবেই বারাণসীর সঙ্গীত মহলে পরিচিত হন তরুণ মওজুদ্দিন। 

পরবর্তী কালে এই দুই সঙ্গীতরসিক মওজুদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন কলকাতার সঙ্গীতরসিক শেঠ দুলিচন্দের সঙ্গে। কলকাতায় শেঠ দুলিচন্দের বাড়িতে এক গানের আসরে মওজুদ্দিন পরিচিত হন এই শহরের সঙ্গীত জগতের দিকপালদের সঙ্গে। 

 

পছন্দ করতেন দামি আতর

মওজুদ্দিন তখন সুশ্রী তরুণ যুবক। তাঁর মুখে ছিল অল্প বসন্তের দাগ। মাথায় ছিল পাগড়ি, আর পরনে আদ্দির ঢিলা পাঞ্জাবি ও জোধপুরী ঢঙের পায়জামা। চোখে সুরমা। পছন্দ করতেন দামি আতর। এটাই ছিল তাঁর পরিচিত বেশভূষা। পাগড়ি ও সুরমা এই দুই ব্যাপারে মওজুদ্দিন ভীযণ খুঁতখুঁতে ছিলেন। এক বার বারাণসীর ডাল-কা-মান্ডি গলির মধ্যে গোলমালের সময় তাঁর মাথায় চোট লেগেছিল। তখন তিনি টুপি পরতেন। সেই সময়ে কেউ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, মাথায় পাগড়ি থাকলে এমনটা হত না। সেই থেকেই তাঁর পাগড়ি বাঁধা শুরু।

একবার শ্যামলাল ক্ষেত্রী এবং গণপত রাও সাহেব বারাণসীতে রয়েছেন। সেই সময়ে শ্যামলাল ক্ষেত্রীর গুরুভাই কামাখ্যাপ্রসাদ মৈমুরগঞ্জে তাঁর বাগানবাড়িতে একটি আসরের আয়োজন করেছিলেন। তাতে উপস্থিত ছিলেন চন্দন চৌবে, রাজেশ্বরী বাই ও হুসনাজান। ওই আসরেই কামাখ্যাপ্রসাদের এক বন্ধু এক তরুণ যুবককে নিয়ে এসে বললেন, এর নাম মওজুদ্দিন। দারুণ মিষ্টি গলা। গণপত রাও সাহেব কোনও আপত্তি করলেন না, বরং উৎসাহ দিয়ে গান আরম্ভ করতে বললেন। মওজুদ্দিন গান আরম্ভ করতেই সকলে অবাক। তার ঠিক আগেই ‘হম সে আবদ্‌বদ’ গানটি গেয়েছিলেন রাজেশ্বরী কিংবা হুসনা। মওজুদ্দিন আবার সেই গানটি ধরলেন। সকলেই অবাক! সুর বিস্তার করতে করতে সেই গান এমন এক জায়গায় পৌঁছল যে, শ্রোতাদের মুখে সে দিন আর কোনও ভাষা ছিল না। আবেগে আপ্লুত গণপত রাও সাহেব মওজুদ্দিনকে বললেন, বিশেষ একটি তান আবার করতে। মওজুদ্দিন এ বার নতুন রকমের বিস্তার করতে করতে যখন ফের সেই তানটিতে ফিরে এলেন, তখন গণপত রাও সাহেব তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। 

গণপত রাও সাহেব, মালকাজান আগরেওয়ালি ও বড়িমতি বাই

পরে মওজুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তিনি ললিতের মধ্যে ললিতের তান করা কার কাছে শিখেছেন? উত্তরে মওজুদ্দিন বলেছিলেন যে, হুসনার গাওয়া গানটি তাঁর খুব ভাল লেগেছিল। তাই গানটির কথা ও সুর নকল করে তিনি সেই গানটি গেয়েছিলেন। 

