রাতভর ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম আসে না। দুঃস্বপ্ন আসে। রোজই তো পড়ি কাগজে, ট্রেন বেলাইন, লুঠ ছিনতাই— আরও কত! ঠিক তেমনই ভয় চেপে ধরে। তার পরে রাত ফুরিয়ে ভোর হয়। ট্রেন মাঠ পেরোয়, ঘাট পেরোয়, নদী... ব্রিজ। দূর থেকে উঁকি মারে পাহাড়। কে যেন বলে দেয়— ‘ওই... ওই যে স্লিপিং বুদ্ধা।’ অমনি ছুট ট্রেনের দরজায়।

এনজেপি ছাড়াতে না ছাড়াতেই জানালা জুড়ে সবুজ মায়া এসে দাঁড়ায়। তেমনি করেই এসে পড়ে নিউ মাল স্টেশন। গাড়ি বলা ছিল। বড় গাড়ির পিছনের সিট নানা নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে ভরা, গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে তরিতরকারি— কী নেই! জানা গেল, আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেখানে সবই অমিল। অগত্যা শহর থেকেই বয়ে নিয়ে যেতে হয় এ সব। গাড়ি ছোটে।

নাম না জানা রাস্তা। আস্তে আস্তে ক্যানভাসে ঢুকে পড়ছে পাহাড়, জংলা নদী, রোদ-লাগা গাছ। কোন দিকে তাকাই! কোন দিক ছাড়ি। পথে পড়ে থাকে অচেনা গুমটি, হাসিমুখ লাল-নীল ছেলেমেয়ে। গাড়ি পৌঁছয় ঝান্ডি।

চারপাশে রংবেরঙের মরসুমি ফুল, যে দিকে তাকাবে পাহাড় আর সবুজ। ঢুকতে না ঢুকতে আলতো শীতের চাদর গা জড়িয়ে নিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সমবায়ে গড়ে তোলা ইকো-হাট। এ কুটির সে কুটির নয়। মোবাইল টাওয়ারের আওতা থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকা স্বপ্ন-গ্রাম। যেখানে প্রতি ভোরে ঘুম ভাঙাবে সোনা মাখা কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়ো। ছোট্ট টিলার উপরে খুলে গেল একরত্তি কাচের ঘর। আপাতত দিন দুয়েকের ঠিকানা এটাই।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের ঘরে ঘড়ির কাঁটা। খাওয়া সেরে কাঁধে ক্যামেরা চড়িয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। সূর্য ততক্ষণে কড়কড়ে চোখ মুছতে শুরু করেছে ঘুম-রুমালে। আশপাশে ঘুরি। গাছের ছায়া পড়া জঙ্গলের হাঁটা পথ। কারা যেন আগুন জ্বেলেছিল কাল রাতে। তার চিহ্ন লেগে থাকে। শুকনো পাতা পায়ে দলে যাই।

সামসিংয়ের চা বাগান

পাহাড়ের দিকে তাকাই। তার লালে আবছা জেগে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। কাল ভোর হবে— ‘‘প্রতিদিন সূর্য ওঠে তোমায় দেখবে বলে।’’ সূর্য নিভে যায়। দূরে বিন্দু বিন্দু তারার মতো জেগে থাকে কোনও এক শহর। ভাঙা ইটের পথ ধরে নেমে যাই নীচে। ক্যাম্পফায়ারের আগুনে সেঁকতে থাকে বারবিকিউ। স্থানীয় মদ ছাংয়ের গন্ধ ওঠে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় রাত নামে।

পরদিন এসে দাঁড়াই ঘরের সামনের ভিউ পয়েন্টে। কোথায় স্বর্ণচূড়া? মেঘের আস্তরণে ঢেকে যে কাঞ্চনজঙ্ঘা! মন খারাপ নিয়ে ফিরে যাই ঘরে। ঘণ্টা দুই পরে আবার চেষ্টা। তখন রোদ উঁকি মারছে ঘরের সামনের গাঁদা ফুলের সারিতে। সামনে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারি না—  সোনার পাহাড়! তার সামনে কিছুক্ষণ নিরুপায়।

ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ি নতুন দিনের খোঁজে। গাড়ি রওনা দেয় ছাঙ্গে ফলসের উদ্দেশে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে সোনা রোদ, নীল আকাশ, পাইনের সারি। রাস্তায় পড়ল নিসর্গে মোড়া ছোট্ট গ্রাম কোলাখাম। সেখানে মিনিট দশেক কাটিয়েই ফের ছুটল গাড়ি। সরু পাথুরে রাস্তা গাছের ছায়ায় ঢেকে। আরও কিছু দূর যেতে ক্ষীণ জলের শব্দ আসে। পায়ে পায়ে এগোই। গায়ে সোনারোদ। অনেক চড়াই-উতরাই, নামা ওঠা। ক্রমশ গাঢ় হয় জলের আছড়ে পড়ার শব্দ। চারপাশে সবুজ পাহাড় ঘেরা, মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ছাঙ্গে ফলস। মুখে জলের কুচি এসে বিঁধছে। চারপাশে সবুজ। ফিরতে চাই না— ‘‘পথশ্রমে বড় ক্লান্তি।’’ ভেজা মুখে ফিরে এসে বসি গাড়িতে। এ বার গন্তব্য লাভা মনাস্ট্রি।

