‘আত্মপ্রচারের অহমিকা থেকে নয়, অত্যন্ত অপরাধীর মতো সঙ্কোচভরে আমি স্বীকার করছি যে আমি অত্যন্ত কুঁড়ে...কেজো লোকেরা আমার নামে মুখ বিকৃত করে, বন্ধু-বান্ধবেরা হতাশার নিশ্বাস ফেলে, অনুরাগী যে দু’চারজন আছে তারা বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ে... সম্পাদকেরা আমার কাছে সময়মতো লেখা পায় না, বন্ধু-বান্ধবেরা পায় না চিঠির জবাব। সদিচ্ছার আমার অভাব নেই— চিঠি পেলেই তার জবাব দেবার জন্য উৎসুক হই, কিন্তু লেখাটা বেশির ভাগ সময়ে মনে মনেই হয়, কলমের মুখে কাগজ পর্যন্ত পৌঁছোয় না।’’

 

তাঁর বাবার লেখা থেকে এই শব্দগুলো মনে করিয়ে দেওয়ায় মুখে হাসি খেলে গেল মৃন্ময় মিত্রের। ‘‘লেখার ব্যাপারে সত্যি কুঁড়েমি ছিল ওঁর। কালীঘাটের বাড়িতে দেখতাম, বাবা লিখতে লিখতে উঠে পায়চারি করছেন, ভাবছেন। আবার গিয়ে বসছেন লেখায়। আমরা দুষ্টুমি করলে বাবার দিদিমা (বাবা ‘ঠাটু’ বলে ডাকতেন) বলতেন, ‘খোকা লিখছে, গোলমাল কোরো না।’ লিখতে বসলে কিন্তু কিছু খেয়াল থাকত না। চেয়ার-টেবিলে লিখতেন না। যে খাটে শুতেন, তার তলায় একটা তোরঙ্গ থাকত। সেটা টেনে তার উপরে বসতেন। আর একটা ম্যাসোনাইট বোর্ড ছিল, সেটা খাটে রেখে তার উপরে কাগজে লিখতেন। ছোট্ট ছোট্ট, পরিষ্কার অক্ষরে।’’

প্রেমেন্দ্র মিত্র! ‘কল্লোল’, ‘কালি কলম’-এর ছোট গল্প লেখক, বুদ্ধদেব বসু-সমর সেনের সঙ্গে ‘কবিতা’ পত্রিকা সম্পাদনা করা প্রেমেন্দ্র মিত্র। ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’-এর স্রষ্টা, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘সাগর থেকে ফেরা’র কবি। ‘পথ বেঁধে দিল’, ‘কালো ছায়া’, ‘হানাবাড়ি’র মতো ছবির পরিচালক, ‘ওরা থাকে ওধারে’র গীতিকার-চিত্রনাট্যকার, আনন্দ পুরস্কার থেকে সাহিত্য অকাদেমি, নেহরু অ্যাওয়ার্ড থেকে দেশিকোত্তমে বন্দিত সাহিত্যিক। মামাবাবু, পরাশর বর্মা বা অমর ঘনাদার মতো চরিত্রের, দুর্দান্ত বিজ্ঞান-সাহিত্যের জিয়নকাঠি যাঁর হাতে, সেই প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখতে চাইতেন না?