তৎকালীন শিল্পীদের চেয়ে মওজুদ্দিন ছিলেন একেবারেই অন্য ধরনের। আসরে গান গাওয়ার আগে তিনি তৈরি হয়ে আসতেন। মওজুদ্দিন প্রথমে ডন বৈঠক সেরে পুরি-হালুয়া খেয়ে পেটপুজো সারতেন। ‘বিশুদ্ধ তান্ত্রিক মতে’ কণ্ঠশুদ্ধি করতেন। তার পরে তিনি আসরে গান গাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেন। শোনা যায়, সে কালের সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে কালে খান এবং মওজুদ্দিন এই দু’জনে গান গাওয়ার আগে পেট ভরে খেয়ে নিতেন। তবে দু’জনের মধ্যে পার্থক্য ছিল এই যে, মওজুদ্দিন ছিলেন মিতাহারী এবং কালে খান ছিলেন ভোজনবিলাসী। 

 

কলকাতায় আত্মপ্রকাশ

গানের আসরে মওজুদ্দিন ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত গলায় গান ধরতেন অবলীলাক্রমে। কোনও রকম সুর বিস্তার বা সরগম না করেই শুরু করতেন গান। চোখের ইশারায় সারেঙ্গি বাদককে ইঙ্গিত দিয়েই গান ধরে ফেলতেন। তাঁর গান শোনার পরে অনেকেই জিজ্ঞেস করতেন, তাঁর গলায় কোনও লুকোনো যন্ত্র আছে কি না? তা না হলে এমন সুরের দানা বেরোয় কী ভাবে? এ কথা শুনে মওজুদ্দিন স্মিত হেসে সলাজ্জ ভঙ্গিতে সেলাম জানাতেন।

বিংশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় ধ্রুপদী সঙ্গীত চর্চার নতুন জোয়ার এসেছিল। ল্যান্সডাউন রোডে নাটোরের মহারাজার বাড়িতে, শেঠ দুলিচাঁদের বাগানবাড়িতে, লালাবাবুর বাড়িতে, গণেশচন্দ্র চন্দ্রের বাড়িতে প্রায়ই বসত ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর। সেই সময়ে ১০১ হ্যারিসন রোডে শ্যামলাল ক্ষেত্রীর বাড়িটি হয়ে উঠেছিল সঙ্গীতশিল্পী এবং সঙ্গীতরসিকদের কাছে একটি তীর্থক্ষেত্র। শ্যামলাল ক্ষেত্রীর বাড়ির দোতলায় প্রায়ই বসত ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর। তাতে উপস্থিত থাকতেন কালে খান, ইমদাদ খান, হাফিজ আলি খান, গণপত রাও সাহেব, গওহরজান, মালকাজান... এমনই সব শিল্পী। তেমনই এক আসরে কলকাতায় মওজুদ্দিনের আত্মপ্রকাশ। 

প্রতিটি আসরে মওজুদ্দিনের প্রতিভার নিত্যনতুন পরিচয় শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। গানের আসরে তিনি খেয়াল, গজল, ঠুমরি গাইতেন। অনেকেই মনে করেন, মওজুদ্দিন বাইজি-বিদ্বেষী ছিলেন। শোনা যায়, একটি আসরে শিল্পী-শ্রোতা সকলে উপস্থিত, মওজুদ্দিনও খোশমেজাজে বসে গল্প করছেন। এমন সময়ে সেখানে এক বাইজি এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখা মাত্রই মওজুদ্দিন পিছন ফিরে বসলেন। তাঁর দিকে তাকালেনও না। তবে এই বিষয়টি নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কেননা, সে কালের বহু বিখ্যাত বাইজি তাঁর কাছে তালিম পেয়েছিলেন। 

তেমনই আর এক আসরে সুগ্গন বাইয়ের গান ছিল। তাতে উপস্থিত ছিলেন মওজুদ্দিন, আগরেওয়ালি মালকাজান। সুগ্গন ধরলেন ‘নদীয়া নারে হিয়ারআই কঙ্গনা’ গানটি। সুগ্গন একটি খেয়াল, তারানা ও কয়েকটি দাদরা গাইলেন। গান শেষে সেখানে উপস্থিত সকলেই তাঁর গানের প্রশংসা করলেন— একমাত্র মওজুদ্দিন বাদে। কিছুক্ষণ পরেই আসরে ‘মওজুদ্দিনের গান হোক’ এমন একটা রব শোনা গেল। কেবল মাত্র হারমোনিয়াম সঙ্গতে মওজুদ্দিন গান ধরলেন ‘নদীয়া নারে হিয়ারআই কঙ্গনা’ গানটি। সকলে একেবারে হতবাক! সেই একই গান তিনি ধরলেন তার উপরে চারগুণ রং চড়িয়ে। কোথায় ভেসে গেল সুগ্গনের গাওয়া গানটি। রাগে, অপমানে সুগ্গন আসর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরে মালকাজান নাকি শ্যামলাল ক্ষেত্রীর উপস্থিতিতে মওজুদ্দিনকে সুগ্গনের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। তবে মওজুদ্দিন তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, সেই গানটি তাঁর ভাল লেগেছিল, তাই তিনি না গেয়ে থাকতে পারেননি। শোনা যায়, মওজুদ্দিন গান গাইতে চাইলে কেউ তাঁকে বাধা দিত না। কেননা গান গাওয়ায় তাঁকে বাধা দিলে বিপত্তি ঘটে যেত।

ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘‘মওজুদ্দিন সম্পর্কে কিছু বলা বা লেখার সময় সবচেয়ে কঠিন উপযুক্ত ভাষা ব্যবহার।’’ মওজুদ্দিনের গাওয়া অবিস্মরণীয় গানগুলির মধ্যে ‘বাজুবন্ধ খুল খুল যায়ে’, ‘সাঁইয়া বিদেশ গ্যায়ো’, ‘দুর্জন লোগো কো’, ‘পিয়া পরদেশ মোরা মনোহরা’ ‘রং দেখে জিয়া ললচায়’ ‘ফিরায়ে মোরি আঁখিয়া ও রাজা’ ইত্যাদি। সে কালে গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর গাওয়া আঠারোটি গান রেকর্ড করে। যা সে কালে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এ ছাড়া নিকোল রেকর্ড কোম্পানি তাঁর কিছু গান রেকর্ড করে। 

 

তিনি গান ধরলে রাত পার হয়ে দুপুর হয়ে যেত

তাঁর সঙ্গীতের আসরে মিশে আছে কত কাহিনি। এক বার মওজুদ্দিন রয়েছেন রামপুর দরবারে। সে সময় রামপুরের নবাব কালবে আলি খান। এক দিন সকালে নবাবের ইচ্ছে হয়েছে, তিনি মওজুদ্দিনের গান শুনবেন। তাঁকে খবর পাঠানো হল যে, নবাব অপেক্ষা করছেন। মওজুদ্দিন প্রস্তুত হতে লাগলেন। ইতিমধ্যেই বেশ বেলা হয়ে গেল। মওজুদ্দিনের দেরি হওয়ায় নবাবের গান শোনার ইচ্ছেটাও চলে গেল। এমন সময়ে মওজুদ্দিন সভায় উপস্থিত হলেন। নবাব বিরস মুখে বললেন, ‘এখন থাক, ও বেলা গান শুনব।’ মওজুদ্দিন তখন হাত জোড় করে বললেন, ‘থোড়া শুন লিজিয়ে।’ নবাব অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলেন। মওজুদ্দিন একটা ঠুমরি ধরলেন। সময় যে কী ভাবে কেটে গেল, সে হুঁশ কারও ছিল না। হঠাৎ সেজ বাতিতে আলো জ্বলতে নবাবের হুঁশ হল, তখন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। 

