কথায় বলে, আমাদের শরীরে যত রোগ, তার অর্ধেকেরই জন্ম মনে। মনটা সারা দিন বলেই চলেছে, এটা নিয়ে একটু চিন্তা করতে হবে, ওটা কি ঠিক হল— এর থেকেই ভিড় করে নানা ভাবনা। তার থেকে আসে স্ট্রেস এবং স্ট্রেস-জনিত নানা লাইফস্টাইল ডিজ়িজ। অথচ, ছোটাছুটির জীবন থেকে মানসিক চাপ, উদ্বেগপ্রবণতা, অবসাদ— সহজে তাড়ানো সম্ভব নয়। উপায় একটাই। যোগাসন। আবার যোগাসন শক্ত ভেবেই অনেকে শুরুর আগেই পিছিয়ে যান। কিন্তু সঠিক তত্ত্বাবধানে, নিয়ম মেনে করলে বাড়িতেও শুরু করা যায় সহজ যোগাভ্যাস।

 প্রোফেসর শঙ্কুর সেই সর্বরোগহরা বড়ি মিরাকিউরল-এর কথা মনে আছে? এক বার খেলেই সব রোগ উধাও। আমাদের রোজকার জীবনে যোগাসনের কাজও ওই রকমই। বার বার নিয়ম করে অভ্যেস করলে তবেই ফল মেলে। 

যোগের একটা সুন্দর গালভরা নাম আছে— সাইকো-সম্যাটিক মেডিসিন। মানে, মন থেকে শরীরে যে সব রোগ জন্ম নেয়, তাদের মোক্ষম দাওয়াই যোগাসন। দীর্ঘ দিন মনের রোগ মনে পুষে রাখলে তার ছায়া শরীরে পড়বেই। ফলে প্রেশার, সুগার, অনিদ্রার মতো নানা শারীরিক অসুখ। আবার আইবিএস-এর (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) মতো কিছু পেটের রোগ আছে, যাদের স্বভাবটাই বড্ড ঘ্যানঘেনে। বেঁচে থাকাটাই তখন ওষুধের পাতার উপর নির্ভর করে। এমন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ডাক্তাররাও পরামর্শ দেন যোগাসনের দিকে ঝোঁকার। কারণ, মনকে ফুরফুরে রাখার কাজটাই করে যোগাসন। ফলে শরীরও ঝরঝরে থাকে।

যোগ-ব্যায়াম বিশেষজ্ঞ দিব্য সুন্দর দাস জানালেন, যাঁরা অফিসে চাকরি করেন, তাঁদের জন্য ‘এগজ়িকিউটিভ যোগা’ খুব কাজের। একটানা কাজের মধ্যে মাত্র কিছু ক্ষণ সময় বার করে আনা। চেয়ারে বসে কিছু হালকা এক্সারসাইজ়ই যথেষ্ট। যেমন, ঘাড় আর কাঁধের কিছু ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে কাঁধের ব্যথা বা ঘাড়ের ব্যথা সারিয়ে নেওয়া, কোমরটা একটু হেলিয়ে কোমরের ব্যথা সারানো ইত্যাদি। যাঁদের সেটুকু সময়ও নেই, তাঁদের হালকা কিছু প্রাণায়াম দেওয়া হয়। তাতেও দিব্যি কাজ হয়। কিন্তু নিয়ম করে সেটা চালিয়ে যাওয়া চাই। এরই সঙ্গে রোগ সারাতে তিনি কিছু ঘরোয়া টোটকারও দাওয়াই দেন। যেমন, যাঁরা ক্রনিক সর্দিকাশির সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কিছু ব্রিদিং এক্সারসাইজ়ের সঙ্গে তুলসি পাতা বা বাসক পাতা খেতে বলা হয়। পেটের রোগে বলা হয় থানকুনি পাতার রস খেতে। অর্থাৎ যোগব্যায়াম আর কিছু ওষধির মাধ্যমে শরীর সারানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে মুঠো মুঠো ট্যাবলেট গলাধঃকরণের প্রয়োজন না পড়ে।  

    

যাঁরা প্রথম যোগাসন শুরু করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে গোড়ায় কিছু হালকা এক্সারসাইজ় দেওয়া হয়। যেমন, একটা করে ব্রিদিং এক্সারসাইজ়, ডাইজেস্টিভ সিস্টেম ভাল রাখার এক্সারসাইজ়, স্পাইনাল এক্সারসাইজ় (ব্যাক বেন্ডিং, ফরওয়ার্ড বেন্ডিং, এক্সটেনশন ইত্যাদি), সঙ্গে থাকে কিছু হালকা আসন, স্ট্রেস, টেনশনকে আটকে রাখার জন্য কয়েকটি প্রাণায়াম এবং অতি অবশ্যই ধ্যান বা মেডিটেশন।

এই প্রসঙ্গে ফিটনেস বিশেষজ্ঞ চিন্ময় রায় জানালেন, যাঁরা প্রথম যোগাসন শুরু করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নমনীয়তা কতখানি, সেটা আগেই দেখে নেওয়া উচিত। কারণ নমনীয়তা কম থাকলে যোগাসন তাঁদের কাছে খুব সহজ ব্যাপার হবে না। এই ক্ষেত্রে অনেক সময়ে কিছু উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যাতে যিনি করছেন, তাঁর উপর চাপটা কম পড়ে। যেমন কুশন, ফোম রোলার ইত্যাদি।

আরও একটা বিষয় খুব জরুরি। যাঁরা শুরু করতে চলেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দেখে নিতে হবে ব্যথার কোনও ইতিহাস আছে কি না। চিন্ময় জানাচ্ছেন, কারও পুরনো ব্যথা থাকলে যোগাসনের সব ভঙ্গি তিনি করতে পারবেন না। যেমন, যাঁদের সামনে ঝুঁকতে গেলে কোমরে লাগে, তাঁদের ক্ষেত্রে জানুশিরাসন বা পদহস্তাসন করাটা ঠিক হবে না। এতে ব্যথা আরও বাড়বে। এই জন্য কোনও বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে যোগাসন শেখা উচিত। নিজে নিজে ইন্টারনেট দেখে শুরু না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

 

কয়েকটি টিপ‌্স:

• যোগাসনের জন্য কোনও শান্ত পরিবেশ বেছে নিন, যেখানে মনঃসংযোগের কাজটা ভাল হয়।

• আরামদায়ক পোশাক বেছে নিন। যোগাসনের সময়ে ভারী অ্যাকসেসরিজ় না পরাই ভাল।

• যোগা ম্যাট কিনতে হলে দেখে নিন, সেটা যেন অ্যান্টি-স্কিড হয়। প্রসঙ্গত, যোগাসনে ‘যোগা ম্যাট’-এর কিন্তু খুব বিরাট ভূমিকা নেই। মাটিতে চাদর পেতে বা খালি মেঝেতেও যোগাসন করা যায়।

• যোগাসনের পরে অবশ্যই কিছু ক্ষণ রাখুন শবাসনের জন্য।

• এক দিন-দু’দিন নয়, যোগাসনের সেরা ফল পেতে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করে অভ্যেস করা উচিত।

 

 

মডেল: ত্বরিতা, অন্বেষা

ছবি: অমিত দাস

মেকআপ: অভিজিৎ পাল

পোশাক: লাইফস্টাইল,

কোয়েস্ট মল

লোকেশন: দ্য হলিডে ইন, এয়ারপোর্ট কলকাতা