ধরো, তোমার পাড়ায় দুজন ডাক্তার আছেন। দুজনেই চিকিৎসা ভাল করেন। কিন্তু এক জন রোগীর কথা মন দিয়ে শোনেন, তাঁকে অনেক প্রশ্ন করলেও রেগে যান না। অন্য জন রোগীকে শুধুমাত্র একটা নম্বর হিসেবে দেখেন। রোগীরা কার কাছে বেশি যেতে চাইবে বলে মনে হয়? অবশ্যই প্রথম জনের কাছে। তাঁর ‘সফ্‌ট স্কিল্স’-এর কারণে।    

কলেজ বা ইনস্টিটিউট থেকে আমরা যে যোগ্যতা অর্জন করি সেগুলো আমাদের টেকনিকাল স্কিল। কিন্তু এই টেকনিকাল স্কিল ছাড়াও আমাদের অন্য দক্ষতারও প্রয়োজন আছে। সেটা চাকরির ক্ষেত্রেও, জীবনের ক্ষেত্রেও। ‘সফ্‌ট স্কিল্‌স’। এই দক্ষতা কোনও প্রতিষ্ঠানে কোর্স করে শেখা যায় না। এটা অনেকখানি ব্যক্তিত্ব-কেন্দ্রিক। তোমার স্বভাব, কমিউনিকেশন স্কিল, মনোভাব, যে কোনও পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা— অনেক কিছুই সফ্‌ট স্কিল্‌স-এর মধ্যে পড়ে। যে কোনও কাজের ক্ষেত্রেও নিয়োগকর্তারা এমন প্রার্থী খোঁজার চেষ্টা করেন যাদের টেকনিকাল স্কিল-এর পাশাপাশি সফ্‌ট স্কিল্‌স-ও ভাল। এই ধরনের কর্মী থাকলে প্রতিষ্ঠানের লাভ হয়। যদি মনে করো একটা সফল জীবন বাঁচবে, যাকে আমরা বাঁচার মতো বাঁচা বলি, তা হলে তোমার রোজকার জীবনে এই ধরনের সফ্‌ট স্কিল্‌স তৈরি করে নাও। এর জন্য আলাদা করে খাটতেও হবে না, দিনে কয়েক ঘণ্টা সময়ও দিতে হবে না। কেবল মনটাকে একটু গুছিয়ে নিতে হবে।

 

• শুধু পড়ার বই নয়

পড়ার বইয়ের মধ্যে আটকে থাকলেই হবে না। চারপাশ সম্পর্কে, নিজের পছন্দের বিষয়ে, এমনকী যেটা অনেক সময়ই পড়তে ভাল লাগে না, কিন্তু কেরিয়ারের প্রয়োজনে পড়ে রাখা দরকার, সেগুলোও জেনে রাখতে হবে। মোট কথা, পড়ার একটা অভ্যেস তৈরি করতে হবে।

 

• রাইটিং স্কিল্‌স

যা ভাবছ, তা স্পষ্ট করে ভাষায় প্রকাশ করাটাও একটা দক্ষতা। তাই, যে কোনও ক্ষেত্রে যা লিখতে হবে, সে প্রজেক্ট রিপোর্টই হোক বা ক্লাস নোট্স, সব কিছুতেই যেন একটা পরিচ্ছন্নতা থাকে। বিশেষত, চাকরিতে যদি তোমাকে সহকর্মীর জন্য কোনও মেমো বা বস-এর জন্যে কোনও রিপোর্ট তৈরি করতে হয়, তা হলে বুঝতে হবে, কী লিখতে হবে, কতটা লিখতে হবে। কম কথায় সোজাসাপটা ভাষায় কোনও কিছু গুছিয়ে লেখার অভ্যাস করো। একই সঙ্গে মাথায় রেখো— লেখায় গ্রামার, পাংচুয়েশন, বানান যেন ঠিক থাকে। 

 

• লিসনিং স্কিল্‌স

এটাও এক দক্ষতা। যে কোনও কাজের জায়গাতেই যে অন্যের কথা মন দিয়ে শোনে, অর্থাৎ যে ‘গুড লিসনার’, তার বা তাদের গুরুত্ব অন্য রকম। তাদের কিন্তু সংস্থায় প্রোডাকটিভ ওয়ার্কার হিসেবে দেখা হয়। কারণ তুমি যদি চট করে কোনও কথা শুনে বুঝে যাও তোমার কাছ থেকে কী চাওয়া হচ্ছে, তা হলে তোমারই কাজের সুবিধে। এতে বস-এর নেকনজরে পড়বে, সহকর্মীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক তৈরি হবে। ব্যক্তিগত জীবনেও এই অভ্যেস তৈরি করতে পারলে, জীবনে নানান সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অন্যান্য মানুষকে বোঝার অনেক সুবিধে হয়। তবে সবাই যে গুড লিসনার হয় তা নয়। আবার অনেক সময় যাঁদের মনে করা হয় গুড লিসনার, তাঁরাও এমন আচরণ করেন, দেখে মনে হবে তিনি কোনও মনোযোগই দিচ্ছেন না। যাঁরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন তাঁরা দেখবে কয়েকটা জিনিস করেন। যেমন, চোখে চোখ রেখে কথা বলা। অন্য ব্যক্তি যখন কথা বলেন, তখন তাঁর কথার মধ্যে কথা না বলা। অযথা উসখুস না করা। কথার মাঝে মাথা নাড়া। বক্তার দিকে সামান্য ঝুঁকে বসা। বক্তার কথা শেষ হয়ে গেলে তবেই প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা।

 

• ভার্বাল কমিউনিকেশন

কাজের জায়গা হোক বা অন্য কোথাও, তুমি কী বলতে চাইছ সেটা স্পষ্ট করে বলা, কোন টোন-এ বলছ, কথা বলার সময় তোমার বডি ল্যাংগোয়েজ কেমন হচ্ছে, অনেক কিছুই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই যখন কোনও কিছু নিয়ে কথা বলছ, সে বিষয়ে তোমার কী বক্তব্য, তা নিজের কাছে যেন পরিষ্কার থাকে। অনেকে খুব তাড়াতাড়ি কথা বলেন। আবার কারও কারও কণ্ঠস্বর এমনই যে কথা বোঝাই যায় না। ভার্বাল কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে কিন্তু তোমাকে খুব স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে হবে, যাতে অন্যরা বুঝতে পারেন। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, ভাষা যেন হয় সহজ-সরল। আলঙ্কারিক ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে অন্য ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করতে পারো তিনি তোমার কথা বুঝতে পারছেন কি না। এতে তোমাদের মধ্যে কমিউনিকেশনেই সুবিধে হবে। 

 

• অর্গানাইজেশনাল স্কিল্‌স

কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা খুব গুছিয়ে কাজ করতে পারেন। এ ধরনের স্কিল যাঁদের থাকে, তাঁরা দেখবে কোনও হুড়োহুড়ি না করেই যে কোনও কাজ করে ফেলতে পারেন। একাধিক অ্যাসাইনমেন্ট খুব স্বচ্ছন্দে করে ফেলতে পারেন এবং তাদের কাজে ভুলও থাকে নামমাত্র।

আমরা অনেকেই গুছিয়ে কাজ করতে পারি না। কিন্তু কয়েকটা জিনিস করলেই এই অভ্যাস তৈরি করে ফেলা যায়। প্রথম কাজই হল কাজের একটা তালিকা তৈরি করা। এ বার কোন কাজটা বেশি গুরুত্বের আর কোন কাজটা কম গুরুত্বের, সেটা ভাগ করে নাও। যেমন যেমন কাজ শেষ করছ, টিক মারতে থাকো। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট বা হাতে লেখার নোটবুক— যেটাতে তোমার সুবিধে, এই তালিকা বানিয়ে রাখো। প্রত্যেকটা কাজের জন্য একটা ডেডলাইন করে রাখো ক্যালেন্ডারে। দরকারে রিমাইন্ডার দাও। একটা রুটিন ফলো করো।   

 

• প্রফেশনালিজ্ম

কাজের ক্ষেত্রে এই ওপরের শব্দটার গুরুত্ব যথেষ্ট। এর কারণে কাজের জায়গায় তোমার অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। এর জন্য কয়েকটা জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এই সূত্রে কয়েকটা উদাহরণ দেওয়াই যায়।

কাজের জায়গায় কিংবা মিটিং-এ দেরিতে পৌঁছনো একেবারেই নয়। এতে ধারণা হয়, তুমি কাজকে গুরুত্ব দিচ্ছ না। একই নিয়ম খাটে লাঞ্চে যাওয়ার সময়েও। খেতে গিয়ে আড্ডায় অনেক ক্ষণ কাটিয়ে দিলে, এমনটা না করাই ভাল।

বাড়িতে বা অন্য কোথাও ঝামেলার কারণে যদি মুড খারাপ হয়ে যায়, সেটা কাজের জায়গায় এনো না।

জামাকাপড়ের দিকে নজর দাও। ফর্মাল পরো বা ক্যাজুয়াল, সেটা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। সাধারণত উইকডেজ-এ ফর্মাল পরো। আর, উইকেন্ডে ক্যাজুয়াল।

অনেকের অভ্যাস থাকে সহকর্মীদের সঙ্গে পরচর্চা করার। অফিসে এ সব না করাই ভাল।

কোনও ভুল করলে সেটা নিজের ঘাড়ে নাও। অজুহাত দিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কোরো না। ভুল থেকে শিক্ষা নাও।

হতেই পারে কোনও একটা বিষয়ে তোমার এক রকম মত, তোমার সহকর্মী বা বস-এর আর এক রকম। যদি তিনি তোমার মতামত গ্রহণ না করে নিজের মতটাই খাটাতে চান, অযথা রেগে যেও না বা চিৎকার-চেঁচামেচি কোরো না। তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করে দেখতে পারো, তুমি কোন দিক থেকে বিষয়টা দেখেছ। তার পরেও তিনি যদি রাজি না হন, বিষয়টা নিয়ে আর না এগনোই ভাল।

 

• পিপ্‌ল স্কিল্স

কাজের ক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ভাবে লোকের সঙ্গে মিশছ, সেটাই অন্যের কাছে তোমার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে দেয়। তোমার ব্যবহার, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, এই সব কিছুই কিন্তু এক জন সফল মানুষ হতে খুব প্রয়োজন।

অধিকাংশ মানুষেরই লক্ষ্য থাকে, যেখানে কাজ করছে, সেখানে এক সময় সে নেতৃত্ব দেওয়ার স্তরে পৌঁছবে। এই লিডারশিপ স্কিল তৈরি করতে হলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। যেমন, দলের মধ্যে একটা মত প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে রাজি করানো একটা বড় ব্যাপার। তার জন্য নিজের চিন্তা এবং অনুভূতিকে ঠিকমত প্রকাশ করতে জানতে হয়। সবাইকে উৎসাহ দিয়ে বুঝিয়ে রাজি করানো এবং নিজের দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে অন্যের আস্থা অর্জন করাটাও একটা জরুরি শিক্ষা।

যখন কোনও টিম-এ কাজ করছ, তখন কেবল ভাবনা এবং পরিশ্রম দিয়ে টিমকে সমৃদ্ধ করলেই হবে না। নিজেকেও সহকর্মীদের অনুভূতির সঙ্গে গড়েপিটে নিতে হবে; ঠিক কাজটা বের করে আনার জন্য প্রয়োজনে কঠোরও হতে হবে। টিমওয়ার্ক মানে কিন্তু একটা টিমকে দিয়ে কতটা কাজ করানো গেল তা নয়, একটা টিম নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে কতটা কাজ করল, সেটাই আসল। 

 

• থিংকিং স্কিল্স

অন্যে যা ভাবছে, সেটাকেই সহজে গ্রহণ করো না। নিজের ভাবনা-চিন্তা-কল্পনার ওপর জোর দাও। এখন চাকরির ক্ষেত্রে যা প্রতিযোগিতা, তাতে নিজের কাজে যে যত সৃষ্টিশীল হতে পারবে, সে তত এগিয়ে যাবে।

সমস্যা হলে দেখবে অধিকাংশ মানুষ সেটা নিয়েই মেতে যায়। কিন্তু যে সমস্যা সমাধান করে, সে-ই লিডার হয়। ফলে ঠান্ডা মাথায়, যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতির বিচার করে, সমাধানের পথ খোঁজাটা বুদ্ধিমানের কাজ। 

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একটা বড় দক্ষতা। একটা পরিস্থিতি কী চাইছে, সেটা বুঝে নিয়ে এবং সেই পরিস্থিতির কী কী সমাধান হতে পারে, সেটা ভেবে তোমার যা ঠিক মনে হবে, সেই অনুযায়ী একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেকেই নানা রকম পথ বাতলাতে পারে, কিন্তু কোনও একটা পথ চিহ্নিত করতে বললে, দ্বিধায় পড়ে যায়। সেটা কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা খুব বড় গুণ।

 এই সব স্কিল কিন্তু শুধু কাজের জায়গায় সাফল্য পাওয়ার জন্য নয়। জীবনের প্রতি মুহূর্তে এর প্রয়োজন। পেশাদার জীবন আর ব্যক্তিগত জীবন নিশ্চয়ই আলাদা, কিন্তু একটা জীবন বাঁচতে হলে তার সাধারণ কিছু সমীকরণ থাকে, যা দুইয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দু’ক্ষেত্রে দু’রকম নীতি তৈরি করলে কিন্তু কোনও দিকেই সফল হতে পারবে না।