‘‘তুমি যখন আমার গান করো, শুনলে মনে হয় আমার গান রচনা সার্থক হয়েছে— সে গানে যতখানি আমি আছি ততখানি ঝুনুও আছে— এই মিলনের দ্বারা যে পূর্ণতা ঘটে সেটার জন্য রচয়িতার সাগ্রহ প্রতীক্ষা আছে। আমি যদি সেকালের সম্রাট হতুম তাহলে তোমাকে বন্দিনী করে আনতুম লড়াই করে। কেননা তোমার কণ্ঠের জন্য আমার গানের একান্ত প্রয়োজন আছে।’’

একটি দীর্ঘ চিঠির অংশবিশেষ। নীচে পত্রলেখকের স্বাক্ষর: ‘স্নেহাসক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। চিঠির তারিখ ১৯৩৮ সালের ৪ অগস্ট। যাঁকে ‘কল্যাণীয়াসু’ সম্বোধনে এই চিঠি লেখা, সেই ‘ঝুনু’ তার দশ বছর আগে থেকেই পণ্ডিচেরিতে শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন।

রবীন্দ্র-গানে যাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেয়েছে, চিঠির সেই ঝুনুকে জগৎ চেনে সাহানা দেবী নামে। ১৮৯৭ সালে ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম তাঁর। খ্যাতি ও গরিমায় তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুল দুই-ই সমান উজ্জ্বল।

বাবা প্যারিমোহন গুপ্ত ছিলেন নামজাদা চিকিৎসক। ডিস্ট্রিক্ট সিভিল সার্জেন। পিতামহ জমিদার কালীনারায়ণ ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। জ্যাঠামশাই কে জি গুপ্ত দুঁদে আইসিএস। বড়মামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। মাসি অমলা দাশ এইচএমভি-র প্রথম মহিলা সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর আগে গৃহস্থ পরিবারের কোনও মহিলা গানের রেকর্ড করেননি। পিসতুতো দাদা অতুলপ্রসাদ সেন। পিসতুতো ভগ্নীপতি সুকুমার রায়। পরিবারের গণ্ডিতে এমন নক্ষত্রসারি শেষ হওয়ার নয়!

জীবনপথে প্রধানত যে তিন জনের প্রভাব সাহানাকে নানা ভাবে এগিয়ে দিয়েছে, বিভিন্ন ওঠা-পড়ায় তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা জুগিয়েছে, তাঁদের প্রথম জন অবশ্যই তাঁর ‘মামাবাবু’ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন। তার পরে রবীন্দ্রনাথ এবং সর্বশেষ শ্রী অরবিন্দ। ৯৩ বছরের জীবনে সিংহভাগ তাঁর কেটেছে পণ্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমে। বাষট্টি বছর ধরে সেটিই ছিল তাঁর ঠিকানা। ১৯৯০ সালে সেখানেই তাঁর জীবনাবসান হয়।

চিত্তরঞ্জনের কাছে বরাবর স্নেহ ও প্রশ্রয় পেয়েছেন সাহানা। ছোটবেলাতেই তাঁর বাবা মারা যান। সন্তানদের নিয়ে মা চলে আসেন দক্ষিণ কলকাতায় বাপের বাড়ি। আত্মজীবনীতে সাহানা দেবী লিখেছেন, ‘‘মামাবাবু যখন আইন ব্যবসা শুরু করেন তখন মামাবাড়ির অবস্থা সচ্ছল ছিল না, দাদামশাইয়ের ঋণের জন্য... এই অবস্থা জেনেও পিতৃদেব মামার হাতেই আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন। মামার উপর তাঁর এমন বিশ্বাস ছিল, এতটা নির্ভরযোগ্য তাঁকে বুঝেছিলেন।’’

মামাবাড়ির আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠা সাহানার জীবনবোধ, আদর্শ সব কিছুতেই তাই মাতৃকুলের, বিশেষ করে মামা চিত্তরঞ্জনের প্রভাব ছিল খুব বেশি। স্বাজাত্যবোধ, উদার মানসিকতা, দানশীলতা ইত্যাদি সেখান থেকেই শেখা। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘মামাবাবুকে দেখতাম চাইলে শুধু যে তিনি খুশি হতেন বা পছন্দ করতেন তাই নয়, চাইতেন যে আমরা তাঁর কাছে চাই, আবদার করি, দাবি করি।’’ মামিমা বাসন্তী দেবীর কাছেও একই রকম ভালবাসা পেয়েছেন তিনি।

