নীল নীল আকাশে হিমের পরশ লাগলেই বাঙালির মনে উৎসবের রং গাঢ় হয়। ক্যালেন্ডারে গাদাগাদি ভিড় করে পিকনিক, বিয়েবাড়ি, ক্রিসমাস কার্নিভ্যাল, বর্ষবরণ, চিড়িয়াখানা, ওপেন-এয়ার ডিস্ক আর হাউজ়-পার্টি। সৌন্দর্য গোলাপ পাপড়ির মতো মখমলি সজল হলে তবেই না ডিভা-পোশাকগুলি মানাবে! শীতে ত্বক ঘামে না, মেকআপ দেখায় ভাল, টেকেও বেশিক্ষণ। কিন্তু মরসুমি কিছু ঝঞ্ঝাটও থাকে। সব দিক দেখেশুনে, ত্বকের চাহিদাটি বুঝে শীতের রূপসজ্জার কিছু কৌশল রাখুন মেকআপ বাক্সে।

 

স্বাভাবিক ত্বকের মেকআপ

ত্বকের পিএইচ ভারসাম্য যথাযথ, অতিরিক্ত তেল নেই, শুষ্কতা ময়শ্চারাইজ়িং-টোনিংয়েই জব্দ— সাধারণত সদ্যতরুণীরাই এমন ‘ন্যাচারাল’ ত্বকের অধিকারিণী হন। অল্পবয়সিরা ‘নো মেকআপ লুক’ ট্রাই করুন। পরিষ্কার তুলো দিয়ে ‘টি-জ়োন’-এ (কপাল, নাক) লেগে থাকা তেলটুকু মুছে, অল্প ময়শ্চারাইজ় করলেই এমন ত্বক তুলতুলে হয়। ফাউন্ডেশন নয়, লাগান লোশনের মতো পাতলা বিবি ক্রিমের (বিউটি বাম) প্রলেপ। কমপ্লেকশনে অসামঞ্জস্য থাকলে শুধু সেই অংশে কনসিলার ব্যবহার করে পুরোটা মিশিয়ে নিন। ব্রাশের সাহায্যে কমপ্যাক্ট মিশিয়ে নেবেন। ব্যবহার করুন ‘ডিউ হাইলাইটার’। ত্বক চকচকে লাগে। 

চোখে শ্যাডো-ক্রিম, শুধুই উপরের পাতায় মাসকারার ডাবল কোট, গালে ব্রঞ্জার, ঠোঁটে নুড বা ফুশিয়া শেডের লিপগ্লস। এটুকুই। কেউ ত্বকে মেকআপের আভাস টের পাবে না। অবাক হয়ে দেখবে আপনার সিন্ডারেলা-রূপ।

 

তৈলাক্ত ও মিশ্র ত্বকের জন্য

তাপমাত্রা কমলে এই ধরনের ত্বকের প্রধান সমস্যা হয় রোমকূপ নিয়ে। রোমকূপের তেলে শীতে বড্ড ধুলো-ময়লা আটকায়। ফলে ত্বক সংবেদনশীল হয়। নরম ফেসওয়াশ দিয়ে সকাল-বিকেল ঈষদুষ্ণ জলে মুখ পরিষ্কার করুন। বন্ধ রোমকূপ খুলে ত্বকে অক্সিজেন পৌঁছবে। শীতেও পুরু ময়শ্চারাইজ়ার এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। মেকআপ শুরুর আগে ম্যাট-প্রাইমার লাগান। এতে ত্বক নরম থাকবে, অথচ বেশি পিছল হবে না। এর উপরে মুজ় ফাউন্ডেশন লাগালে ত্বকে মেকআপ ভাল বসবে। ব্রণ-ফুসকুড়ির দাগ ঢাকুন লিকুইড ম্যাট কনসিলারে। স্পঞ্জের সাহায্যে ফিনিশিং পাউডার নিয়ে মেকআপটা ব্লেন্ড করে নিন। 

চোখ ও গালের হাড়ের অংশে মেকআপ ব্রাশের সাহায্যে পাউডার-বেসড আইশ্যাডো ও ব্লাশঅন লাগান। লিপব্রাশের সাহায্যে লিপকালার লাগান। মেকআপ শেষ হওয়ার দশ মিনিট পরে ব্লট-টিসু ব্যবহার করে অতিরিক্ত তেলটুকু মুছে সেটিং স্প্রে ব্যবহার করুন।

 

শুষ্ক ত্বকের মেকআপ  

অনুষ্ঠানের আগের রাত থেকে ত্বক বারবার ময়শ্চারাইজ় করতে থাকুন। স্নানের আগে ভিটামিন ই দেওয়া তেল লাগান। ত্বক ভিজে থাকতেই পুরু করে ময়শ্চারাইজ়ার লাগান। 

