সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সত্যজিৎবাবু বলতে লাগলেন

পথের পাঁচালীতে তিনি কী কী ভুল করেছিলেন এমন সব অত্যাশ্চর্য কাহিনিতে মোড়া ছোট বাক্সোর চল্লিশটি বছর। বললেন দূরদর্শন-ব্যক্তিত্ব পঙ্কজ সাহা। শুনলেন দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়।

Pankaj Saha

রিকশা কি গাড়ি নয়?

ব্রহ্মাণ্ডে আমার চেনা একজনই আছেন, যিনি এই প্রশ্ন করতে পারেন।

দূরদর্শন তখন রাধা ফিল্মস স্টুডিয়োর বাড়িতে। অফিসে তুমুল গোলমাল। কে একজন রিকশা করে অফিসে ঢুকতে চান। আমাদের দারোয়ান হুকুম সিংহ তাঁকে কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। রিকশা নিয়ে ঢোকার অনুমতি নেই। তবু তিনি ঢুকবেনই। গেটে এত গণ্ডগোল, মারপিট হওয়ার জোগাড়।

ডিরেক্টর পর্যন্ত খবর চলে গেছে। আমি তখন স্টুডিয়োতে। ভদ্রলোক আবার নাকি আমার সঙ্গেই দেখা করতে চান। ফলে জরুরি তলব। বেরিয়ে এলাম। দেখি শক্তিদা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

আমায় দেখে উত্তেজিত হয়ে শক্তিদা বললেন, ‘‘আমি তো তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আগে বলো, রিকশা কি গাড়ি না? আমার সামনে দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে। রিকশা ঢুকবে না?’’

সাততাড়াতাড়ি হুকুম সিংহকে বললাম, ‘‘তুমি ওঁকে ঢুকতে দাও। উনি কে তুমি জানো না।’’

হুকুম সিংহ নাছোড়, ‘‘কিছুতেই হবে না। অর্ডার নেই।’’ বললাম, ‘‘আমি ডিরেক্টরের কাছ থেকে অর্ডার করিয়ে আনছি।’’

এ বার ছাড় পাওয়া গেল।

শক্তিদা রাগে গরগর করতে করতে ঢোকার সময় হুকুম সিংহকে বললেন, ‘‘আমি যতক্ষণ থাকব, রিকশা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। আজ থেকে জেনে নাও রিকশাও গাড়ি। গাড়ি যেখানে পার্ক করে ওখানেই পার্ক করা থাকবে।’’

তখন ভ্রমণ নিয়ে একটা অনুষ্ঠানের কথা ভাবা হচ্ছিল। সে ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছিলেন শক্তিদা। তখন আবার তাঁর অন্য রূপ। অসম্ভব সাহায্য করেছিলেন। বিড়লা মিউজিয়ামে শ্যুটিং হয়েছিল। সারা দিন ঠায় বসে ছিলেন।

এমনিতে শক্তিদাকে কবিতা পাঠের যে অনুষ্ঠানে ডাকা হত, আসতেন না। আবার যে দিন আসার কথা নয়, অন্যদের ডাকা হয়েছে, হঠাৎ দেখতাম, কারও কাঁধে হাত রেখে ঢুকছেন শক্তিদা। এসেই বলতেন, ‘‘এদের সবার চেয়ে আমি ভাল কবিতা লিখি। আমায় এক টাকা বেশি দিতে হবে।’’

শক্তিদার কাজকর্মে, কথায় এক-এক সময় সত্যিই ঘাবড়ে যেতাম। সুনীলদা (গঙ্গোপাধ্যায়) আশ্বস্ত করতেন, ‘‘শক্তি অমনই করে, ও সব নিয়ে ভেবো না।’’

প্রথম রঙিন সম্প্রচারের জন্য কলকাতায় শ্যুটিং।

 

টেলিভিশন আসার গোড়ার পর্ব থেকেই মনে হয়েছিল, সাহিত্যের খুব ক্ষতি করবে টিভি। যেহেতু সাহিত্য নিয়ে আছি, কবিতা লিখি, ঠিক করেছিলাম, এই মাধ্যমটারই ঘাড় ধরে সাহিত্যের কাজে লাগাব। ‘সাহিত্যসংস্কৃতি’ অনুষ্ঠানটা সেই কারণেই ভাবা। তারই সূত্রে সুনীলদাদের আসা-যাওয়া।

সুনীলদার কোনও ‘না’ ছিল না। দেখে মনে হত অনন্ত ছুটিতে আছেন। অথচ তখন কী প্রচণ্ড ব্যস্ত!

প্রথম দিকে যাঁরা সংযোজনা করতেন, সুনীলদা তাঁদের একজন। শঙ্খদা (ঘোষ) তো শুরু থেকেই নানা ভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া সংযোজনার কাজে নিয়মিত আসতেন স্বপন মজুমদার, পবিত্র সরকাররা। বসন্ত চৌধুরী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়,  শংকরও এসেছেন। তবে এঁদের কারও কারও মনে হয়েছে, টেলিভিশনে বেশি মুখ দেখানো ঠিক না। ফলে পর্দায় তাঁদের মেয়াদ বেশি দিনের ছিল না। 

আমি কৃতজ্ঞ যে শঙ্খদা নেপথ্যে থেকে অনেক সাহায্য করে দিয়েছেন। আমি তাঁর ছাত্র। আমার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তথ্যচিত্রের জন্য অনেক অসাধারণ স্ক্রিপট লিখে দিয়েছেন। আমার যে কোনও বড় অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা থেকেছেন। কিন্তু ওঁকে এক বারের বেশি ক্যামেরার সামনে বসাতে পারিনি।

সে বার ঠিক হল, বন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে আড্ডায় বসবেন শঙ্খদা। ওঁরা ওঁদের বন্ধুতার পুরনো গল্প বলবেন। সে দিন শঙ্খদার বলা একটা ঘটনা কোনও দিন ভুলব না।

ওঁরা দু’জনেই তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ছুটির পর ফাঁকা রাস্তায় অনেকটা পথ হাঁটতে হাঁটতে গল্প করেন। সে দিন ময়দান অবধি চলে এসেছেন। শঙ্খদা বলেছেন, ‘‘চলো একটু বসা যাক ময়দানে।’’

বসেছেন ওঁরা। গল্প-আড্ডা চলছে। এর মধ্যে সন্ধে নেমে গেছে। সাতটা-সাড়ে সাতটা হবে। হঠাৎ এক পুলিশ অফিসার হাজির। সঙ্গে দু’জন কনস্টেবল।— ‘‘এখানে হচ্ছেটা কী? দেখেই তো মনে হচ্ছে কালপ্রিট। এক্ষুনি উঠুন। ইয়ার্কি পেয়েছেন? রাত্তিরে এখানে কী করছেন?’’ কথার মাঝে, আগে, পরে যথেচ্ছ ব-করান্ত, ম-করান্ত। অলোকদা তো প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন। শঙ্খদা তাঁকে বোঝালেন, ‘‘উত্তেজিত হয়ো না।’’ পুলিশকে বললেন, ‘‘আপনি এ ভাবে কেন কথা বলছেন? আপনার যদি মনে হয়, এখানে এ ভাবে গল্প করাটা বেআইনি, থানায় নিয়ে চলুন।’’

তার পরও বিস্তর কথার শেষে অফিসার ঠিক করলেন, ওঁদের থানায় নিয়ে যাবেন।

হাঁটতে হাঁটতেই যাচ্ছেন সবাই। সামনে অফিসারের সঙ্গে শঙ্খদা। পিছনে দুই কনস্টেবলের পাশে অলোকদা।

কিছু দূর গিয়ে অফিসার বললেন, ‘‘নাহ্, যান। আপনাদের থানায় নিয়ে যাব না।’’ শঙ্খদা বললেন, ‘‘না, না আমরা তো অপরাধ করেছি। থানায় নিয়ে যাবেন না কেন?’’ তাতেও অফিসারের সেই এক কথা। শেষে শঙ্খদা বললেন, ‘‘আচ্ছা যখন থানায় নিয়ে যাবেনই না, আপনাকে একটা কথা বলার আছে।’’

‘‘বলুন।’’

‘‘যখন কাউকে ধরবেন, প্রথমেই ওই কথাগুলো বলবেন না। পরে বলবেন।’’

অনেকক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে অফিসার বললেন, ‘‘কোন কথাগুলো বলুন তো?’’

‘‘সেগুলো যদি উচ্চারণই করা যেত, তা হলে তো আর নিষেধ করতাম না।’’

আবারও আকাশের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অফিসার ওই শব্দগুলোই বলতে বলতে উত্তর করলেন, ‘‘ও, আপনি এইগুলো বলছিলেন, আরে এইগুলো তো বাংলা কথাই, এর মধ্যে খারাপ কী আছে!’’ বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন।

শঙ্খদা মনে মনে ভাবলেন, বাংলা ভাষাটা বোধ হয় এখনও ভাল করে শেখা হয়নি তাঁর।

শঙ্খদা ক্যামেরার সামনে বসতে চাইতেন না। আর শম্ভু মিত্রকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা বললে কিছুতেই রাজি হতেন না। বহু অনুষ্ঠানে ওঁকে চেয়েও পাইনি। যদিও উনি নিজে উদয়শঙ্করের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ‘ডাকঘর’ করেছেন। একটা সময় মনে হল, এত বয়েস হয়ে যাচ্ছে ওঁর, কিছু একটা করে রাখতেই হবে।

আকাশবাণীকে নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে পঙ্কজকুমার মল্লিক,
আঙুরবালা, হীরেন বসু ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (বাঁ দিকে থেকে)।

 

বেশ কয়েকজনকে নিয়ে গেলাম ওঁর বাড়ি। তখন ঢাকুরিয়ায় পঞ্চাননতলায় গভর্মেন্ট হাউজিং-এ থাকতেন। বললাম, ‘‘আপনি তো কখনই রাজি হন না, এ বার কিন্তু আসতেই হবে।’’ বললেন, ‘‘ও সব কথা থাক। চা খাবে?’’

নিজে হাতে চা করে খাওয়ালেন। তার পর বললেন, ‘‘তোমাদের খুব মন খারাপ হয়, আমি ‘না’ বলি বলে?’’ আচ্ছা, তোমাদের ভাল লাগবে, একটু কবিতা শোনাই।’’ বলে পর পর কয়েকটি কবিতা শোনালেন। আমরা ওই অপার্থিব মুহূর্তের মধ্যে পড়ে কেমন পাথর বনে গিয়েছিলাম।

শম্ভু মিত্র থামলেন। বেশ কিছুক্ষণ বসে আমাদেরও আচ্ছন্ন ভাব কাটল। বললাম, ‘‘আপনাকে একটা কথা বলার আছে।’’

‘‘বলো।’’

‘‘আপনি তো সত্যজিৎ রায়কে গুরুত্ব দেবেন? ওঁকে আমরা নানা সময়ে নানা ভাবে পেয়েছি। আপনি তো কোনও কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। এ বার আমি বলি, আপনার একটা রেকর্ডিং করে রেখে দেব। আপনার অনুমতি ছাড়া টেলিকাস্ট করব না। আপনি যাকে যাকে চান, তাঁরা থাকবেন, আপনার সঙ্গে। রেকর্ডিং দেখার পর কোনও জায়গা যদি বাদ দিতে বলেন, তাতেও অসুবিধে নেই। কিন্তু একটা অডিও ভিস্যুয়াল রেকর্ডিং রেখে দিতে চাই ভবিষ্যতের জন্য।’’

শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তার পর বললেন, ‘‘কোনও দিন তো এ ভাবে বলোনি?’’

এর কয়েক দিন পরই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। আমাদের সহকর্মী কল্যাণ ঘোষ রেকর্ড করেছিলেন। দূরদর্শনের রেখে দেওয়া মণিমুক্তোর মধ্যে তা আজও জ্বলজ্বল করে।

সত্যজিৎ-প্রসঙ্গ যখন উঠলই, একটু পিছিয়ে যাই। দূরদর্শন তখন আরম্ভই হয়নি। চাকরি পাওয়ার পর আমাদের পাঠানো হয়েছে পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। টেলিভিশনের কাজ শেখবার জন্য। টেলিভিশন ফ্যাকাল্টির উদ্বোধন করতে এলেন সত্যজিৎ রায়।

ইনস্টিটিউটে মানিকদার এক বক্তৃতায় বিরল অভিজ্ঞতা হল। ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে বলছিলেন। বলতে বলতে হঠাৎ বললেন, ছবিটাতে উনি বেশ কয়েকটা ভুল করেছেন! সেই বলার শুরুটা ছিল অদ্ভুত। আত্মমগ্ন হয়ে বলতে বলতে হঠাৎ পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘‘আচ্ছা আখের ইংরিজি কী যেন?’’