চিত্তরঞ্জনের লেখা ‘কেন ডাকো অমন করে, ওগো আমার প্রাণের হরি’ গানটিতে সুর দিয়ে গেয়ে শুনিয়ে তাঁর কাছে পছন্দসই হিরের দুল এবং কণ্ঠহার পুরস্কার পেয়েছিলেন তরুণী সাহানা।

খুব অল্প বয়স থেকেই গান করতেন তিনি। সাত-আট বছরের মেয়ে রেকর্ড থেকে লালচাঁদ বড়ালের গান তুলে ওই রকম গায়কি অনুকরণ করে শোনাতেন। শুনে চিত্তরঞ্জন মজা করে বলতেন, ‘‘ইমিটেশন অফ বড়াল বলে তুই গ্রামোফোনে গান দে!’’ 

সাহানার বয়স যখন আরও কম, তখন থেকেই শুনে শুনে গান গলায় তুলে নেওয়ার প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর মাসিমা, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী অমলা দাশ এক বার সাহানার অন্য দিদিদের একটি টপ্পা শেখাচ্ছিলেন। আড়াল থেকে সেই গান শুনে দিদিদের আগেই মাসিমাকে সেই গান শুনিয়ে অবাক করে দিয়েছিলেন তিনি। তার পর থেকে বারবার বিভিন্ন পারিবারিক আসরে তাঁকে গানটি শোনাতে হত।

সাহানা দেবীর প্রথাগত সঙ্গীতশিক্ষার গুরু বিষ্ণুপুর ঘরানার পণ্ডিত গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। প্রথাগত অর্থে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক তিনি ছিলেন না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান ‘নিজের মতো করে’ গাইবার স্বাধীনতা যে দু’-এক জনকে দিয়েছিলেন, সাহানা তাঁদের অন্যতম। ‘নৃত্যের তালে তালে’ গানটিতে চারটি স্তবক ভিন্ন ভিন্ন তালে বাঁধার ভাবনা সাহানার। কবি তা গ্রহণ করেছিলেন। এমন দৃষ্টান্ত আরও কয়েকটি আছে। হয়তো তাই সাহানাকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, তাঁর কণ্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীতে যতটা স্রষ্টা আছেন, ততটাই আছেন এই গায়িকা। 

সাহানাকে গান শেখানোর জন্য সুরেন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তিনি বছর বারোর কিশোরী। সাহানাকে অবশ্য কোনও দিন তান সাধতে বলেননি তাঁর সঙ্গীতগুরু। বরং প্রথম দিনেই তাঁর গান শুনে তাঁকে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভৈরবী টপ্পা— ‘পিপাসা হায়, নাহি মিটিল’।

গান গাইতে এতই ভালবাসতেন সাহানা যে, একবার গান গাওয়া আরম্ভ করলে একটানা একশো-দেড়শো গান গেয়ে যেতেন। এমনও হয়েছে, অনেক বার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-কন্যা মীরাদেবীর ঘরে বসে সারা রাত গান গেয়েছেন। চোখের সামনে ভোর হয়ে গিয়েছে।

অনর্গল গান শোনানোর এমন তৃপ্তি তিনি পেয়েছেন অতুলপ্রসাদ সেনের সান্নিধ্যেও। পিসতুতো দাদা অতুলপ্রসাদকে তাঁরা ডাকতেন ‘ভাইদা’ বলে। সাহানা লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের মতো ইনিও গান শুধু শুনতেই ভালবাসতেন না, শেখাতেও সমান ভালবাসতেন।’’ অতুলপ্রসাদের আগ্রহে তাঁর লখনউয়ের বাড়িতে ঘরোয়া আসরে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেকেও গান শোনানোর সুযোগ হয়েছিল সাহানার।