শুষ্ক ত্বক শীতে আরও খসখসে হয়ে যায়। মেকআপ করলে শুষ্ক চামড়া উঠতে পারে। মেকআপের আগে স্ক্রাব করে নিলে মৃত কোষ উঠে ত্বক মসৃণ হবে। হাইড্রেটিং ময়শ্চারাইজ়ার লাগান। কোকো বাটার সমৃদ্ধ ময়শ্চারাইজ়ার খুব শুকনো ত্বককেও মোলায়েম করে। 

লিকুইড প্রাইমার লাগিয়ে, সেরাম দেওয়া ফাউন্ডেশন ব্যবহার করুন। সকালে কোথাও বেরোলে ওই ফাউন্ডেশনে অল্প সানস্ক্রিন মিশিয়ে নিন। আর শুষ্ক ত্বকে ফাউন্ডেশন ব্লেন্ড করতে একদম ঘষাঘষি করবেন না। থুপে থুপে মেকআপ লাগান। পাউডার নয়, ফেস মিস্ট দিয়ে মেকআপ ত্বকে বসিয়ে নিন। 

সান্ধ্য বিয়েবাড়ি বা পার্টির জন্য শিমার দেওয়া ব্রঞ্জ বা সোনালি রঙের ক্রিমি ব্লাশ ও আইশ্যাডো ব্যবহার করবেন। কাজল ও মাসকারা স্মাজ করে, ঠোঁটে মেকআপ তুলি দিয়ে ওয়াইন, চেরি বা প্লাম রঙের গাঢ় শাইনি লিপকালার লাগান। লিপলাইন ঘেঁটে ঠোঁটের রং বাইরে বেরোলে কিন্তু সাজ মাটি হবে।

 

বলিরেখাকে হারাতে বোল্ড মেকআপ

চল্লিশ বা পঞ্চাশের পরে ত্বক পাতলা হয়ে শুকিয়ে যায়। ভীষণ সংবেদনশীল হয়ে যায়, বেশি ফাটেও। জ্বালা-চুলকানি নিত্যসঙ্গী। মেকআপ করলে বলিরেখা আরও ফুটে ওঠে। কিন্তু মেকআপের জাদুতুলিতে এমন ত্বকেরও বয়স অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া যায়। লাবণ্যও বেড়ে যায়।

রেটিনল যুক্ত পুরু ময়শ্চারাইজ়ার ব্যবহার করুন। এতে কোলাজেন তৈরি হবে। চোখের নীচের শুষ্ক রেখা, দাগছোপ অনেকটাই মিলিয়ে যাবে। ত্বক আবার টানটান হবে। 

মেকআপের আগে অ্যান্টি এজিং প্রাইমার ব্যবহার করলে চোখের নীচের কালি বা বয়সের ছোপ নিমেষে দূর হবে। ডার্ক স্পট বা হালকা রেখায় ঘন করে কনসিলার লাগান। তার পরে ফাউন্ডেশনের পালা। সুন্দর করে ব্লেন্ড করে মিনারেল সমৃদ্ধ ফেস পাউডার দিয়ে তা সেট করুন। 

মেকআপ শিল্পীরা বয়স্ক তারকার চোখ ও ঠোঁটে গাঢ় ও ভরাট মেকআপ করেন। এই বোল্ড, হাইলাইটেড চোখ আর ঠোঁটের খেলাতেই বাজিমাত। ত্বকের দাগত্রুটি থাকলেও সেদিকে আর নজরই যায় না! তাই ভ্রু রাখুন চওড়া। চোখের মেকআপ স্মোকি বা মেটালিক। ঠোঁটের রং উষ্ণ, ঘন। 

 

আরও কিছু কথা

এথনিক বা ওয়েস্টার্ন যা-ই পরুন, শুধু মুখে মেকআপই যথেষ্ট নয়। হাত-পা, গলা-কানে বডি ফাউন্ডেশন লাগান। নইলে বেমানান দেখাবে। ক্রিমি ফাউন্ডেশন শরীর জুড়ে থাকলে ত্বকও আরাম পাবে।

শীতে ঘাম হয় না। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডায় চোখে জল আসে। সর্দিও হতে পারে। তাই শীতেও চাই ওয়াটারপ্রুফ বা ট্রান্সলুসেন্ট মেকআপ। এতে অ্যালার্জিও কম হয়। সাজ শেষে মৃদু সুগন্ধি ব্যবহার করুন। 

মডেল: ডিম্পল, ছবি: সন্দীপ সরকার, মেকআপ: অভিজিৎ চন্দ