রাজীব গাঁধীর হাত থেকে ‘দেশিকোত্তম’। ১৯৮৮ সালে

‘‘পড়তেন কিন্তু খুব। যাকে বলে ভোরাশিয়াস রিডার,’’ বলছেন মৃন্ময়বাবু। ওঁর বিপুল পড়াশোনার কথা লিখে গিয়েছেন লীলা মজুমদার থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৮৮ সালের ২ মে চলে গেলেন। এক মাস পর, ৪ জুনের ‘দেশ’ পত্রিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন তাঁর দৃষ্টিক্ষীণতার মধ্যেও ‘অদম্য পাঠতৃষ্ণা’র কথা। ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে পড়তেন, পরে মাইনে করা লোক রেখেছিলেন, যে তাঁকে বই-পত্রপত্রিকা পড়ে শোনাত। সুনীল লিখছেন প্রেমেন্দ্রের বয়ান: ‘‘না পড়ে যে পারি না! পৃথিবীটাকে এখন আর ভালো করে দেখতে পাই না, এইসব লেখাপত্তরের মধ্য দিয়েই পৃথিবীটাকে দেখি।’’ আলস্য তখন কোথায়, আবার লেখালিখির ইচ্ছে। আন্দাজে কলম ধরে, পরে ডিক্টেশন দিয়ে লিখতেন। আর খুব গুরুত্বপূর্ণ সুনীলের যে কথাটি: ‘‘সাধারণত প্রবীণ লেখকরা পরবর্তী প্রজন্মের রচনা বিশেষ পড়েন না। প্রেমেনদা সব সময়ই সাম্প্রতিক সাহিত্যের খুঁটিনাটি খবর রাখতেন।’’

চিরকালই নিজের শর্তে বেঁচেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁর সাহিত্যকৃতিও একক, স্বতন্ত্র। বলা যাবে না যে তিনি ‘অমুকের মতো’ লিখতেন। রবীন্দ্রধারার বিপরীতে ‘কল্লোল যুগ’, এ রকমটা সাহিত্যের ইতিহাসে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র কিন্তু লিখে গিয়েছেন আসল কল্লোল-কথা, ‘বহু বিচিত্র অমিলকে মেলাবার একটি পতাকা’ ছিল ‘কল্লোল’, ‘সেখানে মিল ছিল না শৈলজানন্দ আর অচিন্ত্য সেনগুপ্তের লেখায়। বুদ্ধদেব আর যুবনাশ্ব ছদ্মনামে মণীশ ঘটক সম্পূর্ণ ভিন্ন কলমে লিখত। আমার সঙ্গে অজিত দত্তের কোনো মিল ছিল বলে মনে হয় না। তবুও পটুয়াটোলা লেনের দোতলার ছোট্ট একটি ঘরে আমরা কী এক প্রচণ্ড গভীর আকর্ষণে মিলিত না হয়ে পারতাম না।’ পরে সাক্ষাৎকারেও বলেছেন, ‘‘আমরা কবিতা লিখেছি, কিন্তু আন্দোলন করিনি। কবিতার আন্দোলন বলে কিছু নেই। আসল কথা, কবিতায় যা বলা হয়নি, তা-ই বলব। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রাখব। যে-যার ক্ষমতা অনুযায়ী বাহাদুরি নেব; আন্দোলন করে নয়।’’

সাহিত্যে অশ্লীলতা নিয়ে যখন সে যুগে সমাজমন তোলপাড়, প্রেমেন্দ্র মিত্র উচ্চারণ করেন শুধু একটি অমোঘ বাক্য, ‘আশঙ্কাটা সাহিত্যের অশ্লীল হয়ে ওঠা নিয়ে নয়, অশ্লীলতার সাহিত্য সাজবার চাতুরি ও স্পর্ধা দেখে।’ বলিষ্ঠ কলমের মানুষটা কত কিছু যে লিখেছেন— ছোট গল্প, উপন্যাস, গান, কবিতা, ছড়া, কৌতুক, রম্যরচনা, গোয়েন্দা কাহিনি, বিজ্ঞান-সাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে গ্রীষ্মে ছায়া, ঝড়বাদলে ত্রাণ, শীতে ওম পেয়েছে।

‘‘লোকে সোনার চামচ-রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মানোর কথা বলে, আমি তো ‘প্লাটিনাম টাং’ নিয়ে জন্মেছিলাম,’’ বলতেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। দাদামশাই যখন মারা যান, তাঁর দিদিমার কাছে নাকি ষাট হাজার টাকার সোনার গয়না আর আশি হাজার টাকার কোম্পানির শেয়ার ছিল! কিন্তু ঠাটুর আত্মীয়পরিজনরা সব লুটেপুটে খেয়ে নিল। কালীঘাটে আদি গঙ্গার ধারের বাড়ি, যার পাঁচ হাজারও দাম হয় না, আত্মীয়রা কেনাল ২৫ হাজার টাকা দিয়ে! মৃন্ময় স্মৃতিচারণ করেন, ‘‘বাবা বলতেন, বড় হয়ে দেখি, পড়ে আছে মোটে পাঁচ-দশ হাজার টাকা। সেও এক ফুটবলার বন্ধু ধার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। জীবন শুরু করলাম পেনিলেস অবস্থা থেকে।’’

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘চুপি চুপি আসে’র সেটে

জীবনানন্দে ভাটা পড়েনি তাতে। স্মৃতিকথা ‘নানা রঙে বোনা’র পাতায় পাতায় সে জীবন পড়ে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। উত্তরপ্রদেশের রুখুসুখু মির্জাপুরে রেল হাসপাতাল কম্পাউন্ডে তারের বেড়ায় ঘেরা শৈশব, বিংশ শতাব্দী শুরুর দশকে। পেশায় ডাক্তার দাদু রাধারমণ ঘোষকে লোকে বলত সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। বসন্ত রোগে তিনি মারা যাওয়ার পর মির্জাপুরের পাট চুকিয়ে ঠাটুর সঙ্গে পাড়ি— ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের লুপ লাইনের ছোট্ট স্টেশন, বীরভূমের নলহাটি। রেলের ওয়াগনে বাক্সপ্যাঁটরা পোঁটলাপুঁটলির সঙ্গে ঠাটু নিয়ে এসেছিলেন বিরাট একটা পাথরের চাঁই! মির্জাপুরের স্মৃতি। সেই পাথর পরে কলকাতার বাড়ির প্রাঙ্গণেও স্থান পেয়েছিল। ভবানীপুরে সাউথ সুবার্বান স্কুলে ভর্তি হওয়া, বন্ধু হল উদ্দাম প্রাণশক্তির এক ছেলে— দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী। ভবিষ্যতের অনন্য ভাস্কর-চিত্রকর দেবীপ্রসাদের সঙ্গেই গড়ের মাঠে বায়োস্কোপ দেখা, বড় আর বেপরোয়া হওয়ার স্বাদ। এরই মধ্যে জীবনে এসেছে বই। জুল ভার্ন, চার্লস ডিকেন্স, এমনকী ইঙ্গারসোলও! ইস্কুলে কিন্তু সেই ছেলেই নীলডাউন হয়ে থাকে। এক দিন পণ্ডিতমশায়ের হঠাৎ চোখে পড়ল, প্রেমেন্দ্র খাতায় কবিতা লিখেছে। কী আশ্চর্য, বকেননি, বরং নীলডাউন থেকে তুলে বেঞ্চিতে ফেরত পাঠালেন।

এক জীবনে কত কিছু করা যায়? কত কী পড়া যায়? চোদ্দো বছর বয়সে ‘ফার্স্ট ক্লাস’-এ উঠে গিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। কিন্তু ষোলো না হলে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। খুব ভাল রেজাল্ট ছিল, হেডমাস্টারমশাই প্রেমেন্দ্রকে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওঁর ইচ্ছে, ফুটবল খেলবেন মন দিয়ে। পরে ঠিক করলেন, ডাক্তার হবেন। গোড়ায় স্কটিশে আর্টস নিয়ে, পরে আশুতোষ কলেজে (তখন নাম সাউথ সুবার্বান কলেজ) সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলেন। ১৯২২, স্বাধীনতার আন্দোলন জমাট বাঁধছে তখন। ইচ্ছে পাল্টাল আবারও, কৃষিবিদ্যা শিখবেন। পোঁটলায়
দু’-একটা জামাকাপড় বেঁধে শ্রীনিকেতন চলে গেলেন। আমি পড়তে চাই, কিন্তু টাকা দিতে পারব না। ভর্তি হওয়া গেল। ভোর পাঁচটায় উঠে কাজ শুরু। প্রতি ছাত্রের জন্য তিন কাঠা জমি বরাদ্দ, একটা ফসল ফলাতে হবে তাতে। জল বয়ে আনা, মাটি খোঁড়া, সার দেওয়া, বীজ লাগানো। শীতের রাতে ফিতের খাটিয়ায় একটি মাত্র কম্বল জড়িয়ে শোওয়া। তোশক, বালিশ নেই, জানালা খোলা! এক বার ‘আমিষ বনাম নিরামিষ’ নিয়ে বিতর্ক হল। বিশ্বভারতীর নামকরা ছাত্র, রবীন্দ্রস্নেহধন্য ও পরবর্তী কালের প্রখ্যাত লেখক-অধ্যাপক সেখানে নিরামিষ নিয়ে বললেন। প্রেমেন্দ্র আমিষ নিয়ে। ‘নিরামিষ বন্দনাটা যথার্থ আন্তরিক না হওয়ায় মাননীয় অতিথি খুব বেশি সুবিধে করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ক্ষুদে দুর্বাসার মতো বেশ যেন একটু রুষ্ট হয়েই চলে গিয়েছিলেন বলে মনে পড়ছে’, স্মৃতিকথায় লিখেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

শ্রীনিকেতন ছেড়ে চলে এলেন। এ বার ডাক্তারি পড়তে ঢাকা শহরে। ভর্তির ক্ষেত্রে ঢাকার ছেলেদের অগ্রাধিকার, পরে অন্য ছেলেদের। জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলেন সায়েন্স নিয়ে। ছুটিতে মাঝে মাঝে কলকাতা। তখন ঠাটু থাকেন কাশীতে, কলকাতার বাড়ির প্রায় পুরোটাই ভাড়া দেওয়া। তাই কলকাতায় এসে ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেনে এক মেসে উঠতেন। সেখানেই এক শনিবার ছুটির দিনে, ফাঁকা মেসবাড়ির ঘরের কুলুঙ্গিতে বোর্ডারদের ডাঁই মালপত্র আর কাগজের বান্ডিলের মধ্যে আবিষ্কার করা গেল একটা পোস্টকার্ড। গ্রামের মেয়ে সংসারের সব খবর জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। ‘বৌমার আজো জ্বর এসেছে, দেখতে দেখতে দুমাস হয়ে গেল। ঘুষ ঘুষে জ্বর ত’ কিছুতেই সারে না...’ চিঠি পড়ে কী মনে হল, সেই রাতেই দুটো গল্প লিখে ফেললেন প্রেমেন্দ্র। পরদিন সকালে ভবানীপুর পোস্ট অফিসে গিয়ে ‘প্রবাসী’র ঠিকানায় পাঠিয়েও দিলেন। ঢাকায় ফিরে মাসের পর মাস হস্টেলের রিডিং রুমে ধুকপুকুনি সমেত ‘প্রবাসী’র দিকে নজর। নেই নেই, কিছু নেই! হঠাৎ এক দিন ডাইনিং হলে এক বন্ধু জানাল, ‘‘এ মাসের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত একটা গল্পের লেখকের নাম হুবহু তোমার যা, তা-ই!’’

সপরিবার প্রেমেন্দ্র মিত্র

সেই শুরু। ‘প্রবাসী’তে পর পর দু’মাসে দুটো গল্পই বেরিয়েছিল— ‘শুধু কেরাণী’ আর ‘গোপনচারিণী’। লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র। বড়দিনের ছুটিতে কলকাতায় আসতে বন্ধু অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত জানালেন, এহ বাহ্য, ‘কল্লোল’ নামে একটা সাহিত্যপত্রিকায় ‘শুধু কেরাণী’ নিয়ে বারো পাতা প্রশংসা-প্রবন্ধ বেরিয়েছে, ‘গোপনচারিণী’ নিয়েও চার পাতা! জানা গেল, এ পত্রিকার বয়স মোটে দুই। কিন্তু এরই মধ্যে সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়-সহ তরুণ সুলেখকদের লেখা জ্বলজ্বলে! আলাপ হল ‘কল্লোল’-সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগের সঙ্গে, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ছেলের জন্মদিনে ‘কল্লোল’-এর সবাইকে ডেকেছেন তাঁর হুগলির বাড়িতে। হইহল্লা, খাওয়াদাওয়া। ছাদে আবৃত্তি চলছে একের পর এক। শৈলজানন্দ উসকে দিলেন প্রেমেন্দ্রকে, ‘‘তোমার নিজের কবিতা আবৃত্তি করো!’’ নজরুল অবাক, প্রেমেন কবিতা লেখে? নজরুল কবিতা শুনে দীনেশ দাশকে বলছেন, ‘‘তুমি এদের কবিতা ছাপো না, দীনেশদা?’’

