শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা সুন্দরবনের নদীজল, বিপুল বৃক্ষের মহাবৈচিত্র, অজস্র ডালপালার ভাস্কর্যসুলভ বিস্তার, জলাধারের স্তব্ধ নির্জনতা, জলের উপরে গাছপালার কেঁপে ওঠা ও ভেঙে পড়া কল্লোলিত ছায়া, আকাশ ও নিসর্গের সামগ্রিক ছন্দ, আন্দোলিত পত্রপুষ্পের বিচিত্র খেলা— এমন বহু কিছুই তাঁকে নিয়ত মুগ্ধ করত ছাত্রাবস্থায়। এ সবই তাঁর মনের অন্তঃস্তলে লালিত হয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছর। ধীরে ধীরে সেই গ্রাম-জীবনের নৈসর্গিক নস্ট্যালজিয়ার নানা ছন্দ এক জন ভাস্করের নিজস্ব রূপকল্পে কী ভাবে ব্রোঞ্জের মাধ্যমে রূপ পায়, তারই জীবন্ত উদাহরণ অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে মৃণালকান্তি গায়েনের এই সাম্প্রতিক প্রদর্শনী।

আসলে শূন্যতাকে (শিল্পীর ব্যাখ্যায় যা কিনা ‘হলো’) তিনি গভীর ভাবে অনুভব করেছেন। এই ‘হলো স্পেস’ অতীতে তাঁর কাজে ‘রিফ্লেকশন’-এর মধ্য দিয়ে যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনই পরবর্তী সময়ের ভাস্কর্যে তাকেই তিনি পরিচিত রূপারোপের মাধ্যমে ও আরও প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের সংযোজন ঘটিয়ে, নির্দিষ্ট ভাবে শিল্পে স্থান দিয়েছেন। ফলে মনুষ্য অবয়ব-সহ বহু পশুপাখির দৈনন্দিন জীবনের টুকরো অংশ সংযোজিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। তাদের নিবিড় ক্রীড়ার ক্ষণিক আনন্দকে তিনি মূর্ত করেছেন ব্রোঞ্জের ফর্ম, অ্যারেঞ্জমেন্ট ও কম্পোজিশনের চমৎকার ব্যবহারে।

নিসর্গের এ জীবন নিয়েই মৃণালের দীর্ঘ যাত্রা। নৌকো নিয়ে এক সময় নানান ভাবনাচিন্তা থেকে বহু রকমের ভাস্কর্য গড়েছেন। তবে পুকুর ও দিঘির জলে গাছপালার ছায়া, হঠাৎ জল থেকে উত্থিত শাখাপ্রশাখার আশ্চর্য ছন্দ, শিশুদের সাঁতার, হাঁসের বিচরণ, এমনকী মানবজীবনের রোম্যান্সকেও নিজস্ব ভাবনা ও ব্রোঞ্জের ভাষায় প্রাণ দিয়েছেন তিনি তাঁর ভাস্কর্যে।

এই প্রাণ প্রতিষ্ঠার রূপটি ঠিক কী রকম? মাছ, ফড়িং, পদ্মপাতা থেকে সরীসৃপসদৃশ অবয়বকে ওই শাখার বেড়ে ওঠা বা এগিয়ে চলার মধ্যে মৃণাল খুঁজে নিয়েছেন কিছু নির্দিষ্ট ফর্ম ভেঙেই। হয়তো কখনও সেখানে এক ধরনের একঘেয়েমিকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছেন সেই ছন্দকে ধরতে গিয়ে। কিন্তু তাকে ভেঙে ও নতুন রূপ দানে যে অনির্বচনীয় মাধুর্য আনা যায়, তাও উপলব্ধি করেছেন। এখানেই তাঁর কাজের সার্থকতা। অর্থাৎ গাছের ডালপালা যে নিজস্ব ছন্দে বেঁকেচুরে এগিয়ে যায়, সেই সত্যটিকেই মৃণাল অনেক কাজে ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে নিসর্গের বিভিন্ন ফর্মের কন্ট্যুর লাইনকে অনুরূপ ব্রোঞ্জের ফর্মে গড়ে নিয়ে, তার গায়ে ছোট ছোট রূপকে আশ্রয় দিয়েছেন। সম্পূর্ণ নিজস্ব এই স্টাইলাইজেশনের সঙ্গে অদ্ভুত এক সবুজ পাতিনা যেন গোটা কাজটি জুড়েই এক-একটি নাটকীয় মুহূর্তের সার্চলাইট ফেলছে।