তেমনই মুর্শিদাবাদ দরবারে তাঁর এক আসরের কাহিনি আজও স্মৃতির পাতা থেকে উঁকি দেয়। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের পৌত্র মির্জা সাহেব মওজুদ্দিনকে সে বার মুর্শিদাবাদ দরবারে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় ওখানে উপস্থিত ছিলেন পাতিয়ালা ঘরানার কালে খান। সন্ধের পর আসর বসল। তবে আসরে গাওয়ার আগে মওজুদ্দিনের কিছু অভ্যেস ছিল। সেগুলি না হলে তাঁর কণ্ঠ প্রস্তুত হত না। মুর্শিদাবাদ রাজ দরবারে কিছু নিয়ম থাকায় অন্যান্য আসরের মতো মওজুদ্দিনের কণ্ঠ প্রস্তুত ছিল না। সেখানেই হল সমস্যা!

গান শুরু হলেও সে দিন গানে কোনও প্রাণ ছিল না। তাই কিছুতেই আসর জমছিল না। কালে খান আগে কখনও মওজুদ্দিনের গান শোনেননি। মনে মনে ভাবলেন, এই মওজুদ্দিন! যাঁর এত নামডাক। সে কথা তিনি মির্জা সাহেবকে পরে জানিয়েছিলেন। গতি ভাল নয় দেখে, মির্জা সাহেব নবাবের কানে কানে বললেন, মওজুদ্দিনের আসল গান যদি শুনতে চান, তা হলে তাঁকে তৈরি হয়ে আসতে দিন। নবাব প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হন। এর পরে অভ্যেস মাফিক মওজুদ্দিন ‘তৈরি হয়ে’ আসরে এলেন। এবং তিনি গান ধরতেই কিছুক্ষণের মধ্যে আসর জমে উঠল। নবাব এবং কালে খান দু’জনেই মশগুল হয়ে উঠলেন। আর এ ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। সারা রাত অতিক্রান্ত হয়ে কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, সে দিকে কারও হুঁশ ছিল না। অবশেষে মির্জা সাহেব আসর ভাঙতে উদ্যত হলেন।

 

ভালবেসেছিলেন মালকাকে, কিন্তু স্বীকৃতি পাননি

মওজুদ্দিনের ঠুমরি শুনে প্রভাবিত হয়েছিলেন ফৈয়াজ খানও। তা নিয়ে শোনা যায় এক কাহিনি। তখন কলকাতায় এলে ফৈয়াজ খান ইন্ডিয়ান মিরর স্ট্রিটের বাড়িতে আগ্রেওয়ালি মালকাজানের অতিথি হয়ে উঠতেন। তাঁদের মধ্যে ছিল অন্তরঙ্গ এক সম্পর্ক। এক সময়ে ফৈয়াজ মালকাকে বলেছিলেন যে, তিনি মওজুদ্দিনের ঠুমরি শুনে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েন। তিনিও গান শিখেছেন, তবু মওজুদ্দিনের গান শ্রোতাদের চোখে জল আনতে পারত। এটা তাঁর কাছে ছিল এক বিস্ময়! যদিও মওজুদ্দিনের কাছে গিয়ে গান শেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। সেই সময়ে মওজুদ্দিন মালকাকে ইন্ডিয়ান মিরর স্ট্রিটের বাড়িতেই তালিম দিতে আসতেন। সেই সুযোগে ফৈয়াজ খানকে খুশি করতে মালকা এক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। স্থির হল, যে ঘরে তিনি তালিম দিতেন, সেখানে একটি চৌপাই দাঁড় করানো ছিল। মালকাকে যখন মওজুদ্দিন তালিম দেবেন, ফৈয়াজ খান তখন ওই চৌপাইয়ের আড়ালে বসে থাকবেন। এ ভাবেই মওজুদ্দিনের গায়কির খুঁটিনাটি বিষয় শুনে নেবেন ফৈয়াজ। এমন একটি উপায় ফৈয়াজ খানের বেশ পছন্দ হল। সে বার মওজুদ্দিন প্রায় দু’মাস মালকাকে তালিম দিয়েছিলেন আর ফৈয়াজ খান সাহেবও উপকৃত হয়েছিলেন। 