‘‘সুগারকেন।’’

‘‘ও হ্যাঁ, সুগারকেন।’’

তার পরই ইংরেজিতে ফিরে গেলেন। বললেন, ‘‘অপু-দুর্গা যেখানে আখ খেতে খেতে কাশবনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, মনে পড়ে? সেখানে ওরা যে আখগুলো খাচ্ছিল, সেগুলো ছিল টুকরো টুকরো। অথচ পরে আমার মনে হয়েছে, ওটা ভুল। অপু-দুর্গার মতো গ্রামের ছেলেমেয়েদের তো মাটি থেকে ভেঙে নিয়ে লম্বা বড় আখ চিবনোর কথা।’’

আমরা মোহিত হয়ে ওঁর কথা শুনছিলাম। মানিকদা বলছিলেন, ‘‘এমনকী যখন দুর্গা মারা যাচ্ছে। ভেবে দেখো, ঝড়-বাদল। পুরোটাই প্রায় ঘরের মধ্যে ক্যামেরা রেখেছি। বাইরের তাণ্ডব আরও খানিকটা ধরা উচিত ছিল।’’

 পুণে ইনস্টিটিউটে সেই সময় উপস্থিত ছিলেন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও।

কথা বলতে বলতে বাংলা থেকে ইংরেজিতে ফিরে গিয়েছিলেন মানিকদা। ঋত্বিকদা কিন্তু বাংলাতেই রয়ে গিয়েছিলেন!

ইনস্টিটিউটে একটা গাছকে বলা হত ‘উইসডম ট্রি’। কী গাছ খেয়াল নেই। ক্লাসের সময়টুকু বাদ দিলে তার নীচে বসে থাকতেন ঋত্বিকদা। ওখানে বসেই আড্ডা দিতেন অন্যদের সঙ্গে। ওঁর ফিল্মের ক্লাসগুলোয় আমরা সরাসরি ছাত্র না হলেও যেতাম।

এক বার, আমাদেরই এক জন ক্লাসে সাদা বাংলায় ওঁকে একটা প্রশ্ন করে বসল। অদ্ভুত, ঋত্বিকদা বাংলাতেই উত্তর দিতে লাগলেন। কথা বলতে গিয়ে এতটাই আত্মমগ্ন হয়ে পড়লেন, তাঁর হয়তো মনেই ছিল না, ছাত্রছাত্রীদের বেশির ভাগই অবাঙালি। ব্যাপারটা আরও অদ্ভুত এই যে, অবাঙালিদের কেউই টুঁ শব্দ করল না। ওরাও ছিল তখন নিমগ্ন শ্রোতা, আমাদেরই মতো।

উত্তমকুমারকে নিয়ে বড় একটা অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা চলছিল। সুপ্রিয়াদি এক বার আমায় বলেছিলেন, উত্তমকুমার আমার ‘দর্শকের দরবারে’ দেখতে খুব ভাল বাসতেন। খাবার সময় বলতেন, ‘‘টেলিভিশনটা চালিয়ে দাও। ‘দর্শকের দরবারে’ দেখি।’’ কিন্তু তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা আর হল না। হঠাৎ তিনি চলে গেলেন।

মহানায়ক যে দিন চলে যান, সে দিন বাড়ির একটা কাজে ছুটি নিয়ে ছিলাম। ফোন এল। ছুটে গেলাম অফিস। স্টেশন ডিরেক্টর তখন মীরা মজুমদার। যেতেই বললেন, ‘‘আমরা এ রকম এ রকম ভেবেছি, দেখো কী করবে?’’ আমি বললাম, ‘‘আমি দায়িত্ব নিচ্ছি অনুষ্ঠান করার।’’

মনে আছে, সঙ্গে সঙ্গে একটা স্মরণ-অনুষ্ঠান করেছিলাম। তাতে অনেকের মধ্যে ডেকেছিলাম এক প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মধুসূদন মজুমদারকে। তার একটা কারণ ছিল, বলি।

ভদ্রলোক চোখে দেখতে পেতেন না। সে দিনের অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, নতুন ছবি করলে উত্তমকুমার অবশ্যই তাঁকে দেখানোর ব্যবস্থা করতেন। কিছু ভাল না লাগলে মধুসূদনবাবু স্পষ্ট নাকি বলে দিতেন, ‘‘উত্তম ওই জায়গাটায় তোমার এক্সপ্রেশন ঠিক হয়নি।’’

মীরা মজুমদারের মতো ডিরেক্টর, আর শিপ্রা রায়ের মতো ডেপুটি ডিরেক্টর পাওয়া সত্যিই খুব ভাগ্যের ব্যাপার।

বহু জায়গায় স্টেশন ডিরেক্টর হয়েছেন মীরাদি। খুব শিক্ষিত পরিবারের মানুষ। ঐতিহাসিক সুশোভন সরকারের ভাগ্নি। মীরাদির সঙ্গে সুচিত্রা সেনের খুব ভাল যোগাযোগ ছিল।

মীরাদি অনেক বার আমায় বলেছেন, ‘‘সুচিত্রা সেনের একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে রাখতে হবে। উনি রাজি। এক বার তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কথা বলতে হবে।’’

মহানায়িকা তত দিনে অন্তরালে। তাঁর সাক্ষাৎকার। যে কোনও সাংবাদিকের হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। কিন্তু আমি তখন অদ্ভুত একটা দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। বহু দিন ধরে রেডিয়ো, টেলিভিশন করতে করতে আমার মনে হচ্ছিল জীবনে ‘ইলিউশন’ বলে আর কিছু রইল না। সাহিত্য-বিনোদন জগতের হেন কেউ নেই যাঁর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়নি। আঙুরবালা, পঙ্কজ মল্লিক থেকে মান্না দে-হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছি। রেডিয়োয় চাকরি করতে গিয়ে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রদের মতো মানুষকে পাশে পেয়েছি। ফলে নক্ষত্রদের দূর থেকে দেখার যে ম্যাজিক, সেটা দিন কে দিন হারাতে বসেছিল। ‘মিথ’গুলো মিথ্যে হয়ে যাচ্ছিল!

এক বার মনে আছে, কোনও এক কাজে মাধবী মুখোপাধ্যায়কে খুঁজতে ওঁর লেক গার্ডেন্সের পাড়ায় গেছি। তার আগে মাধবী মুখোপাধ্যায় মানে, আমার কাছে ‘চারুলতা’, ‘মহানগর’, ‘সুবর্ণরেখা’...!

একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘মাধবী মুখোপাধ্যায় এখানে থাকেন?’’ সে কিছু না বলে ফিক করে হেসে কোথায় পালিয়ে গেল। একটু পরেই দেখি, মাধবী মুখোপাধ্যায় আসছেন। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বললেন, ‘‘ও বাবা, আপনি?’’ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওঁর দিকে।

সত্যিই, আমার ইলিউশনগুলো কেমন খুন হয়ে যাচ্ছিল! সুচিত্রা সেনের কথা উঠতে মীরাদিকে বললাম, ‘‘প্লিজ, আমায় ছেড়ে দিন, অন্তত এই একটা ইলিউশন থাক আমার জীবনে।’’ লোকে বলবে, বোকা। তবু বলব, আমার এই বোকামিটুকু থাক না বেঁচে!

মীরাদি আমায় রেহাই দিলেন। পরে সুচিত্রা সেনও তাঁর মত বদলান। আর সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। বহু দিন বাদে কথা প্রসঙ্গে মুনমুন আমায় বলেছিল, ‘‘সে কী, গেলে না কেন, মাকে মানুষ হিসেবে তোমার খুব ভাল লাগত!’’

মীরাদির প্রশ্রয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব সাহসী কাণ্ড করতে পেরেছি তখন দূরদর্শনে।

ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারটা যেমন। টেস্টটিউব বেবির আবিষ্কর্তা। আমাদের এক সহকর্মী ছিলেন ড. অলোক সেন। বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানগুলো করতেন। এক দিন হঠাৎই বললেন, ‘‘এক জন টেস্টটিউব বেবি ব্যাপারটা আবিষ্কার করেছেন, তার প্রেস কনফারেন্স আছে, যাচ্ছি।’’

অলোকদা ফিরলেন অসম্ভব উত্তেজিত হয়ে। বললেন, ‘‘শোনো, আমি খুব কনভিন্সড। উনি সত্যি সত্যিই ব্যাপারটা করেছেন। প্রেস কনফারেন্সে খুব গোলমাল হয়েছে। আমার মনে হয়, এখানকার ডাক্তার, বিজ্ঞানীরা ব্যাপারটা মেনে নেবেন না। ওঁর পিছনে আমাদের দাঁড়ানো দরকার।’’

দূরদর্শনের কাজটাকে কখনই ‘চাকরি’ হিসেবে দেখিনি। বরং মনে করতাম আমি একটা বিশাল সামাজিক কর্মযজ্ঞের এক সেনা মাত্র। এই মাধ্যমটিকে কাজে লাগিয়ে টেলিভিশনের পর্দা ছাপিয়ে চেষ্টা করেছি, বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা ঘটানোর। তার মধ্যে অন্যতম, নববর্ষের বৈঠক অনুষ্ঠানটি প্রচলন করে পয়লা বৈশাখকে বাঙালির একটি ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক উৎসবের দিন করে তোলার। এটা একটা তৃপ্তি, যে নববর্ষ আজ এক সামাজিক উৎসব হয়ে উঠেছে।

ছোট থেকে লেখালেখি, নাটক, ক্লাব, সেবামূলক কাজ, নানা রকম সংগঠন, পত্রিকা বের করা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে এক ধরনের কাতরতা, বিশ্বাস, চেতনা, সহমর্মিতার বীজ সেই যে ঢুকে গিয়েছিল, যত বয়স হয়েছে সে তত ডালপালা মেলেছে। সেই ডালপালার ঝাপটা আমায় নানান সময় নানা ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বেলাতেও তাই হল।

অলোকদা বললেন, ‘‘এখনই মীরাদিকে বলো, ট্রান্সমিশনের সময় তো প্রায় শেষ। সময় বাড়িয়ে দিয়ে কাজ করতে হলেও, এই খবরটা আজই যাওয়া উচিত।’’ বললাম মীরাদিকে। উনি বললেন, ‘‘তুমি কী করে কনভিন্সড হচ্ছো?’’ আমি অলোকদার কথা তুলে বললাম, ‘‘উনি বিজ্ঞানটা ভালই বোঝেন। ওঁর ওপর আমার বিশ্বাস আছে। তাড়াতাড়ি একটা অ্যানাউন্সমেন্ট করে দিই?’’

মীরাদি রাজি হয়ে গেলেন। তখনকার সময় ট্রান্সমিশন এক্সটেন্ড করা অত সহজ ছিল না। তা’ও হল। ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর তাঁর সহযোগীদের নিয়ে অলোকদা একটা অনুষ্ঠান করলেন দূরদর্শনে। আমি তাঁকে সহায়তা করলাম। এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষি রইলাম আমরা।

তার পরদিন আমাদের নিয়ে সর্বত্র ‘ছি ছি’! আমরা নাকি বিশ্রী ভাবে মিথ্যের পক্ষ নিয়েছি। কিন্তু সময় ঘুরতেই জানা গেল, ডা. মুখোপাধ্যায়ের দাবি ঠিকই ছিল। আমরাও সে দিন ঠিক মানুষের পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। তত দিনে অবশ্য উনি অপমানে, হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন।

অমর্ত্য সেনের নোবেল পুরস্কারের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। অমর্ত্যদার নোবেল পাওয়ার অনেক আগে আমি ওঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। শান্তিনিকেতনে। অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন আমায় খুব স্নেহ করতেন।

অমর্ত্যদার নোবেল-প্রাপ্তির খবর যখন এল, তখন আমাদের ডিরেক্টর ছিলেন অরুণ বিশ্বাস। বললেন, ‘‘আপনি তো অমর্ত্য সেনের পরিবারকে চেনেন, দেখুন না যদি কিছু করতে পারেন।’’

