পঞ্চাশ বছর আগের কথা। জীবনে প্রথম আমেরিকা সফর সেরে ফিরছেন এক নবীন লেখক। দমদম বিমানবন্দরে তাঁকে আনতে গিয়েছেন তাঁর মা এবং স্ত্রী। লটবহর নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসতেই জানালা গলে একটি মুখ। ‘আপনি এখানে!’ বিস্মিত লেখক। অতি অমায়িক ভঙ্গিতে সেই ব্যক্তি জবাব দিলেন, ‘‘তোমাকে ধরব বলেই এসেছি। যদি কিছু মাথায় আসে, মনে রেখো।’’

কে সেই লেখক, সে কথা পরে। আগে বলে নেওয়া দরকার, যিনি লেখক ‘ধরতে’ ভোরবেলা দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তিনি সাগরময় ঘোষ। ‘দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজে নিমগ্ন থেকে তিনি অর্জন করেছিলেন এক প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা। সম্পাদক হিসেবে তাঁর তুলনা তিনি-ই। এ নিয়ে আজও কোনও দ্বিমতের অবকাশ নেই।

নিছক সম্পাদনা নয়। সাগরময় ছিলেন জহুরি। আক্ষরিক অর্থেই লেখক চিনে নিতে পারতেন তিনি। তাঁর অনুসন্ধানী চোখ বাংলা সাহিত্যের সাগর ছেঁচে অনেক মণিমাণিক্য তুলে এনেছে। যার ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে ভাণ্ডার। এখানেই তিনি অনন্য।

‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে সাগরময়ের সংযোগের সূচনা ১৯৩৯-এ। স্বাধীনতা আন্দোলন করে জেলে গিয়েছিলেন। সেখানেই আলাপ আনন্দবাজার সংস্থার প্রাণপুরুষ অশোককুমার সরকারের সঙ্গে। তিনিও তখন একই কারণে জেলে বন্দি। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-ছায়ায় বেড়ে ওঠা সাগরময় জেলে গান শোনাতেন। গল্পে, আড্ডায় তাঁদের সখ্য জমে উঠল। ছাড়া পাওয়ার কিছু দিন পর অশোকবাবুর ডাকে ‘দেশ’ পত্রিকায় যোগ দিলেন সাগরময় ঘোষ। আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ-এর কার্যালয় তখন মেছুয়াবাজারের বর্মণ স্ট্রিটে।

কাগজে-কলমে সম্পাদক হয়েছেন অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে। সেই দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৯৭-এর অক্টোবর পর্যন্ত। তার পরেও আমৃত্যু অর্থাৎ ১৯৯৯-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘দেশ’-এর সাম্মানিক সম্পাদক।

কিন্তু এ সব হল দিন-তারিখের নিরস খতিয়ান মাত্র। ‘দেশ’-এ যোগ দিয়ে গোড়া থেকেই সম্পাদনার কাজে নিজেকে পুরোদস্তুর জড়িয়ে ফেলেছিলেন সাগরময়। নিজে বড় একটা লিখতেন না। বরং লেখক সত্তাকে নির্বাসনেই পাঠিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। বেছে নিয়েছিলেন আড়ালে থেকে অন্যের লেখার গুণমান বিচার, নবীন লেখকদের খুঁজে নেওয়া এবং দক্ষতা অনুযায়ী প্রবীণ ও নবীন সকলের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠটি আদায় করার কাজ। এ ব্যাপারে অননুকরণীয় ক্ষমতা ছিল তাঁর অনায়াস করায়ত্ত।

তিনি যখন ‘দেশ’-এ আসেন তখনও রবীন্দ্রনাথ জীবিত। সেই সময় এক দিকে বিমল মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রবোধ সান্যাল, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলি, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ পরিচিত লেখক। অন্য দিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমরেশ বসু, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়,  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, জয় গোস্বামীর মতো বহু লেখক-কবিকে ‘দেশ’-এর পাতায় পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করানো। দু’টিই সমান নিষ্ঠা এবং ঐকান্তিকতায় সম্পন্ন করেছেন সম্পাদক সাগরময়।

‘দেশ’ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যায় (১৯৮৩) ‘দেশ: অতীত ও বর্তমান’ শীর্ষক নিবন্ধে অশোককুমার সরকার লিখেছেন, ‘‘আমি দীর্ঘকাল দেশ-এর সম্পাদক ছিলাম। কিন্তু উপন্যাস, গল্প নির্বাচনের ব্যাপারে সমস্ত দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সাগরময় ঘোষের উপর।’’

