কলকাতার একটা বিখ্যাত কলেজে অঙ্কের স্নাতকোত্তরের পড়ুয়া, কিন্তু ইতিমধ্যেই একটি কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি বাগিয়ে ফেলেছে। কম্পিউটার ব্যবহারে তুখোড়, ব্লগ-টগও লেখে নিয়মিত।

‘‘ইদানীং তুমি কী পড়ছ?’’— এই প্রশ্নের উত্তরে ছেলেটি বলে বসল, ‘‘রাজশেখর বসুর মহাভারত’’, তার পরেই যোগ করল, ‘‘সংস্কৃত পড়ার বিদ্যে নেই, কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদও ভীষণ খটোমটো লাগল, তাই এ সংক্রান্ত অন্য কিছু বই পড়ে মহাভারতের বিস্তারটাকে বোঝার চেষ্টা করছি।’’

দ্বিতীয়জন হিসেবে যাকে ধরা গেল, সেও বিজ্ঞানের ছাত্রী। কলকাতা থেকে অনেকটাই দূরের এক মফসসল শহরের বাসিন্দা। ‘একদম সম্প্রতি পড়া এবং ভাল লাগা’ একটা বইয়ের নাম জানতে চাই শুনেই মেয়েটির জবাব, ‘‘নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর কলিযুগ। আসলে আমি কিছু দিন ধরেই মহাভারত পড়ছি, রাজশেখর বসুর অনুবাদে’’, বলল মেয়েটি, ‘‘সেই সূত্রেই সময়টাকে আরও ভাল করে জানার জন্য মহাভারত সংক্রান্ত অন্যান্য বইপত্র ঘাঁটাঘাটি করছিলাম। তখনই ‘কলিযুগ’ আমার হাতে আসে। যদিও ওটা মহাভারত নিয়ে নয়, কিন্তু ওই সময়টার সঙ্গে আমাদের সময়টাকে এমনভাবে রিলেট করেছেন লেখক, যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।’’

সকালের মেট্রোর প্রবল ভিড়ে এক হাতে ওপরের হাতল ধরে, নিবিষ্ট চিত্তে একটা পেপার ব্যাক পড়ছিল মেয়েটি। নামটাও চোখে পড়ল, ‘দ্য কৃষ্ণা কী’ (The Krishna Key)। লেখক, অশ্বিন সংহী। বই এবং লেখক দুই-ই একেবারে অপরিচিত। প্রশ্ন করা গেল, ‘‘এই যে বইটা আপনি পড়ছেন, এটার ‘থিম’-টা কী?’ ‘‘মিথোলজিক্যাল থ্রিলার।’’ তারপর বলল, ‘‘বিষ্ণুর দশম অবতার কল্কি আসলে একজন সিরিয়াল কিলার ছিলেন— এমন একটা ধারণা নিয়ে একজন লোক পুরাণের দ্বারকা নগরীতে ভ্রমণ করছেন এবং কৃষ্ণের কিছু গুপ্ত সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন— এইরকম গল্পটা। একেবারে রুদ্ধশ্বাস, টানটান।’’

স্বল্প কথাবার্তায় আরও যা জানা গেল, মেয়েটি একটি নামী এফ এম চ্যানেলের রেডিও জকি।

এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর হদিশ পেতে শহরতলির মোটামুটি নামী একটা কলেজের বাংলার অধ্যাপককে টেলিফোনে ধরা গেল। বললেন, ‘‘দূর দূর, বাংলা অনার্সের ছেলেমেয়েরা পাঠ্য বইগুলোর বাইরে কোনও দিন কিস্যু পড়ে না’’, হতাশ গলায় বললেন তিনি, ‘‘প্রতিবছর আমরা বড়জোর পাঁচ-ছ’জনকে পাই, যাদের একটু-আধটু পড়াশুনোর অভ্যেস আছে।’’

‘‘সেই পাঁচ-ছ’জনের সঙ্গেই যোগাযোগ করিয়ে দিন।’’

কলেজ-পড়ুয়া একদল নব্য তরুণ-তরুণীর সঙ্গে বসা গেল ক্যান্টিনের আড্ডায়। ওদের সামনে স্পষ্ট দুটো প্রশ্ন পেশ করা হল: এক) সম্প্রতি পড়ে ভাল লেগেছে এমন একটি বা দুটি গল্প-উপন্যাসের নাম বলো। কেন ভাল লেগেছে জানাও। এবং দুই) এর বাইরে বরাবরের ভাল-লাগা লেখকের নাম জানাও যাঁদের বই তুমি সংগ্রহে রাখো এবং মাঝে মাঝেই পড়ো। সাম্প্রতিক-পড়া যে বইগুলোর নাম ওদের মুখে ঘুরেফিরে এল— খুব ব্যতিক্রমী দু’একটা উদাহরণ বাদ দিয়ে,  আপাতত সেগুলো পেশ করা যাক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ আর ‘পূর্ব-পশ্চিম’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পার্থিব’ এবং ‘মানবজমিন’, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘কাছের মানুষ’, বাণী বসুর ‘গান্ধর্বী’, হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজ।  আর, যে সমস্ত লেখকের বই ওদের সব সময়ের প্রিয়, সেই তালিকায় সর্বাগ্রে রইলেন দু’জন— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ। আর রইলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, লীলা মজুমদার, নবারুণ ভট্টাচার্য, সুধীর চক্রবর্তী।

বাংলা বা ইংরিজি সাহিত্যে নতুন গল্পকার-ঔপন্যাসিকরা তবে গেলেন কোথায়? অতএব পরবর্তী গন্তব্য কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া। বন্ধু-স্থানীয় একজন উঠতি প্রকাশক, যার নিজেরও বয়স সদ্য তিরিশ অতিক্রান্ত, তার সামনে এই সমীক্ষার ফলাফলটা ফেলে দিতে তিনি মন দিয়ে খানিক শুনলেন। তারপর বললেন, ‘‘একটা জিনিস আমাকে খুব অবাক করছে। সেলিব্রিটিদের লেখা বইগুলো, যেমন ধরুন, ‘রূপম অন রকস’ বা দেব-এর আত্মজীবনী— কিন্তু এই বয়সের ছেলেমেয়েরা খুব কেনে। সেই নামগুলো এই সমীক্ষায় উঠে এল না কেন? বইমেলায় এমন বই বিক্রির হিসেব দেখলে কিন্তু মাথা খারাপ হয়ে যাবে।’’

কলেজ স্ট্রিটের অভিজ্ঞ বই-বিক্রেতারাই বা বাদ যান কেন? ‘‘ইয়ং জেনারেশন এখন খুব কষে থ্রিলার পড়ছে’’, বললেন বহু দিনের পোড় খাওয়া এক দোকান-মালিক, ‘‘ব্যোমকেশ বিক্রি হচ্ছে হটকেকের মতো, নীহাররঞ্জনের কিরীটী-র কাটতিও বেশ ভাল।’’

তবে যে প্রতি হপ্তায় বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকা বেরোয় সংবাদপত্রের পাতায়, সেগুলো কারা কেনে? ‘‘মূলত একটু বয়স্ক লোকজন। ধরুন চল্লিশের ওপর যাঁরা’’—ব্যস্ত দোকান-মালিকের সংক্ষিপ্ত জবাব।