• logo
  • অভীককুমার দে
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ঠাকুর পরিবারের তথ্যভাণ্ডার

Thakubari
ঠাকুরবাড়ি: যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ‘টেগোর কাস্‌ল’ (১৯০৭)— আজ এ বাড়ি আমূল পরিবর্তিত। বই থেকে
  • logo

ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল

লেখক: চিত্রা দেব

মূল্য: ৪৫০.০০ 

প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ির জায়গা যে কতখানি তা ঠিকমতো বিশ্লেষণ করা কঠিন। আজকের আধুনিক নাগরিক সমাজ সংস্কৃতি জীবনচর্যা ঠাকুরবাড়ির প্রভাব বহন করছে সর্বাঙ্গে। এমন একটি পরিবারের বিষয়ে আমাদের আকর্ষণ ও কৌতূহল অফুরন্ত। চিত্রা দেবের ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮০-তে (নতুন সংস্করণ মার্চ ২০০৩)। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলেরও যে একটি বিচিত্র অন্তরঙ্গতা আছে বইটি তার পরিচয় বহন করছে। প্রকাশিত হওয়ার পরে বইটি বিশেষ সাড়া জাগিয়েছিল পাঠকমহলে। এ বার লেখক অন্দরমহল ছেড়ে বাহিরমহলের দিকে নজর দিয়েছেন। প্রকাশিত হয়েছে ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল। এ বই ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের জীবনচর্যা নিয়ে আলোচনা। প্রকাশিত-অপ্রকাশিত নানান তথ্য একত্র করে একটি সামগ্রিকতার ছবি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন লেখক। চিত্রা দেবের এই দুটি বই শুধু আধুনিক বাংলার ইতিহাসে নয়, ভারতের ইতিহাসেও একটি প্রয়োজনীয় বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। নতুন বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, ‘জোড়াসাঁকোর দুটি বাড়ি ছাড়াও আরও কয়েকটি ঠাকুরবাড়ি ছিল পাথুরিয়াঘাটা ও অন্যত্র। আদিতে একই পরিবারের সদস্য ছিলেন এঁরা। স্বনামধন্য এবং প্রতিনিধিস্থানীয় ব্যক্তি সেখানেও কম ছিলেন না। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রধান সহায়ক হিসেবে পেয়েছিলেন দুই জ্ঞাতিভ্রাতা দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্নকুমার ঠাকুরকে। স্বদেশে-বিদেশে ঠাকুর পরিবারের নামযশ যেমন একদিনে ছড়িয়ে পড়েনি, তেমনই একজনের জন্যেও ছড়ায়নি। বিদ্যায় বিত্তে ঠাকুর পরিবারের উত্থান বিস্ময়কর।’

ঠাকুরবাড়ির আদিপর্বটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানান মতামত আছে। চিত্রা দেব প্রকাশিত প্রায় সব তথ্য নিপুণ ভাবে ব্যবহার করে এগিয়েছেন, যাতে করে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরা যায়। ঠাকুরবংশের ইতিহাসটি খুবই জটিল ও ঘটনাপ্রবাহের ঘনঘটায় মোড়া। এই সঙ্গে এই কথাও উল্লেখ করতে হয় যে, প্রতিষ্ঠিত উত্তরপুরুষেরা কেউ কেউ নানা জনকে দিয়ে বংশের ইতিহাস ও কুলজি তৈরি করতে গিয়ে হরেক রকমের কাহিনি তৈরি করেছেন। কৌলিক পরিচয় হারিয়ে ঠাকুর পদবির আড়ালে যেন অনেক কিছুকেই আড়াল করার একটা চেষ্টা বেশ সহজেই ধরা পড়ে। একমাত্র পিরালি পরিচয় ছাড়া বাকি সব যেন গিয়েছে মুছে।

ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী যশোহর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার শাসক মোহাম্মদ তাহির পির আলির সঙ্গে জমিদার দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর পুত্রদের বেশ হৃদ্যতা হয়েছিল। কিন্তু এঁরই চক্রান্তে এই পুত্রদের মধ্যে দু’জন, কামদেব ও জয়দেব ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন, অপর দু’জন রতিদেব ও শুকদেব তাঁদের সংস্পর্শে সমাজচ্যুত হয়ে ‘পিরালি থাক’ভুক্ত হন। শুকদেব মেয়ের বিয়ে দেন পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারীর সঙ্গে। পতিত ব্রাহ্মণের কন্যাকে বিয়ে করায় জগন্নাথকে তাঁর আত্মীয়-পরিজনরা ত্যাগ করলেন। এই জগন্নাথ কুশারীই ঠাকুর বংশের আদিপুরুষ। তাঁর উত্তরপুরুষ পঞ্চানন কাকা শুকদেবকে নিয়ে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আসেন। গোবিন্দপুর গ্রামে তাঁরা যখন বসতি করেন তখন সেখানে জেলে-মালো-কৈবর্তদের বাস, তাঁরাই তাঁদের ‘ঠাকুর’ বলে ডাকতে শুরু করে। পঞ্চাননের পুত্র জয়রামের দুই পুত্র নীলমণি ও দর্পনারায়ণ যথাক্রমে জোড়াসাঁকো ও পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। বিদেশি জাহাজে জিনিসপত্র সরবরাহ করে ঠাকুররা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন, প্রভূত জমিদারিরও মালিক হন। 

আদিপর্ব থেকে ধারাবাহিক আলোচনায় শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের পরিচয় দিয়ে চিত্রা দেব সমাপ্তিরেখা টেনেছেন এই গ্রন্থের। বলেছেন, ‘এঁদের দু’জনেরই জন্মসাল ছিল ১৮৪০। একই বছরে দেখা যাচ্ছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও জন্মগ্রহণ করেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অথচ তিনি পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ। সে জন্য তাঁদের কথা লেখার ইচ্ছা রইল দ্বিতীয় খণ্ডে, সময়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে।’ লেখকের প্রত্যয়ী আশা পূর্ণ হোক, তাতে আগ্রহী পাঠক নিঃসন্দেহে লাভবান হবেন।

কাহিনির আঙ্গিকে লেখক দক্ষ হাতে বুনেছেন গ্রন্থটি, পাঠক কাহিনি হিসাবে পাঠসুখ পাবেন সন্দেহ নেই। তবে এই ইতিহাস এতটাই জটিল যে কোনও কোনও তথ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি উদাহরণ, ‘দশ নং সদর স্ট্রিটের বাড়িটিও যতীন্দ্রমোহনের সম্পত্তি।’ (পৃ ২৯৯)। এ দিকে দেখা যায়, ১৮৮১-’৮২ সালের কয়েক মাস জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। প্রশান্তকুমার পাল রবিজীবনী-তে (২য় খণ্ড, পৃ ১৩৬) ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবইয়ের উল্লেখ করেছেন এই প্রসঙ্গে: ‘৭ বৈশাখ ১২৮৯ [বুধ 19 Apr 1882] তারিখে ক্যাশবহির একটি হিসাবে দেখা যায়: ‘ব যদুনন্দন লাল দ চৌরঙ্গির সদর স্ট্রীটে ১০ নং বাটীতে শ্রীযুত ছোটবাবু মহাশয় থাকায় ঐ বাটীর ১২৮৮ সালের চৈত্র মাসের ভাড়া শোধ... ১৯০’।’ এই দুই গ্রন্থে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনে স্বভাবত প্রশ্ন জাগে, দশ নম্বর বাড়ির মালিকানা তখন কার।

প্রায় একশো পাতা জুড়ে মূলত ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে রচিত দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঠাকুরবাড়ির বংশপঞ্জির সঙ্গে আধুনিক কালের বংশপঞ্জিও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এই বইয়ে। এতে গবেষকরা উপকৃত হবেন এবং লেখকের পরিশ্রমকে ধন্যবাদ দেবেন।

সুবিখ্যাত পরিবারের কোনও কোনও প্রসঙ্গ বহু লেখকের গ্রন্থে স্থান পেয়ে থাকে। যেমন, দেবেন্দ্রনাথের জীবনকাহিনি। তাঁর ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ, প্রচলিত প্রথায় পিতৃশ্রাদ্ধ না করা, অবিচলিত চিত্তে পিতৃঋণ শোধের ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি। তথ্য সংকলনে লেখক অক্লান্ত, কিন্তু বহু প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখকের বই থেকে সংকলিত একই তথ্যের পুনঃ পুনঃ সবিস্তার উল্লেখ পাঠককে কিছুটা ক্লান্ত করে। এ ক্ষেত্রে সনিষ্ঠ সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল।

সেই পাঠকই আবার আনন্দিত হবেন এই গ্রন্থের দুর্লভ ছবির সম্ভার দেখে। যেমন জোড়াসাঁকো বাড়ির লক্ষ্মীজনার্দন শিলা যা নিয়ে নীলমণি ঠাকুর পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ছেড়েছিলেন, আর দর্পনারায়ণ ভার নিয়েছিলেন যে রাধাকান্ত বিগ্রহের, এই দুইয়ের ছবি। ঠাকুরবাবুদের পনেরো জনের ছবি ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় এঁদের বাড়ির ছবি বইটির মর্যাদা বাড়িয়েছে। যেমন, জোড়াসাঁকো, বেলগাছিয়া ভিলা, গুপ্তবৃন্দাবন, মরকতকুঞ্জ (ড্রইং রুম ও অলিন্দ), টেগোর কাস্‌ল অতীত ও বর্তমান, পাথুরিয়াঘাটার ৬৮ নং বাড়ি, টেগোর ভিলা ও ভাগলপুরের টিলাকুঠি। বাড়িগুলির অধিকাংশই আজ এতটাই পরিবর্তিত যে পুরনো ছবিগুলি একমাত্র অতীত ঐতিহ্যের পরিচায়ক। 

বইয়ের ভূমিকাটি সুলিখিত এবং আগেই বলেছি চিত্রা দেবের তথ্য সংগ্রহ বিপুল, তার জন্য যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার তিনি। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন