হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্বকে দীর্ঘ দিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন মিলন দত্ত। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘দ্বন্দ্ব অহর্নিশ’— দলাদলি যেমন আছে গলাগলিও তেমন কম নয়। মিলন গলাগলি ও দলাদলি দুই ইতিহাসকেই স্বীকার করেন, দলাদলির থেকে গলাগলিতে যাতে উত্তীর্ণ হওয়া যায় তারই চেষ্টা করেন প্রকাশিত গ্রন্থগুলিতে। বাংলা সাহিত্যে ইসলামি সংস্কৃতির পরিচয় তেমন পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও লেখাগুলি আমপাঠকের দরবারে এসে পৌঁছয় না। সেই অভাব তাঁর সম্পাদিত গল্প সঙ্কলনে কিছুটা পূর্ণ হয়েছিল। অপরিচয়ের দূরত্ব মোচন করার জন্য পাঠককে ইসলামি শব্দকোষ উপহার দিয়েছিলেন তিনি। বাঙালি মুসলমানেরা হিন্দুদের যতটা জানেন, বাঙালি হিন্দুরা মুসলমানদের ততটা জানেন না। শব্দকোষ সেই অপরিচয় খানিকটা দূর করতে পেরেছিল। মিলনের মুসলিম জাহান গুরুত্বপূর্ণ বই। সে বইয়ে আক্ষেপ করেছিলেন, ‘‘বস্তুত একই কথা বলে যাওয়া। তাতে বিশেষ কোনও হেলদোল হয় না, ঢেউ ওঠে না সমাজে।... তবু বলতে হয়, আবারও বলতে হয়, বারবার বলতে হয়।’’ হিন্দু মুসলমান সম্পর্কের ঐক্য-দ্বন্দ্ব-ধন্দ দূর করার জন্য মিলন তাঁর সাম্প্রতিক সঙ্কলনে নানা রকম গদ্যরচনার সহায়তা নিয়েছেন।

আলোচ্য বইটি তিন ভাগে বিন্যস্ত। ‘‘নতুন লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রথম অধ্যায়। তার কয়েকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণা।’’ শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে পাকশি স্কুলের দিনগুলির কথা। শঙ্খ ঘোষ জানিয়েছেন, ‘‘ইস্কুলের ক্লাস এইট পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড়ো বন্ধু যে ছিল তার নাম তরিকুল আলম খান। তার বাবা ছিলেন একজন রেলওয়ে অফিসার, যাঁদের বদলির চাকরি।’’ শঙ্খের ছোটভাই অসীমেরও সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিল হারুন-অর-রশিদ। শিক্ষক পিতা তাঁদের বলতেন ‘পাকশি স্কুলে তাঁর সেরা ছাত্র হারুন’। বোঝা যায় বিত্ত ও শিক্ষার সামঞ্জস্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী ধর্মীয় ব্যবধানকে ভুলিয়ে দিতে পারে। শঙ্খ বলেন, ‘‘বঞ্চনাবোধ বাড়তে বাড়তে কাউকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে একটা বিপরীত আক্রোশ গড়ে ওঠে।... বঞ্চনাগত সমস্যাটা সব সময়ই যে সাম্প্রদায়িক তা নয়, বস্তুত তা শ্রেণিভিত্তিক। বস্তিবাসী মুসলমান আর বস্তিবাসী অন্ত্যজ হিন্দু বা দলিতরা যে একই ভাবে অবহেলার শিকার হতে পারে, সেটা আমাদের চেতনায় স্পষ্ট করা হয়নি।’’ সৌরীন ভট্টাচার্য তাঁর ‘দু-একটি সরল কথা’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘রাষ্ট্র ক্ষমতার মঞ্চে ইস্যু লাগে।’ রাষ্ট্র ক্ষমতা ‘ইস্যু’ করে তুলতে পারে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে কারণ সমাজের ভেতরে সে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। সৌরীনবাবু লিখেছেন, ‘‘১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় কফি হাউসে মাঝে মাঝেই গুজব এসে পৌঁছোত, ভাবতে লজ্জাই করে, এমনকি হুমায়ুন কবির, সৈয়দ মুজতবা আলি এঁদের নামেও। ততদিনে যাঁরা এসব গুজব মুখে করে আসত তাদের আমরা হয়ত বকেই দিতাম, কিন্তু কথাটা যে আমাদের মাথায় আসত তাতে তো ভুল নেই। আমাদের মুসলমান বন্ধুদের অনেকের কাছেই শুনেছি তাদের ছোটোবেলায় বাড়ির বড়োরা বোঝাতেন হিন্দু বাড়ি গিয়ে পুজোর প্রসাদ ট্রসাদ খাবে না, জিভ খসে যাবে।’’ সামাজিক স্তরের এই ভয়, সংশয় আর বিতৃষ্ণাকে রাষ্ট্র-ক্ষমতা ব্যবহার করে।

বইটির দ্বিতীয় ভাগের লেখাগুলি পুনর্মুদ্রিত। শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথে, শেষ হয়েছে আবুল বাশারে। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় উত্তপ্ত কলকাতায় বাশার তাঁর লেখাটি নির্মাণ করেছিলেন। বাশার সে দিন লিখেছিলেন, ‘‘মৌলবাদী শক্তি তার রাজনৈতিক অবলম্বন পেয়েছে, সেই রাজনৈতিক মঞ্চ এবং তার তলার ধর্ম সংগঠনের পারস্পরিক সম্বন্ধ সভ্যতার পক্ষে বিভীষিকা।’’ কথাটা এই সময়েও সমান সত্য। আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আগেকার চেহারা কেমন ছিল? জগদীশ নারায়ণ সরকার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক বুঝতে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর অভিমত, সিন্ধু প্রদেশে আরবদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সহিষ্ণুতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তুর্কি-আফগান শাসন প্রণালীতে মোল্লাতন্ত্রের প্রভাব প্রবল। ইলিয়াস শাহি আমলে (১৩৪২-৫৭) শাসনকার্যে ও সৈন্য বিভাগে হিন্দুরা নিযুক্ত হতেন। হুসেন শাহ এই উদারনীতি বহাল রেখেছিলেন। তাঁর এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় প্রাচীন হিন্দু রাজাদের মতোই মুসলমান শাসকেরা এক রকম ছিলেন না। জগদীশ নারায়ণ ‘মনীষী’ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতের বিরুদ্ধে ফুট কেটেছেন। দীর্ঘ মুসলমান রাজত্বে ‘‘হিন্দু গণেশের রাজা হওয়াটাই ত একটা বিরাট ব্যতিক্রম ও হিন্দুদের পক্ষে তৎকালীন রাষ্ট্র ও সমাজে গৌরবের বিষয়। দুইশত বর্ষব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ব্রিটিশ রাজ্যে কই একজন ভারতীয় ত ‘ভাইসরয়’— ‘গবর্নর জেনারেল’ নিযুক্ত হ’ন নাই।’’ নলিনীকান্ত গুপ্ত হিন্দু আর মুসলমানকে ‘সাত্ত্বিক’ ও ‘রাজসিক’ এই দুই বর্গে যাচাই করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘‘হিন্দুমুসলমানের আসল মিল হইতে পারে তখনই যখন হিন্দু অর্জ্জন করিবে মুসলমানের কিছু রাজসিক ভাব, আর মুসলমান অর্জ্জন করিবে হিন্দুর কিছু সাত্ত্বিক ভাব!’’ ছকটি চেনা, বিবেকানন্দের ‘ঐস্লামিক দেহ ও বৈদান্তিক মস্তিষ্ক’ প্রকল্পটির কথা মনে পড়বে। ক্ষিতিমোহন সেন তাকিয়ে ছিলেন মধ্যযুগের ভারতে— সে মধ্যযুগ অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়, ভক্তি আন্দোলনের আলোয় উদ্ভাসিত। ‘‘ধর্মসাধনায় উদারতার ক্ষেত্রে সকলের সেরা হইলেন কবীর। তিনি হিন্দু ও মুসলমানকে মিলাইতে চাহিলেন। ফলে দুই দলই তাঁহার নামে বাদশার কাছে নালিশ করিলে দরবারে তাঁহার তলব হইল। একই অভিযোক্তার কাঠগড়ায় মোল্লা ও পণ্ডিতকে একসঙ্গে দেখিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, হায়, ইহাই তো আমি চাহিয়াছিলাম।’’  (‘মিলিত সাধনা’, ক্ষিতিমোহন সেন) এই বিশ্লেষণগুলি পড়লেই বোঝা যায় মুসলমান শাসন পূর্ববর্তী হিন্দুর অতীত গৌরবের ঘোষকেরা সময়ের দীর্ঘ একটি পর্বকে বাদ দিতে চাইছেন। শুধু তাই নয়, হিন্দু সমাজের অনাচারগুলিকেও তাঁরা ভুলিয়ে দিতে তৎপর।  

হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক/ ঐক্যের দ্বন্দ্বের ধন্দের
সম্পাদক: মিলন দত্ত
৬০০.০০, ছোঁয়া

এই বইয়ের তৃতীয় অংশে সঙ্কলিত হয়েছে পত্রপত্রিকায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের কথা, ১৮২০ থেকে ১৯৪১ কালপর্বের মধ্যবর্তী নানা লেখা সেখানে ঠাঁই পেয়েছে। সেই সব লেখাতেও মিলের কথা যেমন আছে তেমনই আছে দূরত্বের প্রসঙ্গ। ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকা জানাচ্ছে, ‘‘রাজশাহীর নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যে ছেলেদের অসুখ হইলে পদ্মাপুরাণ পাঠ করিয়া শুনান হয় ও গো-মড়ক উপস্থিত হইলে গোরক্ষার লাড়ু গীত করা হয়। বিবাহের সময় মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করা হয়।’’ আবার গোমাংস নিয়ে দাঙ্গাও লেগেছে। ‘ঢাকা প্রকাশ’ জানিয়েছে, ‘‘অম্বালা জিলার মুসলমানগণ, হিন্দুদিগকে চটাইবার অভিপ্রায়ে এক গাড়ী গোমাংস লইয়া হিন্দুদিগের সম্মুখীন হইয়াছিলেন; হিন্দুরা তাহা অবশ্যই সহ্য করিতে পারে নাই, উভয় পক্ষে দাঙ্গা হয়, তাহাতে ৬০ জন অপরাধীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করিয়াছে। হিন্দুগণ দোকানপাট বন্ধ করিয়াও মুসলমানদিগকে শাস্তি দিয়াছে।’’

এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক যেন ছোটবেলার অঙ্ক বইতে কষা সেই তৈলাক্ত বাঁশের কিস্‌সা। খানিক ওপরে ওঠা, আবার পরক্ষণেই পিছলে নেমে আসা। অঙ্ক বইতে এক সময় বাঁশের শীর্ষে ওঠা যেত, তখন আর পিছলে নেমে আসার ভয় নেই। বাস্তবে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে দ্বন্দ্বের সমাধান হয় না, এই উপমহাদেশের মানুষেরা পিছলে নেমে আসার ভয়হীন স্বর্গশীর্ষে পৌঁছতে পারেন না। সব সময়ই সজাগ থাকতে হয়। কখন কোন ছিদ্রপথে ঢুকে পড়ে দাঙ্গার বিষ। মানুষকে সজাগ করার জন্যই অক্লান্ত ভাবে দীর্ঘ দিন চেষ্টা করছেন মিলন দত্ত। শুধু মিলনের নয়, এ আপনার আমার সকলের দায়।