‘পাঁক’ উপন্যাস লিখেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, এক দিন একটা পোস্টকার্ড এসে হাজির। পত্রলেখক শিবরাম চক্রবর্তী। উপন্যাসের প্রভূত প্রশংসা সেই চিঠিতে। শিবরামের সঙ্গে দেখাও হল অপ্রত্যাশিত, ম্যাডান সিনেমায় (এখনকার ‘এলিট’) নির্বাক ছবির সবচেয়ে সস্তা টিকিটের সিটে। ‘ওয়রলিট্‌জার অর্গান’ বাজনা বসানো হয়েছে তখন। হলের ছাদ ফুটো করে মস্ত চোঙা বসাতে হয়েছিল। সেই সঙ্গীত নিয়ে আলাপ শুরু। আলাপ থেকে বন্ধুতা। যে বন্ধুতা সাহিত্যের কূল ছাপিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল দু’জনের জীবনকে। এক বার ঢাকায় আছেন, শিবরাম চক্রবর্তী চিঠি লিখে পাঠালেন, ‘কলকাতা এস, তোমার চাকরি হয়ে গেছে।’ চাকরি! কই, ইন্টারভিউ-টিউ তো দিইনি কিছু! অফিসের ঠিকানায় পৌঁছে প্রেমেন্দ্র শুনলেন আর এক গল্প। অফিসার বলছেন, ‘‘আরে মশাই, পাবলিসিটি অফিসারের পদে বেছেবুছে লোক ডেকে বললাম, কাল থেকে জয়েন করো। তো সে ছেলে বলছে, আমি তো জয়েন করব না! করবে আমার বন্ধু, প্রেমেন! তা হলে তুমি কে?’’ আমি শিবরাম চক্রবর্তী! শিবরাম ইন্টারভিউ দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু চাকরি করবে তাঁর বন্ধু প্রেমেন মিত্তির। প্রেমেন্দ্র মিত্র সেই বিজ্ঞাপন-অফিসে চাকরি করেওছিলেন কিছু দিন। শিবরাম প্রেমেন্দ্রকে বার বার বলতেন সিনেমাপাড়ার জন্য গল্প দিতে। প্রেমেন্দ্র এড়িয়ে যেতেন। এক দিন ঘটনাচক্রে স্টুডিয়োপাড়ার এক জনের কাছে যেতে তিনি বললেন, ‘‘আপনার পাঠানো গল্প পড়লাম। কিন্তু ওই জায়গাটা বুঝতে পারলাম না, ওই যে মেয়েটা দার্জিলিং গিয়ে একটা পার্টিতে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করে হঠাৎ বিবস্ত্র হয়ে গেল...’’ প্রেমেন্দ্র তো আকাশ থেকে পড়লেন, ‘‘আমি তো লিখিইনি ছাই কিছু সিনেমার গপ্পো, তার উপরে এ সব কী!’’ পরে শোনা গেল, শিবরাম ‘প্রেমেন লিখেছে’ বলে একটা গল্প সেই লোকটির কাছে জমা দিয়ে গিয়েছেন! যখন দেখা হল, প্রেমেন্দ্র চরম বকাঝকা করবেন বলে ফুঁসছেন। শিবরাম বললেন, ‘‘তুমি নিজে পাঠাবে না, তাই আমি নিজে একটা গল্প লিখে তোমার নামে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তা ছাড়া সিনেমায় তো সবই হয়। তুমি তো পরে সে সব বদলে দিতে পারতে!’’ প্রেমেন্দ্র লিখে গিয়েছেন, ‘খোদ শিব্রামকে আমার মতো কেউ বোধ হয় চেনে না, এ আমার একটা অহঙ্কার।’

সেই প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৪টা ছবি পরিচালনা করেছিলেন নিজের কোম্পানি ‘মিত্রাণী’র ব্যানারে। অনেক ছবির গল্প, চিত্রনাট্য, গান লিখেছেন। ছেলে মৃন্ময় বলছেন, ‘‘ধীরাজ ভট্টাচার্যকে ডাবল রোলে নিলেন ‘কালো ছায়া’ ছবিতে। তখন আজকের মতো ক্যামেরা, প্রযুক্তি কোথায়! লেন্সের অর্ধেকটা ঢেকে শুট করলেন একটা চরিত্রের ধীরাজ ভট্টাচার্যকে, তার পর বাকি অংশ দিয়ে আবার অন্য চরিত্রটার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘পথ বেঁধে দিল’ খুব নাম করেছিল। সবিতা বসু, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল বাড়িতে আসতেন। দিদির বিয়েতেও এসেছিলেন চিত্রতারকারা। বাবা উত্তমকুমারকে বলেছিলেন, তুমি এলে তো ভিড়ে সব ভেঙে পড়বে। সারা সপ্তাহ সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বিরাট একটা গাড়ি ছিল, হাম্বার সুপার স্নাইপ। এক জন ড্রাইভার ছিল, তিনশো টাকা মাইনে, সঙ্গে থাকা-খাওয়া। মনে আছে, তখন দশ টাকায় এক গ্যালন, মানে সাড়ে চার লিটার পেট্রল পাওয়া যেত। বাবার জন্য রোজ কুড়ি টাকার পেট্রল কেনা হত।’’ সেই তিনিই ছবি করা ছেড়ে আবার লেখালিখিতে ফিরলেন। সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সিনেমায় যখন গেলেনই, আবার ফিরে এলেন কেন? প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেছিলেন, ‘‘ফিরে এলাম বলেই তো আমাকে আবার সাহিত্যে পেলে!’’

‘‘তা বলে টাকাপয়সার প্রতি টান কোনও দিনই দেখিনি,’’ বলছেন ওঁর পুত্র। ‘‘আমি তখন ছোট, দিদির টাইফয়েড হল। এ দিকে টাকা নেই। তখন একটা কবিতা লিখলে পাঁচ টাকা পাওয়া যায়। তার মূল্য তখন অনেক, তবু তাতে চিকিৎসা হয় না। বাবার দুই বন্ধু— শিবরাম চক্রবর্তী ও বিভাস রায়চৌধুরী— দেখা করতে এসে চুপি চুপি টাকা গুঁজে রেখে যেতেন। বাবা ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক ম্যাগাজিনটা রাখতেন। জমে থাকা সেই ম্যাগাজিনের কপি বিক্রি করে দিদির চিকিৎসা হয়েছিল।’’ শখ তেমন কিছু ছিল না। সকালে চা আসত ট্রে-তে করে, পাতলা লিকার। আলাদা করে লেবু, চিনি।’’ রবিবার রেসের মাঠে যেতেন মাঝেসাঝে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখে গিয়েছেন, ‘বুদ্ধদেব বসু তাস খেলা দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ব্রিজ খুব প্রিয়।’

রবিবার তাঁর বাড়িতে সাহিত্যের আড্ডা বসত। সেখানে সিনেমার স্থান নেই। এক দিন আড্ডা চলছে, তার মধ্যেই কেউ এলেন, একটা ছবির গান লিখে দিতে হবে। প্রেমেন্দ্র প্রথমে ‘না’ করে দিলেন। পরে আড্ডার মধ্যেই বসে বসে পাঁচ মিনিটে একটা গান লেখা সারা! পাঠিয়েও দিলেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বসে কফি আর চুরুট খেতেন। ‘পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ’ লিখছেন যখন, তখন ও সব খাওয়াও বন্ধ। রবিবারের আড্ডায় শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে অনর্গল বলে যাচ্ছেন। উনি চলে যাওয়ার পর কেউ কেউ টিপ্পনী কাটলে প্রেমেন্দ্র মিত্র বললেন, ‘‘তোমরা কেউ কোনও কথা বলবে না। ও যখন বলছিল, তখন তো বলতে পারোনি! এটা তো ওর প্রতিভা, ও এমন ভাবে বলছে যে, তোমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছ!’’

(বাঁ দিক থেকে) বুদ্ধদেব বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, তুষারকান্তি ঘোষ, প্রফুল্ল সেন,
উমা রায়, অশোককুমার সরকার, রমাপদ চৌধুরী ও প্রেমেন্দ্র মিত্র

বনমালী নস্কর লেনের বাসিন্দা ঘনশ্যাম দাস, যে চরিত্রের জন্যই প্রেমেন্দ্র মিত্র অমরত্বের দাবিদার, সেই ঘনাদার গল্পগুলিকে লীলা মজুমদার বলেছেন ‘বিজ্ঞানের একেকটি সার্থক পাঠ’। তাঁর নিজের চোখে দেখা, প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘ঘরের মধ্যে তক্তাপোশে গোটা চারেক এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা খুলে, একটা নিচু মোড়ায় বসে ঘনাদার নবতম অভিযানের গল্প লিখছেন। বৈজ্ঞানিক তথ্যে পাছে কোনো ভুল বা বিচ্যুতি ঢুকে যায়, তাই সতর্কতার আর যত্নের শেষ নেই।’ হাতি ধরার গল্প ‘ঝড়ের কালো মেঘ’ লেখার আগে পড়েছিলেন হস্তায়ুর্বেদ পুঁথি। তাঁর ‘কুহকের দেশে’কে ‘বাংলায় প্রথম সার্থক বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর উপন্যাস’ বলেছিলেন লীলা। স্মৃতিচারণ করেছেন আকাশবাণীতে একসঙ্গে অনুষ্ঠান প্রযোজনার দিনগুলির। ‘রঙমশাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটা অসমাপ্ত গল্পের কথা তুলে প্রেমেন্দ্র প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘‘এটা দু’জনে মিলে শেষ করলে কেমন হয়?’’ তারুণ্যে অচিন্ত্যকুমার-প্রেমেন্দ্র একসঙ্গে বই লিখেছিলেন, ‘বাঁকালেখা’। প্রেমেন্দ্র-লীলার সেই অসমাপ্ত গল্পও পূর্ণ হয়েছিল।

যখন খুব অসুস্থ, তখনও বিছানায় শুয়ে ‘ঘনার বচন’ লিখছেন। ‘এক যে ছিল রগরগে বাঘ, দগদগে তার সারা গায়ে ঘা।’ মৃন্ময়বাবুর মনে হয়েছিল, বাবা নিজের শরীরের কথাই যেন লিখেছেন। ক্যানসারের যন্ত্রণা উনি কি বোঝেননি? কিন্তু বলেননি কিছুই। ‘দেশিকোত্তম’ নেবেন বলে বিশ্বভারতী গিয়েছেন, ’৮৮-র জানুয়ারি। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা আসছে, অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে দিচ্ছে, প্রেমেন্দ্র মিত্র তৎক্ষণাৎ এক-একটা ছ’আট লাইনের কবিতা লিখে দিচ্ছেন এক-এক জনকে! ফিরে আসার পর ডাক্তার দেখানো হল। বেরিয়াম এক্স-রেতে ধরা পড়ল, পেটটা এতটুকু হয়ে গিয়েছে, রোগ এত ছড়িয়ে পড়েছে। ৩মে চলে গেলেন।

‘কুঁড়েমি মানে তো মনের শূন্যতা নয়, অসীম রহস্যে ডগমগ মনের নিথর নিটোল পূর্ণতা’, লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। বাংলা সাহিত্য আশ্রয় পেয়েছিল তাঁর মনের নিথর নিটোল পূর্ণতার কাছে।

কৃতজ্ঞতা: মৃন্ময় মিত্র