• ‘স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ক্লাসের সমস্ত ছেলেই কোনও না কোনও দলে রয়েছে। সায়ন বাদে। কোনও অনুষ্ঠানেই কেউ তাকে নিতে রাজি নয়। কারণ সবার একটাই কথা, সায়নকে কিছু দিলে ও সেটা ভুলভাল করবেই। ছেলেটার একদম কোনও আত্মবিশ্বাস নেই।’  

• ‘অফিসে একটা বড় প্রোজেক্ট এসেছে। বস কাজটা অরিত্রকে দিতে চান। কারণ, ছেলেটা জানে সে কী করতে চায়। তার কথাবার্তার মধ্যেই তার আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। তা ছাড়া তার এই আত্মবিশ্বাসী মনোভাব অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করে।’

এটা ঠিকই, সবার আত্মবিশ্বাস সমান নয়। অনেকেই একেবারেই আত্মবিশ্বাসী নয়। এবং তাদের এই আত্মবিশ্বাসের অভাব তাদের কথাবার্তা, চালচলন, কাজেকর্মেও ফুটে ওঠে। ফলে অন্যরাও তাদের দিয়ে কিছু করাতে ভরসা পান না। তা ছাড়া তাদের এই অভাব তাদের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মজার বিষয় হল, অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন আত্মবিশ্বাসও কিন্তু গড়ে তোলা যায়। এমন নয় যে সেটা পাঁচ মিনিটে গড়ে তোলার কোনও মন্ত্র আছে। এর জন্যেও প্র্যাকটিস দরকার। ঠিক যেমন বিরাট কোহালি বা চেতেশ্বর পূজারারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন ধরনের শট প্র্যাকটিস করেন, অনেকটা সে রকম। আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা অভ্যাস করা যায় নানা ভাবে। তার মধ্যে কয়েকটি তোমাদের বলতে পারি।

 

নিজের সাফল্যগুলি মনে করো

হতেই পারে তুমি পাড়ার কোনও ক্রিকেট ম্যাচে ভাল বল করে দলকে নিশ্চিত হারের মুখ থেকে বাঁচিয়েছিলে। অথবা ক্লাসে কোনও কুইজ় কম্পিটিশনে বেশ কিছু শক্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দলকে জিততে সাহায্য করেছিলে। কিংবা কোনও বার্ষিক পরীক্ষায় বেশ ভাল ফল করেছিলে। তোমার জীবনে যা যা সাফল্য, সে যত ছোটই হোক না কেন, সেগুলো একটা নোটবুকে লিস্ট করে ফেলো। এবং প্রতি সপ্তাহে একটা সময় বার করে (বা যখনই মনে হবে তোমার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরছে)— সেগুলো দেখতে থাকো। দেখবে, নিজের কৃতিত্বগুলো চোখে দেখলে ধীরে ধীরে মনে একটা বল পাচ্ছ।

 

নিজেকে প্রশ্ন করো

আমরা অনেকেই যেটা করি না তা হল নিজেদের প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করে দেখা, কোন কোনগুলো আমাদের জোরের জায়গা, বা কোথায় কোথায় আমাদের খামতি আছে। যেমন জোরের জায়গার ক্ষেত্রে যে যে প্রশ্নগুলো আসতে পারে— ১) আমার এমন কী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যদের নেই (জনসংযোগ, খেলাধুলো, পড়াশোনা, গানবাজনা ইত্যাদি)? জীবনের কোন কোন সাফল্য তোমাকে গর্বিত করে? অন্যরা তোমার মধ্যে কোনগুলোকে তোমার জোরের জায়গা মনে করেন? 

আবার খামতির ক্ষেত্রে তোমার নিজের প্রতি প্রশ্ন হতে পারে— ১) কোন কোন কাজ করার ক্ষেত্রে তুমি আত্মবিশ্বাস বোধ করো না? তোমার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? অর্থাৎ, তুমি কি সব কাজ করতে দেরি করো, তুমি কি চট করে রেগে ওঠো, বা কোনও কঠিন পরিস্থিতি একদম সামলাতে পারো না? তুমি যা পড়াশোনা করেছ বা করছ এবং এত দিনে যে সব দক্ষতা অর্জন করেছ, তা তোমাকে জীবনে এগিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট? কোন বৈশিষ্ট্যটি তোমার এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়? যেমন, তোমাকে শিক্ষকরা ক্লাসে প্রশ্ন করলে তুমি প্রশ্নের উত্তরটা জানা সত্ত্বেও, সেটা দিতে পারো না?

