মাত্র সাতটি ছবি নিয়ে প্রদর্শনী, গ্যালারির ঘেরাটোপে নয়। তাজ বেঙ্গলের দ্য প্রোমেনড লাউঞ্জের চত্বরে। দর্শক ঘুরে, দাঁড়িয়ে, কফি খেতে খেতে আরামকেদারায় বসে প্রদর্শনী দেখবেন, কর্তৃপক্ষ এমন ভাবনাতেই শিল্পীদের এই লাউঞ্জ ব্যবহার করতে দেন। এই পাঁচতারা হোটেলের লাউঞ্জে প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে ধর্মভিত্তিক কাজ না থাকাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সম্প্রতি হয়ে চলা ‘রুদ্রাক্ষ’ নামের স্বল্প সময়ের প্রদর্শনীতে শিল্পী শঙ্করকুমার মিত্রর কাজগুলি কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে ধর্মকে কঠোর ভাবে প্রতিফলিত না করলেও ঈশ্বরভজনার কোনও একটি দিককেই নির্দিষ্ট করে। এখানে দেবদ্বিজে ভক্তি, সাধনার ছবি আঁকতে গিয়ে কোথাও ‘শৈব ভাবনা বা তন্ত্রসাধনা কেন্দ্রিক প্রধান কিছু আকর’ লক্ষ করা গেল না। কোনও ছবিতেই তার কোনও লেশ মাত্র নেই।

ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন শিল্পের ইতিহাসে চিত্র ভাস্কর্যে তৎকালীন শিল্পীরা ভক্তিবাদের পাশাপাশি কামনির্ভর শিল্পকলায় মিথুন মূর্তিচিত্রকে আশ্চর্য নিপুণতায় প্রকাশ করেছিলেন। ভোগবাদকে টপকে শেষে পৌঁছনোর ধারণা ভারতীয় ধর্মে সনাতন চৈতন্যে লালিত হয়েছে। ভক্তিবাদের পাশাপাশি কিছু কামনির্ভর চিত্রকলাতেও শঙ্কর তাঁর কম্পোজ়িশনের মধ্যে দেখিয়েছেন কিছু সৃষ্টিশীল সাধনার রূপকে। তেমন তিনটি কাজ এ প্রদর্শনীতে রাখা যায়নি কিছু শর্ত রক্ষা করতে গিয়ে। যদিও সেগুলো ফোল্ডারে মুদ্রিত রয়েছে।

অন্যান্য চিত্রগুলিতে পেন্টিংয়ের কিছু ত্রুটি লক্ষ করা গিয়েছে। ‘রুদ্রাক্ষ’ নামের এই প্রদর্শনীতে সব ছবিগুলির নরনারীর অবয়বে রুদ্রাক্ষের মালাকে তিনি নানা ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। আর এটা করতে গিয়েই কম্পোজ়িশনে কোনও ভাবেই তাকে যথাযথ স্থানে রাখেননি, স্টাইলাইজ়েশনে চমক আনতে গিয়ে রুদ্রাক্ষের ফাঁকগুলি যেমন মার খেয়েছে, তেমনই অকস্মাৎ হাজির ত্রিশূল, ডমরু, জবা, প্রদীপ, পত্রপুষ্প ইত্যাদি। কারণ অনুষঙ্গের ব্যবহার কম্পোজ়িশনকে তখনই সমৃদ্ধ করে, যখন তাদের অবস্থানগত সৌন্দর্য ও মানানসই ফর্ম গোটা পটের আবহকে বদলে দেয়। সে সবই এখানে অনুপস্থিত। সমগ্র অ্যারেঞ্জমেন্টে বেশ গোলমাল চোখে পড়েছে।

আহুতি, পূজারিনী, ভৈরবী, কুম্ভক, তাণ্ডব, বাসনা, মায়াবী সাধিকা ইত্যাদি নামের ভক্তরা এত কাঠিন্যের কথা মনে করাবে কেন? যতই ফ্ল্যাট রঙের সমাবেশ থাকুক শরীরময়, পেন্টিংয়ের কিছু শর্ত উপেক্ষা করে যত্রতত্র ভ্রান্তিময় ব্রাশিং ও প্রকট ভাবে চোখে লাগা রং ছবিগুলিকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। আসলে তিনি যে স্টাইলকে ছবিতে প্রাধান্য দিয়েছেন, তা সিনেমার আগেকার দিনের ব্যানার পেন্টিংয়ের চেয়েও নিঃসন্দেহে দুর্বল।

