চল্লিশটি অধ্যায়, নয়শো তিরিশ পাতা। রামচন্দ্র গুহর নতুন গাঁধীজীবনী। তার ব্যাপ্তি বা লাভ ক্ষতির হিসেব করা কয়েকশো শব্দে অসম্ভব। বহু বছরের কাজ। অসংখ্য অভিলেখাগার ঘাঁটা। অন্তত দুটো বড় নতুন সংগ্রহ থেকে বিস্তর তথ্য আহরণ এবং সাজানো। আগাগোড়া সুখপাঠ্য গদ্য। 

তা ছাড়া আরও দুটো কারণে বইটা পড়া দরকার। এক, গাঁধীকে দেবতা মনে হয় না, চতুর বানিয়াও মনে হয় না। যে চারটে বড় আত্মিক-রাজনৈতিক প্রকল্প গাঁধী সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়িয়েছেন তার সাধ্যমতো সমাধান করতে পেরেছিলেন বলেও মনে হয় না এই নতুন জীবনী পড়ে। বিস্তর দোষত্রুটির কথা রয়েছে, বুদ্ধিবিবেচনার সীমাবদ্ধতার কথাও রয়েছে। দুই, গাঁধীর জীবনের বিস্তর পার্শ্বচরিত্রের কথা অনেকখানি বিস্তারে জানা যায়। বিশেষ করে জিন্না এবং অম্বেডকরের সঙ্গে দ্বৈরথের পরতে পরতে আলোচনা। তিন, আর একটা বিতর্ক এই বই উশকে দেবে। ইতিহাস কী ভাবে পড়া হবে? যখন ঘটনা ঘটছে সেই সময়কার মূল্যবোধের নিরিখে নাকি আজকের মূল্যবোধের নিরিখে? গুহ প্রথম পক্ষে অনড়। কিন্তু সেটা শেষ কথা কিনা ভাবতে হবে। আবার তাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া চলে কি না, সেটাও ভাবতে হবে। বছর পনেরো আগে ডেভিড হাৰ্ডিম্যান গাঁধী ইন হিজ় টাইম অ্যান্ড আওয়ার্স বলে একটা বই লিখেছিলেন, উৎসাহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন। 

দ্বিতীয় খণ্ড, তবে লেখক বলেছেন একে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ বই হিসেবে পড়া যায়। ভুল বলেননি, কেননা বই শুরু হচ্ছে ১৯১৪ সালে গাঁধীর দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া থেকে আর শেষ ১৯৪৮-এ, তাঁর হত্যায়। যখন প্রয়োজন হয়েছে আগের বই থেকে উল্লেখ এসেছে সবিস্তারে। একটা সমকালীন পাঠনির্দেশ শেষে আছে পরিশিষ্ট হিসেবে। 

গাঁধী/ দি ইয়ার্স দ্যাট চেঞ্জড দি ওয়ার্লড/ ১৯১৪-১৯৪৮ 
রামচন্দ্র গুহ
৯৯৯.০০  
পেঙ্গুইন/ অ্যালেন লেন

তাই গাঁধী এখানে মোটের ওপর তৈরি হয়েই এসেছেন। তাঁর ‘দার্শনিক’ ভাবনাচিন্তা মোটের ওপর ভয়ানক বদলায় না। কিন্তু ঘষামাজা বার বার চলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্তরে সংশয় এবং সংশোধন হয়েছে। তবে যেটা বদলায় না, সেটা হল নিজের আর নিজের রাজনীতিবোধের সততা এবং নিজস্ব যাপনপদ্ধতির ওপর অতল, অটল আস্থা। যখন সকলে  সঙ্গে তখনও, যখন কেবল কয়েক জন সঙ্গে, তখনও। 

অথচ ঘুরেই চলেছেন প্রতিনিয়ত। চুয়াল্লিশ থেকে আশি এই ছত্রিশ বছরে গোটা দেশ, বার বার। তৃতীয় শ্রেণির কামরাই যেন ঘরবাড়ি। শ’য়ে শ’য়ে স্টেশনের মতো বড়, মেজ, ছোট চরিত্র, ঘটনা। আর লিখেছেন। প্রতিনিয়ত লিখেই চলেছেন। যত লিখেছেন, যত ঘুরেছেন ঠিক ততটাই বিতর্কে থেকেছেন। স্ববিরোধিতাও ততটাই। 

