কয়েক বছর আগের সম্মিলিত প্রদর্শনীর ক্যাটালগে সুস্পষ্ট জানানো হয়েছিল: ‘‘রবীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, অবনীন্দ্রনাথের হাতে আমাদের দেশীয় শিল্পের ধারা উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়েছে— সেই ধারারই প্রতিভূ কলাভবন প্রাক্তনীদের শিল্প-জোট ‘নন্দন শান্তিনিকেতন’।’’ আর এই বছরে তাঁদের প্রদর্শনীর স্মারক পুস্তিকার ‘আমাদের কথা’য় শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘নন্দন শান্তিনিকেতন’ কোনও শিল্পীগোষ্ঠী নয়।

আসলে এটি প্রাক্তনীদের এক প্ল্যাটফর্ম বটে, কিন্তু বহু প্রাক্তনীই যোগ রাখেন না এই সংগঠনের সঙ্গে। এ বারে সদ্য শেষ হওয়া অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রদর্শনীতে মোট ৫২ জনের শতাধিক কাজ ছিল। তবে প্রায় গায়ে গায়ে রাখা এই ছবিগুলি দেখতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই অসুবিধে হয়েছে। 

এ সব প্রদর্শনীর মান নির্ধারণ করা কঠিন। শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতা নিয়ে সকলেই যে এখনও রয়েছেন, তা নয়। কয়েক জন সামান্য কিছু কাজ করেন। বাকিদের অনেকেই নিরন্তর চর্চায় অনভ্যস্ত। প্রত্যেকের কাজের ধরনে বৈচিত্র, দুর্বলতা, নব্য আঙ্গিকের সন্ধান অনুভূত হয়। যদিও প্রথিতযশা শিল্পী থেকে সদ্য পাশ করা শিল্পীর অনেকের কাজই যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। আবার অনেকের কাজেই কলাভবনের একটা ঘরানা ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা একদল মানুষ অন্তত এক বার মিলিত হচ্ছেন এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে— শিল্পের পক্ষে এটি অবশ্যই এক শুভ প্রয়াস। 

রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বল্পমাত্র কাব্যিক রেখার লাবণ্যে মা ও মুদ্রিত চোখের এক শিশুর লাইন ড্রয়িংটি অসামান্য। পার্থপ্রতিম দেব বহু বছর যাবৎ পপুলার আর্টকে লালন করে আসছেন। মস্তিষ্কের সাবকনশাস স্তরে থাকা দীর্ঘ স্মৃতিপর্বের নস্ট্যালজিয়াকে তিনি উপলব্ধি করিয়েছেন নানা ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও মজার মধ্য দিয়ে। অদ্ভুত সব মোটিফ এবং এক নিজস্বতার মিশেলে নির্মাণ করেছেন তাঁর নিজস্ব পৃথিবীর রূপবন্ধ। মাধ্যমের আশ্চর্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি সিদ্ধহস্ত। 

জলরঙে মানবীর উড়ন্ত শরীরময় আলঙ্কারিক বৈচিত্র অবশ্য কিছুটা সচিত্রকরণের মতো মনে হয় জহর দাশগুপ্তের ছবিতে। কার্টুন চিত্র এবং পেন্টিং কোয়ালিটির সমন্বয় একসঙ্গে মিশে শুচিব্রত দেবের ছবিকে যথেষ্টই প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অ্যাক্রিলিকের একটি কাজে কাপড়ের উপরে টেম্পারা ও গোয়াশের বিভ্রম এনেছেন শিল্পী শান্তনু ভট্টাচার্য। 

সেরামিকসের দু’রকম ফর্মের দুই জ্যামিতিকে দু’ভাবে বিন্যস্ত করে এক ডিজ়াইনসদৃশ ছিদ্র ও ড্রয়িংয়ের মিলন দর্শককে আকর্ষণের কেন্দ্রে নিয়ে যায় জনকঝংকার নার্জারির কাজে। পুরনো একটা শান্তিনিকেতনী স্টাইল এখনও যেন অনুভূত হয় হালকা নীল, সাদা, খয়েরি, হলুদ সমন্বিত কম্পোজ়িশনে। প্রবীরকুমার বিশ্বাসের ক্যানভাসে কাব্যময়তা গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়েছে। শিল্পী 

তপন মিত্রের ‘মোরগ’ ও অরুন্ধতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘একলা বালক’ যথাযথ। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গাঢ় সবুজ পাতিনার আধিক্যে গড়া ‘মা ও শিশু’র ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য চমৎকার। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গি থেকে সামান্য অন্য রকম ভাবনায় হরেন ঠাকুরের তুলোট কাগজের ভাঁজ করা ও সমতল ভাবে আটকানো ‘বরাহ’ চোখ আটকে রাখে। 

ক্যানভাসের ত্বক বার করা ভিন্ন ধারার ব্রাশিং লম্বোদর নায়েকের দু’টি কাজকে দৃষ্টিনন্দন করেছে। মাত্র তিন-চারটি রঙের ব্যবহার আছে ছবিটিতে।  চঞ্চলকৃষ্ণ দে ওঁর সেরামিকসের কাজে অনাবৃত দুই বক্ষযুগলের স্তনবৃন্তে ছোট্ট ব্রোঞ্জের ঘণ্টা ঝুলিয়ে উত্তোলিত হাতের মাধ্যমে কিসের ইঙ্গিত দিলেন? লকলকে জিভ নেমে এসেছে নীচে, সেরামিকস-ব্রোঞ্জের মিশ্র উত্তোলিত সমতল হাত— অন্য রকম এক ভাল লাগা আনে এ ভাস্কর্য। সেরামিকসের পেঁচার আধুনিকতায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সার্থক। অমিত বসুর আধুনিক ছন্দিল ভাস্কর্যের প্রতিরূপ দু’টি ধাতুপাতের ঘোর কালো রং তার নিস্তব্ধতাকে নষ্ট করলেও ভাস্কর্য হিসেবে অসাধারণ। শৈবাল রায়ের দু’টি কাজই চিত্তাকর্ষক তার লাইন কম্পোজ়িশন, রং এবং জ্যামিতির বিশ্লেষণে। এ ছাড়া কিরণ দীক্ষিত থাপার আদ্যোপান্ত পরিশ্রমে গড়েছেন বৃহৎ দণ্ডায়মান দুই ভাস্কর্যের নারীকে। লোহার পাত, রড ব্যবহার করেছেন। চমৎকার কাজ। সুদীপ্ত বসু সরু ও মোটা পাত-সহ লোহার রডে অসাধারণ ফ্যাশন তৈরি করেছেন তাঁর দু’টি ভাস্কর্যে। অতি সরলীকরণই এ ক্ষেত্রে ভঙ্গির সৌন্দর্যকে সুস্পষ্ট উপলব্ধি করায়। 

এই প্রদর্শনীতে সন্দীপকুমার ঘোষ, লালিমা ভৌমিক, ভারতী চৌধুরী, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, গৌরব রায়, বিকাশ আচার্য, নাজিমা খাতুন, শ্যামা রায় প্রমুখ ভাল কাজ করেছেন।

অতনু বসু