• শেখর ভৌমিক
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মেয়েদের ভ্রমণ আসলে মুক্তি

Traveler
ভ্রামণিক: উপরে বাঁ দিক থেকে, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, অবলা বসু। নীচে, সুবর্ণপ্রভা দেবী ও প্রসন্নময়ী দেবী।

Advertisement

‘‘স্ত্রীলোকের কিছু দেখিবার হুকুম নাই। কলিকাতার গঙ্গার উপর পুল নির্ম্মাণ হইল, লোকে কত তাহার প্রশংসা করিল, কিন্তু আমাদের শোনাই সার হইল, এক দিনও চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করিতে পারিলাম না।’’— এমনি করেই তো ‘বঙ্গমহিলা’য় (শ্রাবণ ১২৮২) ঝরে পড়েছিল মায়াসুন্দরীর আক্ষেপ। কিন্তু সে কালের বিশিষ্ট চিকিৎসক চন্দ্রকুমার দে’র অকালপ্রয়াতা পৌত্রী সরযূবালা বসুর মতো অনেকের জ্বালা তো ‘খাতাবন্দী’ হয়েই উত্তরপুরুষদের কাছে রয়ে গেল। বড় যন্ত্রণায় যিনি লিখেছিলেন— ‘‘বিধির সৃষ্টি কতই মিষ্টি দেখা কী হায় হবে/ বল দেখি বোন জুড়াবে মন সাধ পূরিবে কবে?’’ এরই মধ্যে মনের সাধ মিটিয়ে যে মহিলারা বেরোনোর সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁদেরই ২০টি রচনা সঙ্কলিত হয়েছে প্রথম খণ্ডে। দ্বিতীয় খণ্ডে দুটি— কৃষ্ণভাবিনী দাস-এর ‘ইংলণ্ডে বঙ্গমহিলা’ এবং প্রসন্নময়ী দেবীর ‘আর্য্যাবর্ত্তে বঙ্গ মহিলা’। তৃতীয় খণ্ডে কেবলই দেবেন ঠাকুর দুহিতা স্বর্ণকুমারী আর জগদীশ বোস জায়া অবলার লেখা একাধিক ভ্রমণবৃত্তান্ত। সম্পাদক দময়ন্তী দাশগুপ্ত ঠিকই লিখেছেন যে এঁদের ভ্রমণটা ঠিক অন্যদের মতো ‘ঘোম্টা খুলে’ বেরোনো নয়।

আসলে এই বেরোনোটা সবার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। ‘বিদেশবাসিনীর পত্র’য় লেখিকা বলছেন সাগর, পাহাড় বা অচেনা জায়গা দেখার বাসনা অনেক দিনের। কিন্তু ‘আমি [যে] বঙ্গবাসিনী’। যে কথা লিখেছিল ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা (৮ জ্যৈষ্ঠ ১২৭০)— ‘‘এদেশে অন্য দেশ দেখার দরজা মেয়েদের কাছে বন্ধ, তাই সুযোগ পেলে তারা সে পথের পথিক না হইবেন কেন?’’

স্বর্ণকুমারী দেবী প্রয়াগে মাথা মুড়োননি, তাঁর কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু ‘কাশীদর্শন’-এর লেখিকা বিশ্বনাথ মন্দিরের শিবলিঙ্গকে ‘প্রস্তর’ বলায় দময়ন্তী বিস্মিত হয়েছেন। লিখেছেন হিন্দুতীর্থের আচার-বিচারের বিরুদ্ধে রমাসুন্দরী বা লক্ষ্মীমণির মতো মহিলারা যে ‘ক্ষুরধার’ সমালোচনা করেছেন, ১৫০ বছর পরে সে পরম্পরা রক্ষিত হল না? লেখিকাদ্বয়ের ব্রাহ্ম পারিবারিক প্রেক্ষাপট স্মরণে থাকলেই তার উত্তর পাওয়া সম্ভব। সম্পাদিকা নিজেও তো এঁদের সাধারণ ঘরের বাইরেই রেখেছেন। তাই তো লক্ষ্মীমণিদের কাছে ‘পৈরাগী’ (প্রয়াগের পান্ডা) ‘অসুর’ আর বৃন্দাবনের ব্রজবাসী (পান্ডা) ‘নির্দয়’। আর হাজার হাজার সাধারণ মেয়ের কাছে তাঁরাই তীর্থের আধা ভগবান। ‘অসাধারণ’ ঘরের যে মেয়েদের কাছে বিশ্বনাথ স্রেফ পাথরের টুকরো, সেই বিশ্বনাথের শহর বারাণসীতে এসেই তো দলে দলে বঙ্গবিধবাদের হাজির হওয়া। কারণ এখানে মরলে নাকি আর জন্মাতে হয় না বলে ‘মহাস্থবির জাতক’-এ প্রেমাঙ্কুর আতর্থী মশাই লিখেছিলেন।

আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত/ ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গমহিলাদিগের ভ্রমণকথা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব
সম্পাদক: দময়ন্তী দাশগুপ্ত
৩৫০.০০, ৪৭৫.০০ ও ৪৭৫.০০
গাঙচিল

তবে সে কালেও গিরীন্দ্রমোহিনীর মতো মহিলা পান্ডার প্রশংসা করেছেন। যেমন করেছেন প্রসন্নময়ী ‘আর্য্যাবর্ত্তে বঙ্গ মহিলা’য়। ‘ইংরেজের দিল্লী’-তে এসে নিজেকে যখন তাঁর ‘নিতান্ত পরিত্যক্ত’ বলে মনে হয়েছে, তখন ‘পাণ্ডাঠাকুরদিগের সময়োচিত সাহায্য ও উপকারিতা’ তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যাই হোক প্রয়াগে মাথা মুড়োননি বলে লক্ষ্মীমণিকে যে দেশে ফিরে অশেষ দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছিল সে কথা তৃতীয় পর্বের শুরুতে সম্পাদিকাই লিখেছেন। 

অনেক লেখিকাই আগে ভ্রমণ-বৃত্তান্ত পড়বার সুযোগ পেয়েছেন বোঝা যায়। প্রসন্নময়ীর লেখায় ‘গলিভার ভ্রমণ’ বা ভোলানাথ চন্দ্র-র উল্লেখ আছে। তবে সকলেই যে এত সব পড়ে বেরোতেন তা কখনওই নয়। অনেক কাল ধরেই তীর্থোপলক্ষে বাইরে বেরোনো মেয়েদের কাছে এক প্রকার মুক্তিই ছিল। ‘সোমপ্রকাশ’ (১৮ মে ১৮৬৩) লিখেছিল গহনা বন্ধক রেখে দলে দলে মেয়েরা ‘রজনিযোগে গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্তা হইতেছে’ এবং গঙ্গাস্নানের জন্য বেরিয়ে ‘কলস পরিত্যাগ পূর্ব্বক’ তীর্থযাত্রী দলে ভিড়ছেন। দুর্ভাগ্য এঁদের অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়নি, তা হলে অন্য ধরনের কিছু ছবি নিশ্চয়ই পাওয়া যেত। 

তবে যা পাওয়া গেল, এ কালের গবেষকের কাছে তা স্বর্ণখনি। তেমন ভাবে হোটেল ব্যবসা চালু হওয়ার আগেও যে কত লোক নিজের বাড়িতে পর্যটকদের রাখতেন এবং তাঁদের দিয়ে নামধাম লিখিয়ে রেখে ভবিষ্যতের পর্যটকের বিশ্বাস অর্জন করতেন, তা তো ‘আর্য্যাবর্ত্তে বঙ্গ মহিলা’ না পড়লে জানাই যেত না। সবচেয়ে বড় কথা, বেড়াতে এসে প্রকৃতির পাশাপাশি সমাজ পর্যবেক্ষণ, যুক্তিবাদী ভাবনার প্রয়োগ, কখনও ইতিহাস বা পুরাণকে যুক্ত করা, কিংবা ‘সিংভূমের কোলজাতি’-র মতো লেখায় নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা নিশ্চিত ভাবে তিনটি পর্বকে সমৃদ্ধ করেছে।

আগ্রহী গবেষকের বহু রসদ রয়েছে এখানে। ধরা যাক স্বর্ণকুমারীর কথাই। যেমন রয়েছে পরিশীলিত, উচ্চমানের অনুষঙ্গ— কখনও পশ্চিমি কখনও বা দিশি, কী ভাষাপ্রয়োগে কী উপমায় তেমনই রয়েছে স্বাজাত্যবোধের ছোঁয়া। বাইরে গিয়ে তাঁর মনে হল কলকাতায় কত যে ‘এরূপ ধরণের’ ভাল ভাল ‘বাড়ী উদ্যান’ আছে— ‘তাহা দেখিবার কথা মনেও হয় না।’ তাই তাঁর মনে হয়েছে এখানে এই ‘ইংরাজি প্রাবার্বটা ঠিক খাটে Familiarity brings contempt.’ আবার গাজিপুর থেকে বারাণসী— এই চার-পাঁচ ঘণ্টার পথে এক বার নামাওঠায় তাঁর মনে হল সমস্ত পথটায় ‘‘তুমি যেন বিলিয়ার্ডের একটা গোলা,— ঢুঁ খাইয়া কেবলি ফেরাফেরি করিতেছ’’। প্রয়াগে দুই সতীনের ঝগড়া দেখে আবার তাঁর ইচ্ছে হয়েছে ‘বঙ্কিমবাবুর দেবী চৌধুরাণীর আদর্শটা তাহাদের চোখের সমুখে’ তুলে ধরে ‘সতীনে সতীনে কি রূপ’ ভাব করতে হয় তা শেখান। আদালত চত্বরে বিচারককে একটি ছেলে জুতো দিয়ে আঘাত করায় সাহেবরা তাকে যখন কাপুরুষ বললেন, স্বর্ণকুমারী লিখছেন, ‘‘কোর্টের ভিতরে দাঁড়াইয়া ম্যাজিষ্ট্রেটকে জুতা মারিল— cowardই বটে!’’ আবার দার্জিলিঙে পাঁচ-ছ’জন বাঙালির ‘স্ত্রী পুরুষে’ ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় দুজন সাহেব অসহ্য বোধ করে বোধহয় বলে ফেলেন— ‘Damnation take them’, তাইতে দেবেন্দ্রনাথ-দুহিতা লিখলেন ‘‘ওদের মত উঁচুতে মাথা রাখতে দেখলে ওদের ভাল না লাগবারি কথা’’। অন্য দিকে লখনউ রেসিডেন্সিতে দেশীয় সেপাইদের বিদ্রোহ চলাকালীন নিহত এই সাহেবদের সমাধিস্থল দেখে অবলা বসু-র মনে আবার ‘গভীর বিষাদের আবির্ভাব হয়।’ ‘বিষাদপূর্ণ হৃদয়ে’ তিনি ‘গৃহে ফেরেন।’

এমন কত বিচিত্র বিষয় ছড়িয়ে রয়েছে তিনটি পর্বে। ‘মহীশূরের পত্র’, ‘মহানদী বক্ষে’, ‘মসুরী’ বা ‘তাজমহল’-এর মতো লেখাগুলো পড়লে বাঙালির ‘তীর্থযাত্রী’ থেকে  ‘পর্যটক’ হয়ে ওঠার বিবর্তনটিও বেশ ধরা পড়ে। তবে বাঙালিনিদের বিদেশ ভ্রমণের বিবরণ এখানে না এলেই বোধহয় ভাল ছিল। কারণ সে অভিজ্ঞতা, ভূগোল, দর্শনীয় স্থান— সবই তো ভিন্ন মেজাজের। আর কিছু জায়গার উনিশ শতকের ছবি দেওয়া গেলে আরও জমে উঠত।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন