(১)

স্থান লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিন বছরের জন্য বিলেতে এসেছেন কলকাতার এক অধ্যাপক। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। উদ্দেশ্য গবেষণা করে ডিলিট পাওয়া। কিন্তু বাধ সাধলেন থিসিস বোর্ডের লোকজন। জানিয়ে দিলেন, ‘আগে পিএইচডি, পরে ডিলিট।’

বিলেতে সেই সময় রামশর্মা তর্কবাগীশের ‘প্রাকৃত কল্পতরু’ সম্পাদনা করছেন এক পণ্ডিত। তা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় অর্থ ও পাঠ উদ্ধারে বড় সমস্যা হচ্ছে। ছুটে গেলেন সেই বাঙালি অধ্যাপকটি। কাজ মিটল। খুব খুশি সেই বিলেতি পণ্ডিত। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ দেশে কী করতে?’ সমস্যার কথা জানালেন কলকাতার যুবক। শুনেই সেই পণ্ডিতের উক্তি, ‘তুমি যে আমার বইয়ের পাঠোদ্ধার করে দিলে, তাতেই তো পিএইচডি হয়ে গেল। আবার কেন?’ এর পরে সেই পণ্ডিতের সুপারিশেই যুবকটি ডিলিট-এর জন্য ভর্তি হলেন।

পণ্ডিতটি জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন। বাঙালি অধ্যাপকটি, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। বিখ্যাত ধ্বনিতাত্ত্বিক ড্যানিয়েল জোনসের তত্ত্বাবধানে গবেষণার ফলটিও চমকপ্রদ। ‘দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (সংক্ষেপে যা ওডিবিএল নামে পরিচিত)— নামে মহাগ্রন্থ। এক লহমায় এই বই সুনীতিবাবুকে দিল দেশ-বিদেশের খ্যাতি।

বইটির ‘সংবর্ধনা’ও চমকপ্রদ। এক বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ প্রায়ই বাড়িতে সান্ধ্য আসর বসান। আসরে সঙ্গতের জন্য থাকে নৈহাটির গজা, বর্ধমানের মিহিদানা-সীতাভোগ, বড়বাজারের বাতাবি সন্দেশ-সহ হরেক কিসিমের মিষ্টি। তা, এক দিন আসর জমেছে। মিষ্টিমুখও হচ্ছে। এমন সময় সেই প্রাচ্যবিদ ওডিবিএল-এর দু’খণ্ড (তখনও তাই ছিল) এনে বললেন, ‘এই ছোকরা নূতন পথ দেখাইয়াছে।’ সেই প্রাচ্যবিদই ‘চর্যাপদ’-এর আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

এই ‘নূতন পথ’ দেখানোর প্রস্তুতিপর্বে অনেক চড়াই-উতরাই। সুনীতিবাবুর জন্ম ২৬ নভেম্বর, ১৮৯০। কার্তিক পূর্ণিমার দিন, শিবপুরে মামার বাড়িতে। পৈতৃক ভিটে ৬৪ সুকিয়া স্ট্রিটে। বাবা হরিদাস চট্টোপাধ্যায়, মা কাত্যায়নী দেবী। বাড়িতে অনেক মানুষ। ঠাকুরদা-বাবা ‘কেরানিগিরি’ করেন। তাই নিত্য টানাটানির সংসার। ছোটবেলায় পোলিয়ো হল সুনীতিবাবুর। চোখ দুটোয় পাওয়ার মাইনাস ১২, ৯। এ রকম পরিবার থেকেই ক্যালকাটা অ্যাকাডেমি, মোতিলাল শীলের অবৈতনিক স্কুল, স্কটিশ চার্চ ও প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়— ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার সব স্তরে সাফল্য অর্জন তাঁর। প্রেসিডেন্সিতে ইংরেজি পড়ার সময়েই তিনি চার কিংবদন্তি মাস্টারমশাই প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, মনোমোহন ঘোষ, বিনয়েন্দ্রনাথ সেন ও এইচএম পার্সিভালের সংস্পর্শে এলেন। শুরু হল গ্রিক, ল্যাটিন-সহ নানা পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য ভাষার চর্চা। সুনীতি-মেধা আগ্রহ বোধ করল ভাষাতত্ত্ব, বিশেষত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলিতেও। কৃতিত্ব দেখালেন বেদপাঠেও।

ছাত্রাবস্থা ও তার আশেপাশের সময়ে তিন জন মানুষ এলেন সুনীতিবাবুর জীবনে। তৃতীয় জন শিশিরকুমার ভাদুড়ী। পরে যাঁর প্রযোজিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের পোশাক পরিকল্পনা রেখায় ফুটিয়ে তুলবেন সুনীতিবাবুই।

অন্য দু’জন স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ— এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সুনীতিবাবুর জীবন প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মালয়, সুমাত্রা, বালিদ্বীপ, যবদ্বীপ, শ্যামদেশ ভ্রমণেও যান সুনীতিবাবু। যার ফসল, ‘রবীন্দ্র সংগমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ’ বইটি। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘বাংলাভাষা-পরিচয়’ বইটির উৎসর্গপত্রে সুনীতিকুমারকে দিলেন উপাধি— ‘ভাষাচার্য’। দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত ‘ভাষাচার্য’ কিন্তু নিজের ‘অমরত্ব’র দাবি করেছেন রবীন্দ্র-সাহিত্য সূত্রেই। করাটা স্বাভাবিকই। কারণ, শিলং পাহাড়ের ঢালুতে দেওদার গাছের ছায়ায় রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র অমিত রে ‘সাধারণের দস্তুর’ গল্পের বইয়ের বদলে ‘বাংলা ভাষার শব্দতত্ত্ব’র পাতা ওল্টান। বইটি যে সুনীতিবাবুরই!

 

(২)

ছাত্রাবস্থা শেষে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যাসাগর কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবন শুরু সুনীতিবাবুর। জীবনে এলেন সহধর্মিণী কমলা দেবী। বিয়েতে বন্ধুদের নিমন্ত্রণপত্র লেখা, তা-ও মন্দাক্রান্তা ছন্দে। পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রের বাবা-মা এই দম্পতি।

কিন্তু ‘বিয়ে’ ও তার আচার অযথা নানা বিষয়ে ভারাক্রান্ত, এমনটা সারা জীবন মনে হয়েছে সুনীতিবাবুর। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনিয়েছেন সুনীতিবাবুর ছেলে সুমনের স্ত্রী ছায়াদেবী। আমাদের প্রচলিত বাঙালি ঘরে বিয়ে করতে যাওয়ার সময়ে ছেলে বলে, ‘মা, তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।’ কিন্তু হিন্দু বিয়ের মন্ত্রে রয়েছে, ‘সম্রাজ্ঞী শ্বশুরে ভবঃ’ অর্থাৎ ‘শ্বশুরবাড়িতে সম্রাজ্ঞীর মতো বিরাজ করো।’— বৌমাকে এ কথা প্রায়ই বলতেন সুনীতিবাবু।

এমন ‘গোঁড়ামিমুক্ত মন’ সুনীতিকুমার অর্জন করেন তাঁর ‘যুক্তিবোধ’ থেকে। তাই এক সময় হয়তো খানিকটা উগ্র হিন্দুত্বের সমর্থক হলেও সেখান থেকে সরে আসতে দেরি হয়নি তাঁর।

কেমন সে যুক্তিবোধ? জীবনের এক চরম শোকের সময় এমন একটি ঘটনার সাক্ষী সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন।

নবনীতার বাবা নরেন্দ্র দেব মারা গিয়েছেন। ক্রিয়াকর্মে ব্যস্ত নবনীতা। পৌরোহিত্যে সাহিত্যিকের প্রিয় ‘কাকাবাবু’ সুনীতিকুমার। উপবীতধারী ব্রাহ্মণ সুনীতিকুমার মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন।

ইউনেসকো-র অফিসে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে

স্তম্ভিত নবনীতা। বললেন, ‘আমি একেই অব্রাহ্মণ, তায় নারী— কিন্তু এ যে গায়ত্রী, কাকাবাবু!’ সঙ্গে সঙ্গে ধমক। আচার্য বললেন, ‘যে মানুষ বেদ উপনিষদ পড়েছে, মন্ত্রের মানে যে বোঝে, যার জীবনধর্ম হচ্ছে অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনা— তাকে গায়ত্রী পড়াব না? পড়াতে হবে কোনও নিরক্ষর ভূতকে, যে ঘটনাচক্রে ব্রাহ্মণ-বংশে জন্মেছে?’

এই যুক্তিবোধ প্রবল ভাবে দেখা গেল ‘রামায়ণ বিতর্ক’র সময়ে। সুনীতিবাবুর কিছু মন্তব্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী তো বটেই, পণ্ডিত সমাজের মধ্যেও বিতর্ক তৈরি করল। এমন সময়ে দিল্লিতে সাহিত্য অকাদেমিতে একটি আলোচনাসভা হবে রামায়ণ নিয়েই। সুনীতিবাবুর পরামর্শ, দীনেশচন্দ্র সরকার-সহ বিরুদ্ধবাদী পণ্ডিতদের ডাকতে হবে সেখানে। কেন? সুনীতিবাবুর সিদ্ধান্ত, ‘পণ্ডিতরা যদি আমার মত ভুল প্রমাণ করেন, আমার কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু ভক্তবাবাজিদের আবেগের কাছে হার স্বীকার
করব না।’

আসলে ‘পাণ্ডিত্য’কে স্বীকৃতি দেওয়া ভাষাচার্যের মজ্জাগত। তাই দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পারেন, ‘ওডিবিএল-এ বাংলা ছন্দের কিছু ভুল দৃষ্টান্ত দিয়েছি, ভুল ব্যাখ্যাও করেছি। প্রবোধবাবু (‌‌সেন) আমার সে ভুল সংশোধন করে দিয়েছেন।’ আবার কখনও বা তাঁর করা প্রশ্নপত্রের ‘ভুল’ ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলে ছাত্র সুকুমার সেনের সঙ্গে মুহম্মদ শহীদুল্লাহের পরিচয় করাতে এগিয়ে আসেন স্যার সুনীতি। এক বার নদিয়ার এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক বীরেন বিশ্বাস বই লিখেছেন, ‘রবীন্দ্র-শব্দকোষ’। বইটি পৌঁছলে সুনীতিবাবুর পরমার্শেই বইটি ‘থিসিস’ হিসেবে গণ্য হল। ‘ডক্টরেট’ হলেন বীরেনবাবু।

উল্টো দিকে, ভিন্ন মতকে কী ভাবে স্বীকার করেছেন, তা দেখা যায় ভারতীয় ভাষাগুলির লিপি-বিতর্কের সময়ে। প্রথমে মতদান ও পরে নিজের মত থেকে সরে আসা— এ-ও তো এক উদার ব্যক্তিত্বেরই পরিচয়।

কিন্তু এই উদার মানুষটিকেই খুব ফ্যাসাদে ফেলেছিলেন জয়দেব।

জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ সুনীতিবাবুর কাছে ‘শুদ্ধ ইরোটিক লিটারেচর..।’ একদিন সুনীতিবাবু আর নবনীতায় আলোচনা চলছে ওই কাব্য নিয়ে। কথাপ্রসঙ্গে ‘ধীর সমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী—’ পংক্তিটি উচ্চারণ করলেন সুনীতিবাবু। তার পরেই চুপ। কাকাবাবুর স্মৃতিবিভ্রাট— এ অসম্ভব, ভাবছেন নবনীতা। কিছুক্ষণ পরে নবনীতা বুঝলেন, ‘কন্যাসমা’র কাছে পরের পঙ্‌ক্তিটির উচ্চারণে বাধছে কাকাবাবুর। পঙ্‌ক্তিটি ‘পীন পয়োধর পরসিরমর্দন কম্পিত করযুগশালী’।

 

(৩)

প্রকাণ্ড পণ্ডিত এই মানুষটি কিন্তু অন্তরঙ্গে একেবারেই ঘরোয়া, বাঙালি ভদ্রলোক। ছেলের বিয়ে দেবেন স্থির করে বৌমা ছায়াদেবীকে দেখতে গিয়েছেন সুনীতিবাবু ও কমলাদেবী। পরের দিনই ছায়াদেবীর ইংরেজি টেস্ট পরীক্ষা। দেখাশোনা সব হওয়ার পরেও ছায়াদেবীকে ছাড়তে চান না হবু শাশুড়ি মা আর জন্মদাত্রী মা। এমন সময় ‘বাবা’ সুনীতিবাবু বললেন, ‘ওগো, একে তোমরা এ বার ছে়ড়ে দাও।’

স্ত্রী কমলাদেবী কিন্তু একেবারেই আটপৌরে বধূ। তা বলে দাম্পত্যের মিঠেকড়া দিকগুলির দিকে সুনীতিকুমারের নজর পড়েনি, এমনটা নয়। আর তাই বোধহয়  স্ত্রীর পছন্দকে মর্যাদা দিয়ে এই মানুষটিই বাড়িতে ময়ূর আর হরিণ পুষতে চেয়েছিলেন!

ছেলেমেয়েদের বৌদ্ধিক বিকাশের দিকেও সজাগ নজর তাঁর। কন্যা নীলাদেবীর তাই মনে পড়ে, রং-রেখা-গল্পে তাঁদের কী ভাবে মাতিয়ে রাখতেন বাবা। তিনি জানিয়েছেন, প্রায়শই হিন্দুস্তান পার্কের ‘সুধর্মা’র ঘরের মসৃণ লাল মেঝেয় সাদা চক দিয়ে হরেক কিসিমের গল্প রেখায় ফুটিয়ে তোলাটা অভ্যাস ছিল তাঁর বাবার।

সুধর্মায় বাড়ির ছাদে ঠাকুরঘরটি, যা কিনা শিল্পরসিকদের কাছে দ্রষ্টব্যও বটে, সেখানে প্রতিদিন ‘মহাদেবের বেদি’র সামনে দাঁড়িয়ে সুনীতিবাবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিবস্ত্রোত্র পাঠ করছেন। আর তা শুনছেন বাড়ির মেয়েরা— এমন দৃশ্যেরও সাক্ষী ছায়াদেবীরা।

পরের দিকে অবশ্য ঠাকুরঘরে গীতা, উপনিষদের সঙ্গে বাইবেল, কোরান, হোমার, গ্রিক নাটক বা রবীন্দ্র-সাহিত্য পাঠ করতেও দেখা যাবে ‘অজ্ঞেয়বাদী’ সুনীতিকুমারকে।

২৯ মে, ১৯৭৭ মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও এই ঘরোয়া মানুষটিকে দেখেছিলেন বাড়ির মেয়েরা। বাবা অসুস্থ। তাই গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, বাতাস করছেন মেয়েরা ও বৌমা। বিষয়টা লক্ষ করে আচার্যের জিজ্ঞাসা, ‘তোমাদের হাত ব্যথা করছে না তো?’

বৌদ্ধিক জগতেও এই মানুষটি কী রকম ‘ভদ্রলোক’, সে কথা শুনিয়েছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। সুকুমারীদেবী এক বিদেশি অধ্যাপককে নিয়ে সুধর্মায় সুনীতিবাবুর বাড়ি গিয়েছেন। সেই অধ্যাপককে সুনীতিকুমার নিজের সংগ্রহে থাকা গ্রিক বইগুলি দেখাচ্ছেন। দেখাতে দেখাতে একটি বই বাদ দিলেন।

কেন? বইটি তুলে নিয়ে সুকুমারীদেবী দেখলেন, সেটি উৎসর্গ করা সুনীতিবাবুকেই।

নিপাট ভদ্রলোক হলেও প্রাত্যহিক বাঙালি জীবনের দুষ্টুমিগুলিতেও বেশ দড় সুনীতিকুমার। মৃত্যুর ক’বছর আগে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এক বার রিপোর্ট এসেছে। ছেলে সুমন ভারি খুশি। রিপোর্টে বাবার ডায়াবেটিস তেমন নেই বলা হয়েছে। এ বার সুনীতিবাবু অল্প হেসে বললেন, ‘আমি কিন্তু লুকিয়ে কিনে একটু-আধটু মিষ্টি রোজই খাই!’

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে নিয়মিত ব্যায়ামচর্চা করা সুনীতিবাবুর খাওয়াদাওয়া ও স্বাস্থ্য গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় বেশ জোরদারই ছিল বলা চলে।

কেমন সে খাওয়াদাওয়া?

