গান শেখাতে এসে ‘শিক্ষিতা পতিতা’ মানদা দেবীকে ওস্তাদ বলেছিলেন, “তোমার ব্রহ্ম সঙ্গীত অথবা স্বদেশী গান তো এখানে চলবে না। লপেটা, হিন্দি গজল অথবা উচ্চ অঙ্গের খেয়াল ঠুংরি এ সব হল বেশ্যা মহলের রেওয়াজ। কীর্তনও শিখতে পার।”

তাই কি? বাইজী সঙ্গীত বইয়ে ছাপা হয়েছে, “ভালবেসে যদি সুখ নাহি।” রবীন্দ্রনাথের গান। আঠারো শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের গোড়ার দুই-তিনটি দশক, প্রায় দেড়শো বছর কলকাতায় বেশ্যা-বাইজিরা ছিলেন সঙ্গীত-সংস্কৃতির ধারক বাহক। তাঁদের গানের ভাণ্ডার ছিল ধ্রুপদ থেকে খ্যামটা, বাউলাঙ্গ থেকে কৌতুকগীতি। মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের বহু গীতিকার ব্যবহার করেছেন সোনাগাজি তথা সোনাগাছি থেকে পাওয়া গানের পংক্তি। এই বইটিতে সংকলিত ছ’শোরও বেশি গান এই বিস্তারের নিদর্শন। সমাজ সম্মান করেনি, কিন্তু তাঁদের পারদর্শিতাকে কাজে লাগিয়েছে বিনোদনে, শিল্পের নির্মাণে। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, কে না মুগ্ধ হয়েছেন এঁদের প্রতিভায়।

এই সংকলনের উপক্রমণিকাটি ইতিহাস-সমাজতত্ত্বের প্রেক্ষিতে বারাঙ্গনাদের নিয়ে আলোচনা। সংযোজনে তারই অন্য দিক— মঞ্চে, চলচ্চিত্রে বারাঙ্গনার চরিত্রায়ণ। বাড়তি সম্পদ সে কালের চুয়াল্লিশজন বিখ্যাত বাইজির চিত্র। তাঁরা যে সেই সময়ের শিল্প ও সমাজের কতখানি ছিলেন, এই বই তার চমৎকার আন্দাজ দেয়।

অনিবার্য কারণে ‘অক্ষরেখা’ পত্রিকা পরিকল্পিত ‘দেশ বিভাজন’ বিষয়ক সংখ্যাটি প্রকাশ পায়নি, কিন্তু তার জন্যে ‘দেশ বিভাজন স্মরণে’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, সেটি এখানে এই প্রথম মুদ্রিত হল। লেখাটির অনেকটাই আত্মস্মৃতি: ‘‘উদ্বাস্তু কলোনিতে জীবিকার সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল তৈরি ও শিক্ষাভিযানও চলল পুরোদমে।... পড়াশোনায় দুর্মর তাগিদ দেখেছি সেদিনের বিজয়গড়-আজাদগড় ইত্যাদি অঞ্চলে। আমার প্রাক্তন কর্মকেন্দ্র, বিজয়গড় কলেজেই মূলত ছেলেরা, কিছু মেয়েরাও কোনো না কোনো ভাবে রোজগার করে পড়াশোনা করত। এটাও দেশভাগের ফলে সম্ভব হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলায় যারা স্কুল কলেজে যেত না, দেশভাগের পর তারা শিক্ষার দরকারটা খুব বুঝেছিল।’’ লেখিকার এ রকমই আরও বেশ কিছু রচনায় ঋদ্ধ সঙ্কলনটি। গোটা সঙ্কলনটিই এমন ভাবে বিন্যস্ত যাতে মহাশ্বেতার সাহিত্য ও সমাজকর্মের সম্মিলিত রূপটি প্রকাশ পায়। ফলে তাঁকে নিয়ে শুধু বিশিষ্ট জনেদের রচনাই  নয়, রচনাগুলিও তাঁর সৃষ্টি ও সংগ্রামের বিশিষ্টতাকে চিহ্নিত করে। মুদ্রণ পারিপাট্যে চমৎকার এই সঙ্কলন এমন সব বিরল সাদাকালো ছবিতে শোভিত, যেগুলি প্রায় মহাশ্বেতার জীবৎকালের (১৯২৬-২০১৬) প্রামাণ্য দলিল হয়ে উঠেছে। তাঁর সারা জীবনের লেখালেখি থেকে ‘‘জন্ম নেয় সাহিত্যের আর এক ইতিহাস, বলা যেতে পারে দলিত জীবন... নিম্নবর্গের সাহিত্য-ইতিহাস এমনকী দলিত নন্দনতত্ত্বও।’’— এটি পাঠকের জ্ঞাতার্থে আনাই যে এ-সঙ্কলনের প্রধান অভিপ্রায়, জানানো হয়েছে সম্পাদকীয়-তে।

দেবদারু কলোনি থেকে না স্নেহকরস্পর্শ— ১১টি বইয়ের কবিতাসংগ্রহ। শুধুমাত্র বইয়ের নামকরণেই পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ কবিদের উপর তিনি যেমন প্রভাব ফেলেছেন, তেমনই জনপ্রিয় হয়েছেন। যেমন, সহ্য করো, বাংলাভাষা, বা ঘন মেঘ বলে ঋ। হঠাৎ করে চোখ আটকে যায় কয়েকটি লাইনে। ‘‘সময় স্থির ও বর্তুল।/ এর আরম্ভ নেই, শেষ নেই, শুধু মাঠের উপরে/ অনেকক্ষণ একটা ফাঁকা টুপি পড়ে রয়েছে/ মহাকাল আসলে এইরকম:/ কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে চায়ের দোকান রক্তাক্ত/ কেরোসিন কাঠের বেঞ্চিতে/ কেউ নেই।’’ একই সঙ্গে উত্তাল সত্তরের দশক যেমন মনে পড়ে, আবার ঠিক তেমনই মনে হয় এ যেন কবিতার এক চলচ্চিত্র শুরু হল। ইচ্ছে করলেই তো তিনি জনপ্রিয় হওয়ার লাইন লিখতে পারতেন। ১৯৯৩-৯৪’এ লেখা কবিতাগুচ্ছ পরে বহুত আঁধিয়ার হো বাবু, হামে কুছ রোশনি চাহিয়ে (১৯৯৯) বইটি— ভাবতে অবাক লাগে কী অত্যাশ্চর্য সংযমে এমন স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা কবিতা সব সুব্রত তুলে রেখে দিয়েছিলেন বছরের পর বছর। প্রথম মুদ্রণে কবির ভাষ্য থেকে যা জানা গেল তাতে করে— সৌম্য দাশগুপ্তকে ঐকান্তিক ধন্যবাদ জানানো, কেননা বিপরীত গোলার্ধে বসবাস করেও তিনি যে বাংলা কবিতার গূঢ়তম পাণ্ডুলিপির সন্ধানে ব্যাপৃত থাকেন তা হয়তো অনেকেই জানেন না। অবশ্য এঁরা জানতে দিতে চানও না। সুব্রত সরকারের কবিতা টানা পড়ে যেতে থাকলে শেষে গিয়ে মনে হয়, সুব্রত কখনও কবিতাকে ছেড়ে যেতে পারেন, কিন্তু কবিতা কখনওই সুব্রতকে ছেড়ে যাবে না।