সাইগলকে কষে এক চড় মেরে বসলেন পঙ্কজ মল্লিক!

স্টুডিয়ো ভর্তি লোক। সবাই স্তম্ভিত। মুহূর্তে থম-মারা নীরবতা।

প্রত্যেকে ধরে নিলেন, অপমানিত কুন্দন লাল সাইগলের স্টুডিয়ো ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াটা এ বার শুধু সময়ের অপেক্ষা।

কিন্তু পরের কয়েক মুহূর্তে এ কী দেখলেন তাঁরা!

নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় ‘মাই সিস্টার’ ছবির কাজ চলছে। ‘অ্যা-এ কাতিবে তাখদির মুঝে ইতনা বাতা দে’ গানটির রেকর্ড করতে গিয়ে কিছুতেই সুর লাগাতে পারছেন না সায়গল। কথাও ভুলে যাচ্ছেন।

সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ মল্লিক সমেত ঘরসুদ্ধ সকলেই তত ক্ষণে বুঝে গেছেন চূড়ান্ত মদ্যপানের জেরেই সায়গলের এই বিপত্তি।

ওঁর তখন বদ্ধমূল ধারণা, মদ না খেলে বুঝি গান গাইতে পারবেন না! সে দিনও তাই নেশায় চুড়।

পঙ্কজকুমার বহু ভাবে চেষ্টা করছিলেন। টুকরো টুকরো করে ভেঙে ভেঙেও রেকর্ড করতে চাইছিলেন। তাতেও সামাল দিতে না পেরে এক সময় মেজাজ হারালেন। সায়গলকে সজোরে চড় মেরে দিলেন।

আর তাতেই সম্বিৎ ফিরল সায়গলের! অল্পক্ষণ থমকে ছিলেন। তার পরই বন্ধু পঙ্কজকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কান্না।

এর পরই ‘টেক’। এবং এক বারেই নির্ভুল রেকর্ডিং। সে-গান যে কতটা দরদ-ঢালা, গানপাগল কারওই আজ অজানা নয়।

আগের ঘটনাও কম চমকপ্রদ নয়।

গানের সুর করার সময় পঙ্কজকুমার প্রথমে ভেবেছিলেন নিজেই গাইবেন। পরে তাঁর সায়গলের কথা মনে হয়।

প্রযোজক তো রাজি। কিন্তু সে-সময় সাইগলের যা নামডাক, তাঁকে নিতে বিস্তর খরচ। অত টাকা কী করে দেওয়া সম্ভব!

নিউ থিয়েটার্সের আর্থিক অবস্থা তখন মোটেই ভাল নয়। উপরন্তু আজ বাদে কাল রেকর্ডিং। সায়গলের ব্যস্ত শিডিউলও তো কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অথচ বন্ধু পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে তাঁর এতটাই হৃদ্যতা যে, সমস্ত কাজ বাতিল করে এক ডাকে প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে গাইতে কলকাতায় চলে এসেছিলেন কুন্দন লাল সায়গল।

 

*

সাইগল-পঙ্কজকুমারের বন্ধুতায় ঘটনার অন্ত নেই। রেমিংটন কোম্পানির চাকুরে পঞ্জাবি যুবক কুন্দন লাল যখন অফিসে ছুটি নিয়ে শুধু গানের নেশায় কলকাতায় চলে আসেন, ওঁদের সম্পর্ক সেই তখন থেকেই।

সায়গল সোজা চলে গিয়েছিলেন রেডিয়ো স্টেশনে। ঘটনাচক্রে সেখানেই প্রথম আলাপ তাঁর পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে। তখনও বাংলা জানতেন না সায়গল। হিন্দি-উর্দুতে গান গাইতে পারেন। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন মজুমদারের নির্দেশে তাঁর অডিশন নেন পঙ্কজ মল্লিক। ওঁর গলা শুনে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েন তিনি যে পাশের ঘর থেকে তক্ষুনি ডেকে নেন নৃপেনবাবু আর রাইচাঁদ বড়ালকে।

