এখানে প্রয়াগের মতো ফি বছর মাঘমেলা নেই।

হরিদ্বারের মতো অর্ধকুম্ভ নেই।

শিপ্রা নদীর ধারে, কালিদাসের উজ্জয়িনীতে শুধুই ১২ বছর অন্তর কুম্ভমেলা।

রাশি, লগ্ন মেনে এই কুম্ভের ব্র্যান্ড নেম ‘সিংহস্থ মহাকুম্ভ’।

বৈশাখ মাসে সূর্য যখন মেষ রাশিতে, চন্দ্র তুলা রাশিতে ও বৃহস্পতি সিংহ রাশিতে অবস্থান করে, তখনই দ্বাদশ বর্ষ অন্তর সিংহস্থ স্নান।

রাশি, লগ্ন, নক্ষত্রের জটিল হিসেব বুঝি না। কিন্তু খবরের কাগজে, টিভিতে, বাইপাস থেকে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি, এসপ্ল্যানেড মোড় সর্বত্র মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহানের হাসিমুখে করজোড়ে আমন্ত্রণের ছবিটি চোখে পড়েছিল।

দিল্লি এয়ারপোর্টেও সেই এক ছবি। মাঝে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে অমিত শাহ, যোগগুরু রামদেব সকলেই ঘুরে গিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীও সাফ জানিয়েছেন, ‘‘এই যে কোটি কোটি মানুষের ভিড়়, এদের কি নেমন্তন্ন পত্র দিয়ে ডাকা হয়েছে? সিংহস্থ মহাপর্ব এ দেশে যুগযুগান্তের ঐতিহ্য।’’

মেলা দেখতে কে আর কবে নেমন্তন্নপত্র পেয়েছে! আমিও পাইনি, কিন্তু ঐতিহ্যকে ফেলব কী ভাবে?

অগত্যা গত শনিবার বুদ্ধপূর্ণিমার শেষ শাহি স্নানে কলকাতায় রইল ঝোলা, উজ্জয়িনী পৌঁছে গেল ভোলা।

রাশি, লগ্নের জটিল হিসেবটা বুঝলাম তিন দিনে কয়েক কোটি মানুষের ভিড়ে।

কুম্ভে ভিড় হবে, ১৫০টা স্পেশাল ট্রেন ও ততোধিক বাস সারা দিনমান জনতার ভিড় উগরে দেবে, মাথায় বোঁচকা নিয়ে পঞ্জাব-সিন্ধু-গুজরাত-মরাঠা হাঁটতে থাকবে, জায়গা না পেয়ে ফুটপাথে, মেলার মাঠে অনেকেই কাঠকুটোর আগুন জ্বালিয়ে লিট্টি বানিয়ে খাবে, নতুন কথা নয়।

হরিদ্বার থেকে প্রয়াগ সর্বত্র এক দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু সিংহস্থের মহিমা অপার।

হরিদ্বারে শাহি স্নান থাকে দুপুরে, সকাল থেকে নাগা সাধুদের জলুস আসতে থাকে হর-কি-পৌড়ির ঘাটে।

প্রয়াগে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল ভোরে, সকাল ৬টা থেকেই নাগা সাধুরা ঘোড়ায় চেপে তলোয়ার, বল্লম ও নিশান নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমতটে।

আর সিংহস্থ মানে গভীর রাতে স্নানের লগ্ন। এ বার সেটি ছিল রাত ২টোয়।

রাত ১১টা থেকেই শুরু হয়ে গেল আখড়ার সাধুদের ‘হর হর মহাদেব’ স্লোগান। রাত-জাগা জনতাও সোৎসাহে পাল্লা দিচ্ছে তাঁদের সঙ্গে।

এক বৃদ্ধ নাগাবাবা বেশ পুরনোপন্থী। এক বাঙালি টুরিস্ট অ্যাঙ্গল মেপে তাঁর দিকে ক্যামেরা তাক করেছিলেন, নাগা রেগে চিমটে দিয়ে তাঁকে মারতে গেলেন। পুলিশ হইহই করে ভদ্রলোককে সরিয়ে দিল।

রেগে গেলে নাগা সাধুরা ভয়ঙ্কর। এক নাগা সাধু বোলেরো ড্রাইভ করে আসছেন, পিছনের সিটে আরও চার-পাঁচ জন ছাই মাখা নগ্ন বাবা।

ড্রাইভারের পাশে আর এক নাগাবাবা হাত বের করে খাপবন্দি তলোয়ার হাতে বসে। সামনের ভিড় রাস্তা না ছাড়়লেই হাতে, পিঠে আছড়ে পড়ছে খাপের মার।

তিন  নাগা সাধু আবার সরু রাস্তা দিয়ে বাইক চালিয়ে আখড়ায় যাচ্ছেন।

প্রশাসন তটস্থ। শহরের রাস্তায়, নদীর ঘাটে সব মিলিয়ে ৩৫ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক জওয়ান।

নাগা সাধুরা যে দত্তঘাটে স্নান করবেন, পুলিশ কমিশনার নিজে সেখানে রাত জেগে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

রাত দেড়টায় হইহই, পাশের জুনা আখড়া থেকে ঘাটে ঢুকছে হাতি। প্রশাসনিক বন্দোবস্তে জুনা আখড়াই আগে স্নান করবে।

প্রশিক্ষিত হাতি, ঘাটের একটু আগে  ভদ্রলোকের মতো দাঁড়িয়ে গেল।

শাঁখ বাজাতে বাজাতে, তলোয়ার, বল্লম ও নিশান নিয়ে ততক্ষণে আসতে শুরু করেছেন সাধুরা।

শাহি স্নান মানে এই অস্ত্রকেও স্নান করিয়ে ঝান্ডায় ঢেকে দেওয়া হবে।

আসছে রথ। রথ মানে ট্রাক্টর, পিছনে ফুল দিয়ে সাজানো। মাথায় রুপোর ছাতা। তারই মধ্যে সিংহাসনে বসে আছেন বড় বড় মহামন্ডলেশ্বররা।

এক-একটি আখড়ায় এঁরা প্রায় চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার। ভস্মমাখা, কলকে-টানা নাগা সাধুদের কাছে এঁদের কথাই চূড়ান্ত।

এই বড় সাধু ও তাঁদের সঙ্গে থাকা মেজ, সেজো সাধুরা সকলেই বেশ ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি। রাত দুটোতেও হাত নাড়ছেন, মোবাইলে ছবি তুলছেন। কেউ কেউ স্নান সেরে লম্বা জটা শুকোতে শুকোতে সেলফি তুলছেন।

প্রয়াগ বা হরিদ্বারে এ জিনিস দেখিনি। শিপ্রা নদীর ধারে মঙ্গলঘাটে অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা বাসনকোসন, প্লাস্টিকের খেলনা, ময়ূরের পালকের পাশাপাশি গত কয়েক দিন সেলফি স্টিকও দেদার বিকোচ্ছিল। এ বারের সিংহস্থ আসলে সেলফির মহাকুম্ভ।

এটাই কুম্ভ। যেখানে ধর্ম, প্রযুক্তি সব পাশাপাশি।

কত যে সাধু, আর তাঁদের কত যে বিচার!

শান্তিপুরের বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর পাশেই তাঁবু গেড়েছেন জম্মুর বৈষ্ণোদেবী থেকে আসা সাধুরা, কর্নাটকের পাশেই জোড়হাটের বঙ্গীয় অসম সারস্বত সমাজ।

কোথাও চলেছে নামগান, কোথাও যজ্ঞ, কোথাও’বা দেওয়া হচ্ছে ভাণ্ডারা।

উমাকান্ত মহারাজ নামে এক সন্ন্যাসী সারা কুম্ভক্ষেত্র ছেয়ে দিয়েছেন পোস্টারে: ‘গো বাঁচাও। দেশ বাঁচাও। গৌ কো রাষ্ট্রীয় পশু বনাইয়ে।’

বালক যোগেশ্বর দাস নামে এক সাধুর আশ্রমে সাবমেরিনে নৌ সেনাদের সঙ্গে তাঁর ছবি। তাঁবুর সামনে ভগৎ সিংহ থেকে কার্গিল-শহিদ ক্যাপ্টেন বাত্রা, মুম্বইয়ে হত পুলিশ অফিসার হেমন্ত কারকারে। সকলের ঢাউস ছবি। তাঁবুর মাথায় জাতীয় পতাকা।

সন্ধ্যায় সমবেত ভক্তমণ্ডলীর সামনে লাউডস্পিকারে ‘বর্ডার’ ছবির গান: সন্দেশ আতি হ্যায়। ভারতমাতাই তাঁর আরাধ্য। পূর্বাশ্রমের কথা বিশেষ বলতে চান না, জম্মুতে এক সৈনিক পরিবারে জন্ম, এটুকুই অনেক কষ্টে উদ্ধার করা গেল।

ভোর ৬টা নাগাদ শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে স্নান করতে এলেন স্বামী নিত্যানন্দ। বছর কয়েক আগে এঁর আশ্রমে একটি সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে খবরের কাগজ ছেয়ে গিয়েছিল, এ দিন কেউ সে সব মনে রাখেনি। জনতা মাথা লুটিয়ে তাঁকে প্রণাম করেছে।

এসেছেন সন্ন্যাসিনীরাও।

সাধ্বী প্রেরণা, বেদমাতা ইত্যাদি সন্ন্যাসিনীর পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল অস্থায়ী কুম্ভনগরী।

শেষ রাতে পাইলটবাবার আশ্রম থেকে স্নান করতে এলেন জাপানি লাধ্বী কোকেইও আইকোয়া।

অগ্নি আখড়ায় দিন তিনেক আগে এক সাধ্বী মহামণ্ডলেশ্বর হয়েছেন, সেই আখড়ার ইতিহাসে তিনিই প্রথম মহিলা মহামণ্ডলেশ্বর। তাঁর রথ ঘিরে ভক্তদের উৎসাহের কমতি নেই।

ইউরোপ থেকে আসা সন্ন্যাসিনীও যে কত! কেউ রথে বসে লাউডস্পিকারে সুরেলা শিবস্তোত্র চালিয়েছেন, সেই রথ ঘিরে তালি দিয়ে ঘুরতে ঘুরত আনন্দে নেচে গিয়েছেন গেরুয়াধারিণী মেমসাহেবরা।

ভোররাতের অন্ধকারে শিপ্রা নদীর জলে তখন আছড়ে পড়ছে লেজার বিমের আলো। নিরাপত্তার খাতিরে আকাশে উড়ছে ক্যামেরা-লাগানো ড্রোন।

সকাল সাতটায় কিছুটা হাঁফ ছে়ড়ে বাঁচলেন উজ্জয়িনীর ডিভিশনাল কমিশনার রবীন্দ্র পাস্তোর। এমনিতে কালিদাসের মেঘদূত-খ্যাত শিপ্রা নদী এখন বাংলার চূর্ণী বা কাঁসাই নদীর থেকেও সরু। তার ওপর খরার সুখা মরসুম, নদীতে জল নেই।

প্রশাসন গত এক মাস তাই আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপে নর্মদার জল শিপ্রায় নিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অনুদানে তৈরি হয়েছে এই সব পাইপলাইন, নতুন স্নানের ঘাট, রাস্তা ও ব্রিজ। হরিদ্বারের আদলে প্রতিটি ঘাটেই লোহার রেলিং, লাইফবোটে জলপুলিশ।

কলকাতার ভারত সেবাশ্রম থেকে এসেছেন প্রায় ২০০ লাইফসেভার সাঁতারু। শাহি স্নানের চূ়ড়ান্ত পরীক্ষার দিন এঁরাই ঘাট পরিষ্কার রেখেছেন। এক আখড়ার স্নানশেষে, অন্য আখড়া আসার আগে বালতি, স্ক্র্যাবার নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। হরিদ্বার, প্রয়াগ প্রতিটি কুম্ভে তাঁদের এই কাজেই ব্যাপৃত দেখেছি, এ বারেও ব্যতিক্রম হল না।

অবাক হলাম সঙ্ঘের সম্পাদক বিশ্বাত্মানন্দজিকে দেখে। দিন কয়েক আগে কেদার ও গৌরীকুন্ডে নতুন যাত্রিনিবাস উদ্বোধন করে এসেছেন, তারপর ৪৪ ডিগ্রি গরমে ফের এখানে। নিজে পজিশন ভাগ করে দিচ্ছেন, এত জন স্বেচ্ছাসেবক ভুখীমাতা ঘাটে, এত জন রামঘাটে। সঙ্গে আশ্রমে যাত্রীদের থাকা-খাওয়া প্লাস অস্থায়ী হাসপাতাল। রোজ গেরুয়াধারী সাধু থেকে দেহাতি মানুষের দাওয়াই নেওয়ার ভিড় সেখানে, কাউকে এই প্রবল গরমে অস্থায়ী হাসপাতালের খাটে শুইয়ে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।

ডিভিশনাল কমিশনারের প্রাথমিক হাঁফ ছাড়ার কারণ একটিই। ওপরে মা শিপ্রা, অন্তরে নর্মদা। দুই পুণ্যতোয়ার জলে ভালয় ভালয় চূড়ান্ত পরীক্ষা উতরে যাওয়া।

ঠিক হয়েছিল, নদীর এ পারে দত্তাঘাটে স্নান করবে শৈব আখড়াগুলি, ও পারের রামঘাটে উদাসীন ও বৈষ্ণব আখড়া।

