উপকরণ বলতে রোলার স্প্যাচুলা আর মুদ্রণের জন্য যে রং ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ প্রিন্টিং ইঙ্ক। কাগজ ও ক্যানভাসে শিল্পী মনীষা সাহা বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সবই অ্যাবস্ট্রাক্ট ল্যান্ডস্কেপ। অ্যাকাডেমিতে তাঁর সম্প্রতি শেষ হওয়া প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘বিয়ন্ড নেচার’। 

প্রকৃতির ঊর্ধ্বের তথা বাইরের ভাবনাটা কী? অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ যে বোধ ভিতরটাকে দীর্ঘকাল নির্মাণ ও লালন-পালনের মধ্য দিয়ে একটা নির্দিষ্ট-অনির্দিষ্ট ভাবনায় পরিচালিত করেছে, প্রকৃতির ঋণ ঠিক সেখানেই অপরিশোধ্য। প্রকৃতির গভীর থেকে গভীরতর দৃশ্যকল্পের মধ্যে লালিত হতে হতে আলো-অন্ধকারের একটি রহস্যময় ঔজ্জ্বল্য শিল্পীর মনের কোন গহন অভ্যন্তরে থেকে যায়, কে জানে! ওই সাবকনশাস মোহময় প্রেক্ষাপটটি তাঁকে বাধ্য করে দ্বিমাত্রিকতার নির্দিষ্ট পরিসরে বিবিধ রং-রেখা, আলোছায়া ঘেরা বেষ্টনীতে সীমাবদ্ধ এক অন্যতর প্রকৃতির কথা জানাতে। বাস্তব কিংবা অবাস্তবতার বাইরে এবং ফ্যান্টাসি বা রোম্যান্টিকতার ঊর্ধ্বে রিয়্যালিজ়ম ও সুররিয়্যালিজ়মের দ্বান্দ্বিক প্রকাশে বা মূর্ত-বিমূর্তেরও অন্দরে তার খোঁজ— প্রকৃতিকে এড়িয়ে কিন্তু কিছুই নয়! 

অজস্র গ্রহণ বর্জনের সূক্ষ্ম ও গূঢ় অভিজ্ঞতা, তারই বেশ কিছু নির্যাস ও সারাৎসার নিয়ে সরলীকরণের এক সীমাহীন ও সীমাবদ্ধ যাত্রাই মনীষার এই ‘বিয়ন্ড নেচার’! সংক্ষুব্ধ রেখা, রঙের ঝটিকা সফর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ভালই। 

শিল্পীর এই চতুর্থ এককে এসেছে সাঙ্গীতিক এক মূর্ছনা, কোলাহলমুখর সন্ধ্যার নাটকীয় এক আলো-আঁধারি, রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক নৈঃশব্দ্য, গাঢ় আঁধার ভেদ করা আলোর বল্লম, যেন আপাতনিরীহ ঘন মেঘময় এক তরল সৌন্দর্য, আবার অতি নিশ্চুপ রঙিন স্বরলিপির পট জোড়া বিন্যাস! প্রকৃতি বিষয়ক ভাবনায় যে সরলীকরণে চলে গিয়েছে তাঁর পেন্টিং— সেখানে তাঁর অজান্তেই তৈরি হয়ে গিয়েছে বহু গদ্যভাষার শিল্পিত অধ্যায় ও কাব্যময় অলঙ্কারের রঙিন সৌন্দর্য। পাশাপাশি এখানেই তৈরি হওয়া কিছু দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্যের জন্য পেন্টিংয়ের নানা নির্দিষ্ট স্পেস ‘পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট’-এর ধারণাকে জোরদার করেছে। সমগ্র পটে রঙের আবহে যেন ভারসাম্যের প্রয়োজন। ভিন্ন রঙের আপাতবিমূর্ত টুকরো রূপবন্ধকে সহযোগী রেখার পোশাকে কী ভাবে কতটা মানানসই করবেন, সেই বোধ নিঃসন্দেহে কাজ করেছে তাঁর ছবিতে। সে কারণেই উৎসব বা নিরুৎসবের  বাতাবরণে কী অসামান্য রূপকের প্রয়োগে, প্রকৃতি টেনে নেয় তার গহন-তরল অন্দরে! 

ফরাসি-রুশ চিত্রকর নিকোলাস দ্য স্তেল চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে যে সব অ্যাবস্ট্রাক্ট ল্যান্ডস্কেপ এঁকে গিয়েছেন তেলরঙে, মনীষার অনেক কাজে যেন তারই প্রতিফলন। দ্য স্তেল একটা সরলীকরণের মধ্যে চলে যাওয়ার আগে ‘ইমপ্যাস্টো’ গোছের ওঁর কিছু কাজে রূপবন্ধকে এক নির্দিষ্টতায় ছেড়ে ও ব্যবহার করে বুঝিয়েছিলেন, ফর্ম ও কনটেন্টের ব্যবধান কী এবং নৈকট্যই বা কতখানি! বর্ণকে সমতল আঙ্গিকে প্রকাশ করে, তিনি প্রবল বিমূর্ততায় নানা অনন্য ল্যান্ডস্কেপকে দিয়ে যেন কথা বলিয়েছেন। 

এমন নিরন্তর অথচ সমৃদ্ধ জার্নিরই ধারাবাহিক প্রয়াস আমরা প্রবাদোপম শিল্পী রামকুমারের মধ্যেও পাই। অজস্র নিরীক্ষার সরলীকরণে রূপ ও বর্ণকে তিনি ডায়মেনশনের যতখানি উচ্চতায় বিশ্লেষণ করেছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। এই দুই শিল্পীর কাজ মগ্ন অনুধাবন করলে মনীষাকে বুঝতে পারা যাবে। অথচ আশ্চর্য, তিনিই হয়তো দ্য স্তেল বা রামকুমারকে তত গভীর ভাবে উপলব্ধি করেননি। তাই মনদ্রিয়ান-কোলটে-ক্লী’র মৃদু সমন্বয় ঘটেছে কোথাও— এক সময়ের গণেশ হালুইয়েরও। 

মনীষার বর্ণ নির্বাচন পরীক্ষামূলক, নইলে আলো-অন্ধকারের বৈপরীত্য বা তরলায়ন সম্ভব হত না। পটের প্রায় অর্ধেক ঘোর কালো সমতল, উপরে ধেয়ে আসা লালকে কেন্দ্র করে যেন বালিয়াড়ি, খয়েরি জমি বা আকাশ এক নির্জনতর পটভূমি তৈরি করছে। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই তৈরি হয় মনোটোনি। কাগজে গাঢ় আপাততরল রঙের ব্যবহারে নেগেটিভ স্পেসকে চমৎকার ব্যবহার করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে লাইন সলিড ও সমান্তরাল—উল্লম্ব ও পুরু। এ রূপবন্ধ ডায়মেনশন নষ্ট করেছে। এখানে ভারসাম্যহীন স্পেসের অবস্থানও দুর্বল। টেক্সটাইল কোয়ালিটি কাজ করেছে। মিউজ়িক্যাল হারমনি থেকে রোম্যান্টিক পর্ব, অতি বিমূর্ততা থেকে অতি সরলীকরণ বা কখনও বৈপরীত্য তথা ভারসাম্যকে বুঝতে না পারা। এগুলো নিয়েই ওঁকে ভাবতে হবে।