Tour diary of Goa - Anandabazar
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অল্পস্বল্প গোয়ার গল্প

সমুদ্র, পাহাড় আর জঙ্গল— এক ঢিলে তিন পাখি। গোয়া ঘুরে এসে লিখছেন মহুয়া গিরি

spot
পালোলেম সৈকত

Advertisement

বড্ড অস্বস্তিতে পড়েছিলাম

আর ঘণ্টা দুয়েক পরই গোয়ার দেবলিম এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতার ফ্লাইট। আমার হোটেল থেকে এয়ারপোর্ট যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘণ্টা। মালপত্র বেঁধে আমি তৈরি। অথচ ড্রাইভারের পাত্তা নেই। অচেনা শহরে অজানা সংস্থা থেকে গাড়ি ভাড়া করার জন্য নিজেকেই দুষছি তখন। এমন সময়ে দেবদূতের মতো হাজির হয়ে হোটেলের এক কর্মী জানালেন, গাড়ি এসে গিয়েছে। গজগজ করতে করতে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। এয়ারপোর্ট পৌঁছনোর পুরো রাস্তাটাই ড্রাইভারকে কী ভাবে আরও দায়িত্ববান হতে হয়, তা নিয়ে জ্ঞান দিতে দিতে এগোলাম। চালকের মন যদিও স্টিয়ারিংয়ে আটকে। হুঁ-হাঁ করেই কাজ সারছিলেন তিনি। তা, শেষ পর্যন্ত সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছতে পেরে খুশি হয়ে চালককে অতিরিক্ত একশো টাকা দিতে গিয়েই বিপত্তি বাধল। চোস্ত ইংরেজিতে তিনি বলে উঠলেন, ‘‘সরি ম্যাডাম। আসলে ড্রাইভারের সকাল থেকে জ্বর। তাই আমিই চলে এলাম। গাড়ির ব্যবসাটা আমারই। তবে দেখাশোনার লোক আছে। বাকি সময়টায় স্থানীয় একটা স্কুলে ইংরেজি পড়াই।’’ এ দিকে লেট লতিফ বাঙালি আমি, ইংরেজির মাস্টারমশাইকে দায়িত্ববোধের পাঠ পড়িয়ে তখন লজ্জায় লাল!

ব্যাসিলিকা অব বম জেসাস

 

জলের বোতলে পেট্রোল!

অন্য গোয়া দেখব বলে বর্ষায় বেরিয়ে পড়লাম। হাতে সময় তিন দিন। বেড়ানোর জায়গা অনেক। এয়ারপোর্টে নামা ইস্তক বৃষ্টি শুরু হল। এই ঝমঝমিয়ে এক পশলা, তো পরমুহূর্তেই খটখটে রোদ। সঙ্গে ছাতা রাখতেই হয়। প্রথম দিনের গন্তব্য ছিল উত্তর গোয়া। বাগা, কালাংগোট, ক্যান্ডোলিম সৈকত ছাড়িয়ে আরও উত্তরে এগোচ্ছি। হাতে গুগল ম্যাপ আর সঙ্গী বলতে স্কুটি। মাঝরাস্তায় খেয়াল হল, পেট্রোল প্রায় শেষ। গোয়ায় দু’হাত অন্তর গাড়ি ভাড়ার দোকান রয়েছে। দিন প্রতি ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা খরচ করলেই দু’চাকা থেকে চার চাকা আপনার হাতের মুঠোয়। তবে দুটো পেট্রোল পাম্পের দূরত্ব বেশ অনেকটাই। কী করি? মুশকিল আসান করতে এগিয়ে এলেন রাস্তার ধারের ডাবওয়ালা। ডাবের কাঁদির পাশেই সাজানো এক লিটারের জলের বোতল। শুধু তাতে জলের বদলে রয়েছে পেট্রোল! দাম দশ-কুড়ি টাকা বেশি। পান, বিড়ি, সিগারেটের মতোই গোয়ার রাস্তায় রাস্তায় খোলা বাজারে ওভাবেই বিক্রি হয় পেট্রোল।

ফোর্ট আগুয়াডা

সে দিন যখন ছাপোরা পৌঁছলাম, সূর্যদেবতা তখন দিনের শেষ পর্বে। ‘দিল চাহতা হ্যায়’ সিনেমাখ্যাত ছাপোরা আসলে সমুদ্রের গা বেয়ে-ওঠা খাড়া টিলার মাথায় ১৫১০ সালে তৈরি একটা প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। যেখানে ওঠার জন্য আক্ষরিক অর্থে কোনও রাস্তা নেই। খুব সাবধানে পাথরের ফাঁকে পা রেখে উঠতে হয়। ক্ষয়ে যাওয়া প্রাচীন দুর্গের উপর থেকে আরব সাগরের মন কেমন করা অপরূপ বিস্তার চোখ মেলে দেখতে হয়। ছাপোরার তিন দিকেই সমুদ্র। সে দিন আরব সাগরের বুকে বৃষ্টির ধেয়ে আসা দেখতে দেখতে কখন যে ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছি, খেয়াল নেই। আসলে ঠিক সময়ে ছাতাটা বের করতেই ভুলে গিয়েছিলাম!

 

গা-ছমছম সে এক শহরে

পর্তুগিজদের রাজধানী, ভাস্কো ডা গামা’র শহর দেখব বলে বেরিয়েছি। দ্বিতীয় দিনের গন্তব্য ভেলহা গোয়া। পর্তুগিজ শব্দ ‘ভেলহা’র অর্থ প্রাচীন। রাজধানী পানজিম থেকে ভেলহা গোয়া মাত্র দশ কিলোমিটারের পথ। ঠিক করলাম, তার আগে পানজিমে আমার গোয়ানিজ বন্ধু দমিনিকের বাড়িতে দুপুরের ভোজটা সেরে নেব। যথাসময়ে খাওয়ার টেব্‌লে চলে এল দমিনিকের মায়ের হাতে রান্না করা মশলাদার মাছের ঝোল আর সাদা ভাত। সঙ্গে সুজি মাখানো পমফ্রেট মাছ ভাজা। আরও একটা পদ ছিল। ঝিনুক আর ছোট চিংড়ির ঝুরো ঝুরো তরকারি। ঝিনুকের খোলে পরিবেশন করা হল। বাঙালির মতোই গোয়ার মানুষও মাছে-ভাতে বাঁচে।

সন্ধের বালুকাবেলায়

দমিনিকের মায়ের কাছে শুনলাম, পঞ্চদশ শতকে বিজাপুরের সুলতানরা এই ভেলহা গোয়ার পত্তন করেন। ১৮ শতক পর্যন্ত তা পর্তুগিজদের রাজধানী ছিল। তার পরই মড়ক লাগল শহরে। এক ভয়ঙ্কর মহামারীতে মৃত্যুপুরী হয়ে উঠল দু’লক্ষ মানুষের প্রাচীন শহরটা। ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইটের শিরোপা পাওয়া ভেলহা গোয়ার গা ঘেঁষেই রয়েছে পর্তুগিজ আমলের বহু প্রাচীন গির্জা আর স্থাপত্য নিদর্শন।

 

ফিরে আসব বলে

নির্জন সমুদ্রের সান্নিধ্য চাইলে দক্ষিণ গোয়া যেতেই হবে। আমার তৃতীয় দিনের গন্তব্য পালোলেম সৈকত। পানজিম থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ। যখন পালোলেমে পৌঁছলাম, তখন সন্ধে প্রায় সাড়ে ছ’টা। গোয়ায় সন্ধে নামে সাতটারও পরে। সাদা বালি, নীলচে-সবুজ জল আর নারকেল গাছের সারিতে সাজানো পালোলেম বিদেশি পর্যটকদের ভীষণ প্রিয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির ভরা মরসুমে এখানে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের বন্দোবস্ত থাকে। স্রেফ শুয়ে-বসে দিন কাটানোর জন্যেও পালোলেম চমৎকার। তবে যেটা না দেখলেই নয়, তা হল পালোলেমে সূর্যাস্ত। সৈকতের পশ্চিমে জলের ভিতর থেকে জেগে উঠেছে জোড়া পাহাড়। মাঝখানে রুপোলি সুতোর মতো জলের রেখা। আর রোজ ঠিক ওই ফাঁক গলেই টুপ করে জলের মধ্যে ডুব দেয় গনগনে লাল সূর্য। তার পরও বেশ কিছুক্ষণ আকাশে, সমুদ্রের জলে লেগে থাকে দিন শেষের লাল-গোলাপি আভা। সেই আলোর টানেই পতঙ্গের মতো বারবার ছুটে যাই সাদা বালির সৈকতে।

আর প্রতিজ্ঞা রেখে আসি, আগামী বছর আবার ফিরে আসব বলে।

 

কখন যাবেন -

ভরা মরসুম— অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি


কী ভাবে যাবেন -

বিমানে দেবলিম এয়ারপোর্ট অথবা মুম্বই থেকে ট্রেনে বা গাড়িতে চেপেও যেতে পারেন

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন
বিশেষ বিভাগ