আগে অনেক কুম্ভেই দুই দলের ঝগডায় রক্তারক্তি ঘটেছে। এ বার সেই সব হয়নি।

রাত দুটোর মহালগ্নে এ পাশে শৈবরা হর হর মহাদেব ধ্বনিতে জলে নেমেছেন, ও পাশে ‘জয় সিয়ারাম’ ধ্বনিতে বৈষ্ণবরা। রবীন্দ্র হাসছেন, ‘‘একই সঙ্গে দুটো আখড়ার স্নান, এ বারের সিংহস্থে এটাও রেকর্ড।’’

পরের রেকর্ড ৮০ লাখের ভিড় সামলানো। ‘ত্রিলোকগুরু যিনি দেবাদিদেব, তাঁর পুণ্যধামে যেতে ভুলো না,’ এই ভাবেই তো কালিদাসের বিরহী যক্ষ ‘মেঘদূত’কে জানিয়েছিল উজ্জয়িনী শহরের কথা।

গাড়িঘোড়া বন্ধ, হাঁটতে হাঁটতে ভিড়ের একটা অংশ চলেছে দেবাদিদেব মহেশ্বরের সেই মহাকাল মন্দিরের দিকে। গুজরাতের সোমনাথ বা বারাণসীর বিশ্বনাথের মতো ভারতের বারোটি স্বয়ম্ভূ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম।

 এত দিন রাস্তায় টাটা ম্যাজিক, অটো রিকশা ছিল, ছিল নিখরচার কুম্ভদর্শনের সরকারি বাস। মাঝে মাঝে গোয়া বা ব্যাংককের মতো স্থানীয় ছেলেরা ২০০ টাকায় বসিয়ে নিত বাইকের পিলিয়নে। আজ সব বন্ধ।

সামনে হেঁটে যাচ্ছে ভারত, পিছনেও। সেই ঢেউয়ে সওয়ার হয়ে দেখা গেল, মহাকাল মন্দিরের রাস্তায় ছড়িয়ে আছে অজস্র জুতো আর চপ্পল।

দুর্ঘটনা নয়, ভিড়ের ধাক্কাধাক্কিতে অনেকের পায়ের চপ্পল খুলে গিয়েছে, কেউ এখানে জুতো রেখে পুলিশি বন্দোবস্তে অন্য দিক থেকে বেরোতে বাধ্য হয়েছে, জুতো আর খুঁজে পায়নি। বারো বছর আগের সিংহস্থে প্রশাসনকে নাকি ম্যাটাডরে চাপিয়ে এ সব জুতো তুলে নিয়ে যেতে হয়েছিল।

লাউডস্পিকারে ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া মানুষের ঘোষণা: ছত্তরপুর সে আয়ি শম্ভুকে মাই, আপ ক্যাম্প অফিস আইয়ে।

হরিদ্বার, প্রয়াগে যা নেই, তা আছে উজ্জয়িনীর এই সিংহস্থ কুম্ভে। স্নানে পুণ্য, স্নান সেরে মহাকাল দর্শনে আরও পুণ্য। এই ভবের খেলায় আর জন্ম নিতে হবে না।

অন্য দিন মন্দিরের পাশে একটা স্পেশাল গেট খোলা থাকে। ২৫০ টাকার টিকিট কেটে সেখান দিয়ে মন্দিরে ঢোকা যায়। কুম্ভে স্বাভাবিক ভিড়ের লাইনে মহাকাল দর্শনে ঘণ্টা চারেক, স্পেশাল লাইনে মেরেকেটে এক থেকে দে়ড় ঘণ্টা। শাহি স্নানের দিন সেই বিশেষ ক্যাপিটালিস্ট বন্দোবস্ত নেই, সবাইকে এক লাইনে দাঁড়াতে হবে। দুঃখময় এই পৃথিবীতে আর না আসতে হলে কয়েক ঘন্টা লাইনে ঠেলাঠেলির দুঃখ সইয়ে নেওয়া বরং ভাল।

নীচে নেমে দেখা গেল সেই জ্যোতির্লিঙ্গ। মাথায় রুপোর অভিষেক পত্ত থেকে লিঙ্গের মাথায় ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। একটু আগেই পূজারিরা দুধ ঢালছিলেন মহাকালের মাথায়। সেটি দেখতে পেলাম। দেখিনি রাত তিনটেয় শ্মশানের ছাই মাখিয়ে মহাকালের ভস্ম-আরতি। তার জন্য অনলাইনে স্পেশাল টিকিট বিক্রি হয়, ৩০ মে অবধি হাউস ফুল।