 

পরিকল্পনা করো

পড়াশোনাই হোক বা বাড়ির কোনও কাজ, আগে তার একটা সুষ্ঠু পরিকল্পনা করো। দেখে নাও দিনের কোন সময়ে ওই কাজটা তুমি করতে পারবে, তার জন্য কত ক্ষণ সময় লাগবে, কাজটা করতে কী কী প্রয়োজন। এই ভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করলে দেখবে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সেটা সম্পন্ন করার পর দেখবে নিজেকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে।

 

ছোট দিয়ে শুরু করো

তোমার লক্ষ্য অনেক বড় হতে পারে। কিন্তু মনে রেখো, যে কোনও বড় লক্ষ্যই কিন্তু ছোট ছোট লক্ষ্য মিলিয়ে তৈরি হয়। তোমার লক্ষ্য হয়তো সামনের বড় পরীক্ষায় অঙ্কে ভাল নম্বর পাওয়া। তার জন্য হুড়মুড়িয়ে সব অধ্যায় করার চেষ্টা কোরো না। বরং একটা একটা করে অধ্যায় ধরো। তার ছোট থেকে বড়, শক্ত থেকে সোজা অঙ্ক করার চেষ্টা করো। তা হলেই দেখবে ধীরে ধীরে তুমি তোমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ।

 

ঝুঁকি নাও, শিক্ষাও নাও

আমাদের অনেকেরই সমস্যা হল, আমরা অনেক কাজ করতে গিয়েও পিছিয়ে আসি ব্যর্থতার ভয়ে। মনে হয়, যদি ওটা না পারি তা হলে লোকে কী বলবে! আত্মবিশ্বাসী মানুষেরাও কিন্তু ঝুঁকি নেন। এমন নয় যে তাঁরাও প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সফল হন। হারের মুখ তাঁদেরও দেখতে হয়। বিরাট কোহালিকেই দেখো। হয়তো কোনও ম্যাচে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেগুলো আমাদের সবার কাছেই মনে হয়েছিল অবান্তর। দেখা গেল সেই পদক্ষেপের জন্য হয়তো ম্যাচটা হারতেও হল তাঁকে। কিন্তু তাই বলে তিনি তাঁর আত্মবিশ্বাস হারান না বা পরের ম্যাচে আবার কোনও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না। তাই বলছি, জীবনে ঝুঁকি না নিলে এগোতে পারবে না। অবশ্যই তা নিজের সাধ্য বুঝে। আর যদি কোনও কারণে ব্যর্থও হও, ভেঙে পড়ার কিছু নেই। বরং তার থেকে শিক্ষা নিতে হবে। খতিয়ে দেখতে হবে কী কী কারণ তোমার পদক্ষেপগুলো কাজ করল না। 

 

হাল ছেড়ো না

এমন নয় যে তুমি যে ভাবে পরিকল্পনা করে এগোচ্ছ, তা সব সময় হয়ে উঠছে না। তখন আবার নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আসতে থাকে। মনে হয়, পারব না। এই সময়ে হাল ছেড়ো না। বরং মাথা ঠান্ডা করে পরিকল্পনা অনুসরণ করার চেষ্টা করো। কিন্তু হ্যাঁ, যদি মনে হয় পরিকল্পনায় কোথাও পরিবর্তন প্রয়োজন, তা হলে সেটা অবশ্যই করবে। 

 

নিজের বন্ধু হও

বন্ধুবান্ধব বা অভিভাবকরা তো আছেনই। অনেক সময় নিজেও নিজের সঙ্গে কথা বলো। নিজেকেই নিজে উদ্ধুদ্ধ করার চেষ্টা করো। যদি কোনও নেতিবাচক চিন্তা ঘুরপাক খায়, সেটাকে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে মন থেকে বার করার চেষ্টা করো। দেখবে নিজেই হয়তো সেই সমস্যার সমাধান বার করে ফেললে।

 

অবসরের সঙ্গী

কারও ছবি তুলতে ভাল লাগে, কেউ ভালবাসে ক্রিকেট খেলতে, কারও ‘হবি’ হয়তো কার্টুন আঁকা। তোমার যদি কোনও হবি থেকে থাকে, সেটার উপরে নজর দাও। কারণ আমরা যেটা করতে ভালবাসি, সেটা আরও ভাল করবার চেষ্টা করি। এই ধরনের হবি আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। আর, এই ইতিবাচক মনোভাব আমাদের অন্য কাজেও প্রভাব ফেলতে পারে। মানে তুমি হয়তো কোনও অঙ্ক পারছিলে না। ফলে বেশ কিছু ক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ক্রিকেট খেলে এলে। এসে অঙ্কটা নিয়ে বসে দেখলে, হয়ে গেল। ফলে নিজের হবি-টাকে অবহেলা কোরো না। 

 

আগেই বলেছি আত্মবিশ্বাসও প্র্যাকটিসের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব। যদিও এক-এক জনের ক্ষেত্রে তা এক-এক রকম ভাবে গড়ে ওঠে। এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এনে দেয় সাফল্য। আবার অনেক কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেও সাহায্য করে। তাই নতুন বছরের রেজ়লিউশনে যদি ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’ তোমার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে থাকে, তা হলে তা আজ থেকেই তা শুরু করে দাও।