চারপাশের ভেজাল, কৃত্রিম উপাদান, দূষণের বাতাবরণে সময় এসেছে অর্গ্যানিকের হাত ধরার। সেই তালিকায় একদম প্রথম দিকে রয়েছে সাবান। রোজকার সাবানে থাকতেই পারে অতিরিক্ত ক্ষার ও কেমিক্যাল। কিন্তু হাতে সাবান তৈরি করলে তাতে কী থাকছে, তার দিকে নজর রাখা যায়। আবার সাবানের গন্ধ, উপকরণও বাছা যায় নিজের পছন্দ অনুযায়ী। অনেকেই শখেও সাবান তৈরি করেন।

 

সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড: 

বাড়িতে সাবান তৈরি করতে কিছু উপাদান প্রয়োজন। তালিকার শুরুতেই আছে লাই। লাই আসলে ১০০ শতাংশ সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড। সাবান তৈরির ক্ষেত্রে ক্রিস্টাল ফর্মে লাই দরকার। সুগন্ধির দোকানে, অনলাইনে সহজেই মিলবে লাই। তবে লাই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন। ফ্যাব্রিকের উপরে লাই রাখলে, ফ্যাব্রিক ফুটো হয়ে যেতে পারে। আবার অনেকের ত্বকের সংস্পর্শে লাই এলে, ত্বক জ্বালা করতেও পারে। কিন্তু সামান্য যত্নশীল হলে সমস্যাগুলি এড়ানো যায়। গ্লাভস, আই মাস্ক পরতে পারেন। জলে লাই মেশালে অনেক সময়ে গলা জ্বালা বা কাশি হতে পারে। সেটা সাময়িক। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা সেরে যায়। জলের মধ্যে লাইয়ের টুকরো মেশানো উচিত। কিন্তু লাইয়ের মধ্যে জল মেশানো উচিত নয়। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, লাইয়ে সমস্যা থাকলে, তা কি সাবানে ব্যবহার করা উচিত? আসলে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ছাড়া সাবান তৈরি করা যায় না। সাবান তৈরি হয়ে গেলে তাতে লাই অবশিষ্ট থাকে না।

 

আনুষঙ্গিক উপাদান: 

সাবান তৈরির জন্য স্টেনলেস স্টিল, টেম্পার্‌ড গ্লাস, এনামেলের বাটি ব্যবহার করা শ্রেয়। তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে সাবান তৈরি করলে লাইয়ের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। সিলিকনের চামচ নিতে পারেন। বাজারচলতি নানা সিলিকনের মোল্ড পাওয়া যায়। তা সাবান জমানোর কাজে লাগান। এমন একটি স্টেনলেস স্টিলের থার্মোমিটারও কাছে রাখুন যা ৯০ থেকে ২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অবধি যে কোনও তাপমাত্রা মাপতে সক্ষম।

এ ছাড়াও সাবান তৈরিতে হার্ব, এসেনশিয়াল অয়েল এবং নানা রং অপরিহার্য। ল্যাভেন্ডার, ক্যামোমাইল, লেমনগ্রাস, ওকমস ইত্যাদি হার্ব ব্যবহার করতে পারেন। তবে সমস্ত হার্বই শুকনো হওয়া শ্রেয়। গাছের কাণ্ড, শিকড়, ফুল, বীজ থেকে উৎপন্ন হয় এসেনশিয়াল অয়েল। ১০০ শতাংশ এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করলে তা লাগেও কম এবং গন্ধও তীব্র হয়। এ বার র‌ঙের পালা। সাবানের রং খয়েরি করতে গেলে দারচিনি বা কোকো পাউডার মেশাতে পারেন। সবুজের জন্য ক্লোরোফিল পাউডার, হলুদ রঙের জন্য হলুদ গুঁড়ো, কমলার জন্য বিটের রস তো আছেই। কোনও ক্ষেত্রে ফুড কালারও মেশাতে পারেন। কিন্তু বলে রাখা ভাল ফুড কালার সাধারণত সাবানে ভাল রং তৈরি করতে পারে না। এ ছাড়াও অ্যালো ভেরা জেল, ওটমিল, গুঁড়ো দুধ, মাটি, কর্নমিল, কফি পাউডার, নুন... পছন্দসই সামগ্রী ব্যবহার করতে পারেন বাড়িতে তৈরি সাবানে। কোকো বাটার, শিয়া বাটার, চা পাতা ও লিকার, লেবুর খোসা, পোস্তও মেশাতে পারেন।

রইল একটি সাধারণ সাবান তৈরির উপায়।

হ্যান্ড ও বডি সোপ

উপকরণ: নারকেল তেল ২/৩ কাপ, অলিভ অয়েল ২/৩ কাপ, লিকুইড অয়েল ২/৩ কাপ (আমন্ড, গ্রেপসিড, সানফ্লাওয়ার), লাই ১/৪ কাপ, ঠান্ডা জল ৩/৪ কাপ।

প্রণালী: ক্যানিং জারে জল নিয়ে তাতে লাই ঢালুন। চামচ দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে থাকুন। প্রাথমিক ভাবে ধোঁয়া উঠবে। তার পরে জলে লাই পুরোপুরি গুলে গেলে সরিয়ে রাখুন। অন্য জারে একসঙ্গে তিন ধরনের তেল মেশান। মাইক্রোওয়েভে তেলের মিশ্রণ এক মিনিটের জন্য গরম করুন। এক গামলা গরম জলেও তেলের জার বসিয়ে গরম করে নিতে পারেন। তেলের তাপমাত্রা যেন ১২০ ডিগ্রি হয়। লাই মেশানো জল ও তেল— দুইয়ের তাপামাত্রাই ৯৫ ডিগ্রি থেকে ১০৫ ডিগ্রি হওয়া অবধি অপেক্ষা করুন। এ বার বাটিতে তেল ঢালুন। তাতে ধীরে ধীরে লাইয়ের জল মেশান। এ বার পাঁচ মিনিট ভাল করে নাড়তে থাকুন। সাবানের মিশ্রণ ঘন ও রং হাল্কা হতে শুরু করবে। তার পরে পছন্দের হার্ব, অয়েল বা অন্যান্য সামগ্রী মেশান। ভাল ভাবে সব মিশে গেলে মোল্ডে ঢেলে প্লাস্টিক র‌্যাপ চাপা দিন। তার উপরে পুরনো তোয়ালে ঢাকা দিয়ে অন্তত ২৪ ঘণ্টা রাখুন। ২৪ ঘণ্টা পরে যদি সাবান নরম বা গরম থাকে, তা হলে আরও ১২-২৪ ঘণ্টা চাপা দিয়ে রাখুন। সাবান তৈরি হয়ে গেলে অন্তত চার সপ্তাহ র‌্যাকে খোলা রেখে দিন। প্রতি সপ্তাহে এক বার করে সাবান উল্টে দিতে ভুলবেন না। চার সপ্তাহ পরে সাবান পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে। বাতাস থেকে ময়শ্চার টেনে হাতে তৈরি সাবান নিজস্ব গ্লিসারিন তৈরি করে। এ বার সাবান ওয়্যাক্স পেপারে মুড়ে রাখুন।

শুধু নিজের জন্যই নয়, সাবান তৈরি করতে পারেন প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্যও। আবার অনুষ্ঠানে রিটার্ন গিফট হিসেবেও হাতে তৈরি সাবান খুব ভাল। এতে যেমন নিজস্ব ছোঁয়া থাকে, জিনিসটাও হয় খাঁটি। 

মডেল: শ্রীময়ী

ছবি: অমিত দাস