এ সব ছন্দের মধ্যেও কাজ করেছে এক ধরনের দৃষ্টিনন্দন নীরবতা, দুই নর-নারীর রোম্যান্স, শূন্য স্পেসে বা কখনও জলে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র এবং বৃহদাকার বৃক্ষছায়া, অর্ধ-বর্তুলাকার মোটা নলের মতো ফর্মকে বেছে নিয়েছেন ছাগলদের চরে বেড়ানো ও খেলার মুহূর্তকে রূপ দেওয়ার জন্য। যে নলের সারা গায়ে টেক্সচারের উচ্চাবচ তরঙ্গের পাতিনাময় আলো। শাখার উপরিভাগে জিমনাস্টিকসের ভঙ্গিতে মেয়েরা দড়ি নিয়ে লাফাচ্ছে, কনস্ট্রাকশনের ফর্মের চার দিকেই মানুষের নানা মুহূর্ত, পল্লবিত কুঁড়ি, পদ্ম-শাপলা-ডাঁটা নিয়ে তাদের বেড়ে ওঠা— পাখি, ব্যাং, হাঁস, পদ্মপাতা, জল...
সমস্ত কিছুর মধ্যে সচেতন ভাবেই ধরা এই ছন্দ ব্রোঞ্জের কাব্যিক ফর্মের মধ্যে লৌকিক সুরের এক অনুরণন তুলেছে! আর এই নীরব সঙ্গীতই পাতিনার মেলোডিতে হয়ে উঠেছে নিসর্গের জলসার ছন্দোময় নানা মুহূর্ত!

ব্রোঞ্জের এই ব্যবহারিক দিকটিতে নিজস্ব আঙ্গিকে এক লৌকিক গ্রামীণ সারল্য দানের পিছনে অ্যালবার্তো জিয়োকোনেত্তি, মীরা মুখোপাধ্যায় ও রামকিঙ্কর বেইজের অবস্থান কাজ করেছে নিঃসন্দেহে। তাঁদের নিঃশব্দ উপস্থিতি গভীর ভাবে টের পাওয়া যায় মৃণালের ফর্ম, স্টাইল ও অনুষঙ্গে। যে প্রভাব শিল্পীও অস্বীকার করেন না। সব মিলিয়ে ওঁর ভাস্কর্যের নির্জন সৈকত তীব্র আন্দোলিত। বড় মায়াময় তাদের ছন্দোবদ্ধ নস্ট্যালজিয়ায় গড়ে ওঠা নান্দনিক আবহটি।

 

অতনু বসু

রাধাকৃষ্ণের দোল উৎসব

পলি গুহ

ইন্ডিয়ান মিউজ়িয়াম, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডিয়ান ট্যুরিজ়মের যৌথ পরিচালনায় জাদুঘর চত্বরেই প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় পরিবেশন করেন দোল উৎসব। তাঁর নিপুণ পরিচালনায় ছৌ, ওডিশি, রাজস্থানি এবং সৃজনশীল নৃত্যের মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দোল উৎসবের পরিক্রমা। সকলে মিলিত ভাবে রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে গৃহবাসী’র সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকমন মাতিয়ে দেন।

এর পর পরিবেশিত হয় ওডিশি আঙ্গিকে রাধাকৃষ্ণের দোল-উৎসবে আধারিত নৃত্যের কোরিয়োগ্রাফি। এই অনুষ্ঠানটিকে এক নিখুঁত পরিকল্পনার ফসল বললেও খুব কম বলা হয়। রাধারূপী ডোনার নৃত্য-মাধুরী ছিল তারিফ করার মতো। কৃষ্ণের ভূমিকায় রঘুনাথ দাসও ছিলেন বড় প্রাণবন্ত।

রাজস্থানি ও ঘুমর নৃত্যে হোলির প্রকাশ ছিল অত্যন্ত সুন্দর। নৃত্যের পোশাকও মনোগ্রাহী। ছৌ নাচের মাধ্যমে দোলের বহিঃপ্রকাশ দর্শকরা আদ্যন্ত উপভোগ করেন। সর্বশেষ নিবেদন ছোটদের ‘দেশরঙ্গিলা’ গানের সঙ্গে নাচটি সকলেরই মন কেড়ে নেয়। দোলের এই সর্বাঙ্গীন সুন্দর অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার জন্য ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় সন্দেহাতীত ভাবেই সাধুবাদের যোগ্য।