সম্পাদক সাগরময় সম্পর্কে ওই নিবন্ধেই অশোকবাবুর পর্যবেক্ষণ:  ‘‘সাহিত্যধর্মী সাপ্তাহিকের সম্পাদককে সব কিছু দেখেশুনে ছাপাতে হবে... কোনটা পর্নোগ্রাফি আর কোনটা সাহিত্য এটাই বিচার করে নিতে হবে সম্পাদককে। সে দিক থেকে দেশ সম্পাদক সাগরময় যথেষ্ট দক্ষতা এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।’’

বয়স ও অভিজ্ঞতায় সাগরময় ঘোষ যত ঋদ্ধ হয়েছেন, ততই সমৃদ্ধ হয়েছে ‘দেশ’। এক কথায় বলতে গেলে, দীর্ঘ সময় জুড়ে ‘দেশ’ এবং সাগরময় ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। হয়তো বা একাঙ্গী। পত্রিকাটির সঙ্গেই তাই উচ্চারিত হয়েছে তাঁর নাম। তাঁর প্রয়াণের ১৮ বছর পরেও যা অচ্ছেদ্য।

‘‘সম্পাদক হতে গেলে যা যা গুণ দরকার, তার সবই সাগরদার ছিল। কিন্তু কখনও নিজেকে তিনি জাহির করতেন না।’’— স্মৃতিচারণে আবেগাপ্লুত হলেন শংকর। ১৯৬৭ সালে আমেরিকা ফেরত সে দিনের ওই তরুণ লেখককে স্বাগত জানাতেই দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছে গিয়েছিলেন সাগরময়। যার ফলিত রূপ
‘দেশ’-এ প্রকাশিত ‘এপার বাংলা, ওপার বাংলা’।

সম্পাদক সাগরময় সম্পর্কে একই রকম পর্যবেক্ষণ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী থেকে  ‘দেশ’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক হর্ষ দত্ত... সবার। শীর্ষেন্দু যে প্রজন্মের, জয় এবং হর্ষ তার অনেক পরের। কিন্তু লেখা ও চাকরির সূত্রে সাগরময় ঘোষকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা তিন জনেই। তাঁদের মূল্যায়নের অভিন্নতা প্রমাণ করে, সাগর ছিলেন একই রকম প্রবহমান।

 জন্ম ১৯১২ সালে, অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুরে। ছয় ভাই ও এক বোন। সাগরময় দ্বিতীয়। বাবা কালীমোহন ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। যাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে শ্রীনিকেতন।

কালীমোহনের পরিবার যখন শান্তিনিকেতনে চলে আসে, সাগরের তখন নিতান্ত শৈশব। শিক্ষার শুরু সেখানেই পরিপূর্ণ রবীন্দ্র-আবহে। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অগ্রজ শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।  সাগরময়ও সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তবে লেখক সত্তার মতো গায়ক সত্তাকেও তিনি সামনে আনতে চাননি। তাই ঘনিষ্ঠ-বৃত্তের বাইরে তাঁর গান শোনার সুযোগ বড় একটা কারও ছিল না।

আপাত ভাবে মানুষটি ছিলেন বেশ রাশভারী। তিনি নিজে না ডাকলে সম্পাদকীয় দফতরে তাঁর ঘরে ঢুকে কথা বলার ‘সাহস’ অনুজ লেখকদের হত না। কবি জয় গোস্বামীর কথায়, ‘‘এটা ভয় বা ত্রাস নয়। সম্ভ্রম। সেটা সাগরদার ব্যক্তিত্বের জন্য।’’

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মনে আছে, ‘দেশ’-এ লেখা প্রকাশিত হতে থাকার পরেও দীর্ঘকাল সাগরবাবুর সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা বলার সুযোগ ঘটেনি। ভরসাও পাননি গিয়ে আলাপ করার। মাঝে মাঝে এসে বিমল করের কাছে লেখা জমা করে যান স্কুলশিক্ষক শীর্ষেন্দু ও তা ছাপা হয়। সাগরময়কে সেই সময় দূর থেকে দেখতেন তিনি। সব সময় পড়ছেন। হয় কোনও পত্র-পত্রিকা, নয় তো কোনও পাণ্ডুলিপি। পরে বুঝেছিলেন, ওটাই ছিল আসলে তাঁর লেখক-আবিষ্কারের প্রাথমিক প্রক্রিয়া।