তা হলে গাঁধীর মহিমা বা মহত্ত্ব কোথায়? সেটার কোনও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নিজেও দিয়ে যাননি, গুহও দেওয়ার চেষ্টা করেননি। কিন্তু অষ্টম অধ্যায়ে একটা বিস্তারিত প্রচেষ্টা রয়েছে। শেষেও। এতটাই আত্মবিশ্বাস যে অন্যেরা তাঁকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য। একটা গোটা দেশের অসংখ্য মানুষের মনে একটা দীর্ঘ সময় ধরে সাহস আর অনুপ্রেরণা সরবরাহ। ঠিক ওপর থেকে হাতে সাহস তুলে দেওয়া নয়। লেখা, ভ্রমণ এবং কাজের মধ্যে দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশবাসীর সঙ্গে একাত্মতার একটা প্রতীকী অনুরণন। 

তাই অন্যেরা গাঁধীকে তাঁর জীবদ্দশায় কী ভাবে দেখেছেন, সেটা এখানে খুব জরুরি একটা প্রেক্ষিত। অশিক্ষিত গরিব থেকে শুরু করে আলোকপ্রাপ্তা মহীয়সীদের চোখে অবতার মহাত্মা। আবার আদর্শগত বিরোধী বা সশ্রদ্ধ সমসাময়িকদের চোখে কখনও একরোখা, কখনও শঠ, কখনও ভণ্ড। ভীষণ রকম সীমিত, অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু কিছুতেই আলোচনা ছাড়বেন না, হারও মানবেন না। বিশ্বাসের জায়গাগুলোতে বার বার উপবাসে মরণপণ করবেন। আবার সুযোগ পেলেই আপস। শেষ পর্যন্ত কিন্তু হেরেই জিতবেন। তাই সরলরৈখিক ব্যক্তিজীবন বা বিশ্বাসের নিক্তিতে মাপা যাবে না। পড়তে গিয়ে মনে হয় যুযুধানেরা গাঁধীর জীবন থেকে কোন জয়-পরাজয় কী ভাবে আহরণ করছেন তার ইতিহাসই উনি লিখছেন, নিজের মতো করে। যুযুধান মানে যাঁদের গাঁধীর সঙ্গে যুঝতে হয়েছে, তাঁদের সক্কলে। 

কেবল অভিলেখাগারের ব্যবহার বা গাঁধীর জীবৎকালে তাঁর বিচারের কথা ধরলে এর চেয়ে সর্বত্রগামী গাঁধীজীবনী বোধ হয় আর লেখা মুশকিল। বিশেষ করে সবরমতী আশ্রম এবং প্যারেলাল সংগ্রহের বিপুল ব্যবহার বেশ কয়েকটা নতুন কথা শেখায়। তার একটা হচ্ছে গাঁধীর জীবনে অনেক বড় ঘটনাই ভীষণ আকস্মিক। গোখলে এবং তিলকের মৃত্যুর সঙ্গে গাঁধীর উত্থানের যে এতখানি সম্পর্ক সেটা পাঠককে ভাবায়। বিশেষ করে তিলকের অনুপস্থিতি এবং মৃত্যু। গাঁধী মিথের গোড়াপত্তনে অনুপস্থিতির ভূমিকা বিষয়ে আরও গবেষণা নিশ্চয় হবে। উৎসাহী পাঠক নিশ্চয় শাহিদ আমিনের কাজ পড়বেন। 

গাঁধীর ব্যক্তিজীবনের সীমাবদ্ধতাগুলো একের পর এক চোখে পড়ে। গাঁধীর জীবনে মহিলাদের কথা অনেকখানি গভীরে জানা যায়। মহাদেব দেশাই বিশেষ করে চোখে পড়েন। বড় ছেলে হরিলাল যে ভূমিকা নেবে গাঁধী ভেবেছিলেন, মহাদেব সেই ভূমিকা নিয়েছেন অকপটে স্বীকার করেছেন। অথচ সেই স্বীকারের ভাষাটা খুব কৌতূহলের উদ্রেক করে। নিজেকে যেন সে পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলেছে। নিঃস্বার্থ সর্বসমর্পণ। 

আগে সমর্পণ, তার পরে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক। মহাদেব যে সব সময় সব মেনে নিচ্ছেন, তা নয়। কিন্তু বাইরে কখনও প্রতিবাদ করেননি। সেইটে যখন হচ্ছে তখনই মুশকিল। এই রকম তিনটে বিতণ্ডা খুবই চেনা। জিন্না, সুভাষ, অম্বেডকর। সুভাষ বিতর্ক নিয়ে বাঙালির জন্য নতুন কিছু এই বইতে নেই। 

জিন্নার বিষয়ে গুহ সুবিচার করেননি এই রকম একটা অভিযোগ সম্প্রতি এক বিখ্যাত ইতিহাসবিদ করেছেন। ছেচল্লিশের দাঙ্গা মূলত কলকাতাতেই হয়, এবং সেটা মোটের ওপর সুরাবর্দির সমর্থকরাই বাধান। বাইশ বা বেয়াল্লিশের হিংসার জন্য গাঁধীকে যতখানি দায়ী করা যায়, ছেচল্লিশের দাঙ্গা বা দেশভাগের জন্য জিন্নাকে তার চেয়ে বেশি দায়ী করা যায় না, এমনটাই তিনি লিখেছেন। মুশকিল হল, দেশভাগের আর দাঙ্গার জন্য কে কতখানি দায়ী, ইতিহাস গবেষণা বোধ হয় তার চেয়ে গত কয়েক দশকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, জিন্না কি চেয়েছিলেন এতগুলো মানুষ বাস্তুহারা হোক, তা হলে উত্তর অবশ্যই— না। একটা মানুষ যদি পুরোপুরি চেয়ে একটা দেশভাগ করে দিতে পারে, তা হলে হয়তো দশ জন চাইলে দেশ জুড়েও দিতে পারে। কোনওটাই হয় না। গুহর জিন্না খানিকটা হলেও একরঙা। কিন্তু বইতে সেই ১৯১৫ থেকে রয়েছেন। প্রথমে গাঁধী তাঁকে মাঝেমধ্যেই আরও ভাল করে দেশি ভাষা শিখুন বলে উপদেশ দিচ্ছেন। কুড়ির দশক থেকেই রাজনীতির পদ্ধতি নিয়ে লাগছে মৌলিক বিরোধ। বহু বার আলোচনা। আটত্রিশ থেকে প্রায় কখনওই মতের মিল নেই। ছেচল্লিশে অনুনয়। তত দিনে মতানৈক্য সমঝোতার অতীত। গুহর লেখা পড়ে মনে হয় না একে অন্যকে বিশেষ পাল্টাতে পেরেছিলেন। এই বিতণ্ডার ইতিহাস লিখতে গুহ কোনও খামতি রেখেছেন মনে হয় না। 

অম্বেডকর-গাঁধী সংলাপে গুহ অনেকটা সংবেদী। গাঁধীর কাছে জাতিভেদ মানে অস্পৃশ্যতা। অম্বেডকরের কাছে সেটা ধর্মীয় কাঠামোগত নাগরিক অধিকারহীনতা। পুণা চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত একটি অধ্যায়। সেখানে অম্বেডকরের অসহায়তা গুহ স্বীকার করছেন। তাঁর চিন্তার বহুমুখিতা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। মেনে নিচ্ছেন চিন্তাবিদ হিসেবে অম্বেডকর  বড়। তাঁর রাজনৈতিক একাকিত্ব নিয়ে রয়েছে অনেকটা সমবেদনা। কিন্তু দলিত শব্দটা বইতে কেন ব্যবহার করেননি সেই নিয়ে গোড়াতে সাফাইও দিয়েছেন। গাঁধীকে অম্বেডকর বদলেছেন, স্বীকার করেছেন। গাঁধী-অম্বেডকর বিতণ্ডায় একটা মধ্যপন্থা চাই, এইখানে শেষ করেছেন। ব্যক্তি অম্বেডকরের তিক্ততা মেনে নিয়েছেন। বুদ্ধিজীবী অম্বেডকরের প্রশংসায় দরাজ। তবুও যেন মনে হয়, গুহ কেবল ব্যক্তি তথা বুদ্ধিজীবী অম্বেডকরকেই সমাদর করছেন। অম্বেডকরের বৃহত্তর রাজনীতি বিষয়ে বোধ হয় আরও গভীরে যাওয়া যেত। জাতিভেদ মানে কেবল অস্পৃশ্যতা নয়। গাঁধীও সেটা জানতেন, বুঝতেন। শেষে তিনি সহভোজন এবং অসবর্ণ বিবাহও সমর্থন করতেন। কিন্তু জাতিভেদের ধর্ম তথা আমূল কাঠামোগত বিরোধ তিনি যথাসাধ্য করে উঠতে পারেননি। 

মজাও কম নেই। গাঁধী কবে কেন ছাগলের দুধ খাওয়া শুরু করলেন, তার সরস বিবরণ পাবেন। আবার ভাইসরয়-গিন্নিকে চরকা কাটা শেখাবেন বলে ভাইসরয়কে চিঠি লিখছেন। ব্যক্তিজীবনের সঙ্কট বিষয়ে অকপট বর্ণনা। দুর্বার প্রেম আসছে, শুভানুধ্যায়ীরা বকেঝকে সামলাচ্ছেন। বিভিন্ন যৌনতা-নিবারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। নিজে স্বীকার করছেন সব, কিন্তু পরিবার অনুরাগীরা তার প্রমাণ লোপাটে ব্যস্ত। পাছে দুর্নাম হয়। 

তা হলে কী বাকি রইল? ওই সেই সময় বনাম এই সময়, ইতিহাস কাকে দেখবে, সেই বিতর্ক। এক অর্থে সেই বিতর্কের সলতে উশকে দেওয়া হল। সমসাময়িকরা গাঁধীকে কী চোখে দেখতেন তার বিবরণ কম নেই। এমনকি গাঁধীবাদীদের নিয়ে যে আরও বিস্তারে কাজ প্রয়োজন সেটা এই বই স্পষ্ট বলে দেয়। সারা ভারতে বিভিন্ন ভাষায় মানুষ গাঁধীকে কী ভাবে দেখেছে, ব্যবহার করেছে, সেই নিয়ে আরও কাজ হোক। তবে গাঁধীকে গাঁধী-গবেষকরা কেমন করে দেখেছেন, সেই নিয়ে আর একটু লেখা আশা করেছিলাম। গাঁধীর স্মৃতিচারণা গত আশি বছরে কোথায় কী ভাবে তাঁকে দেখার চোখ বদলেছে সেই নিয়ে আরও সংবেদী আলোচনা প্রয়োজন ছিল। চিরন্তন গাঁধী বলে কিছু হতে পারে না। সমকালে গাঁধী কার চোখে কেমন, তার অনন্য দলিল এই বই। তবে স্মৃতি-স্মরণ-বিচারের মিশেল ছাড়া গাঁধীকে চেনা সম্ভব, এ দাবি এখন আর করা যায়, এমনটা নিশ্চিত বলতে পারি না।

এই বই বড় একটা প্রাপ্তি। একটা বড় দাবি তুলে রাখে। গাঁধীজীবনের সঙ্গে এ বার গাঁধীবাদ এবং গাঁধীবিচারের ইতিহাস লেখার সময় এসেছে। দেড়শো হল। গাঁধী আরও বাঁচবেন। তবে কী ভাবে, কার বিচারে, তার ইতিহাসের রাজনীতিও জরুরি। সময়াতীত গাঁধী রূপকল্প বা বিশুদ্ধ একটা নৈর্ব্যক্তিক মূল্যবোধের শরীরী রূপ হিসেবে গাঁধীকে ভাবা চলুক। তবে অশরীরী গাঁধীকে ভাবনার এবং ব্যবহারের ইতিহাস ততটাই উৎসাহে চর্চা হোক। ঢোঁড়াই চরিত মানসের কত বয়স হল?