১৯৭০ সালে নালন্দায় গিয়েছেন সুনীতিকুমার ও ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার। গাড়িতে চড়ে চলেছেন প্রাচীন নালন্দার ধ্বংসাবশেষ দেখতে। এমন সময় গাড়িতে থাকা এক উপাচার্য সামনের ময়রার দোকানটি দেখিয়ে মিষ্টির প্রশংসা করলেন। গাড়ি থামিয়ে মিষ্টিমুখ করবেন না খাদ্যরসিক সুনীতিকুমার, তা-ও হয় নাকি? সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছোট ছেলের বিয়েতেও প্রভূত পরিমাণ বিরিয়ানি, ভেটকি মাছের ফ্রাই এবং মিষ্টি
খেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপক মহাশয়।

 

(৪)

কিন্তু এই খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ বা কৃচ্ছ্রসাধনও সুনীতিকুমার করতে পারতেন। আর তা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি টানের জন্যই।

এক বার বিশ্ব সংস্কৃতি সম্মেলনে সুনীতিকুমার গিয়েছেন মার্কিন দেশে। তাঁর ঘরের তাকে প্রায় দিনই থাকে সেলোফোন কাগজে মোড়া একটি বস্তু— স্যান্ডউইচ। সঙ্গে কলের জল আর খানিকটা কফি। এটা প্রাতরাশের মেনু। কারণ, হাতে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দেওয়া একশো ডলার। তাই খেয়েদেয়ে পয়সা নষ্ট নয়। ও টাকায় বই-শিল্পসামগ্রী কেনা হবে!

আবার কখনও বা এই মানুষটিই গ্রিস ভ্রমণ করেন গাধায় চড়ে। খাবার বলতে সঙ্গে থাকে কয়েক টুকরো রুটি আর রাস্তা লাগোয়া গাছের ফল!

শুধু কি ভ্রমণ! ভাষাতত্ত্ব, প্রাচ্যবিদ্যার প্রতিনিধি হিসেবে বারবার গিয়েছেন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, আফ্রিকা, চিন, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর্মেনিয়া। লন্ডনে আন্তর্জাতিক ধ্বনিবিজ্ঞান সংস্থার সভাপতিও হয়েছেন। প্রাচ্যবিদ্যার বক্তৃতা দিয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড, এমআইটি-র মতো বিদ্যাচর্চার শ্রেষ্ঠ স্থানগুলিতে। এই দিক থেকে তাই সুনীতিবাবুর পরিচয় শুধু ভ্রমণরসিক নয়, বরং পরিব্রাজক শিক্ষকের।

বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ইন্দিরা গাঁধীর কাছ থেকে দেশিকোত্তম উপাধি লাভ

আসলে দেশ-বিদেশে ছুটে যাওয়ার নেপথ্যে বোধহয় কাজ করেছে সুনীতিবাবুরই খুব প্রিয় একটি উদ্ধৃতি। ‘আন্তিগোনে’ নাটকের— ‘পৃথিবীতে বিস্ময়ের বস্তু বহু, কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হল মানুষ।’ এই মানুষ সম্পর্কে সুনীতিবাবুর জিজ্ঞাসা কোন পর্যায়ে তা দেখছিল আফ্রিকা। এক বার আফ্রিকার এক দেশে গাড়িতে চলেছেন ভাষাচার্য। দেখলেন, রাস্তার ধারে মাঠে গোল হয়ে বসে অর্ধনগ্ন মানুষেরা কী যেন খাচ্ছে পাতায় করে। মুহূর্তে গাড়ির চালককে সুনীতিবাবুর জিজ্ঞাসা, ‘চাইলে আমাকে চাখতে দেবে?’

‘দেবে’ শুনেই গাড়ি থেকে নামলেন সুনীতিবাবু। খাবার চাখা হল। ‘ভয় করল না, যদি শরীরে না সয়?’ এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে সুনীতিবাবু বললেন, ‘সইবে না কেন, মানুষই তো ওটা খাচ্ছিল।’

এই মানুষের সন্ধানে আরও এক বার লন্ডন থেকে ফেরার পথে ঢুঁ মারলেন হাইতিতে। কেন? ভুডু ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানা বাকি রয়ে গিয়েছে যে! বইও লিখেছেন ইথিয়োপিয়া এবং ভারতবর্ষের যোগাযোগের ইতিহাসটিকে নিয়ে। এই মানুষটিই পরে কলকাতার ‘তামিল সংঘম’-এর সভাপতিও নির্বাচিত হলেন।