অতুলপ্রসাদের কাছে প্রথম বারেই তিনটি গান শিখেছিলেন তিনি। তখন দার্জিলিংয়ে বড় মেসোমশাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন সাহানা। অতুলপ্রসাদও সেই সময়ে ওই বাড়িতে উঠেছিলেন। সাহানা তাঁর কাছে প্রথমে শেখেন ‘তব পারে কেমনে যাব হরি’। তার পরে ‘বঁধু ধর ধর মালা ধর’ এবং ‘এ মধুর রাতে বল কে বীণা বাজায়’।

 সে বারেই ঘটেছিল এক মজার ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ একই সময়ে দার্জিলিংয়ে ছিলেন। অতুলপ্রসাদের সঙ্গে সাহানা দেবী এক দিন যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। কথাবার্তার ফাঁকে সাহানাকে ইঙ্গিত করে অতুলপ্রসাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ জানতে চান, ‘‘গানে অনুরাগ কী বলে? গাইছে আজকাল?’’ অতুলপ্রসাদ জবাব দেন, ‘‘গানে অনুরাগ তো খুবই দেখছি। উৎসাহের শেষ নেই।’’ রসিক রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, ‘‘ওহে, রোস, রোস। এখনও তো বিয়ে হয়নি। মেয়েদের হয় বিয়ে, নয় গান। দুটোর মাঝামাঝি কিছু নেই।’’

গান শোনাচ্ছেন সাহানা দেবী, পাশে দিলীপকুমার রায়

সাহানা দেবী নিজে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে তিনি যে গভীর তৃপ্তি পেতেন, তা আর কোথাও পাননি। কবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের রসায়নটাও ছিল বড় গভীর। স্নেহ, প্রীতি, অধিকারবোধ সব কিছুর এক অদ্ভুত মিশেল ছড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরতে পরতে। একবার রবীন্দ্রনাথকে সাহানা বললেন, ‘‘আমার গানের প্রতি আপনার বেশ পক্ষপাতিত্ব আছে।’’ কবির বিস্মিত জবাব, ‘‘ঝুনু, তুমি আমায় একথা বলছ!’’

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাহানার প্রথম দেখা মামা চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে। তিনি তখন নিতান্ত বালিকা। কেমন ছিল সেই দর্শনের অভিজ্ঞতা? সাহানা লিখেছেন, ‘‘কি সুন্দর চেহারা, কোথায় যেন  যিশুখৃষ্টের আদল আসে— গৌরবর্ণ, লম্বা, দোহারা, চোখ নাক মুখ সব যেন দেখবার মতো। দেখলে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।’’ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ওই বাড়িতে প্রায়ই যেতেন রবি ঠাকুর। নিজের লেখা পড়তেন। গান হত।

মাসি অমলা দাশ এক বার সাহানাকে কবির কাছে নিয়ে গিয়ে গান গাইতে বলেন। সেই প্রথম তাঁকে গান শোনানো। সাহানা গেয়েছিলেন মাসির কাছে শেখা ‘ঘুরে ফিরে এমনি করে ছড়িয়ে দে রে ফাগের রাশি’। সেই থেকে ওখানে গেলেই রবীন্দ্রনাথ সাহানার খোঁজ করতেন। আদর করতেন বালিকাকে।

যখন পঞ্চদশী, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মাঘোৎসবের সম্মিলনে সাহানা গাইলেন ‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে’ এবং ‘লুকিয়ে আস আঁধার রাতে’। সে দিনের প্রার্থনায় আচার্য ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

ওই রকম বয়সেই সাহানার প্রথম শান্তিনিকেতনে যাওয়া। উপলক্ষ, রবীন্দ্র-জন্মোৎসব। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোতে বা কলকাতার অন্য কোথাও এলেও বারবার ডাক পড়ত সাহানার। কখনও কবি নিজে, কখনও দিনেন্দ্রনাথ গান শেখাতেন তাঁকে। এক বার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে টেলিফোনে দিনুবাবু সাহানাকে একসঙ্গে চোদ্দোটি গান শিখিয়েছিলেন। সাহানা ছিলেন তাঁর মামার বাড়ি রসা রোডে অর্থাৎ দেশবন্ধুর বাড়িতে।

১৯১৬ সালে চিকিৎসক বিজয় বসুর সঙ্গে বিয়ে হয় সাহানার। বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অনেক টালমাটাল সময়ের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাঁকে। সেই সব সময়েও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পরম নির্ভরতার আশ্রয়।

১৯২৬-এ অসুস্থ হয়ে পড়েন সাহানা দেবী। শান্তিনিকেতনে থাকতে চেয়ে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথকে। ব্যবস্থা হয়ে যায়। সাহানা বলেছেন, ‘‘তাঁর মধুর সুকোমল স্পর্শ তখন আমাকে নবজীবন দান করেছিল।’’ এক দিন বিকেলের পরে কবি এলেন সাহানার ঘরে। কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপলেন। তার পরে অনেক ক্ষণ সাহানার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পাশে বসলেন এবং পিঠে হাত রাখলেন। কিছু আন্তরিক কথাও হল দু’জনের।

আত্মজীবনীতে সাহানা দেবী সবিস্তার জানিয়েছেন সেই সন্ধ্যার কথা। সে দিন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘যে অভিজ্ঞতা তোমার হল এ-অভিজ্ঞতা জীবনে কম আসে। বিশেষভাবে তোমাদের জীবনে সেটার সুযোগ খুব কমই আসে। তোমাদের চারিদিকে এত বাঁধাবাঁধি যে, সে সুযোগ যদি কখনও আসেও তো ঝড়ের মতো সব যেন ভেঙে দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়।’’ সায় দিয়ে সাহানার জবাব ছিল, ‘‘আমারই তো তাই, দেখুন না যেন সব ভেঙে, যেখানে যা ছিল খসিয়ে তবে ঠাণ্ডা হল।’’

সাহানা দেবীর অসুস্থতা ক্রমশ টিবি রোগের আকার নেয়। তখনও, ১৯২৭ সালের গোড়ার দিকে, মাস তিনেক তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন। পরে সেখান থেকেই নৈনিতালের কাছে এক স্যানেটোরিয়মে চলে যান। ট্রেনে কাশী পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁর যাত্রাসঙ্গী ছিলেন। সাহানা লখনউতে দাদা অতুলপ্রসাদের বাড়িতে ওঠেন এবং সেখান থেকে পরদিন স্যানেটোরিয়মে। শুরু হয় একাকী জীবনের আর এক অধ্যায়।

অধ্যায় এই কারণে যে, জীবনের এই পর্বেই তিনি আধ্যাত্মিকতায় অনুরক্ত হন। এর পরে কলকাতায় তিনি খুবই কম এসেছেন। শান্তিনিকেতনেও নয়। বরং উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় একা একা ঘুরে অবশেষে ১৯২৮-এর নভেম্বরে পৌঁছন পুদুচেরিতে, শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে। সেখানে শ্রী অরবিন্দের দর্শন ও আশীর্বাদ পান। মাদারের স্নেহ পান। আশ্রমের সেলাই বিভাগে কাজের দায়িত্বও দেওয়া হয় তাঁকে। সেই থেকে আমৃত্যু আর অন্য কোথাও ফিরে যাননি।

অরবিন্দকে সাহানা দেবী প্রথম দেখেছিলেন তাঁর মামা চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে। ১৯০৮। আলিপুর বোমার মামলায় জেল থেকে ছাড়া পেয়ে অরবিন্দ দেখা করতে গিয়েছিলেন সেখানে। চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন সেই ঐতিহাসিক মামলার আইনজীবী।

স্মৃতিকথায় সাহানা দেবী লিখেছেন: ‘‘তখন তাঁকে অল্পক্ষণের জন্য দেখেছিলাম, কিন্তু সে চেহারা খুব স্পষ্ট মনে নেই, শুধু একটু একটু মনে আছে— রোগা শ্যামবর্ণ আবছা একটি সৌম্যমূর্তি।’’

আরও কুড়ি কুড়ি বছরের পার, ১৯২৮-এ তিনি যখন পুদুচেরির অরবিন্দ আশ্রমে মুক্তির আশ্রয় খুঁজে পান, তার প্রথম অভিজ্ঞতাও বেশ চমকপ্রদ। যক্ষ্মায় আক্রান্ত সাহানা দেবী উত্তর ভারতে স্যানেটোরিয়মে যাওয়ার পর থেকে পুদুচেরিতে স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত এক প্রকার পরিব্রাজকের মতো জীবন কাটিয়েছেন। এখানে, ওখানে ঘুরেছেন। কখনও অল্প দিন কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর আতিথ্য নিয়েছেন। আবার দিন কয়েক পরেই বেরিয়ে পড়েছেন নতুন যাত্রায়।

কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায় শ্রী অরবিন্দ আশ্রমেরই বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাহানার ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। যার সূচনা হয় ১৯২২ সালে গয়ার কংগ্রেস অধিবেশনে। মামা চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন সাহানা। দিলীপ রায় আবার ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর বন্ধু। ফলে আলাপ জমতেও দেরি হয়নি। মুগ্ধ বিস্ময়ে সাহানা শুনেছিলেন দিলীপ রায়ের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’। সম্পর্কের উষ্ণতায় পরবর্তী কালে দিলীপবাবুকে সাহানা দেবী ডাকতেন ‘মন্টু’ বলে। সেটি দিলীপবাবুর ডাকনাম।

দিলীপ রায়ের কাছেই প্রথম  শ্রী অরবিন্দের পূর্ণযোগের বিষয়টি জানতে পারেন সাহানা। এর পরে তাঁর লেখা পড়ে আরও অনুরক্ত হয়ে পড়েন। অন্তরে অনুভব করতে থাকেন তীব্র, অমোঘ আকর্ষণ। তিনি স্থির করেন, পুদুচেরিতে শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে যাবেন। অন্য সব কিছুতে বিরাগ তখন। গানেও রুচি নেই। আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁকে বিশেষ সহায়তা করেছিলেন দিলীপ রায়েরই বন্ধু নলিনীকান্ত গুপ্ত। তাঁর সঙ্গে বারবার এ বিষয়ে পত্রালাপ চলত সাহানা দেবীর।

কলকাতা থেকে জাহাজে তৎকালীন মাদ্রাজ বন্দর। সেখান থেকে বেঙ্গালুরুতে কিছু দিন কাটিয়ে অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে পুদুচেরি। তার আগে ঘটল সেই চমকপ্রদ ঘটনাটি। আশ্রমে যাওয়ার দিন তখন এগিয়ে আসছে। এক রাতে সাহানা দেবী স্বপ্নে দেখলেন শ্রী অরবিন্দকে।

কেমন ছিল সেই দর্শন? আত্মকথায় বর্ণনা দিয়েছেন তিনি নিজেই। আশ্রমে যাওয়ার জন্য তাঁর অন্তরে যে ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, সেই কথা জানিয়ে নলিনীবাবুকে চিঠি লিখেছিলেন সাহানা দেবী। বলেছিলেন মাদারকে সব জানাতে। তার দু’দিন পরেই স্বপ্নে সাহানার মনে হল, শ্রী অরবিন্দ এক বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের জমি পেরিয়ে হেঁটে আসছেন। সাহানা ছুটে গেলেন তাঁর দিকে। প্রণাম করে জানতে চাইলেন, ‘আমার পণ্ডিচেরী থাকার কী হল?’’ সাহানা স্বপ্নে দেখলেন, শ্রী অরবিন্দ তাঁর দিকে কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলছেন: ‘পণ্ডিচেরী? পণ্ডিচেরী এখনই কেন? আরও কিছুকাল গানটান করো না!’

সাহানা লিখেছেন, ‘‘উত্তর শুনে আমার মনে হল আমি যেন একেবারে ভেঙে পড়লাম। কাতরকণ্ঠে বললাম— গান? গান তো আর আমি করতে পারব না!’—তিনি সস্নেহে আমার পিঠে হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন— পণ্ডিচেরী তোর হয়ে গেছে, কাল চিঠি পাবি।’’

স্বপ্ন দেখার তারিখ ১৪ নভেম্বর। পরদিনই নলিনীবাবুর চিঠি পৌঁছয় সাহানা দেবীর হাতে। তিনি জানান, আশ্রমে যাওয়ার বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ। পুদুচেরিতে ১৯২৮-এর ২৪ নভেম্বর শ্রী অরবিন্দের দর্শন পান সাহানা।

সোফায় বসে ছিলেন গৌরবর্ণ, উজ্জ্বলকান্তি সেই পুরুষ। পরনে গরদের ধুতি-চাদর। প্রণাম করতেই সামনের দিকে ঝুঁকে মাথায় হাত রাখলেন। ‘‘আহা! কী যে নরম সেই হাতের স্পর্শ... যা পাচ্ছিলাম তা আর কোথাও কখনও পাইনি’’—লিখেছেন সাহানা।

গান অবশ্য শেষ পর্যন্ত সাহানা দেবীকে ছাড়েনি। পাশাপাশি সেটাও বজায় থেকেছে। মৃত্যুর আগেও তিনি বলতেন, ‘‘যাঁরা আমার এই ৯২ বছরের কণ্ঠের গান শোনেন তাঁরা অবাক হয়ে এই কথাই বলেন যে— আজও কেমন করে আমার এই কণ্ঠ রয়েছে?’’

তাঁর সঙ্গীতচর্চা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আশ্রম-পর্বে দিলীপ রায়ের ভূমিকাও বড় কম ছিল না। একসঙ্গে গান গাওয়া তো ছিলই। সাহানা দেবী গাইছেন, দিলীপ রায় হারমোনিয়মে সঙ্গত করছেন— এমনও ঘটেছে বারবার। অরবিন্দ আশ্রমের অন্যতম ভক্ত ও ধর্মবিষয়ক শিক্ষক শ্রী চিন্ময় বলেছেন, এক বার দিলীপ রায়ের কাছে একটি বাংলা গান শেখেন সাহানা দেবী। পরে তিনি যখন গানটি গেয়ে শোনান, দিলীপবাবু শুনে বলেছিলেন, ওই গানটি তিনি নিজে আর গাইবেন না। কারণ সাহানা গানটিতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।

আশ্রম-জীবনে সাহানা দেবী রবীন্দ্রসঙ্গীত একেবারে গাইতেন না, তা নয়। কিন্তু বেশি গাইতেন ভজন, ভক্তিমূলক গান ইত্যাদি। নিজে কিছু গান লিখেওছিলেন। শ্রী চিন্ময় জানাচ্ছেন, সাহানা দেবী কিছু দিন নিয়ম করে শ্রী অরবিন্দকেও গান শুনিয়েছেন। প্রথমে সপ্তাহে এক বার, পরে মাসে দু’বার বা মাসে এক বার করে তাঁর গান শুনতেন
শ্রী অরবিন্দ।

তাঁর আশ্রমবাসের কথা লিখতে গিয়ে সাহানা দেবী শুনিয়েছেন এক অদ্ভুত ঘটনার কথা। সেখানে প্রতি শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় গাড়িতে মাদার বেড়াতে বেরোতেন। সঙ্গে যেতেন তাঁরা কয়েক জন। শ্রী অরবিন্দ মাদারের বেরোনো এবং ফেরার সময় গাড়ির হর্ন শুনে দোতলার ঘরের জানলায় এসে দাঁড়াতেন। কিন্তু সে দিকে অন্য কারও তাকানোর অধিকার ছিল না। একবার সাহানা দেবী তাকিয়ে ফেলেন এবং দেখেন, ‘‘শ্রীঅরবিন্দ খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর দেহের খানিকটা দেখা যাচ্ছে।’’ সাহানা লিখছেন, ‘‘শ্রীঅরবিন্দ আমায় দেখা মাত্র চট্ করে সরে গেলেন জানালার আড়ালে। পাশে লুকিয়ে অদৃশ্য হলেন!’’

দীর্ঘ জীবনপথে এমন বহু বিচিত্র এবং বহুমূল্য অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারী এই অভিজাত রমণী বাঙালির স্মৃতিতে আজ হয়তো অনেকটাই ধূসর। কিন্তু গত শতাব্দীর প্রায় সবটা জুড়ে এমন এক বর্ণময় প্রতিভা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে যে ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, তা ভোলার নয়। সাহানা দেবীর কণ্ঠের গান, বিশেষত রবীন্দ্রসঙ্গীত, স্মৃতির সম্পদ হয়ে রয়ে যাবে চিরকাল।

ঋণ: ‘স্মৃতির খেয়া’: সাহানা দেবী