১৯৭০-এর দশকের প্রধান এক শিল্পী বাঁধন দাস (১৯৪৪-২০০২) মাত্র ৫৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন। তখন তিনি তাঁর সৃজন-ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। প্রয়াণের প্রায় ১৪ বছর পর তাঁর কিছু বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীর প্রচেষ্টায় তাঁর ছবি ও ভাস্কর্যের একটি পূর্বাপর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হল সম্প্রতি অ্যাকাডেমির তিনটি গ্যালারি জুড়ে।

বাঁধন আজীবন মনে প্রাণে ছিলেন মার্কসবাদে বিশ্বাসী। তাঁর সমস্ত-শিল্প-প্রয়াসের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাজকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। সেই সমাজতান্ত্রিক চেতনা কীভাবে তাঁর ছবিতে রূপায়িত ও ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছে, এরই পরিচয়ে উজ্জ্বল তাঁর সারা জীবনের সৃজনমালা, তাঁর ছবি ও ভাস্কর্য।

বাঁধনের জন্ম ওপার বাংলায়। দেশভাগের পর ১৯৪৭-এ পরিবারের সঙ্গে তিনি এদেশে চলে আসেন। স্কুল ফাইনাল পাশ করার পর ১৯৬১-তে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৬-তে চিত্রকলার স্নাতক হন। ষাটের দশকে ইডেন গার্ডেনে প্রতি বছর নিয়মিত যুব উৎসব হত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সেই ‘ইয়ুথ ফেস্টিভালের’। বাঁধন ছাত্র অবস্থাতেই ছিলেন সেই উৎসবের একজন উজ্জ্বল তরুণ কর্মী। ওখানে ছবি ও পোস্টার করতেন তিনি। সেগুলি প্রচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সৃজনাত্মক হয়ে উঠত অনেক সময়ই।

এই রাজনৈতিক চেতনা ও মানুষের প্রতি ভালবাসাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে আদিবাসী ও লোকশিল্পীদের উন্নয়নে ও সৃজনে অনুপ্রাণিত হতে। কলকাতায় তাঁর দেশপ্রিয় পার্কের বাড়িতে এবং পরবর্তী কালে শান্তিনিকেতনের গ্রামে যখন তিনি বাড়ি করেন, সেখানে এই সব শিল্পীর অনায়াস গতিবিধি ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের এই ভালবাসার দিকটি জড়িয়ে আছে তাঁর সমস্ত সৃজন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে।

বাঁধন আর্ট কলেজে পাশ্চাত্য চিত্রকলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সেই পর্যায়ে তাঁর যে অনুশীলনমূলক ছবি তাতে স্বদেশচেতনা-আশ্রিত ভারতীয় রীতির দৃষ্টান্ত অনেক। এর মধ্যে হয়তো তাঁর আত্মপরিচয় ভাবনার কিছু ঈঙ্গিত পাওয়া যায়। এই প্রদর্শনীতে তাঁর সত্তর দশকের কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি হয়তো তখন রাজনৈতিক সংগঠনেই ব্যস্ত ছিলেন বেশি।

আশির দশক থেকে তিনি পূর্ণ উদ্যমে ফিরে এসেছেন সৃজনমূলক রচনায়। তখন তাঁর ছবি জীবনের ক্ষয় ও তমিস্রাকে জড়িয়ে বিস্তৃত ভাঙনের পথে গেছে। স্বাভাবিকতা বিশ্লিষ্ট হয়েছে আদিমতা-সম্পৃক্ত অভিব্যক্তিবাদী আঙ্গিকে। সময়ের ও মানুষের অস্তিত্বের গভীরে জমে থাকা তীব্র হতাশা ও দুঃখের প্রতীকী ভাষ্য হয়ে উঠেছে এক-একটি ছবি। ১৯৮৫-র এ রকম একটি ছবিতে আমরা দেখতে পাই একটি মানুষ যেন শকুনে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ১৯৮৬-র একটি পেনসিল ড্রয়িং-এ দুটি ঘোড়া ও একটি মানুষ প্রবল যন্ত্রণায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে তীব্র চিৎকারে আন্দোলিত হচ্ছে। প্রকরণ ও মননের শক্তির উজ্জ্বল প্রকাশ থাকে এই সব ছবিতে।

১৯৯০-এর দশক এর কিছু আগে থেকেই তাঁর প্রতিবাদী-চেতনা ক্রমশ অস্তিতা-র দিকে রূপান্তরিত হতে থাকে। অভিব্যক্তিবাদী বিশ্লিষ্টতাকেই তিনি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। জীবনের সমস্ত সংক্ষুব্ধতাকে আত্মস্থ করেই জেগে ওঠে সেই বিমূর্ততা। ক্রমশ তা মহাবিশ্বের উদাত্ততাকে চিত্রভাষায় উন্মীলিত করে। ১৯৯৭-এর ক্যানভাসের উপর টেম্পারার একটি ছবি ছিল প্রদর্শনীতে। বর্গাকার চিত্রপটে বিপুল আলোকিত নক্ষত্র-সদৃশ একটি বৃত্ত এঁকেছেন তিনি। সেই বৃত্তের উপর একটি ছোট কালো ‘স্ক্র্যাচ’ সমগ্র নৈর্ব্যক্তিকতাকে যেমন বাঙ্ময় করে তোলে। ১৯৯৯-এর একটি তেলরঙের ক্যানভাসে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মহাকাশের স্তব্ধ আলোর ব্যঞ্জনা।

নব্বইয়ের দশকে তিনি করেছেন সিরামিকের ভাস্কর্য। আর্ট কলেজে অধ্যাপনার সূত্রে এই সময় তাঁর হাতেই ছিল সিরামিক বিভাগ। অজস্র ছাত্র তৈরির পাশাপাশি নিজেও কাজ করেছেন নিরবচ্ছিন্ন। আদিমতার তীব্র অভিব্যক্তি সম্পৃক্ত সিরামিকসে এই ভাস্কর্যগুলিতেই যেন সবচেয়ে সফল ভাবে রূপায়িত হয়েছে মগ্নচেতনা সঞ্জাত তাঁর রূপবোধ। মূল্যবান একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে প্রদর্শনী উপলক্ষে। তাতে লিখেছেন প্রণবরঞ্জন রায়, যোগেন চৌধুরী, আর শিবকুমার, তপন ভট্টাচার্য, সৌমিক নন্দী মজুমদার প্রমুখ তাত্ত্বিক ও শিল্পী।