 

বৈচিত্রময় ভাবানুভূতি

কাশীনাথ রায়

সম্প্রতি যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি প্রেক্ষাগৃহে সঙ্গীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতি বিজড়িত সংস্থা রবিরঞ্জনীর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে পরিবেশিত হল গীতবিতানের ‘বিচিত্রা’ পর্যায়ভুক্ত গান অবলম্বনে ‘আলোর নাচন পাতায় পাতায়’ শিরোনামে এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠান। উপযুক্ত ভাষ্য-সহ ১৫টি গান দ্বৈত এবং সমবেত কণ্ঠে ২০ জন শিল্পী পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘এই তো ভালো লেগেছিল’ গানের মধ্য দিয়ে এবং পরিসমাপ্তি ঘটে ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ গানটি দিয়ে। বিচিত্রা পর্যায়ের গানগুলির বৈচিত্রময় ভাবানুভূতি মনকে বিস্মিত ও অভিভূত করে তোলে। মনে হয়, এই পর্যায়ের বেশ কিছু গান হয়তো ‘পূজা’ পর্যায়ের গানের সঙ্গে মিলেমিশে যেতে পারে। গান নির্বাচন খুবই আকর্ষণীয়। প্রত্যেকটি গানই সুগীত। তবু তারই মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ‘আমারে ডাক দিল কে’, ‘কোন সুদূর হতে’, ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি’, ‘তিমিরময় নিবিড় নিশা’, গানগুলি। তবে ‘আমার অন্ধপ্রদীপ’ গানটির পরিবেশনা তুলনামূলক ভাবে দুর্বল। ভাষ্যপাঠে অংশ নেন জয়শ্রী ভট্টাচার্য ও শিবিররঞ্জন দাস। যন্ত্রানুষঙ্গও যথাযথ। একান্ত শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন আশিস ভট্টাচার্য।

 

 

অনুষ্ঠান

• সম্প্রতি শিশির মঞ্চে মডার্ন মাইম সেন্টার আয়োজন করেছিল মাইম শো রবীন্দ্র সন্ধ্যার। অনুষ্ঠানটির চিত্রনাট্য লিখেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন এবং
অভিনয় করেছেন কমল নস্কর। তাঁকে সহযোগিতা করেন শুভ্রা সান্যাল, বৃষ্টিকণা নস্কর। আলোর কাজ করেন হর্ষ দাস। মিউজ়িক নিলয় দত্তর।

 

• সম্প্রতি বোধোদয় এবং
মিশন কালচারের সহযোগিতায় শৌনক মিউজ়িক্যাল ট্রুপ
হাওড়ার শরৎ সদনে আয়োজন করেছিল একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। এ দিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, নীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আশিস দাশগুপ্ত, নন্দিনী ভট্টাচার্য, অমিতেশ চন্দ, সচ্চিদানন্দ ঘোষ, সুদীপ বসু, তরুণ মণ্ডল, সুজিত দাস,
কাজরী সেন, ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল, দেবরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বনানী রুদ্র, মঞ্জুশ্রী বাজানী, মহুয়া দাস প্রমুখ। মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেছিলেন মলয় রায়। অনুষ্ঠানটির পরিচালনায় ছিলেন গোপাল দত্ত।

 

• সম্প্রতি ইইডিএফ তালতলা মাঠে সূর্য সেন মঞ্চে খানপুর সন্ধানী ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আয়োজন করেছিল একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাম ছিল ‘রবীন্দ্র সঙ্গীতের আসর’। দু’দিন ব্যাপী এই সঙ্গীতাসরে গান ছাড়াও পরিবেশন করা হয়েছিল নৃত্য, আবৃত্তি। অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন লোপামুদ্রা মুখোপাধ্যায়, পিয়ালি কর, সুপর্ণা মুখোপাধ্যায়, আকাশ সেন, মানসী ভট্টাচার্য, মধুশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, শুভেন্দু তালুকদার, অপর্ণা সেন প্রমুখ।