মনাস্ট্রি আমায় বরাবরই কেমন টানে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি এসে ঢেকে দেয় চারপাশ। মনাস্ট্রির সিংহদুয়ার পেরোতেই দেখি গাছে গাছে পাখিদের মেলা। সে সব কি আগে দেখেছি কখনও! পাখিপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে ভাল আর কি বা হতে পারে। এখান থেকে যাওয়া যেতে পারে রিশপও। হাতে সময় কম, তাই পরের বারের জন্য তোলা রইল তা। রোদ পড়ে এসেছে ততক্ষণে। ঘুরে বেড়াই আশপাশে। উপাসনাগৃহ, প্রার্থনালয় সব ছাপিয়ে মন যেন পড়ে থাকে ওই সবুজমাখা পাহাড়েই। মরসুমি ফুলের মেলা আলো হয়ে থাকে। সময় পেরিয়ে যায়। ফেরার পথে সূর্য ডুবতে দেখি। ঠান্ডা চেপে ধরে। আকাশের কোণে উঁকি মারে একথালা চাঁদ। পূর্ণিমা বোধহয়!

পরের দিন ভোর হতেই ছুটে যাই ফের। সেই সোনার পাহাড়। রোদ পড়ে চিকচিকিয়ে উঠছে বরফের পুরু চাদর। মনে হয়, হাতে নিয়ে দেখি সেই অপূর্ব চিকন-সোনা। আশপাশে পাখিদের ডাকাডাকি। ঘুরে দেখি ইকো-হাটের চারপাশ। অজস্র পাখিদের ভূস্বর্গ ঝান্ডি। আচ্ছা, শহরের পাততাড়ি গুটিয়ে এখানে চলে এলে কেমন হয়?

ঘড়িতে দুপুর। আজ ঝান্ডি ছাড়ার দিন। লোটাকম্বল গুটিয়ে উঠে বসি গাড়িতে। ঝান্ডি শেষ হলেও ঘোরা কিন্তু শেষ নয়। ‘‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়’’— শুরু হয় পাহাড়ি পথ। ওঠা-নামা আশ্চর্য পাকদণ্ডি। পড়ে থাকে নদী। অচেনা বুদ্ধ মনাস্ট্রি। সদ্য বিয়ে হওয়া নেপালি বউ, স্কুল ফিরতি হাসিমুখগুলো, পাহাড়ি ফুল, ব্রিজ আর মন খারাপ। হাওয়ায় উড়ে যায় চুল, দুঃখরাও।

গাড়ি থেকে নেমে আসি নদী-ব্রিজে। লোহার ব্রিজের ফাঁক দিয়ে দেখি ছুটির দিনে পিকনিক করছে একঝাঁক খুশিমুখ। ওদের বাড়ি ফেরা নেই, পাহাড় আছে। অথচ জীবন সহজ নয় কোথাও। সেখানে একটু সময় কাটিয়ে গাড়ি রওনা দেয় সুনতালেখোলা।

আশ্চর্য ফুলের বাগান যেন। যে দিকে তাকাবে, রঙিন। ওই তো ট্রেনের সেই চেনা মুখটা। কলকাতা কলকাতা গন্ধ ওঠে। ওঁদের দিকে হাত নেড়ে ছোট্ট একটা গাড়ি ভাড়া করে রওনা হই আসল গন্তব্যে। গিয়েই দেখি, সবুজ জঙ্গলের মাঝে একখানা দড়ির ব্রিজ। ভারী মজার। পাঁচ জনের বেশি ওঠা মানা। কে শোনে কার কথা! দড়ি বেয়ে ওঠে-নামে পর্যটকের ভিড়। পাশেই ছোট্ট রাঙা এক কালীমন্দির। দূর থেকে দেখা। একটু এগোতেই পাথর ছুঁয়ে বয়ে চলা তিরতিরে নদী। কেউ স্নান সারে, তো কেউ পিকনিক। ধোঁয়া ওঠে মখমলে দিনের। আশপাশে দেখার জায়গা যে আরও কত।

ফিরে আসার পথে পড়ে সামসিং গ্রাম। নীল আকাশ আর রোদ্দুরে মোড়া ভিউ পয়েন্ট লালিগুরাস। নীচে তাকাতেই দেখা যায়, এক ফালি নদী সব দিক ছুঁয়ে হেঁটে চলেছে তিরতিরিয়ে। বাকিটা পাথুরে পথ— দিগন্ত বিস্তৃত। দিব্যি পিকনিক স্পট নাকি ওটা। সপ্তাহান্তে ভিড় জমে স্থানীয়দের। পাশে যে দিকে চোখ যায় চা বাগান। ছুঁয়ে দেখি দু’টি পাতা, একটি কুঁড়িদের। দূরে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক।

এ বার পাখির ঘরে ফেরার পালা। ট্রেন আসে। শুধু চোখে জেগে থাকে আশ্চর্য নীল রোদ্দুর আর সোনার পাহাড়।