দু’জনের সামনাসামনি কথা হয় একটি বিশেষ কারণে। হঠাৎ কিছু টাকার দরকার হয়েছিল শীর্ষেন্দুর। ‘দেশ’-এ লেখার টাকা আসবে সময় মতো। কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রয়োজনটা আরও বড়। তাই যদি একটু আগে টাকা পাওয়া যায়, সেই অনুরোধ নিয়ে দেখা করলেন বিমল করের সঙ্গে। বিমলবাবু তাঁকে নিয়ে গেলেন সাগরময়ের কাছে। নাম বলতেই সাগরময় বললেন, ‘‘চিনি। লেখা পড়েছি। এখানে আসতেও দেখি। কী প্রয়োজন এখন?’’ উদ্দেশ্য জানাতেই তৎক্ষণাৎ সিদ্ধি! সাগরবাবু নিজে অ্যাকাউন্টসে ফোন করে টাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন।

ব্যস। ব্যক্তিত্বের দরজায় আবার খিল। বড়জোর দূর থেকে একটু মুচকি হাসি। শীর্ষেন্দু বলেন, ‘‘এমনকী আমার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ বেরোনোর পরেও একটি শব্দ নেই! ভাল-মন্দ কিছুই নয়। ‘দেশ’ জুড়ে এক অখণ্ড নীরবতা। গল্প দিয়ে যেতাম। আগের মতোই ছাপা হত। কিন্তু খুব চাপে কাটছিল। কিছুই বুঝতে পারছি না! প্রায় মাস চারেক পার। একদিন লেখা জমা দিতে গিয়ে শুনলাম, সাগরদা দেখা করতে বলেছেন। গেলাম। এত দিন পরে বললেন, ‘ঘুণপোকা’ ভাল হয়েছে।’’
এ বার ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে বললেন সাগরময়।

সেখানেও আর এক কাহিনি। ‘দেশ’-এ ধারাবাহিক লেখার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ‘পারাপার’ লেখার সময় পরপর দু’ সপ্তাহ লেখা দিলেন না শীর্ষেন্দু। ক্ষমাহীন অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে তৃতীয় সপ্তাহে যখন গেলেন, তখন ধরেই নিয়েছেন দেশ-এ লেখার সাধ এখানেই শেষ!

শীর্ষেন্দু বলেন, ‘‘প্রথমে জ্যোতিষ দাশগুপ্তের কাছে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, ‘দুটো ইনস্টলমেন্ট বাদ! সাগরবাবু খুব রেগে আছেন। উনি যা বলার বলবেন।’ দুরু দুরু বক্ষে সাগরদার ঘরে ঢুকলাম। আমাকে দেখেই বকুনি। ‘নতুন লিখছ, আর পরপর দু’ সপ্তাহ লেখাই দিলে না! কী ভেবেছ? এ রকম ভাবে ধারাবাহিক লেখা যাবে?’ উত্তর ছিল না আমার। সাগরদা এ বার বললেন, আর এ রকম কোরো না। ইনস্টলমেন্ট দিয়ে যাও। এ বার থেকে আর যেন বাদ না পড়ে।’’

পরবর্তী কালে আনন্দবাজার পত্রিকা এবং দেশ-এ চাকরি করার সুবাদে সাগরময় ঘোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক ভাবেই আরও বাড়ে শীর্ষেন্দুর। তবে গোড়ার সেই সব দিনের কথা তাঁর স্মৃতিতে বাঁধানো। এক নতুন লেখকের উৎসাহ এবং স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার মতো মহৎ হৃদয় যে-সম্পাদকের, শীর্ষেন্দু আজও তাঁকে প্রণাম করেন।

অনুরূপ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারী আর এক লেখক শংকর। হাইকোর্ট পাড়ার বিবিধ ছবি গেঁথে তিনি যখন কয়েকটি লেখা তৈরি করেছিলেন, কোথায় কবে ও কেন সেগুলি ছাপা হবে, সে ধারণাই তাঁর ছিল না। ১৯৫৪-র কথা। ঘটনাচক্রে গৌরকিশোর ঘোষের মাধ্যমে তিনি একদিন পৌঁছন সাগরময়ের কাছে।