অ্যাক্রিলিকের সুন্দর ভাবকে কাজে লাগাতে গিয়ে সেই সঙ্গে রং নির্বাচনের ব্যবহারিক দিকটাকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে ছবিতে কোনও টোনই তৈরি হয়নি। শিল্পী চেষ্টাও করেননি প্রয়োজন অনুযায়ী আলো-আঁধারি ছায়াতপের টেকনিককে ব্যবহার করার। ড্রয়িংয়ের অনেক ভ্রান্তি চোখে লাগে, রুদ্রাক্ষ যেমন তার নিজস্বতাকে এখানে খর্ব করেছে, তেমনই বড্ড সমতলীয় প্যাটার্নে কোনও কোনও অবয়ব ভীষণ কাঠিন্য নিয়ে হাজির হয়েছে। পূজারিনীর মুখ পুরুষালী। তার অনাবৃত পৃষ্ঠদেশ নারীদেহের কমনীয়তাকে নষ্ট করেছে। অ্যানাটমির বোধ প্রখর না হলে শরীরী অবয়বে অনেক জায়গাকেই ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রে সামলানো মুশকিল হয়।

তাণ্ডবের হাতের আঙুল এত তীক্ষ্ণ? ইনি কি শিব? রুদ্র রূপই বা কোথায়? মাথার চুড়ো কিসের প্রতীক? সাদা মেশানো হলুদ পটভূমিকার এই শিব তাণ্ডবের চিরাচরিত রূপকে ব্যঙ্গ করছে। বাসনার মানব-মানবীর হাতে ধরা ধুনুচি ও হাতের ড্রয়িং খুবই দুর্বল। ধুনুচির ধোঁয়া শরীরের সাদায় মিলেমিশে একাকার। নাম ‘বাসনা’। কিসের বাসনা পরিষ্কার নয়। আসলে ধরে ধরে কাজ করতে গিয়ে পেন্টিং কোয়ালিটি ছবিতে প্রবেশ করতে বাধা পেয়েছে। অবয়বগুলিতে অদ্ভুত নীরবতা থাকলেও বড্ড নীরস। সামগ্রিক কাঠিন্য, দুর্বল ড্রয়িং আর অদ্ভুত সব রং ছবিগুলিকে পেন্টিং হতে দেয়নি। তাই ভিত্তিহীন এই ভক্তিবাদের ভুলভ্রান্তিগুলিই প্রকট হয়ে ওঠে।

অতনু বসু

 

সুপ্রয়াসে অভিব্যক্তির অভাব

সম্প্রতি মধুসূদন মঞ্চে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবেশিত হল কাবেরী পুইতুণ্ডি কর ও কৌশিকী আয়োজিত নৃত্যালেখ্য ‘ত্রয়ী’।

রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট তিনটি অবিস্মরণীয় নারী চরিত্র—মণিপুরের রাজদুহিতা চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালকন্যা প্রকৃতি এবং রাজনর্তকী শ্যামাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই নৃত্যালেখ্যটি। এতে নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অজস্র মনোভাব যেন বহুর মাঝে একক হয়ে ফুটে উঠেছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। কৌশিকীর পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন বিশেষ ভাবে সক্ষম কিশোরী নৃত্যশিল্পী অভিনন্দা বসু। অনুষ্ঠানের প্রথমেই বিশেষ ভাবে সক্ষম তিন কিশোর ও কিশোরীর নৃত্য ছিল মনোমুগ্ধকর। এই তিন নৃত্যশিল্পী কোরক বিশ্বাস, অনুরাগ ভৌমিক ও অভিনন্দা বসুর অসাধারণ নৃত্যপ্রতিভা তুলে ধরার কৌশিকী-প্রয়াস অবশ্যই প্রশংসনীয়।

‘ত্রয়ী’ নৃত্যালেখ্যর প্রথম উপস্থাপনা ছিল ‘চিত্রাঙ্গদা’। গল্পাংশটুকু অবিকৃত রেখেই এর বিশেষ বিশেষ অংশগুলি পরিবেশিত হয়। কুরূপা ও সুরূপা চিত্রাঙ্গদার ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট গৌড়ীয় নৃত্য বিশেষজ্ঞ কাবেরী পুইতুণ্ডি কর। গৌড়ীয় নৃত্যাঙ্গিকে তাঁর নৃত্য পরিবেশন উচ্ছ্বসিত প্রশংসার দাবি রাখে। অর্জুনের ভূমিকায় নিলয় মণ্ডলের নৃত্যাভিনয় উপভোগ্য। এর পর দ্বিতীয় উপস্থাপনা ‘চণ্ডালিকা’র অংশবিশেষ। প্রকৃতির ভূমিকায় নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন অনিন্দিতা চক্রবর্তী। তাঁর নৃত্যাভিনয় প্রশংসনীয়। প্রকৃতির মায়ের ভূমিকায় নীলাঞ্জনা অধিকারী ছিলেন যথাযথ।

শেষ পর্বের ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে নামভূমিকায়  ছিলেন শিল্পী রঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর হৃদয়স্পর্শী নৃত্য পরিবেশন দর্শকমনকে আপ্লুত করেছে। এ ছাড়া এই নৃত্যালেখ্যর বিভিন্ন ভূমিকায় ছিলেন কোটাল— নিলয় মণ্ডল, বজ্রসেন— মিঠুন রায়, মদন ও উত্তীয়— অনির্বাণ দেব এবং সখীকুল— মৌমিতা, রুষিতা, অনন্যা, কমলিকা, সেঁজুতি, দেবাঙ্কনা, সায়নী। যাঁদের প্রত্যেকেই প্রশংসার দাবিদার।

‘ত্রয়ী’ নৃত্যালেখ্যটির পরিকল্পনা ও নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন কাবেরী পুইতুণ্ডি কর। তাঁর নৃত্য-পরিকল্পনায় গৌড়ীয় নৃত্যের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ও সুদক্ষ ব্যবহার ছিল মনোমুগ্ধকর। নানা রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য থেকে সংকলিত  ও সংক্ষেপিত চিত্রনাট্য নির্মাণ ও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অভীক মল্লিক। দু’টি ক্ষেত্রেই তিনি প্রভূত প্রশংসার দাবিদার। নৃত্যালেখ্যর মূল পুরুষ চরিত্রগুলিতে কণ্ঠদানও করেন তিনি। যে কাজে তাঁর উৎকর্ষ অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। মূল মহিলা কণ্ঠে ছিলেন শ্রীধারা গুপ্ত মল্লিক। তাঁর পরিবেশিত সঙ্গীত ছিল অনবদ্য। অন্য যাঁরা সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা হলেন সুরঞ্জনা সেনগুপ্ত ও সুপ্রিয় মৈত্র। দু’জনেই ছিলেন যথাযথ।

যন্ত্রসঙ্গীতে সহযোগিতা করেন— কি-বোর্ডে সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তবলা ও মৃদঙ্গে বিপ্লব মণ্ডল। ভাষ্যপাঠে ছিলেন মধুমিতা বসু।

এমন মনোরম কোনও নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশনার আগে যদিও একটি কথা মনে রাখা জরুরি ছিল। তা হল, যে- কোনও রবীন্দ্রকবিতা, গান বা নাটকই মূলত ভাবপ্রধান। এ কারণে রবীন্দ্র-নৃত্যনাট্য পরিবেশনের সময়ে শিল্পীর মুখে যে অভিব্যক্তির প্রয়োজন হয়, তার অভাব পরবর্তী প্রযোজনাকে যেন সীমাবদ্ধ করে না তোলে। 

জয়শ্রী মুখোপাধ্যায়

 

অনুষ্ঠান

সম্প্রতি সোনারতরী কলাকেন্দ্র বিড়লা অ্যাকাডেমিতে আয়োজন করেছিল একটি অনুষ্ঠানের। ‘কবিপ্রণাম’ নামে অনুষ্ঠানটিতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জয়তী ভট্টাচার্য, অরূপ মজুমদার, কল্যাণী রায় সান্যাল, পম্পা শূর, ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল, প্রদীপ সিদ্ধা, মধুছন্দা ঘটক, সুতপা হালদার এবং অণিমা দাস। আবৃত্তি পরিবেশন করেন দেবাশিস মিত্র, দীপক মুখোপাধ্যায়, ঈশিতা দাস অধিকারী, মহুয়া দাস, মানসী চট্টোপাধ্যায়, তানিয়া মিত্র, গৌতম চৌধুরী, সুজাতা চৌধুরী, অরিন্দম রায়চৌধুরী, জিৎ দাশগুপ্ত, কাকলি চক্রবর্তী, শ্যামা ভট্টাচার্য এবং লোপামুদ্রা সরকার। এ ছাড়াও ছিলেন সপ্তর্ষি, মৌলিনাথ, জ্যোতিরাদিত্য, যুধাজিৎ। অনুষ্ঠানটি সংযোজনার দায়িত্বে ছিলেন নিমাই মণ্ডল এবং ল্যাঞ্জু রায়। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন দেবাশিস ভট্টাচার্য, তিলক রায়চৌধুরী এবং অলক রায়চৌধুরী।

 সম্প্রতি মঞ্জির ডান্স অ্যাকাডেমি মুক্তাঙ্গন রঙ্গালয়ে আয়োজন করেছিল ‘দ্য ভিশন অব ডান্স’ নামে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের। এ দিন উপস্থিত ছিলেন নিরঞ্জন প্রধান, জনার্দন ঘোষ, রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানটির নির্দেশনা ও কোরিয়োগ্রাফি করেছিলেন অর্পিতা রায়। ভারতনাট্যম পরিবেশন করেন লিসা চট্টোপাধ্যায়, শতরূপা গণ এবং মঞ্জির ডান্স অ্যাকাডেমির ছাত্র-ছাত্রীরা। গৌড়ীয় নৃত্য পরিবেশন করেন সুনিষ্ঠা মণ্ডল। কত্থক পরিবেশন করেছিলেন বিশাল দত্ত। কথাকলি পরিবেশন করেছিলেন অর্পিতা রায়।