সে দিনই রেডিয়োর লাইভ-অনুষ্ঠানে  মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় সায়গলকে।

আকাশবাণী-তে সায়গলের গানের সম্প্রচার সেই প্রথম বার। পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে সম্পর্কেরও তখন শুরু।

এর পর তো সায়গলের জীবনের বহু সফল গানের সঙ্গে জড়িয়ে পঙ্কজ কুমার মল্লিক। এমনকী তাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ানোর পিছনেও ছিলেন তিনি।

সায়গলকে প্রথম রবীন্দ্র-গান শেখান ‘প্রথম যুগের উদয় দিগঙ্গনে’। এর পর আরও।

শুরুর দিকে গায়ক বাধ্য ছাত্রের মতো চোখ বুজে হুবহু নকল করে যেতেন তাঁর বন্ধু-শিক্ষককে।

সায়গল তখন এতটাই রবীন্দ্রসঙ্গীতে আচ্ছন্ন যে, এক-এক দিন পঙ্কজকুমারকে বাইকে বসিয়ে মধ্য কলকাতায় উড়ান দিতেন কবির গান গাইতে গাইতে।

তাতে এক দিন এমনও হয়েছে, মাঝপথে বাইক থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন পিছনে বসা ‘শিক্ষক’। গানের নেশায় মগ্ন ‘ছাত্র’র হুঁশ হয়নি প্রথমে। টের পেয়েছেন বহু দূর গিয়ে।

 

*

‘জীবন মরণ’ ছবির সময় সায়গলকে দিয়ে দু’টি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াবেন ঠিক করলেন।— ‘আমি তোমায় যত’ আর ‘তোমার বীণায় গান ছিল’।

কবির অনুমতি আগেই নেওয়া ছিল। কিন্তু অবাঙালি সায়গলের গলায় দুটি গান এক বার অন্তত কবিকে না শুনিয়ে যেন স্বস্তি ছিল না ওঁর। কুন্দন লালের গান শুনে প্রাণ ভ’রে আশীর্বাদ করলেন রবীন্দ্রনাথ। 

কবির শেষ জীবনে পঙ্কজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অসম্ভব নৈকট্যের। এক বার তাঁর গান শুনে রবিঠাকুর বলেন, ‘‘আমার বাকি লেখা যেগুলি রইল, যার আমি সুর করে উঠতে পারলুম না, তুমি তার সুর দিয়ো।’’

কিন্তু একেবারে গোড়ার পর্বে?

সে-কাহিনিতে যাওয়ার আগে কিঞ্চিৎ মুখড়া লাগে।

 

*

ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে বঙ্গবাসী কলেজে ঢুকলেন পঙ্কজ। পাশাপাশি গানের চর্চাও চলছে। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের ইস্কুলে।

এক রবিবারের দুপুরে দুর্গাবাবুর বাড়িতে গিয়ে একলা বসে ছিলেন তক্তপোশে। গুরুমশাই বাড়ি নেই। চোখে পড়ল বিছানায় রাখা রবীন্দ্রনাথের কবিতা সঙ্কলন ‘চয়নিকা’। পাতা উল্টোতে উল্টোতে চোখ আটকে গেল ‘চির আমি’ কবিতায়।— ‘‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,/ আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,/ ...তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে…।’’

শব্দের বাণ যেন শেল হয়ে বিঁধল বুকে! বেশ খানিকক্ষণ অসাড় শরীর নিয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকার পর গুনগুন করে কবিতাটিতে সুর বসাতে লাগলেন।

হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন, বেশ লাগছে! উত্তেজনায় ছিটকে বেরিয়ে পড়লেন দুর্গাবাবুর মদন বড়াল লেনের বাড়ি ছেড়ে।

পাশেই গণেশ পার্ক। নিঝুম দুপুর। গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে বাকি অংশেরও সুর দিয়ে ফেলেলেন।

এর পর আর তর সইছে না।

যন্ত্রে ফেলে সুরের শরীর তাঁকে দেখতেই হবে। এবং এখনই।

একটু দূরে ফকির দে লেনে সখের নাট্যদল ‘আনন্দ পরিষদ’-এর ঘর। তাঁর কর্তা লক্ষ্মীনারায়ণ মিত্র। পঙ্কজের লক্ষ্মীদা। লক্ষ্মীদার অর্গান আছে।

ছুটলেন সেখানে। গুটিকয় লোক বসে। তাঁদের পাশ কাটিয়ে সোজা বসে গেলেন অর্গানে। রিড-এ হাত বুলিয়ে সুর গড়তে গড়তে কেমন যেন দাউ দাউ দাবানল লেগে গেল অন্তরাত্মায়!

হঠাৎ পিছন থেকে কার গলা! চমকে তাকিয়ে দেখেন, লক্ষ্মীদা।—

‘‘সুরটা মোটামুটি ঠিকই হচ্ছিল, দু-একটা জায়গা বাদ দিয়ে।’’

পঙ্কজ শুনে অবাক। মানে কী? এ সুর তো তাঁরই দেওয়া, তার ভুল-ঠিক লক্ষ্মীদা বুঝবেন কী করে?

এর ঠিক পরে লক্ষ্মীদার কথাতেই বুঝলেন, তিনি যে সুরের কথা বলছেন সেটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। তার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেছে এই সুর! এই অত্যাশ্চর্য সমাপতন পঙ্কজের নাভিমূল থেকে কাঁপন ধরিয়ে দিল!

কলেজে পড়তে পড়তে আর একটি কবিতা পেলেন— ‘শেষ খেয়া’।— ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া/ ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ…।’’

সুর বসিয়ে ফেললেন তাতেও। যত্রতত্র সেই গান গেয়েও বেড়াতে লাগলেন। এক বারের জন্যও ভাবেননি এ জন্য অন্তত কবির অনুমতি নিতে লাগে।

গোল বাধল তাতেই।

বাড়িতে লোক পাঠিয়ে  জোড়াসাঁকোয় ডেকে পাঠালেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ।

 

*

ঠাকুরবাড়িতে পা রাখতেই মোটা মোচওয়ালা এক দারোয়ান দোতলার হলঘরের পথ দেখিয়ে দিল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন সৌম্য সুদর্শন কবিপুত্রকে।

‘‘আপনি নাকি বাবামশায়ের কী একটা ছায়া ছায়া গান গেয়ে থাকেন?’’

শুনে গলা শুকিয়ে গেল পঙ্কজের। বললেন, ‘‘ঠিক বুঝলাম না!’’

সেই মুহূর্তে ঘরে এলেন সৌমেন্দ্রনাথের বোন রমা। রথীন্দ্রনাথ তাঁকে ঘটনাটি বলতেই রমা বললেন, ‘‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া… ওটা কিন্তু আবার কবিতা। গান নয়।’’ পঙ্কজ তত ক্ষণে আন্দাজ করেছেন অন্যায় হয়ে গেছে। থতমত খেয়ে রেহাই পেতে মিথ্যে বলে দিলেন, ‘‘ওটা রবিঠাকুরেরই সুর। স্বরলিপি পেয়েছি এক বন্ধুর কাছে। সে আবার এখন কাশীতে।’’

‘‘আশ্চর্য! বন্ধু ফেরত এলে স্বরলিপির বইটা এনে দেখাবেন?’’

আশ্বাস দিয়ে সে দিন রেহাই পেলেন বটে, কিন্তু এক মাসের মধ্যে জোড়াসাঁকো থেকে রবিপুত্রের কড়া চিঠি। দিনক্ষণ জানিয়ে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং দেখা করতে চান।

এক দিকে উত্তেজনা, তাঁর ঈশ্বরদর্শন হবে বলে! অন্য দিকে শঙ্কা! না জানি কী হয়! মনকে বোঝালেন, ‘‘প্রহার করলেও আমি তা আমার অঙ্গের ভূষণ করে নিয়ে ফিরে আসব। তবে আসার আগে কেবল তাঁর কমল চরণে দুটি চোখের অশ্রুতে সিক্ত করে সব অপরাধ স্বীকার করে নেব।’’

 

*

জোড়াসাঁকো। কবির ঘর।

রথীন্দ্রনাথ গম্ভীর মুখে বসে। পঙ্কজ আসা মাত্র কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে তিনিই এনেছেন এই ঘরে। তাঁর হাবেভাবেই পরিষ্কার গানটির সুরকার কে, তাঁরা বিলক্ষণ জেনে গিয়েছেন।

ঘরের এক পাশে একটা নিচু সুদৃশ্য তক্তপোশ। তার ওপরেই বসে কবি। লিখছেন। মাঝে মাঝে কী যেন আওড়াচ্ছেন! তাঁর সামনে রাখা বই, কাগজপত্র। কালি, কলম, নানা রঙের পেন্সিল। অন্য পাশে বিশাল হ্যামিল্টন-অর্গান। ঘরে উপস্থিত জনা আটেক। সবাই পরিবারেরই মনে হয়।

রথীন্দ্রনাথ চোখের ইশারায় অর্গানটি দেখিয়ে দিয়ে গান গাইতে বললেন। ভয়ে পঙ্কজের শরীর তখন ঘামে ভিজে উঠছে।

কাঁপা কাঁপা হাত অর্গানে রেখে শুকনো গলায় গান ধরলেন, ‘‘… ও পারেতে সোনার কূলে আঁধারমূলে কোন মায়া/ গেয়ে গেল কাজ-ভাঙানো গান... দিনের শেষে…’’

গান শেষ হলে দেখলেন ঘরের প্রায় সকলেই পা টিপে টিপে বেরিয়ে যাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ শুধু স্থাণু পাথর। চোখ অর্ধনিমীলিত। আত্মসমাহিত!

পঙ্কজ আর দাঁড়লেন না। কোনও ক্রমে রথীন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন ঠাকুরবাড়ি ছেড়ে।

বহু বহু পরে যখন ‘মুক্তি’ ছায়াছবিতে এই একই গান ব্যবহার করার অনুমতি চাইতে গিয়েছিলেন পঙ্কজ, সে আরেক পর্ব!

তার মাঝে কত স্রোত বয়ে গেছে। কত বাঁক পেরিয়ে! কত যে গ্লানি, দুঃখ মুখ বুজে মেনে নিতে হয়েছে!

 

*

তিরিশের দশক।

সিনেমার তখনও নির্বাক যুগ। ভারতবিখ্যাত ইম্প্রেসারিও হরেন ঘোষ সেই প্রথম বায়োস্কোপে মিউজিক করার জন্য ডেকে পাঠালেন পঙ্কজ মল্লিককে। তখন তিনি বেতারের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। সুরকার।

কিন্তু ছবিতে কী করে সুর করা হবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন পঙ্কজ আর তাঁর সঙ্গী রাইচাঁদ বড়াল।

তবু বহু ভাবাভাবির পর ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্র্যাফট’ কোম্পানির সাইলেন্ট মুভি ‘চোরকাঁটা’য় আবহ করে ফেললেন।

পরে আবার একটি। ‘চাষার মেয়ে’। দুক্ষেত্রেই তাঁর আশ্রয় হল রবীন্দ্রগান নির্ভর সুর। দু’টি ছবির মুক্তির পরই সবাক ছবির যুগ।

তত দিনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম-ক্র্যাফট’ নাম বদলে হয়ে গিয়েছে ‘নিউ থিয়েটার্স লিমিটেড’। ওদের প্রথম সবাক ছবি ‘দেনাপাওনা’। কাহিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরিচালক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। পঙ্কজের বুড়োদা। ক্যামেরাম্যান নীতিন বসু। সর্বজনীন পুতুলদা। ছবি মুক্তি পেল। কিন্তু, এ কী! ক্রেডিট টাইটেলে সহকর্মী রাইচাঁদের নাম বড় বড় অক্ষরে। পঙ্কজের নাম ছোট ছোট করে।

বিস্ময়! অপমান! দুঃখ! ক্ষোভ!

ভেবেছিলেন প্রতিবাদ করবেন। পরে মনে হল, কোনও লাভ নেই। বরং ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু কেন?

‘‘এক দিকে রাইবাবু ছিলেন সেই সময়কার বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ লালচাঁদ বড়ালের পুত্র। তাঁরা ছিলেন বউবাজারের এক বিখ্যাত ধনী পরিবার এবং তাঁদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যও ছিল প্রসিদ্ধ। অন্য দিকে পঙ্কজবাবু জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত সঙ্গীত বর্জিত পরিবারে, যা আবার ঘটনাচক্রে দৈন্যদশায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল সেই সময়ে। এই অসমান সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রাইবাবুর নাম-ই যে প্রাধান্য পাবে তাতে তো আর আশ্চর্যের ছিল না,’’ পঙ্কজ মল্লিক নিয়ে লিখতে বসে এমনই অনুমান করেছেন তাঁর দৌহিত্র রাজীব গুপ্তর।

এ ছাড়াও কারণ ছিল। বাড়িতে চল্লিশ জনের বেশি লোকের ভার তখন একা পঙ্কজের কাঁধে। বেতার থেকে আয় আর কতটুকুই’বা। তা’ও সেটা চাকরিও নয়। তাই মুখ বুজে টিকে থাকাটাই শ্রেয় মনে করেছিলেন পঙ্কজ মল্লিক। ফলে বছরের পর বছর একই কাণ্ড ঘটতে লাগল।

প্রমথেশ বড়ুয়া নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেওয়ার পর চাকা ঘুরল। পঙ্কজের প্রতি বৈষম্য, অবিচার তাঁর চোখে পড়তেই তিনি কথা বললেন কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে।

এখানেও দৌহিত্র রাজীবের ব্যাখ্যা, ‘‘প্রমথেশ বড়ুয়া ছিলেন অসমের গৌরীপুরের জমিদারের ছেলে। ফলে ওঁর কথা চট করে কেউ অমান্য করতে পারতেন না।’’

কয়েক বছর বাদে প্রথমেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছায়াছবির মুক্তি।

সেই ‘মুক্তি’র পর আলাদা-আলাদা অফিস বাংলো হয়ে যায় পঙ্কজ মল্লিক ও রাইচাঁদ বড়ালের। তার সঙ্গে নতুন স্টুডিয়ো ফ্লোর।

তারও আগে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়লেন পঙ্কজকুমার মল্লিক।

 

*

নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়ো-য় তখন ‘ভাগ্যচক্র’ ছবির কাজ চলছে। পরিচালক নীতিন বসু, সকলের সেই পুতুলদা। পুতুলদা থাকতেন উত্তর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে। পাশের পাড়া চালতাবাগানে পঙ্কজ।

প্রতিদিন স্টুডিয়ো যাবার পথে পঙ্কজকে বাড়ি থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতেন তাঁর পুতুলদা।

এমনই এক দিন পুতুলদা গাড়ি নিয়ে এসে নীচ থেকে ডেকেই চলেছেন। পঙ্কজ আর নামেন না। তিনি তখন পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা ‘পেগান লভ সং’-এ গলা মেলাচ্ছেন। রামোন নাভারোর বিখ্যাত গান— ‘হোয়্যার দ্য গোল্ডেন সানবিমস/ অ্যান্ড দ্য লেজি ল্যান্ড ড্রিমস...’। ‘দ্য পেগান’ ছায়াছবির।

বহুক্ষণ বাদে যখন পঙ্কজের বাবা এসে ডাকলেন তাঁকে, টনক নড়ল। হুড়মুড়িয়ে নীচে নেমে গাড়িতে বসলেন।

পুতুলদা গম্ভীর। কোনও কথা নেই মুখে। নির্ঘাৎ দেরি করার জন্য রাগ করেছেন।

চৌরঙ্গীতে মেট্রো সিনেমার কাছে ট্র্যাফিক সিগনালে গাড়ি থামতেই আচমকা নেমে গেলেন পুতুলদা। চালক ওঁর ভাই মুকুল বসু। তাঁকে শুধু বলে গেলেন, মিউজিয়ামের সামনে যেন গাড়িটা ‘পার্ক’ করা হয়।

পুতুলদা ফিরলেন বেশ কয়েকটা ইংরেজি বই আর একটা রেকর্ড নিয়ে।

স্টুডিয়োয় ঢুকেও কোনও কথা না বলে হন হন করে হাঁটা দিলেন পুতুলদা। পঙ্কজ-মুকুল পিছু নিলেন।

ঘরে ঢুকেই সামনে রাখা গ্রামাফোনে সদ্য কিনে আনা রেকর্ডটা বসিয়ে দিলেন পুতুলদা। ‘পেগান লভ সং’! গান শুরু হতেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘‘পঙ্কজ, শিগগির। গলা মেলা। ঠিক যেমন বাড়িতে মেলাচ্ছিলি। ক্যুইক, ক্যুইক।’’

কিছু না বুঝে যন্ত্রের মতো আদেশ পালন করতে লাগলেন পঙ্কজ মল্লিক। আর গান গাইতে গাইতে অবাক হয়ে দেখলেন, পুতুলদা এ দিক ও দিক থেকে তাঁকে দেখে চলেছেন।

গানের শেষে যা ঘটল তাতে পঙ্কজ ভাবলেন, পুতুলদা নির্ঘাৎ পাগল হয়ে গিয়েছেন। হঠাৎ পঙ্কজকে জড়িয়ে ধরে নাচতে শুরু করে দিলেন।— ‘‘পেয়েছি রে পেয়েছি পঙ্কজ। পেয়েছি।’’

কী পেয়েছেন পুতুলদা?

‘‘কী শুভক্ষণেই না তুই তোর বাড়িতে রেকর্ডের গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলি।’’

পঙ্কজ ধীরে ধীরে বুঝলেন পুতুলদা ‘প্লেব্যাক’-এর পদ্ধতিটা আবিষ্কার করে বসে আছেন! সেই প্রথম ‘প্লেব্যাক’ হল ভারতীয় সিনেমায়।

 

*

‘‘জীবনের মায়া একজন প্রকৃত শিল্পীকে কোনও ভাবে বশীভূত করে ফেলতে পারে না, কারণ সে শিল্পী সারাক্ষণ তার শিল্পের মাধ্যমে মুক্তির খোঁজ করতে থাকে। কে তার আপন, আর কে তার পর বুঝে উঠতে পারে না, সে যেন সারাক্ষণ কারও কোনও ডাকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে…,’’ একটি ছবির কাহিনি শোনাচ্ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া।

কাহিনির অলিতে গলিতে হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন ঘোর লাগছিল পঙ্কজের! শুনতে শুনতেই গান এসে পড়ছিল ঠোঁটে।

‘শেষ খেয়া’র সেই গানটিও যে চলে এল কোনও এক ফাঁকে— ‘ঘরেও নহে, পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে…’।

কিন্তু এ বার কবির অনুমতি চাই।

 

*

কবি তখন প্রশান্ত মহলানবীশের বাড়ি ‘আম্রপালী’-তে  (আজ যেখানে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’)। গেলেন সেখানে।

কাহিনি, দৃশ্যর বর্ণনা শুনে কবি বললেন, ‘‘পঙ্কজ, আমি দেখছি তোমাদের ছবির শুরুতেই দ্বার মুক্ত। তোমাদের কাহিনির মূল চরিত্রটি যেন কীসের থেকে মুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে।’’

এ কথা পরে শুনে লাফিয়ে উঠেছিলেন প্রমথেশ, ‘‘আরে পঙ্কজ, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে আমার ছবির নাম বেরিয়ে এসেছে! তোমায় যে কী বলে ধন্যবাদ দেব! বুঝতে পারছ তো কী নাম? মুক্তি! মুক্তি! যাক, বলো আর কী কী বললেন উনি।’’

‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’র কথা উঠতেই মৃদু হাসি কবির।—‘‘গানটি তো আমায় না শুনিয়েই পালিয়ে গিয়েছিলে। অমন সুন্দর গলা তোমার! সে দিন পালালে কেন?’’

আনত চোখে লাজুক মুখে বসে কবির কথা শুনছিলেন পঙ্কজ।

আরও কিছু আলাপের শেষে কবি হঠাৎ বললেন, ‘‘একটু বদল করলে ভাল হত। ‘ফুলের বার নাইকো যার ফসল যার ফলল না’র বদলে ‘ফুলের বাহার নাইকো যাহার ফসল যাহার ফলল না’…লিখে নাও তো তুমি...।’’

 

*

‘মুক্তি’-তে জোর করে পঙ্কজ মল্লিককে দিয়ে অভিনয়ও করালেন প্রমথেশ। কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না! প্রমথেশ নাছোড়। শেষে তাঁর জেদের কাছে হার মানতেই হল।

এর পর আরও আরও অনেক ছবিতে অভিনয় করলেন তিনি। হিন্দি, বাংলা দুই-ই। একে বারে স্বেচ্ছাবসর নেওয়া অবধি।

পুরোপুরি অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পরও ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন এক প্রযোজক। আর রাজি করানো যায়নি।

সুরের নেশা তখন ওঁকে আরওই যেন পাগল করে দিয়েছে। সেই নেশার জালে একে একে ধরা দিয়ে চলেছেন কাননদেবী, গীতা দত্ত, শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় … কে নন!

পঙ্কজ-সুরের মোহ এমনই যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটতে লাগল সিনেমা হলেও। ‘যাত্রিক’-এ যেমন। তীর্থস্থানকেন্দ্রিক ছবি। ভক্তিরসের গান। লোকমুখে গল্প শুনে দর্শক ভাবরসে ডুবে থাকত ছবি দেখার আগে থেকেই। জুতো খুলে হলে ঢুকতেন তাঁরা।

এক দিকে এই ভাববিহ্বলতা। অন্য দিকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব এফেক্টসের ছোঁওয়া!

‘ডাক্তার’ ছবিতে গীতিকার অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গান ‘ওরে চঞ্চল’। তারই হিন্দি রূপান্তর ‘চলে পবন কী চাল’। শুট্যিং হচ্ছিল ডায়মন্ডহারবারে। রাস্তায়। ঘোড়ায় গাড়ি চালিয়ে। এ দিকে সিনেমায় ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ আনার মতো আধুনিক যন্ত্র তখন কই! নারকোলের খোল বাজিয়ে হুবহু সেই আওয়াজ আনলেন সাউন্ডট্র্যাকে।

পঙ্কজ মল্লিকের নামে তখন ভূ-ভারত নড়েচড়ে বসে!

বারবার ডাক আসতে লাগল বম্বে থেকে। তিনি কিছুতেই যাবেন না। এক বার তো রাজকপূর নিজে এসে বললেন, ‘‘চাচা, আপনার টেবিলে আমি ব্ল্যাঙ্কচেক রেখে যাচ্ছি, যা মনে আসবে ভরে নেবেন। আমার ছবিতে কিন্তু আপনাকে চাই।’’ তাও না।

জার্মান পরিচালক পল জিলস্ ডাকলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ নিয়ে হিন্দিতে ‘জলজলা’ বানাবেন। বম্বেতে। দেব আনন্দ, গীতা বালি অভিনয় করছেন। গান গাইবেন গীতা দত্ত। সঙ্গীত পরিচালনা করে দিতে হবে। তাতেও এক কথা, ‘‘না।’’

জিলস্ অবশ্য হার মানলেন না। গীতাকে নিয়ে সোজা কলকাতায় চলে এলেন। সেবক বৈদ্য স্ট্রিটের নিজের বাড়িতে গীতা দত্তকে নিয়ে মহলা দিয়ে পঙ্কজ মল্লিক গান রেকর্ড করালেন নিউ থিয়েটার্সে।

কিন্তু বম্বে গেলেন না।

এ দিকে তখন দলে দলে শিল্পীরা বাংলা ছাড়ছেন। নিউ থিয়েটার্স-এর সরকার সাহেবও বললেন, ‘‘সবাই তো চলে যাচ্ছে। আপনিও যান। এত টাকা দেবার ক্ষমতা যে আমার নেই! সুযোগ হারাবেন কেন?’’

পঙ্কজ বললেন, ‘‘আপনি আমার অসময়ে পাশে থেকেছেন, আজ এই দুঃসময়ে আপনাকে ছেড়ে চলে যাব!’’

সরকারসাহেবের এর পর আর কী করার থাকে, চোখের জলে ভেসে যাওয়াটুকু ছাড়া!

কিছু পরে বি এন সরকার নিজেই বন্ধ করে দিলেন নিউ থিয়েটার্স। তখনও তাঁর পুরনো ঘরকে ভুলতে পারেননি পঙ্কজ মল্লিক। বাংলা ছাড়লেন না কিছুতেই। কোম্পানি বন্ধ হওয়ার বছর দুয়েক আগে যুক্ত হয়ে ছিলেন ‘লোকরঞ্জন শাখা’য়। মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের ডাকে। তাও সে গ্রামে গ্রামে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে বিনোদনের কাজে যোগ দিতে। রঙিন জীবন থেকে দূরে। বহু দূরে। দেশজ টানে তিনি যে বরাবর আত্মহারা!

আর ছিল রেডিয়ো। আকাশবাণী। তার সম্পর্ক কি এক-আধ দিনের! সেই ’২৭ সাল থেকে।

আকাশবাণী তখন টেম্পল চেম্বার্স-এর বাড়িতে। স্টেশন ডিরেক্টর স্টেপলটন সাহেব। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন মজুমদার। ডাক্তার রামস্বামী আয়েঙ্গারের পালকি গাড়ি করে গিয়ে সেই যে সে-বাড়ির মায়ায় জড়িয়ে ছিলেন, যত দিন গেছে তাতে আরওই মজেছেন। প্রাণভোমরার মতো আগলে বে়ড়িয়েছেন বেতারকে।

গান, নাটক, কথিকা, গল্পদাদুর আসর…। অনেক ভালবাসায় মুড়ে চালু হওয়া ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।

সেই ভালবাসার গর্ভগৃহেই  যে এক দিন চূড়ান্ত অপমানিত হতে হবে, কোনও কালে ভাবেননি। অথচ তাই-ই হল। তা’ও জীবনের একেবারে উপান্তে। 

উপর্যুপরি দু-দুটো ঘটনা ঘটল।

দীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা তাঁর স্বপ্নের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ হঠাৎ এক বার বন্ধ করে নতুন আকার দিয়ে সম্প্রচার করা হল। এমনটা যে হবে, ঘুণাক্ষরে আগে থেকে জানতেন না তিনি। শ্রোতার প্রবল দাবিতে যদিও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আবার ফিরল।

কিন্তু ক্ষত তো রয়ে গেল পাঁজরে!

তার আগে ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’! বহু দশক ধরে রেডিয়োর যে অনুষ্ঠানে প্রাণ ভ’রে গান শেখাতেন তিনি। তার পরিণাম?

আত্মজীবনী-তে পঙ্কজ মল্লিক লিখছেন, ‘‘আসরে শেষ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছিলাম ‘তোমার শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে’। … তখন কি জানতাম এই গানই আমার আসরের শেষ গান হয়ে দাঁড়াবে! … মীরাবাঈ ভজন শেখাতে আরম্ভ করেছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ এক দিন আমার বাসভবনের ঠিকানায় এল এক চিঠি, পত্রলেখক কলকাতা বেতার কেন্দ্রের তদানীন্তন স্টেশন ডিরেক্টর। … অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হল। এক বোবা যন্ত্রণা আমাকে নির্বাক করে দিয়েছিল।… যে মীরাবাঈ ভজনটি শেখাতে আরম্ভ করেছিলাম সেটিকে, বলা বাহুল্য, শেষ হতে দেওয়া হল না।’’

প্রান্তবেলায় সন্তান হারানোর মতো এ শোক ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল গানসাধক প্রবীণ মানুষটিকে।

এও কি তাঁর পাওনা ছিল!