শংকর বলেন, ‘‘গৌরবাবু ওঁকে আমার লেখাগুলির কথা বলতেই উনি বললেন, ‘যা আছে দিয়ে যান। তবে মাস দুয়েকের আগে কিছু আশা করবেন না।’ তখন পর্যন্ত দু’-তিনটি লিখেছিলাম। দিয়ে এলাম। দু’ মাস অপেক্ষার পরেও লেখা বেরোল না। এ বার একদিন বর্মণ স্ট্রিটের অফিসে গেলাম সাগরময় ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে। ভাবলাম, ওঁরা না ছাপলে ফেরত নিয়ে আসব। ঢুকতেই সাগরদা বললেন, ‘এত দিনে এলেন! লেখার সঙ্গে ঠিকানাটাও দেননি! কেমন লোক আপনি?’ তাঁর নির্দেশে পরপর বাকি লেখাগুলিও দিলাম। সব ক’টি ছাপলেন সাগরদা। সেগুলি নিয়েই পরে বেরোল
আমার প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। সাগরদা না থাকলে এটা হত না।’’

জয় গোস্বামী বলেছেন, ‘‘কোনও লেখকের ভিতরে যা সুপ্ত, তাকে বের করে আনতে পারতেন সাগরদা।’’ কেমন সেই অভিজ্ঞতা? জয় মনে করতেন, তিনি কবিতায় কথা বলতে স্বচ্ছন্দ। গদ্য লিখতে ভারি অনীহা ছিল তাঁর। সাগরময় জোর করে তাঁকে দিয়ে প্রথম গদ্য লেখান ১৯৮৮ সালে। দেশ-এ বেরোয় ‘নিজের জীবন, বীজের জীবন।’ শারদীয় দেশ-এ জয় লিখেছেন ‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ’। এ ছাড়াও দশটি সংখ্যায় লিখেছেন ‘মনোরমের উপন্যাস’।

আবার উল্টোটাও আছে জয়ের ঝুলিতে। তখন তিনি দেশ-এ কর্মরত। মূল দায়িত্ব নতুন কবিদের লেখা খুঁজে নেওয়া। তাঁর মনে পড়ে, সাগরবাবু একদিন তাঁকে ডেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বনগাঁর বাড়ি এবং গ্রাম ঘুরে এসে ফিচার লিখতে বলেন। কিন্তু ঘুরে এলেও কিছুতেই লেখা আসছে না তাঁর। জয় বলেন, ‘‘বেশ কয়েক দিন পরে সাগরদা জানতে চাইলেন এখনও লিখিনি কেন। বললাম, কবিতার লাইন মাথায় ঘুরছে। কিছুতেই গদ্য লিখতে পারছি না। কবিতা লিখে নিই। তার পরে ওটা লিখব। সাগরদা কিন্তু একটুও রাগ করলেন না। বরং আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে গদ্য লিখতে হবে না। যা দেখে এসেছ, সেটা নিয়েই কবিতা লেখো।’ লেখা হল দীর্ঘ কবিতা— ‘এখানে তোমার মাটি, দেশ।’ আমাকে গদ্য লেখার জন্য যিনি পাগল করে দিতেন, তাঁর কাছে কবি হিসেবে এমন প্রশ্রয় ভুলব কী করে!’’ শুধু তা-ই নয়, কবিতা লেখার জন্য সাগরময় ছুটিও দিতেন জয়কে। বলতেন, ‘অনেক দিন কিছু লিখছ না। কয়েক দিন ছুটি নাও। কয়েকটি কবিতা লিখে নিয়ে আসবে।’ ‘‘ঠিক যেন শিক্ষক, হোমটাস্ক দিচ্ছেন!’’ মন্তব্য জয়ের।

সাগরময়ের উত্তরসূরি হিসেবে ‘দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন হর্ষ দত্ত। তারও আগে অনেকগুলি বছর এই পত্রিকায় সাগরবাবুর কাছে কাজ করেছেন। তাঁর কথায়,‘‘সব সময় শিখেছি। দেখেছি, সম্পাদনার ক্ষেত্রে আত্মপরিচয়, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ সব কেমন করে বিসর্জন দিতে হয়। সাগরদা যে শুধু লেখক আবিষ্কার করতেন, তা-ই নয়। অন্য কোথাও কারও ভাল লেখা পড়লে তাঁকে ডেকে বলতেন, ‘এত সুন্দর লেখাটি দেশ-এ দিলে না!’ আসলে দেশ-ই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-প্রেম। যাঁর যা শ্রেষ্ঠ, তা প্রকাশের জায়গা ‘দেশ’। এমনই অবস্থানে এই পত্রিকাকে পৌঁছে দিয়েছেন সাগরদা। লেখা কথা বলবে, লেখক নয়। সম্পাদক সাগরময়ের দর্শন ছিল এটাই। তাঁর আহ্বান উপেক্ষা করা লেখকদের পক্ষেও কঠিন ছিল।’’

সত্যিই কত ‘কঠিন’ ছিল, তার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত  হয়ে রয়েছে  শারদীয় দেশ-এ সুবোধ ঘোষের লেখা সংগ্রহের কথা। সুবোধবাবু সে বার লিখতে চাইছেন না। সাগরবাবুও নাছোড়বান্দা। অথচ হাতে একদম সময় নেই। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রেসের সঙ্গে বন্দোবস্ত করা আছে, যাতে সুবোধবাবুর লেখা এলেই সঙ্গে সঙ্গে কম্পোজ ধরানো যায়। কিন্তু লেখা কোথায়!

প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে ঠিক হল, সুবোধবাবু রাত জেগে লিখবেন। সাগরময় শেষরাতে তাঁর বাড়ি যাবেন লেখা আনতে। সেই মতো রাত আড়াইটে নাগাদ সুবোধবাবুর বাড়ির সামনে পৌঁছে তিনি দেখলেন সব নিঃঝুম। কোনও ঘরেই আলোর চিহ্নমাত্র নেই। দু’-চার বার ডাকাডাকির পরে সুবোধবাবু নেমে এলেন। তবে পরিস্থিতি একই। সবিনয় লিখতে না পারার কথা জানালেন তিনি।

সাগরবাবুর তখন বিধ্বস্ত অবস্থা। ভোরের প্রথম ট্রাম ধরে তখনই অফিসে এলেন তিনি। উদ্দেশ্য, সুবোধবাবুর জন্য ধরে রাখা পাতাগুলিতে অন্য লেখা ছাপানোর ব্যবস্থা করা।

কিন্তু কী আশ্চর্য! দেশ-এর দফতরে আলো জ্বলছে। আর ভিতরে বসে একমনে খসখস করে লিখে চলেছেন স্বয়ং সুবোধ ঘোষ!

হ্যাঁ, সাগরময়কে ফিরিয়ে দেওয়ার পরেই মন বদলে গিয়েছিল সুবোধবাবুর। ট্যাক্সি নিয়ে দফতরে পৌঁছে গিয়েছিলেন তৎক্ষণাৎ। আর দুপুর পর্যন্ত একটানা নব্বই পাতা লিখে শেষ করেছিলেন তাঁর সে বারের বড় গল্প। হর্ষ ঠিকই বলেছেন। সাগরবাবুকে এড়ানো এতটাই কঠিন ছিল যে-কোনও লেখকের পক্ষে!

লেখকের স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ করতে চাইতেন না সাগরময়। যদি কোথাও কিছু পরিবর্তনযোগ্য বলে মনে হত, তা-ও সেই লেখককে দিয়ে করিয়ে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। শংকরের অভিজ্ঞতা তেমনই।

তখন তিনি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এক নামী সংস্থায় বড় পদে চাকরি করেন। দেশ-এ একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। তাতে কোনও এক বিশেষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সম্পর্কে ‘পেটমোটা’ বিশেষণ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। একদিন সকাল ন’টায় অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখেন লিফ্‌টের কাছে সাগরময় ঘোষ দাঁড়িয়ে। তাঁকে ওই ভাবে দেখে ঘোর বিস্ময় শংকরের। সাগরবাবু বললেন, ‘‘তোমাকে ধরব বলেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার লেখায় দু’ জায়গায় ‘পেটমোটা’ শব্দটা আছে। ওটা না থাকাই ভাল। বদলে দাও।’’ কুণ্ঠিত শংকর বলেন, ‘‘সাগরদা, এটুকুর জন্য আপনি এভাবে এলেন! অন্য কোনও শব্দ নিজে বসিয়ে দিলেই পারতেন।’’ সাগরময় তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, কী লিখবেন, সেটা লেখকের স্বাধীনতা। তাঁকে না জানিয়ে একটি শব্দও পরিবর্তন করা ঠিক নয়।

একবার দেশ-এ ‘বইমেলা বিশেষ সংখ্যা’র জন্য বিভিন্ন জনের পছন্দের বই বা লেখককে নিয়ে কয়েকটি লেখা তৈরি হল। জয় গোস্বামী লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে। সাগরবাবুর সেটা খুব মনঃপূত হয়নি। জয়কে ডেকে তিনি তা জানিয়েওছিলেন। কিন্তু লেখাটি ছাপা হয়। পরে একদিন জয়কে বললেন, ‘‘শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে তোমার লেখাটি খুব ভাল হয়েছিল। আমি এ ভাবে ভাবিনি। খুব উপকার হয়েছে আমার।’’

সর্বদা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে বাস করলেও সভা-সমিতি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেন সাগরময়। বাইরের জগতের থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চাইতেন সব সময়। নিজের সম্পর্কেও এক অদ্ভুত মূল্যায়ন ছিল তাঁর। অনুজ লেখকদের কাউকে বলেছেন, ‘‘আমি তো স্টেজের মালিক। শুধু স্টেজ ভাড়া দিই। নাচবে তুমি। ভুগলে তুমি ভুগবে।’’

 নিজেকে সব রকম ভাবে আড়ালে রেখে সারা জীবন অন্য স্রষ্টাদের এগিয়ে দেওয়ার এই নির্মোহ মন একজন সম্পাদককে কতটা শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, সময় তার সাক্ষী।

গল্পে, গানে, মুড়ি-বাদাম-তেলেভাজায় নিজস্ব আড্ডা অবশ্যই ছিল। তবে তার পরিসরও ব্যাপক নয়। পছন্দের অল্প লোকজন, সাহিত্যজগতের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনেদের নিয়ে সপ্তাহান্তে চৌরঙ্গির একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় পান-ভোজনের আড্ডাতেও থাকত অন্য রকম আকর্ষণ। দানা বাঁধত বিচিত্র ভাবনা। যেমন একবার সেখানে প্রেমেন্দ্র মিত্র দাবি করলেন, তিনি বিলেত যাননি ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি অলিগলির নিখুঁত বর্ণনা লিখে দিতে পারবেন। পাঠক বুঝতেই পারবেন না। সাগরময় ধরে বসলেন, লিখতে হবে। টেবিলে বসেই প্রেমেনবাবু লেখার শিরোনামও ঠিক করে ফেললেন, ‘বিলেত না গিয়ে সাহেব!’ পরিহাস হল, সাগরবাবুর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও লেখাটি আলোর মুখ দেখেনি!

অফিসে রাশভারী, আড্ডায় মজলিসি সাগরময় পরিবারে কিন্তু একেবারে সদাশিব গৃহকর্তা। সাংসারিক খুঁটিনাটিতে মাথা গলাতেন না কখনও। নাতনিদের জন্মের পরে পারিবারিক বিনোদনের বেশিটাই ছিল তাদের নিয়ে। জীবনযাপনও ছিল একেবারে ঘড়ি ধরে। পুত্রবধূ মৈত্রেয়ী বলেন, ‘‘বাবা এতটাই নিয়মে চলতেন যে, ‘দশটায় খাব’ বললে এক মিনিটও নড়চড় হত না।’’  ইলিশ, চিংড়ি, পারশে সব ভালবাসতেন। রবিবার হলেই পাঁঠার মাংস রাঁধতে হত ‘বৌমা’কে। কিন্তু পাতে সব কিছুই অল্প পরিমাণ। শত অনুরোধেও টলতেন না। 

খেলাপাগল ছিলেন খুব। ইস্টবেঙ্গলের গোঁড়া সমর্থক। যৌবনে শান্তিনিকেতন থেকে বন্ধুরা সাইকেল চালিয়ে কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে এসেছেন। ফুটবল, ক্রিকেট যা-ই হোক, বসে পড়তেন টিভির সামনে। বিদেশে খেলা হলে রাত জেগে বা ভোরে উঠে টিভি খুলতে ভুল হত না। আগে থেকে বসার চেয়ার ঠিকঠাক করে, টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে সব প্রস্তুত করে রাখতে হত। যাতে দেরি হয়ে না যায়! পুত্রবধূ বলেন, ‘‘মৃত্যুর ঠিক আগেও টিভি-তে খেলা দেখছিলেন। ইডেনে ক্রিকেট চলছিল সে দিন। দেখতে দেখতেই অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়েন।’’ জীবনের খেলা সাঙ্গ হয় তাঁর।