বললাম, ‘‘করব। তবে আমায় কতগুলো ব্যবস্থা করে দিতে হবে। প্রোডাকশন প্যানেলে বিদেশে ফোন করার জন্য একটা টেলিফোন চাই। আর টেলিফোনের কথাবার্তার ডাবল্ রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।’’

সব ব্যবস্থা করে দিলেন উনি। কিন্তু আমার এ বার জানার ছিল, কোথায় আছেন অমর্ত্যদা। ফোনে ফোনে নানা জনকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। প্রথমে কেমব্রিজ। নেই। অক্সফোর্ডে, কেমব্রিজে অমর্ত্যদার যাঁরা বন্ধু তাঁদের নম্বর জোগাড় করলাম। নেই। লন্ডন তন্নতন্ন করে ফেললাম। আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী। কোত্থাও নেই।

হঠাৎ খবর পেলাম আমেরিকায় আছেন। কিন্তু কোন হোটেলে? একটু বাদে জানা গেল তা’ও। এর মধ্যে একটা ঘটনাও শুনলাম। অমর্ত্যদার বোন মঞ্জুদির স্বামী মারা গেছেন। এটা জানার পর মনে হল, এত ব্যস্ততার মধ্যে উনি কি খবরটা পেয়েছেন? এই খবর দিয়েই আমাকে ঢুকতে হবে। মিডিয়া শুনলে কেউ আমাকে লাইন দেবে না।

আমেরিকার হোটেলে ফোন লাগালাম। শুনলাম, একটু আগেই বেরিয়েছেন। কোনও এক টেলিভিশন স্টুডিয়োয় গেছেন সাক্ষাৎকার দিতে।

আমেরিকার সেই শহরে টেলিভিশন স্টুডিয়ো কী কী আছে, সব খবর নিয়ে আবার ফোন। এক জায়গায় বলল, ‘‘হি ইজ ইন দ্য রেকর্ডিং।’’ আমি বললাম, ‘‘একটা ডেথ নিউজ আছে, ওঁকে এখনই জানানো জরুরি।’’ রেকর্ডিং বন্ধ করে ওঁরা অমর্ত্যদাকে লাইনে দিলেন।

‘‘তুমি কি এখানে এসেছ?’’

‘‘না, অমর্ত্যদা, আমি কলকাতায়। আপনি কি জানেন, মঞ্জুদির স্বামী মারা গেছেন?’’

‘‘হ্যাঁ, জেনেছি। তুমি ওকে বলবে আমি সন্ধেবেলা ফোন করব।’’

‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওঁর বাড়িতে চলে যাচ্ছি। নোবেলের খবর আপনি কখন পেলেন?’’

‘‘আজ সকালেই খবর পেলাম।’’

‘‘আপনার কি কোনও ইন্টারভিউ ব্রডকাস্ট বা টেলিকাস্ট হয়েছে?’’

‘‘না, এই তো প্রথম একটা টেলিভিশন স্টুডিয়োতে এলাম। রেকর্ডিং চলছে।’’

তার পর নানা কথার শেষে অনুরোধ করলাম, ‘‘আপনার কাছে ইংরিজিতে একটু জানতে চাই।’’

‘‘হোয়াট! আর ইউ রেকর্ডিং?’’

‘‘হ্যাঁ, বুঝতেই তো পারছেন, কলকাতায় কী ভীষণ আলোড়ন!’’

তার পর ইংরেজিতে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলেন।

রেকর্ডিং শেষ হওয়া মাত্র দূরদর্শন-এ তখন যে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হচ্ছিল, সেটি বন্ধ করে দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকার প্রচার করে দেওয়া হল। ফলে ওটাই হল অমর্ত্য সেনের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে পৃথিবীর যে কোনও মিডিয়ার মধ্যে তাঁর প্রথম ইন্টারভিউ প্রচার।

এ বার ওঁর সামনাসামনি ইন্টারভিউ নেওয়ার প্রস্তাব দিল দিল্লি। ধরলাম ফোনে, ‘‘কেমব্রিজে আসি?’’ বললেন, ‘‘না, এখন চূড়ান্ত ব্যস্ততা যাচ্ছে। নোবেল-লেকচারও লেখা হয়নি। তুমি বরং সুইডেনে এসো। ওখানে নোবেল সেরিমনির জন্য তো কয়েক দিন থাকব।’’

বললাম, ‘‘কিন্তু আমাদের তো সুইডেনে নোবেল সেরিমনি অ্যাটেন্ড করার প্রয়োজনীয় অনুমতি পত্র ইত্যাদি নেওয়া হয়নি।’’ উত্তর পেলাম, ‘‘আমি তোমায় আমার পার্সোনাল গেস্ট করে নেব।’’

লন্ডন চলে গেলাম। ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে লাগলাম। সুইডেন যেতে একই ফ্লাইটে উঠলাম। সঙ্গে ছিলেন ওঁর স্ত্রী এমা। ফ্লাইটে দেখলাম, তখনও অমর্ত্যদা ল্যাপটপে নোবেল লেকচার লিখছেন। যে কোনও জায়গায় তাঁর মনোসংযোগ করার অমন ক্ষমতা দেখে তাঁর প্রতি আরও শ্রদ্ধা এল।

এর মধ্যে দেশে কেউ কেউ একটা অকারণ বিতর্ক তুলেছিলেন। অর্থনীতির এই পুরস্কার নাকি আসল নোবেল পুরস্কার নয়। পার্লামেন্টে পর্যন্ত সে নিয়ে কথা উঠেছে। 

আমি ঘুণাক্ষরে অমর্ত্যদার কাছে সে সব প্রসঙ্গই তুললাম না। শুধু বললাম, ‘‘নোবেল কমিটির কোনও উচ্চপদস্থ কারও সঙ্গে আমার একটু পরিচয় করিয়ে দেবেন? আমি ইন্টারভিউ নেব।’’ বললেন, ‘‘হ্যাঁ, এয়ারপোর্টে আসবেন একজন। আলাপ করিয়ে দেব।’’

এয়ারপোর্টে এলেন তেমনই এক উচ্চপদস্থ কর্তা। অমর্ত্যদাকে রিসিভ করতে। অমর্ত্যদা আলাপ করিয়ে দিলেন। আমি তখনই ওঁর কাছে পর দিন সাক্ষাৎকারের নেওয়ার সময় চাইলাম। রাজি হয়ে গেলেন।

স্টকহোমে সুইডিশ টেলিভিশন সেন্টারে গিয়ে ক্যামেরা টিমের ব্যবস্থা করলাম। নোবেল কর্তার কাছে আমার মূল প্রশ্ন ছিল, ‘‘এটা প্রকৃত নোবেল পুরস্কার কিনা?’’ উত্তর এল, ‘‘হ্যাঁ, এটা অ্যাকচুয়াল নোবেল প্রাইজ। একই স্টেজ থেকে দেওয়া হয়।’’

ব্যস্, আমার হাতে স্বর্গ। কিন্তু সেই ‘স্বর্গ’-কে তো দেশে পাঠাতে হবে! তখন তো আর ই-মেলের যুগ নয়! ক্যাসেট পাঠাতে সারা রাত জেগে থেকে যেন লড়াই চালাতে হল। কোনও সরাসরি ফ্লাইট নেই। কথা হল, প্যারিসের ফ্লাইটে পাঠাব। ফ্লাইট মিস হল। কোথাও ফ্লাইট মিস হচ্ছে, তো কোথাও স্টোরে ক্যাসেট পড়ে থাকছে। এই করতে করতে ফ্রাঙ্কফুর্ট, লন্ডন হয়ে দিল্লিতে ক্যাসেট পৌঁছলে আমার দুই সহকর্মী শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত আর চম্পা ভৌমিক অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করল। টেলিকাস্ট হল সেই নোবেল কর্তার সাক্ষাৎকার। পার্লামেন্টে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানটি নিয়ে আলোচনা হল। বিতর্কও থামল।

যেন একটা পাপ ধুয়ে সময়কে অভিশাপ থেকে মুক্ত করল আমার হাতে পাওয়া সে দিনের সেই ‘স্বর্গ’!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন