• অতনু বসু
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

লৌকিকতা ও অলৌকিকতার অতি সরলীকরণ

PAINTINGS
রূপবন্ধ: উৎপল প্রকাশ চক্রবর্তীর শিল্পকলা। সম্প্রতি অ্যাকাডেমিতে

পদ্ধতিগত দিক থেকে দেখতে গেলে তাঁর পেন্টিংয়ের শৈলীকে যে কোনও দর্শকের মনে হবেই, যেন বড় বেশি শিশুসুলভ। ওই রকম ড্রয়িং কিংবা কম্পোজ়িশন—বিশেষত ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রংকে অমন সাদা মিশিয়ে ম্যাট কালার ব্যবহার করা, অনেকটা ফলিত কলার ছাত্রদের পোস্টার, শো কার্ড, রেকর্ড কভার, বুক কভারের মতো পটভূমি তৈরি করা সমতলীয় বর্ণের মতো। আসলে শিল্পী উৎপল প্রকাশ চক্রবর্তীর কাজের ধারা ও বর্ণ প্রয়োগ, সেই সঙ্গে কম্পোজ়িশন যেন সমান তালে ওই রকম শৈলীকেই খুব সচেতন ভাবে ধরে রেখেছে। সম্প্রতি অ্যাকাডেমিতে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী শেষ হল।

কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে হিসেবে ভারতের নানা জায়গায় ঘুরেছেন। কখনও আর্ট কলেজে পড়েননি, কিন্তু শিল্পকলাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন নানা মন্দির-ভাস্কর্য, জাদুঘর ও অন্যান্য উপকরণ থেকে। ছবি আঁকার প্রেরণা তৈরির অন্তরালে ছিল মহান সব শিল্পীর কাজ দেখা। কবিতা, চলচ্চিত্র, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও পাশ্চাত্য মেলোডিতে আচ্ছন্ন থেকেছেন বার বার। কিন্তু নন্দলাল বসুর ‘হরিপুরা পোস্টার’-এর রেখার গতি ও ছন্দ এবং সমান পৃষ্ঠতল তাঁকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। অবচেতন মনে উত্থিত নিজস্ব রং-রেখার এক আশ্চর্য সরলীকরণের শুরু তখন থেকেই। যার পিছনে শিল্পীর গভীর এক দর্শন ও মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল, যা থেকে উঠে এসেছে এই সব চিত্রকল্প।

তাঁর চিত্রকলা দেখতে দেখতে মনে হয় এককালের সুনির্মল বন্দ্যোপাধ্যায় বা হরেন ঠাকুরের বাস্তবতাকে যেন আরও ভেঙে, অতি সরলীকরণের মধ্যে এক সতর্কতাজনিত নিজস্ব জগৎ তৈরি করেছেন। কিন্তু উৎপল কখনও স্পেসকে অনেকটা পরিসরে খোলা আকাশের স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছেন। আবার বিপরীত ভাবে বিবিধ রূপবন্ধ ও মানবশরীর সেই একই স্পেসকে যেন সংকুচিত করে এনেছে। সেখানে কিন্তু কিছু ঘটনা বা গল্পের ইতিহাসকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই তাঁকে ও ভাবে কম্পোজ়িশন করতে হয়েছে।

তিটি ছবিতেই রূপবন্ধ ও বর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমে চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করেছেন শিল্পী।

যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রূপবন্ধ ও রঙে বা স্বল্প ছায়াতপে ক্যানভাসে ‘রূপ’ হয়ে উঠতে চায়, ঘটনাবহুল অনেকানেক ইতিহাসকে খণ্ডিত অংশ হিসেবে দেখাতে চায়, দ্বন্দ্ব ও আনন্দের মধ্যে প্রকৃতি বা মানুষের জীবন বর্ণনা করতে চায়, কখনও সেখানে অযথা ধর্মীয় অনুশাসন বা যন্ত্রণার কথা বলতে চায়, আলো-অন্ধকারের ব্যাখ্যার বাইরের এক অদ্ভুত পৃথিবীকে দেখাতে চায়—সেখানেই তাঁর আশ্চর্য দর্শনের মধ্যে উঠে আসে রহস্যময়, রোমাঞ্চকর ও অতিসরল এক অদ্ভুত জগৎ। যেখানে অপ্রতুল নরম রঙের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে কিছু রেখার ও রূপবন্ধের অলৌকিক এক ভাষা। যে ভাষা সবার বোঝার জন্য নয়। নন্দলাল বসু, পানিক্কর, ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত, হুসেন বা নীরদ মজুমদারে আপ্লুত এই শিল্পী। জীবনানন্দ, শক্তি বা পাবলো নেরুদায় আচ্ছন্ন এই শিল্পী। আবার একই সঙ্গে এই শিল্পী যখন কোলিরিন, বার্গম্যান, গোদার হয়ে বড়ে গোলাম কিংবা কুমার গন্ধর্ব-তে আকণ্ঠ মজে থাকেন—স্বভাবতই তিনি তাঁর রঙিন দ্বিমাত্রিকতার পটে এক অন্য রকম ভাষা তো তৈরি করবেনই। যা অল্প কথায় তৈরি করে ফেলে স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট এক লৌকিক অথচ অলৌকিক কাব্য। লৌকিকতা ও অলৌকিককতার এই স্তরের মধ্যেই আত্মগোপন করে থাকে তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় রহস্যময় সরলীকরণ।

প্রতিটি ছবিতেই রূপবন্ধ ও বর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমে চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। ‘মুনলাইট সোনাটা’র কি-বোর্ড যেন বেঠোফেনের পিয়ানো সোনাটা! সভ্যতার ক্ষত ও লোভের আঘাত বুকে নিয়ে দাঁড়ানো ‘সোনার পাহাড়’ বা ‘লাইফ অ্যান্ড ডেথ’-এ জীবনের অস্তিত্বের লড়াই। এখানে মিশরীয় মৃত্যুর দেবতা আনুবিস জীবনকে আহ্বান করছেন। তাঁর কাজে মিশরীয় পেন্টিংয়ের ছায়াও বিদ্যমান। বস্তু ও সৌন্দর্যের দেখা-না-দেখার দ্বন্দ্ব ‘মডেল অ্যান্ড ব্লাইন্ড আর্টিস্ট’ ছবিতে। ‘বর্ডার লাইন’ ছবিতে কোনও সীমান্তের কাছে গুলিবিদ্ধ এক শিশুর দেহ। কিংবা হত্যাকারী নিজেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মৃতদেহর গাড়ি ‘কিলিং ফিল্ড’ নামের ছবিতে। এ সব কাজও অত্যন্ত দাগ কেটে যায়।

উৎপল প্রকাশ করেছেন এই ভাবে তাঁর গভীর দেখা মানচিত্রের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট, স্বনির্বাচিত সময়, বর্জিত অধ্যায়, শোষিত ও অত্যাচারিতের কাহিনি—সবই যেন জীবনের অদ্ভুত আঁধার এক!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন