বিকল্প বিপ্লব/ যে ভাবে দারিদ্র কমানো সম্ভব

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্বাতী ভট্টাচার্য

২০০.০০ 

আনন্দ পাবলিশার্স

আলোচ্য বইটির অনেকগুলি নিবন্ধ বিচ্ছিন্ন ভাবে পড়া ছিল সংবাদপত্রের পাতা থেকে। কখনও ইংরেজিতে অভিজিৎ বিনায়কের একক, কখনও বাংলায় স্বাতীর, কখনও দু’জনের এক সঙ্গে বাংলায়। অভিজিৎ অর্থনীতির বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিত, আমেরিকার এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশন অধ্যাপক। স্বাতী বাংলা সাংবাদিকতায় অন্য মাত্রা এনেছেন দীর্ঘ কাল ধরে ধারাবাহিক ভাবে তাঁর গবেষণাঋদ্ধ উত্তর-সম্পাদকীয় রচনায়। এঁদের যৌথ রসায়নের ফলস্বরূপ পাওয়া গেল সম্পূর্ণ অন্য রকম এই প্রবন্ধ সংকলন।  

কী এই ‘বিকল্প বিপ্লব’? শিরোনামেই রয়েছে, ‘যে ভাবে দারিদ্র কমানো সম্ভব’। কেউ বলেন রাজনীতির আমূল সংস্কার না করলে কিছুই হওয়ার নয়। কেউ বা বলেন দুর্নীতিই যাবতীয় অনিষ্টের মূল, একে সমূলে উৎপাটন করতে হবে আগে। কথাগুলি সত্যি হলেও হতে পারে, কারণ তেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন যে হেতু বাস্তবে অধরাই থেকে যায়, কথাগুলিও পরীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায় না। আর কবে সেই মহা পরিবর্তন ঘটবে সেই আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো আর গরিবের জীবনে উন্নতি আসবে না। একটা সময় ছিল যখন পুঁজিবাদী বিকাশের দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের চরিত্র, আধা সামন্ততন্ত্র না নয়া উপনিবেশ— এ সব নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামানো হত। সে ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতির বড় প্রশ্নের যুগ। তারপর ভল্‌গা ও ইয়াংসি দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গিয়েছে। ‘সার্বিক বিপ্লব’ কিংবা ‘আমূল পরিবর্তন’— এই সব বাক্যবন্ধে স্বাভাবিক ভাবেই অভিজিৎ ও স্বাতীর তেমন আগ্রহ নেই। 

যে মূল প্রশ্নটি প্রবন্ধগুলিতে ঘুরেফিরে এসেছে তা হল, দারিদ্র কমাতে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ গরিবের কতটা উপকার করছে। প্রশ্নটির গুরুত্ব প্রশ্নাতীত, কিন্তু আমরা অনেকেই এ প্রশ্ন তুলি না এর বিপদের কথা ভেবে। বিপদটা হল, যদি বেরিয়ে পড়ে দারিদ্র কমাতে যে অর্থব্যয় হচ্ছে তা গরিবের কাজে লাগছে না, তা হলে এ বাবদে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার জন্যে জনমত তৈরি হবে, ফলে সরকারেরও সুবিধা হবে সে পথে হাঁটা। পরবর্তী বাজেটে যখন দারিদ্র কমানোর প্রকল্পগুলিতে কাটছাঁট হবে বিরোধীরা শোরগোল তুলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না। কিংবা শোরগোল তোলার আগে দু’বার ভাববে, গরিবদের পক্ষে বলব, না ‘আমজনতার’। আজকালকার স্লোগানে ‘আম আদমি’ যত মুহুর্মুহু শোনা যায়, ‘গরিব’ ততটা নয়। সব দলই হিসেব করে দেখেছে গরিব নিয়ে বেশি ‘বাড়াবাড়ি’ করলে আম আদমি ছেড়ে দেবে না— আম আদমি মানে যাঁরা রান্নার গ্যাস থেকে উড়োজাহাজের ভাড়ায় ভর্তুকি চান আর একশো দিনের কাজের উপর যাঁরা বেজায় খাপ্পা। বস্তুত ‘জনমত’ তৈরিতে গরিবদের ভূমিকা ক্রমশই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। জোরালো জনমতটা হল, সরকার তো ভোটবাক্সের দিকে তাকিয়ে শুধু গরিবদেরই ঢেলে দিচ্ছে। আজ দু’টাকা কিলো চাল তো কাল বাড়ি বানানোর টাকা। আর গরিবরা হাতে টাকা পেলেই নিশ্চিত ভাবে শুঁড়িখানায় ভিড় করবে! আমজনতার এ হেন মনোভাব আন্দাজ করেই তো দারিদ্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি আজকাল আর বাড়াবাড়ি করে না বিশেষ। তারা বলে ‘আম আদমি’র কথা। ‘আম আদমি’ বর্গটি এমনই যে হাশেম শেখ থেকে মুকেশ আম্বানি সবাইকেই এর মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া যায়। আবার অন্য দিকে, এক ধরনের গরিবদরদী রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে যেখানে গরিবদের নামে চালু যে কোনও ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই তাকে গরিবের স্বার্থবিরোধী বলে দেগে দেওয়া হয়। তাই শুধু গরিবদের কী ভাবে উন্নতি হতে পারে এই ভাবনা ভাবা এবং একই সঙ্গে গরিবদের জন্যে চালু প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিছুটা স্রোতের বিপরীতে হাঁটা তো বটেই, বিশেষত পথটা যখন বিপদসঙ্কুল।

অভিজিৎ ও স্বাতী এই বিপদ সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন। তাই এক দিকে যেমন দেখানোর চেষ্টা করেছেন কী ভাবে দারিদ্র কমানোর প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ অর্থ একটু ভেবেচিন্তে খরচ করলে অনেক বেশি পরিমাণে দারিদ্র কমানো যায়। অন্য দিকে, গরিবদের জন্যে খরচের সবটাই যে অপচয়—জনমানসে প্রোথিত এই ধারণারও যে তেমন সমর্থন পাওয়া যায় না গবেষণায়— তাও দেখিয়েছেন। তবু ভুল বোঝার বিপদ থেকে, প্রতি-আক্রমণ থেকে, তাঁরা যে সব সময় নিজেদের বাঁচাতে পারেননি তা স্বীকার করেছেন। যেমন জয়পুর সাহিত্য উৎসবে অভিজিৎ বলেছিলেন কী ভাবে উত্তরপ্রদেশের গ্রাম শিক্ষা কমিটিগুলি বেশির ভাগ কাগজে-কলমেই রয়ে গিয়েছে। শুনে এক তরুণী অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে জানতে চান তাঁর গুপ্ত উদ্দেশ্যটি কী? যাবতীয় সরকারি পরিষেবা কি তিনি তুলে দিতে চান? প্রায়শই দেখা যায় তথ্য ও যুক্তি শোনার চাইতে বক্তার মানসিকতা বোঝার চেষ্টা হয় বেশি, এবং তাঁকে কোনও একটা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে না পারলে শ্রোতা শান্তি পান না।

বইয়ের নিবন্ধগুলি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত— নীতি ও গণতন্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, এবং উন্নয়নের বিতর্ক। বিতর্ক শব্দটি শুধু শেষোক্ত শিরোনামে থাকলেও, বিতর্কের অবকাশ প্রায় সব রচনাতেই রয়েছে কমবেশি। যেমন ‘গণতন্ত্র কেন মূল্যবান’ রচনায় লেখকরা নাগরিক আন্দোলনের নেতাদের আদালতের সাহায্যে রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করার যে প্রবণতা— যাকে আমরা সাধারণত একটি সদর্থক ও আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত—তার  সমালোচনা করেছেন। অন্না হাজারে, জঁ দ্রেজ, অরুণা রায়ের মতো সমাজকর্মীরা যে কখনও বিচারব্যবস্থা দিয়ে কখনও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত ক’রে ‘গণতন্ত্র ডিঙিয়ে’ মানুষের কাছে প্রাপ্য পৌঁছে দিতে চাইছেন, এই কথাটি হয়তো অনেকেই মানতে পারবেন না, কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এই ধারায় নাগরিক আন্দোলন ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’র নামে দুর্নীতিগ্রস্ত পঞ্চায়েত প্রধান কিংবা সরকারি কর্মীদের প্রত্যক্ষ বিচার ও শাস্তিবিধানে যে নেমে পড়তে পারে, সে সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব-মূলক গণতন্ত্রে ‘দমদম দাওয়াই’ চলে না। তা হলে যখন দেখছি কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্মী গরিবের প্রাপ্য তাঁদের কাছে পৌঁছতে নির্ধারিত কাজটি করছেন না, উপায় কী? উপায় হল রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা। লেখকদের তা’ই মত। শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য  পরিষেবা যখন সবার মধ্যে পৌঁছনোর চাপ আসে এই প্রতিযোগিতা থেকে, গরিবদেরই লাভ হয় বেশি। তামিলনাডুর মিড-ডে মিল থেকে বিহারে নীতীশ কুমার প্রবর্তিত মেয়েদের জন্যে সাইকেল এই ভাবেই এসেছে, যার উল্টো পথে হাঁটার ঝুঁকি এখন আর কোনও রাজনৈতিক দলই নিতে পারে না। আর এই প্রতিযোগিতা উস্কে দিতে সংবাদ মাধ্যমের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

নিবন্ধগুলি এক সঙ্গে পড়লে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগতে পারে পাঠকের মনে। যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে গরিবদের লাভ হয় পরিষেবার প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে, সেই প্রতিযোগিতাই কিন্তু আবার কোনও চালু প্রকল্প সংস্কারের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি তড়িঘড়ি এমন প্রকল্প চালু হয়ে যায় যা শেষমেশ গরিবদের প্রকৃত উপকারের বদলে সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ধরা যাক স্বাস্থ্যবিমার ব্যাপারটা। এও সেই প্রতিযোগিতারই ফল। গরিব মানুষকে সরকারি খরচে অসরকারি হাসপাতালে পরিষেবার সুযোগ করে দেওয়ার এই প্রকল্প জনপ্রিয় হতে বাধ্য। তাই স্বাতীর নিবন্ধ ‘এখানে সস্তায় জরায়ু বাদ দেওয়া হয়’ রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা যোজনার যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে— যা এ রকম বিমাভিত্তিক ব্যবস্থায় একেবারেই অকল্পনীয় নয়— তার প্রভাবে নীতি নির্ধারকরা অন্য রকম ভাববেন সে সম্ভাবনা একেবারেই দেখা যাচ্ছে না। উল্টে রাজ্যে রাজ্যে নিজ নিজ স্বাস্থ্যবিমা চালু করার ধুম পড়ে গিয়েছে। অথচ অঙ্ক কষে দেখানো যায়, বিমা বাবদ সরকারের যে অতিরিক্ত খরচ হবে তার ভগ্নাংশও যদি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে উন্নত করতে ব্যবহৃত হত তা হলে গরিবদের লাভ হত বেশি। স্পষ্টতই, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা-উদ্ভূত জনপ্রিয় প্রকল্প যে সর্বদা গরিবের কল্যাণমুখী হবেই সে নিশ্চয়তা নেই। এই দ্বন্দ্বের নিরসনে অভিজিৎ ও স্বাতী হয়ত বলবেন তথ্যের গুরুত্বের কথা। মানুষ প্রকৃত তথ্য জানতে পারলে যে রাজনীতির অভিমুখ বদলে যেতে পারে তা গবেষণায় দেখা গিয়েছে। গবেষণালব্ধ তথ্যের নিরলস জোগানদার হিসেবে লেখকদ্বয় স্বভাবতই চাইবেন এর চাহিদাও বাড়ুক। তবে এই পোস্ট-ট্রুথ যুগে কোন তথ্যটি মানুষ কী ভাবে নেবেন আর তার প্রভাব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কী ভাবে পড়বে তার আন্দাজ পাওয়া মুশকিল।   

ঘন যুক্তিপূর্ণ অথচ সাবলীল গদ্যে লেখা নিবন্ধগুলি পাঠককে আকৃষ্ট করবে, ভাবাবে, প্ররোচিতও করবে তর্কে অবতীর্ণ হতে। বিকল্প বিপ্লবের রূপরেখা তো তর্কাতীত হতে পারে না