পাঁচ তলা মন্দির। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলে মহাকালের গর্ভগৃহের ওপরেই ওঙ্কারেশ্বর। দুটি জ্যোতির্লিঙ্গই মধ্যপ্রদেশে, মধ্যবিত্ত তীর্থযাত্রীরা অনেকে দুই তিন দিন আগে গাড়ি ভাড়া করে ১৫০ কিমি দূরে নর্মদার তীরে সেই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করেও এসেছেন।

তিন তলায় আর এক লিঙ্গ: নাগচন্দ্রেশ্বর। সেটি বছরে এক বার, নাগপঞ্চমীর বিশেষ তিথিতেই খোলা হয়।

মন্দিরের পাশে পুরনো মহাকাল বা জুনা মহাকাল মন্দির। এই চত্বরেই জুনা ও মহানির্বাণী আখড়ার অফিস।

এক নাগাবাবা মাথায় রঙিন টুপি চাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, বললেন, ‘‘সিগারেট খাওয়া।’’

ওঁর পিছনে উজ্জয়িনীর ‘বিবেকানন্দ সাহিত্য সদন’-এর বুক স্টল। কাঁচের আড়ালে রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, অধ্যাত্ম রামায়ণ। তার পিছনে ভেষজ আয়ুর্বেদিক ওযুধের স্টল।

বিবেকানন্দ থেকে নাগাবাবা, রামদেব সকলেই এই মহাকুম্ভের মহাপরিসরে। দ্য গ্রেটেস্ট রিলিজিয়ন শো অন আর্থ!

আর সেই শোতে মহাকালই নায়ক। প্রথম শাহি স্নানে ঝড়ের দাপটে বেশ কিছু তাঁবু ভেঙে গিয়েছিল, বিদ্যুতের খুঁটি আছড়ে পড়েছিল, পয়ঃপ্রণালীর নালা প্রায় শিপ্রায় মিশে যাচ্ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী নিজে বিশেষ হেলিকপ্টারে উড়ে আসেন, জোর হাতে সব সামাল দেওয়া হয়।

প্রশাসনের হিসাব, ৫ লাখ মানুষের ছোট্ট শহর উজ্জয়িনীতে গত এক মাসে ধরে এসেছিলেন মোট আট কোটি পুণ্যার্থী।

তাঁদের মধ্যে ৮০ লক্ষের সবচেয়ে বড় ভিড় ছিল গত শনিবারের শাহি স্নানে।

সাফল্যের হাসি হেসে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জানাচ্ছেন, ‘‘সবই মহাকাল শিবের আশীর্বাদ।’’

মহাকাল ছিলেন, ছিলেন মঙ্গলনাথও।

উজ্জয়িনী মানে শুধু কালিদাস নয়। বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় বরাহমিহির নামে এক জ্যোতির্বিদও ছিলেন।

আর্যভট্ট যেমন শূন্য আবিষ্কার করেছিলেন, এই বরাহমিহিরও সে রকম টেলিস্কোপ আবিষ্কারের বহু আগে আঁক কষে এই উজ্জয়িনী শহরে বসে মঙ্গলগ্রহের কথা বলেছিলেন। এই মঙ্গলনাথ তাই উজ্জয়িনী ছাড়া অন্য কোথাও নেই।

কেমন দেখতে মঙ্গলনাথ?

শিবলিঙ্গ। গ্রহ-নক্ষত্র দেবতা। অতএব, মঙ্গলনাথের লিঙ্গ অবস্থান। শিবলিঙ্গের সামনে যেমন নন্দীমূর্তি, মঙ্গলনাথের সামনে সে রকম পিতলের এক চকচকে মেষ।

মন্দিরে ঢোকার আগে এক জন পুজোর উপচার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল লাল কাপড়ে বাঁধা মসুর ও অড়হর ডালের পুঁটলি। সঙ্গে গমগাছের চারা। হাতে দিয়েছিল সূর্যমুখী ফুল। লাল গ্রহের দেবতা এতেই তৃপ্ত।

 মন্দিরে আছড়ে পড়ছে ভিড়। কবীরপন্থী, নির্মোহী সাধুদের আখড়া এখানেই। স্নানের জন্য এখানেও ঘাট। শাহি স্নানের দিন কবীরপন্থী আখড়ায়

এক জন কলে স্নান করছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঘাটে যাবেন না?

কবীরপন্থী বৃদ্ধ হাসলেন, ‘‘বেটা, জল সব এক। শাহি স্নানের ঘাটে, এখানকার কলের জলে তফাত কোথায়, বলো তো।’’

মার্স রোভার থেকে মঙ্গলনাথ, বিজ্ঞান থেকে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ঘাট থেকে আঘাটা সবাই একাকার।

এটাই কুম্ভ, এটাই ঐতিহ্য।

ছবি: পিটিআই