প্রশ্ন: মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি কী? স্নাতক স্তরে বিষয়টি পড়তে কী যোগ্যতা লাগে? কী ভাবে এই কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়? কোথায় পড়ানো হয়? উচ্চশিক্ষা এবং কাজের সুযোগ কেমন?  

অর্ক দেবদত্ত, কলকাতা
 

জাহাজ চালাতে যে ধরনের যন্ত্রপাতি লাগে, তা সবই মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অন্তর্গত। প্রথাগত ইঞ্জিনিয়ারিং-এর থেকে কিন্তু মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কিছুটা পার্থক্য আছে। জাহাজের মোট দুটো ভাগ— টেকনিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং আর নটিক্যাল। নটিক্যাল হল মূলত ন্যাভিগেশন। মানে জাহাজের গতিপথ, কোথায় জাহাজে তেল ভরা হবে, জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, সেগুলো জাহাজে তোলা, নামানো ইত্যাদি সবই পড়ে নটিক্যাল-এর মধ্যে। আর এ সব করতে যে সব যন্ত্রপাতির দরকার হয়, সেগুলি পড়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মধ্যে।

যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং, তাই বিজ্ঞান থাকা আবশ্যিক। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষায় ফিজ়িক্স, কেমিস্ট্রি ও ম্যাথমেটিক্স-এ গড়ে ৬০ শতাংশ নম্বর এবং ইংরেজিতে ৫০ শতাংশ নম্বর থাকতে হবে। 

 

ভর্তি

আগে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি নেওয়া হত আইআইটি-র প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে। এখন অল ইন্ডিয়া কমন এন্ট্রান্স টেস্ট-এর (সিইটি) মাধ্যমে হয়। পরীক্ষাটা সাধারণত হয় জুন মাসে। আর মার্চ-এপ্রিল থেকে চালু হয় এর বিজ্ঞপ্তি। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রায় সব আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সের ক্ষেত্রে (বিবিএ ছাড়া) যে পরীক্ষা হয়, তাতে মাল্টিপল চয়েস প্রশ্ন থাকে ২০০টা। ইংরেজি, জেনারেল অ্যাপটিটিউড, দ্বাদশ শ্রেণি স্তরের ফিজ়িক্স, কেমিস্ট্রি এবং অঙ্ক থেকে প্রশ্ন করা হয়। কোনও নেগেটিভ মার্কিং থাকে না। পরীক্ষাটা হয় অনলাইন। যারা রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা আইআইটি জয়েন্ট এন্ট্রান্স-এর পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তারা অনায়াসেই এই পরীক্ষা দিতে পারে। সাধারণ আইএমইউ সিইটি-র অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন বেরোয় এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে। তিনটি সিইটি পরীক্ষা হয়। একটা, বিভিন্ন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তির জন্য, একটি মেরিন সংক্রান্ত এমবিএ কোর্সে ভর্তির জন্য এবং আর একটি এম টেক-এ সুযোগ পাওয়ার জন্য।

 

স্নাতক স্তরে কোর্স

বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (৪ বছর), বি টেক নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড ওশেন ইঞ্জিনিয়ারিং (৪ বছর), বি এসসি নটিক্যাল সায়েন্স (৩ বছর), বি এসসি শিপ বিল্ডিং অ্যান্ড রিপেয়ার-এর (৩ বছর) মতো কোর্সে ভর্তি হতে পারে ছেলেমেয়েরা। এ ছাড়াও, ৩ বছরের বিবিএ (লজিস্টিক্স, রিটেলিং অ্যান্ড ই-কমার্স) এবং এক বছরের ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স (যা শেষ করে পরে বি এসসি অ্যাপ্লায়েড নটিক্যাল সায়েন্সে যোগ দেওয়া যায়) পড়ারও সুযোগ রয়েছে। এই দুটি কোর্সের জন্য আলাদা সিইটি হয়। বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দ্বিতীয় বর্ষে ল্যাটারাল এন্ট্রি-র মাধ্যমে যোগ দিতে পারে ডিপ্লোমা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা। 

 

প্রতিষ্ঠান ও কোর্স

ইন্ডিয়ান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি (আইএমইউ) হল কেন্দ্রীয় সরকারের জাহাজ মন্ত্রকের অন্তর্গত একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস রয়েছে কলকাতা (www.merical.ac.in), মুম্বই পোর্ট, নভি মুম্বই, চেন্নাই, বিশাখাপত্তনম এবং কোচিন-এ। বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন কোর্স পড়ানো হয়। যেমন, 

• কলকাতা ক্যাম্পাসে আছে: মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (বি টেক ও এম টেক), ম্যানেজমেন্ট (এমবিএ)

• চেন্নাই ক্যাম্পাসে আছে: নটিক্যাল সায়েন্স (বি এসসি, ডিএনএস), মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (বি টেক), ম্যানেজমেন্ট (বিবিএ, এমবিএ), কমার্শিয়াল শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক্স (এম এসসি)

• কোচি ক্যাম্পাসে আছে: নেভাল আর্টিটেকচার (বি টেক), নটিক্যাল সায়েন্সেস (বিএসসি), ম্যানেজমেন্ট (বিবিএ) 

• মুম্বই পোর্ট ক্যাম্পাসে আছে: মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (বি টেক, পিজিডিএমই)

• নভি মুম্বই ক্যাম্পাসে আছে: নটিক্যাল সায়েন্স (বি এসসি, ডিএনএস), কমার্শিয়াল শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক্স (এম এসসি)

• বিশাখাপত্তনম ক্যাম্পাসে আছে: নেভাল আর্কিটেকচার (বি টেক, এম টেক), ড্রেজিং অ্যান্ড হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং (এম টেক), ম্যানেজমেন্ট (এমবিএ)। 

এ ছাড়াও আইএমএউ-অধীনস্থ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্নাতক বা ডিপ্লোমা কোর্স পড়া যায়। যেমন,

• অ্যাংলো ইস্টার্ন মেরিটাইম অ্যাকাডেমি, মুম্বই (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.angloeasterncollege.com

• অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.ariedu.com

• কোয়েম্বাত্তুর মেরিন কলেজ, কোয়েম্বাত্তুর (বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং)

www.cmcmarine.in

• ড. বি আর অম্বেডকর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, পোর্ট ব্লেয়ার (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

https://dbrait.andaman.gov.in/#no-back-button

• ইউরোটেক মেরিটাইম অ্যাকাডেমি, কোচিন (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স, বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং)

https://eurotechmaritime.org

• এইচআইএমটি কলেজ, চেন্নাই (বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, বি এসসি নটিক্যাল সায়েন্স)

www.himtcollege.com

• ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট, নয়াদিল্লি (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স, বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং) 

www.imi.edu.in

• মেরিটাইম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এসসিআই), মুম্বই ((ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.shipindia.com/maritime-training/overview.aspx

• আর এল ইনস্টিটিউট অব নটিক্যাল সায়েন্সেস, মাদুরাই (বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং)

http://rlins.edu.in

• সমুদ্র ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম স্টাডিজ, মুম্বই (ডিপ্লোমা ইন অ্যাপ্লায়েড নটিক্যাল সায়েন্স, বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং)

www.samundra.com

• দ্য গ্রেট ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম স্টাডিজ়, মুম্বই (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.geinstitute.com

• তোলানি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট, পুণে (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স, বি এসসি নটিক্যাল সায়েন্স, বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং)

www.tmi.tolani.edu

• ট্রেনিং শিপ রহমান, মুম্বই (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.tsrahaman.org

• বিশ্বকর্মা মেরিটাইম ইনস্টিটিউট, পুণে (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

http://vmipune.com

• ইয়াক এডুকেশন ট্রাস্ট, মুম্বই (ডিপ্লোমা ইন নটিক্যাল সায়েন্স)

www.yakindia.com ইত্যাদি

• এগুলি ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত কোর্স পড়ানো হয়। 

 

উচ্চশিক্ষা

এম টেক বা এম এসসি করা যায়। এম টেক পড়ানো হয় তিনটি বিষয়ে— নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড ওশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ড্রেজিং অ্যান্ড হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট। এম টেক 

পড়তে গেলে কিন্তু তাকে বি টেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বা বি টেক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি সিইটি পরীক্ষা হয়। ইংরেজি, অঙ্ক ছাড়াও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, নেভাল আর্কিটেকচার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো যে কোনও একটা বিষয় থেকে প্রশ্ন। আর এম এসসি পড়ানো হয় কমার্শিয়াল শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক্স-এ। আইএমইউ-তে এম এসসি ও 

পিএইচ ডি-ও হয়। এর জন্য আলাদা পরীক্ষা রয়েছে। 

 

কাজ

ইন্ডিয়ান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, (আইএমইউ) কলকাতার অধ্যাপক কৃষ্ণেন্দু দাস এই বিষয়ে জানালেন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সটা অনেকটা প্যারামিলিটারি কোর্সের মতো। ফলে এ ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, বিচক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে সে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে যোগ দেবে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেখানে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে থাকার পরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে উঁচু পদে উঠতে পারবে। মানে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার পরের পোস্টটাই হল ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার। সেটা হতে তাকে ডিরেক্টর জেনারেল অব শিপিং-এর পরীক্ষা দিতে হবে। সেটা পাশ করলে তবেই সে ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে। একই ভাবে নটিক্যাল সায়েন্স পাশ করে যোগ দেওয়া যাবে জুনিয়র অফিসার হিসেবে। এবং তার পরে একই ভাবে পরীক্ষা দিয়ে এক সময় সে জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে পারবে। যদি সে কোনও কারণে পরীক্ষায় পাশ না করে, তা হলে কিন্তু সে ওই র‌্যাঙ্কে পৌঁছতে পারবে না। এই পরীক্ষাগুলো কিন্তু বেশ শক্ত হয়। এই পরীক্ষাগুলোকে বলে ‘সার্টিফিকেট অব কম্পিটেন্সি’। তবে এটা শুধু ভারতেই নয়, গোটা দুনিয়ায় এই নিয়ম রয়েছে। কারণ ছাত্র বা ছাত্রীটি যে কোনও দেশের জাহাজে যোগ দেবে যে! এ ছাড়া বিভিন্ন জাহাজ সংস্থায়, বহুজাতিক সংস্থাতেও যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকে আমাদের ছেলেমেয়েদের।