 

(৫)

বই, পড়াশোনা এবং তার সূত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছাত্রছাত্রীরা সুনীতিবাবুর জীবনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। অন্তত একটি ঘটনা। ‘বিক্রমপুরের উপভাষা’ নিয়ে গবেষণা করছেন গোপাল হালদার। রাজরোষে জেলে গেলেন। সেখানেও বই নিয়ে হাজির ভারতবর্ষের ‘জাতীয় অধ্যাপক’ (হিউম্যানিটিজ) সুনীতিবাবু। সেই গোপালবাবুকে নিয়েই গিয়েছেন মোঙ্গোলিয়ায়। স্থান এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এলাকা। ভীষণ গরম। উপায় বের করলেন সুনীতিবাবুই।

গাড়ি দাঁড়াল। নামলেন ছাত্র-মাস্টারমশাই। পথের কলে স্নান করতে শুরু করলেন দু’জনে। স্নানের পরেই বিপত্তি। চেহারায় বেশ রুগ্‌ণ গোপালবাবু তাঁর পরনের খাদির কাপড়টুকু ভাল করে নিংড়োতে পারছেন না। তা দেখামাত্রই মাস্টারমশাই বললেন, ‘আমি আপনারটা মেলে দিচ্ছি।’

অন্যতম প্রিয় ছাত্র সুকুমার সেন এক বার চায়ের কাপ নিয়ে এক সংবর্ধনাসভায় বেজায় ফ্যাসাদে পড়েছেন। কোথায় রাখবেন বুঝে উঠতে পারছেন না মোটেই। বিষয়টা আন্দাজ করে অবলীলায় ছাত্রের কাপ হাতে নিলেন ভারতবর্ষের ‘পদ্মবিভূষণ’ আচার্য।

কারও কাছে কিছু জানলে বা শিখলে, বয়ঃকনিষ্ঠ হলেও তা স্বীকার করাটা ওঁর স্বভাব। সুনীতিবাবুর অনেক দিনের ইচ্ছে বন্দনামূলক ‘অর্ফিক হাইমস’গুলো পড়ার স্বাদ। কিন্তু কোনও জুতসই অনুবাদ তখনও নেই। যে গ্রিকে হাইমসগুলি লেখা, তার চর্চাও করা হয়নি তখনও। পরে আমেরিকা থেকে সুকুমারীদেবীর মধ্যস্থতায় এক গবেষকের কাছ থেকে টাইপ করা হাইমসের অনুবাদগুলি পেলেন। তা দেখে সুনীতিবাবুর মন্তব্য, ‘জানেন, গত পঞ্চাশ বছর ধরে এগুলো পড়বার বাসনা ছিল!’

 

(৬)

জ্ঞানের প্রতি এমন তীব্র আগ্রহ সুনীতিবাবুর মধ্যে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টির জন্ম দিয়েছিল। সে দৃষ্টি কেমন বিস্ময়কর, তা টের পেয়েছিলেন সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী। কী প্রয়োজনে রমাপদবাবু সুনীতিবাবুর বাড়িতে গিয়েছেন। কথাবার্তা চলছে। হঠাৎ ভুরু কুঁচকে কান পাতলেন প্রবীণ অধ্যাপক। জিজ্ঞাসা, ‘বদ্দমানের সঙ্গে মেদিনীপুরের টান কেন?’ স্তম্ভিত রমাপদবাবু। কী করে উনি তাঁর জীবনবৃত্তান্ত জানলেন? কাউকেই তো বলেননি! আসলে পরিবারের আদি বাসস্থান যদিও বর্ধমান, তার সঙ্গে চল্লিশ বছর পর্যন্ত রমাপদবাবুর কোনও যোগাযোগই ছিল না। আর মেদিনীপুর জন্মস্থান হলেও, তত দিনে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর কলকাতা-বাস হয়ে গিয়েছে রমাপদবাবুর।

ডক্টর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন, জওহরলাল নেহরু ও কম্বোডিয়ার প্রেসিডেন্ট সিংহানুকের সঙ্গে

জ্ঞানের এমন তীক্ষ্ণতায় আশ্চর্য হলেন এক বিখ্যাত ইতালীয় পণ্ডিতও, যিনি আবার দীর্ঘ দিনের সুহৃদও বটে সুনীতিকুমারের। স্থান গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। সামনে থরে থরে সাজানো খাবার। দুই পণ্ডিতে আড্ডা শুরু হল। হঠাৎ সেই ইতালীয় ভদ্রলোক মুগ্ধ। কেন? সুনীতিবাবু যে তাঁরই দেশের রাজধানী ‘রোম’ শব্দটার ইতিহাস বলে চলেছেন। ইতালীয় মানুষটি জুসেপ্পে তুচ্চি। সেই তুচ্চির দেশ ইতালিরই রোম বিশ্ববিদ্যালয় পরে সংবর্ধিতও করে সুনীতিবাবুকে। যার জবাবি ভাষণটি ভাষাচার্য দিয়েছিলেন লাতিনে!

আসলে সুনীতিবাবুর মনীষা বিস্ময়কর। সেই মনীষার সঙ্গে কল্পনা যুক্ত হয়ে তা যেন সাধারণের ধরা-ছোয়ার ঊর্ধ্বে। এক বার খ্রিস্টপূর্ব কালের একটি মাটির প্রদীপ সংগ্রহ করে এনেছেন। প্রদীপটি মিশরের। সে দিকে তাকিয়ে আনমনা আচার্যের মনে হল, ‘সন্ধ্যায় ওই প্রদীপটি জ্বেলে কোনও প্রাচীন বধূ এক ঘর থেকে আর এক ঘরে যাচ্ছেন।’

 

(৭)

সুনীতিকুমারের পাণ্ডিত্য কিন্তু শুধুই আত্মকেন্দ্রিক নয়। বরং সেই পাণ্ডিত্যের সিংহদুয়ারে অবাধ প্রবেশ সাধারণেরও। তাই যখন একমাত্র পুত্রের মৃত্যুতে এক দম্পতি চিঠি লিখে ‘শান্তি’র পথ জানতে চান, তখন অবলীলায় সুনীতিবাবুর পরামর্শ, ‘মহাভারতের শান্তিপর্ব পাঠ করা যেতে পারে’।

সুনীতিবাবু নিজেও হয়তো শেষ পর্যন্ত এই শান্তির খোঁজ করতে চেয়েছেন। কিন্তু তা সেই জ্ঞানের অন্বেষণের মধ্যেই। এই বনস্পতির জীবনের শেষের কয়েক ঘণ্টার কথা শুনিয়েছেন পুত্রবধূ ছায়াদেবী। ১৯৭৭-এ চোখের অস্ত্রোপচার। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই বক্তৃতা দিতে গেলেন প্যারিসের একটি সম্মেলনের জন্য। কয়েক দিন বাদে ফিরলেন বা়ড়ি। অপেক্ষা করছেন চশমার। আবার যে অন্বেষণে নামতে হবে, এই প্রত্যাশায়। এর কয়েক বছর আগে থেকেই জীবনের গুরুমন্ত্রটি নিশ্চিত করেছিলেন স্বয়ং ভাষাচার্যই। ঠিক করেছেন, নব্বই বছর বয়স হলে যাবেন বানপ্রস্থে। সেই বানপ্রস্থের সঙ্গী হবে, ‘ভারত স্মরণং গচ্ছামি, ধর্মং স্মরণং গচ্ছামি, রবীন্দ্র স্মরণং গচ্ছামি’র ত্রি-সূত্র।

সুনীতিবাবুকে বানপ্রস্থে যেতে হয়নি। কিন্তু তাঁর জীবন ওই ত্রি-সূত্রেরই আধার। আমরা, ভারতীয়রা শুধু তাঁর দিকে তাকিয়ে বলতে পারি, ‘সুনীতি স্মরণং গচ্ছামি।’

ঋণ: আনন্দবাজার আর্কাইভ, দেশ, ‘সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’: সুকুমারী ভট্টাচার্য, ‘সমসাময়িক দৃষ্টিতে সুনীতিকুমার’: সম্পাদনা, পল্লব মিত্র (পারুল), ‘কোরক’, তাপস ভৌমিক, ‘সুনীতি কুমার চ্যাটার্জ্জী: দি স্কলার অ্যান্ড দি ম্যান’: জিজ্ঞাসা