স্নাতক স্তরে রাজ্যে এবং বাইরে কোথায় কোথায় ইকনমিক্স পড়া যাবে?

আমাদের রাজ্যে কলকাতা, বর্ধমান, কল্যাণী, উত্তরবঙ্গ, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অন্তর্গত বহু কলেজেই অর্থনীতি পড়ানো হয়। মৌলানা আজাদ (http://mackolkata.ac.in), বিদ্যাসাগর (www.vidyasagarcollege.edu.in), আশুতোষ (www.asutoshcollege.in), লেডি ব্রেবোর্ন, বেথুন (www.bethunecollege.ac.in), যোগমায়া দেবী (www.jogamayadevicollege.org), বাসন্তী দেবী (www.basantidevicollege.edu.in), বিধাননগর (www.bidhannagarcollege.org), কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট (www.krishnagargovtcollege.org) ইত্যাদি অনেক কলেজেই অর্থনীতি বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়া সেন্ট জেভিয়ার্স (স্বশাসিত) (www.sxccal.edu), রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেনশিয়াল কলেজ নরেন্দ্রপুর অটোনমাস (www.rkmcnarendrapur.org/), প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় (www.presiuniv.ac.in/web), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও (www.jaduniv.edu.in) স্নাতক স্তরে বিষয়টি নিয়ে পড়া যায়। 

রাজ্যের বাইরে বহু প্রতিষ্ঠানেই অর্থনীতি পড়ানো হয়। সে ক্ষেত্রে দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স (www.ststephens.edu), লেডি শ্রীরাম (https://lsr.edu.in), মিরান্ডা হাউস (www.mirandahouse.ac.in) বা হিন্দু কলেজ (www.hinducollege.ac.in), মুম্বইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (xaviers.edu/main), মাদ্রাস প্রেসিডেন্সি কলেজ (www.presidencycollegechennai.ac.in), বেঙ্গালুরুর ক্রাইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় (https://christuniversity.in//) এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। 

 

ভর্তি হওয়া যায় কী ভাবে?

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়। তবে কোথাও কোথাও প্রবেশিকা পরীক্ষা হয়। সেখানে মোটামুটি ইংরেজি এবং অঙ্কের উপরেই পরীক্ষা হয়। 

 

উচ্চশিক্ষা? কোন কোন দিকে কী রকম সুযোগ রয়েছে? স্নাতকোত্তর পড়ার সময় অনেক ভাল প্রতিষ্ঠানেই প্রবেশিকা পরীক্ষা নেয়। সেগুলোর জন্য কী ভাবে তৈরি হবে ছেলেমেয়েরা?

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই বিষয়টি বি এসসি হিসেবে পড়ানো হয়। তবে দু’একটা জায়গায় বি এ হিসেবেও অর্থনীতি পড়ানো হয়। বি এ বা বি এসসি-র পরে এম এ বা এম এসসি, এম ফিল, পিএইচ ডি করা যায়। সেন্ট্রাল বা স্টেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে এই ধরনের উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকেই। অনেকে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে (আইএসআই, www.isical.ac.in) মাস্টার অব সায়েন্স ইন কোয়ান্টিটেটিভ ইকনমিক্স কোর্স পড়তে যায়। ভর্তি হতে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট পরিচালিত প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হয়। কোর্সটি দু’বছরের। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব সোশাল সায়েন্সেস-এর অন্তর্গত সেন্টার ফর ইকনমিক স্টাডিজ় অ্যান্ড প্ল্যানিং (জেএনইউ, www.jnu.ac.in/SSS/CESP/), দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স (ডিএসই, econdse.org), ইন্দিরা গাঁধী ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ (www.igidr.ac.in)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতেও অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা করা যায়। জেনারেল ইকনমিক্স, ফিনানশিয়াল ইকনমিক্স, অ্যাপ্লায়েড কোয়ন্টিটেটিভ ফিনান্স, এনভায়রনমেন্টাল ইকনমিক্স, অ্যাকচুয়ারিয়াল ইকনমিক্স-এর মতো হরেক বিষয়ে এম এসসি পড়ানো হয় ম্যাড্রাস স্কুল অব ইকনমিক্স-এ (www.mse.ac.in)। 

দিল্লি বা কলকাতা আইএসআই-তে যে ধরনের প্রবেশিকা পরীক্ষা হয়, ডিএসই বা জেএনইউ-র পরীক্ষার ধরন তার থেকে কিছুটা আলাদা। মোটামুটি সব পরীক্ষাই অঙ্ক এবং ইকনমিক্সের উপরে হয়। ইকনমিক্সের পাঠ্যবইতে যে সব জায়গা  বা অংশগুলি সে ভাবে পড়ানো হয় না বা তাদের সম্পর্কে বেশি বলা থাকে না, সেখান থেকেই প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মূলত মাইক্রোইকনমিক্সের উপরেই জোর দেওয়া হয়। ম্যাক্রোইকনমিক্সের উপরেও প্রশ্ন আসে, তবে বেশি নয়। আর অঙ্কের পরীক্ষাটা হয় বি এসসি পাস স্তরের। ফলে পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা জানার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের অন্যান্য জিনিসও জানতে হবে।  

স্নাতকোত্তর পড়ার সময় ফিনান্স, অ্যাপ্লায়েড ইকনোমেট্রিক্স, ইন্ডিয়ান ইকনমি, ব্যাঙ্কিং, গেম থিয়োরি, লেবার ইত্যাদি পড়ানো হয়। তবে বর্তমানে ডেটা মাইনিং, মেশিন লার্নিং, বিগ ডেটা অ্যানালিসিস, কম্পিউটেশনাল ইকনমিক্স, প্রেডিকটিভ অ্যানালিসিস-এর মতো নতুন নতুন স্পেশালাইজ়েশন বিষয়ও উঠে এসেছে। মূলত শিল্পক্ষেত্রে এই ধরনের জিনিসগুলির এখন প্রয়োজন হচ্ছে। যার ফলে তৈরি হয়েছে বাজার। আর তার জন্যই এই সব বিষয়ে দক্ষ পড়ুয়াদের নিয়োগ করছে সংস্থাগুলি। সমস্যা হল, ডেটা মাইনিং, মেশিন লার্নিং পড়ানো বা শেখানোর মতো পরিকাঠামো বা শিক্ষক মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে। যদিও আশা করা যায় আগামী দিনে আরও বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবে ছেলেমেয়েরা।

 

যারা পরে বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা করতে চায়, তারা কী ভাবে এগোবে? 

অধিকাংশই ছাত্রছাত্রীই যায় এম এসসি করার পরে, পিএইচ ডি বা আরও উচ্চতর গবেষণা করতে। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকায় পড়তে যেতে জিআরই, টোয়েফ্‌ল দিতে হয়। এ ছাড়াও ছেলেমেয়েরা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজ়িল্যান্ড বা ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড-এর মতো ইউরোপের নানা দেশে পড়তে যায়, মূলত স্নাতক স্তরের পরে মাস্টার্স পড়তে। আমেরিকায় মাস্টার্স পড়তে স্কুল ও কলেজ মিলিয়ে ১৬ বছরের পড়াশোনা থাকা প্রয়োজন হয়। তাই যারা আমেরিকায় পড়তে যায়, তারা সাধারণত এখান থেকে মাস্টার্স করে, তার পর ওখানে আরও হায়ার স্টাডিজ় করে। ইংল্যান্ডে এই ব্যাপারটা নেই। তা ছাড়া ওখানকার মাস্টার্স এক বছরের। ফলে ছেলেমেয়েরা ওখানে এই এক বছরের মাস্টার্স পড়ে নিয়ে, তার পর পিএইচ ডি বা অন্য কোনও হায়ার স্টাডিজ়-এর ক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। আমেরিকায় বা ব্রিটেনে স্নাতকোত্তর স্তরে স্কলারশিপের সুযোগ খুব একটা বেশি নেই। বরং পিএইচ ডি স্তরে টিচিং অ্যাসিসট্যান্টশিপ বা রিসার্চ অ্যাসিসট্যান্টশিপ-এর সময় স্কলারশিপ পাওয়া তুলনামূলক ভাবে সহজ হয়। 

মেনস্ট্রিম ইকনমিক্স আর হেটেরোডক্স ইকনমিক্স— পিএইচ ডি স্তরে মূলত দুটি শাখায় উচ্চশিক্ষা করে ছেলেমেয়েরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমআইটি, হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, ইয়েল, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া, ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি কিংবা ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স-এর মতো অনেক প্রতিষ্ঠানেই মেনস্ট্রিম ইকনমিক্স নিয়ে গবেষণা হয়। স্বাভাবিক ভাবেই মেনস্ট্রিম ইকনমিক্স পড়ে অনেক বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী। আর যারা হেটেরোডক্স ইকনমিক্স বা পলিটিকাল ইকনমি নিয়ে উচ্চশিক্ষা করতে চায় তারা যোগ দিতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ওয়াশিংটন ডিসি, ইউটাহ্ ইউনিভার্সিটি বা ম্যাসাচুসেট্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি, সাসেক্স ইউনিভার্সিটি অথবা লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ়-এ।   

 

যদি কেউ স্নাতক স্তরে ইকনমিক্স পড়ে পরে অন্য কোনও বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা করতে চায়, সে ক্ষেত্রে তার সুযোগ কী রকম? 

অধিকাংশ ছেলেমেয়েই ক্যাট, ম্যাট, জ্যাট-এর মতো সর্বভারতীয় ম্যানেজমেন্ট পরীক্ষা দিয়ে আইআইএম, আইআইএফটি, এক্সএলআরআই, আইআইএসডব্লিউবিএম-এর মতো প্রতিষ্ঠানে এমবিএ পড়তে চলে যায়। কিছু ছেলেমেয়ে পরে ফিনান্স, অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড নিয়ে পিএইচ ডি করে। কেউ কেউ আবার সি এ, ল’ পড়তেও যায়। যদিও এদের সংখ্যা তুলনায় অনেক কম। 

ইকনমিক্সকে কেরিয়ার করতে হলে কী কী বিষয় মাথায় রাখা চাই?

ক্যালকুলাস, লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, ম্যাট্রিক্স অ্যালজেব্রা তো ভীষণ ভাবে ব্যবহার করা হয় ইকনমিক্স-এ। তাই অংকের ভিতটা ভাল হওয়া চাই। আর দুই, ইংরেজির ওপর দখল থাকতে হবে। কারণ ইকনমিক্স-এর প্রায় সব ক’টি পাঠ্যবই-ই ইংরেজিতে লেখা। তা ছাড়া, ভাষার দখল না থাকলে বিষয়টা কতটা বুঝেছে সেটা ছাত্রটি ঠিকমতো প্রকাশই করতে পারবে না। আর দরকার, আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন প্রসঙ্গের ওপর স্বাভাবিক আগ্রহ।

আগে মাইক্রোইকনমিক্স ছিল অনেক বেশি থিয়োরিনির্ভর। এখন হয়ে গিয়েছে অঙ্কনির্ভর। ফলে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির অঙ্ক ভাল জানা থাকলে এ ক্ষেত্রে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস, ইন্টিগ্রেশন, লিমিট কন্টিনিউইটি— এই ধরনের জিনিসগুলি মাইক্রোইকনমিক্সে খুবই কাজে লাগে। থার্ড ইয়ারে অপ্টিমাইজ়েশন টেকনিক-এর যে বিষয়টি পড়ানো হয়, সেটা কিন্তু এই সব অঙ্ক দিয়ে হবে না। সেটা আমরা, শিক্ষকরাই ছেলেমেয়েদের শেখাব। অন্য দিকে, ম্যাক্রোইকনমিক্স বিদেশে অনেক বেশি অঙ্কনির্ভর হলেও আমাদের দেশে কিন্তু এখনও অনেক বেশি থিয়োরিনির্ভর হয়ে আছে। যার ফলে আমার মতে, ম্যাক্রোইকনমিক্সের পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমরা বিদেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছি। এর ফলে মাইক্রোইকনমিক্স বা অন্যান্য বিষয়ে যত গবেষণা হয়, ম্যাক্রোইকনমিক্সে প্রায় হয়ই না। যার কারণে এই ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষক বা গবেষকও তৈরি হচ্ছে না। 

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ম্যাক্রোইকনমিক্স হোক বা মাইক্রোইকনমিক্স, ছেলেমেয়েদের টেক্সট বইগুলো খুব ভাল করতে পড়তে হবে। শুধু নোট, বা ক্লাসে যা বলা হচ্ছে তা পড়ে রাখলে হবে না। একই সঙ্গে বইয়ে অনুশীলন থাকলে, সেগুলো সল্ভ করতে হবে। যদি কোথাও আটকে যাও শিক্ষকের কাছ থেকে বুঝে নাও বা প্রশ্ন সল্ভ করার পদ্ধতিটা দেখে নাও। এই ধরনের অনুশীলনে অনেক সময়েই এমন অনেক কিছু থাকে যেগুলো হয়তো ক্লাসে পড়ানো হয় না। এগুলো দেখতে বা করতে গিয়ে তোমার বিষয়ের উপরে দক্ষতা আরও বাড়বে। এবং অনেক ক্ষেত্রে আইএসআই, জেএনইউ বা দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স-এর পরীক্ষায় এই ধরনের অঙ্ক বা বিষয়ের জ্ঞান কাজে লেগে যায়।  

  

কাজের সুযোগ কেমন?  

অনেকে যোগ দেয় ইন্ডিয়ান ইকনমিক সার্ভিস, ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস বা ডব্লিউবিসিএস-এর মতো সরকারি চাকরিতে। কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ থাকলেও স্কুলে অর্থনীতি সে ভাবে পড়ানো হয় না বলে অর্থনীতি পড়ানোর সুযোগ কমই পাওয়া যায়। রেলের বা ব্যাঙ্কের চাকরিতেও যেতে পারে ছেলেমেয়েরা। বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি, ইনশিয়োরেন্স, ফিনান্স বা বাণিজ্যিক সংস্থার অ্যানালিটিক ডিভিশনেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কাজ পাওয়া যায়। স্যাপ, এসপিএসএস-এর মতো বিভিন্ন সফ্টওয়্যার শেখা থাকলে নানা ধরনের চাকরির সুযোগ মেলে।