মওজুদ্দিনের জীবনের শেষ দিনগুলি সুখের হয়নি। ডেরা ইসমাইল খানের নবাব মওজুদ্দিনের গান শুনতে তাঁকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ করেছিলেন। নবাব তাঁর গানে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁকে পাকাপোক্ত ভাবে নিজের কাছে রাখতে চান। সে জন্য তিনি মওজুদ্দিনের কাছে নানা ভাবে অনুরোধও করেছিলেন। তবু মওজুদ্দিন তাতে রাজি হননি। জনশ্রুতি, ক্রুদ্ধ নবাব তাঁকে এমন কিছু খাইয়েছিলেন, যাতে তাঁর গলা চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে যায়। 

বারাণসী ফিরে মওজুদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ভয়ঙ্কর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হতাশায় বেঁচে থাকার উৎসাহটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। শোনা যায়, যে মওজুদ্দিনকে সকলে বাইজি বিদ্বেষী বলতেন, ভাগ্যের পরিহাসে তিনিই ভালবেসেছিলেন আগরেওয়ালি মালকাজানকে। কিন্তু মালকা গভীর ভাবে ফৈয়াজ খানের প্রতি অনুরক্ত থাকায়, মওজুদ্দিনের ভালবাসাকে স্বীকৃতি দেননি। এই দুই ঘটনার প্রভাবেই তিনি অতিরিক্ত পানদোষে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। যা ক্রমেই হয়ে ওঠে তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ। 

১৯২৬ সালে মওজুদ্দিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর সেই সঙ্গেই অস্ত গিয়েছিল বোল বনাও ঠুমরির এক বিরল প্রতিভা। মওজুদ্দিনের কাছে গান শিখেছিলেন বড়ি মতিবাই, মানকিবাই, জদ্দনবাই, অনাথনাথ বসু প্রমুখ। বারাণসীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বড়ি মতিবাই প্রায়ই মওজুদ্দিনের গানগুলি আসরে গাইতেন। গানের আসর শেষে মাঝে মাঝে একটা খোলা জানালায় বড়ি মতিকে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। নিজের অজান্তেই তাঁর দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ত অশ্রুধারা। কেউ জানতে চাইলে, জানালার বাইরে আঙুলের ঈশারায় ঝোপঝাড়ে ভরা একটা জমি দেখিয়ে দিয়ে বলতেন, ওটা ফাতমান কবরখানা, যেখানে একটি ঝোপের নীচে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন মওজুদ্দিন। 

১৯৮২ সালে কিছু সঙ্গীতপ্রেমী মওজুদ্দিনের জন্মশতবর্ষ পালন করেছিলেন। তাঁর নামহীন সমাধিটি সংস্কার করে তাতে স্মৃতিফলক বসানো হয়েছিল। কালের স্রোতে তাঁর সমসাময়িক বহু শিল্পী হারিয়ে গেলেও মওজুদ্দিন কিন্তু হারিয়ে যাননি। আজও কিছু গানপাগল মানুষ তাঁর রেকর্ডের সন্ধানে পৌঁছে যান পুরনো রেকর্ডের দোকানে। কষ্টেসৃষ্টে খুঁজে পাওয়া মওজুদ্দিনের একখানি রেকর্ডই তখন সাত রাজার ধন এক মানিক!

ঋণ: স্মৃতির অতলে: অমিয়নাথ সান্যাল; সেকালের সঙ্গীতগুণী: দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়; সাম ইমমরটাল্‌স অব হিন্দুস্থানি মিউজিক: সুশীলা মিশ্র

শিল্পীর পোর্ট্রেট পাথুরিয়াঘাটা ঘোষ, পরিবারের সৌজন্যে