আমি দেখাতে চেয়েছি যে মহাভারত কোনো সুদূরবর্তী ধূসর স্থবির উপাখ্যান নয়, আবহমান মানবজীবনের মধ্যে প্রবহমান।’’ লিখেছেন বুদ্ধদেব বসু তাঁর যে বইটির মুখবন্ধে, সেটি নতুন করে বেরল এ বার সিগনেট প্রেস থেকে, মহাভারতের কথা (২৫০.০০), চমৎকার প্রচ্ছদ ও মুদ্রণ পারিপাট্যে। তুলনা-প্রতিতুলনায় রামায়ণ ও অন্যান্য পুরাণ প্রসঙ্গের পাশাপাশি এসেছে দেশি ও পশ্চিমি সাহিত্যের অনুষঙ্গও। বুদ্ধদেবের এই দার্শনিক বীক্ষা পাঠককে তার অস্তিত্বের অর্থবহতা সম্পর্কে সপ্রশ্ন করে তুলবে। 

যত অল্পই লিখুন না কেন, তাঁর গদ্যের শৈলী চিনিয়ে দেয় যে আদতে তিনি আদ্যন্ত কবি, আর তাঁর এই গদ্যলেখ যেন তাঁর নিজেরই কবিতার শীর্ষে পৌঁছনোর একটা পথ। দেবারতি মিত্রের গদ্যসংগ্রহ ২ (অবভাস, ২৫০.০০) পড়তে পড়তে আত্মকথনের কিংবা কবিমনের স্পর্শ পাওয়া যায় যেমন, তেমনই মেলে নৈর্ব্যক্তিক দর্শনের বোধও।

১৯৪৬। এক দিকে যেমন দাঙ্গা, উল্টো দিকে প্রতিরোধে বাংলার কৃষকদের সম্মিলিত হিন্দু-মুসলমানের দুর্বার আন্দোলন। আর্থিক সঙ্কট, খাদ্যাভাবের পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্তের শ্রমজীবী মানুষের ধর্মঘট ও ছাত্র-যুবকদের বিক্ষোভ সমাবেশ। ক্ষমতার দড়ি টানাটানি, লাভ-লোকসানের হিসেবনিকেশের বিপরীতে আজাদ হিন্দ ফৌজের বিক্রম, নৌবিদ্রোহ— স্বাধীনতার মরিয়া সংগ্রাম। ঘটনাবহুল বছরটিকে ঘিরে প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা-কবিতার সমাহার: ছেচল্লিশের ইতিকথা (সম্পা: তাপস ভৌমিক। কোরক, ১৭৫.০০)। 

‘‘যদি লেখক না হতাম তাহলে আমিও অভিনেতা হতাম।’’ প্রায়ই বলতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আর তাঁর বন্ধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত: ‘‘বন্ধু সুনীলের অজস্র গুণ। একটা বড় গুণ তাঁর অভিনয় ক্ষমতা।’’ অভিনেতা সুনীলকে নিয়ে একটি অধ্যায়ই আছে কাজি তাজউদ্দিনের বইটিতে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাট্যচর্চা (অক্ষর প্রকাশনী, ১৫০.০০)। কথাকার সুনীলের নাট্যভুবন নিয়ে, বা বহুমাত্রিক সুনীলের অনালোচিত এই দিকটি নিয়ে এমন বই বোধহয় এই প্রথম।

‘‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দলিত সাহিত্যের আন্দোলন সঠিক ভাবে বিশ বছরও অতিক্রম করেনি।’’ সম্পাদক যতীন বালা এমনই লিখছেন দলিত মানুষের গল্প (গাঙচিল, ৩৫০.০০) সঙ্কলনের সূচনায়। দুঃখ করছেন, ‘যথার্থ দলিত ছোট গল্পের লেখক’ সংখ্যায় আজও নগণ্য। বোঝা যায়, কেবল দলিতদের সাহিত্যচর্চা নয়, দলিতের জীবনসত্যকে তুলে ধরা তাঁর উদ্দেশ্য। যার এক দিকে উচ্চবর্ণের পীড়ন, অন্য দিকে রাজনৈতিক দলের নির্যাতন। নির্বাচিত বাইশটি গল্প সে কাজ অনেকটাই করেছে। অনেকগুলিই সাহিত্যের বিচারেও রসোত্তীর্ণ।   

পুরাকালের দু’টি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাল্মীকি ও ব্যাস সৃষ্টি করেছিলেন দুই মহাকাব্য। সেখানে একই আধারে সভ্যতা, সংস্কৃতি, পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ, শাস্ত্র ছাপিয়ে বহু আকর্ষক মানব-মানবীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পরস্পরের পরিপূরক পুরুষ চরিত্ররা সেখানে তাঁদের নিজস্বতায় নানা অসঙ্গতির সৃষ্টি করলেও মহাকাব্যীয় নারীরা চারিত্রিক বিভিন্নতায় একে অপরকে অতিক্রম করে গিয়েছেন। কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন চিরস্মরণীয়। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে, কাহিনির স্বার্থে বা ঘটনাচক্রে যাঁরা এসেছেন তাঁদের অধিকাংশই আমাদের অল্প চেনা, নামে চেনা অথবা না-চেনা— এই সমস্ত মহাকাব্যীয় নারীরাই মধুস্রবা দাশগুপ্তের মহাকাব্যে চিরন্তনী (আনন্দ, ২৫০.০০) বইটির প্রধান উপজীব্য।

‘ভাষিক মাৎস্যন্যায়ের অমোঘ অনিবার্যতার কথা মাথায় রেখেই’ ভাষা আন্দোলনের উপর গল্প সঙ্কলন রক্তে রেখে গেছে ভাষা: ১/ ভাষা আন্দোলনের গল্প প্রকাশ পেয়েছে। প্রথম খণ্ডে আছে অসম ও বাংলাদেশের ১৩টি করে মোট ২৬টি গল্প (সঙ্কলন ও সম্পাদনা: সুশীল সাহা। ধানসিড়ি, ৩৫০.০০)। প্রতিটি গল্পই যেন বেদনাবহ আখ্যানের সমন্বয়। দ্বিতীয় খণ্ডে থাকবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের গল্প।

পনেরো বছর পর অশোক চট্টোপাধ্যায়ের সরোজ দত্ত সমর সেন এ ব্রতযাত্রায় গ্রন্থটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ হাতে এল। উত্তাল সত্তর দশকের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মননশীলতা, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও মতাদর্শ, দুই ব্যক্তিত্বের মতাদর্শগত সংঘাতের কথা তুলে ধরেছেন লেখক। নকশাল আন্দোলনের রূপকার চারু মজুমদারের জন্মশতবার্ষিকী, সরোজ দত্ত শহিদ হওয়ার ৪৭ বছর এবং সমর সেনের ১০২তম জন্মবার্ষিকী। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তিও হয়েছে সম্প্রতি। এই সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বইটি মূল্যবান সংযোজন (ঠিক ঠিকানা, ২০০.০০)।

দীর্ঘ দিনের মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের ২০টি প্রবন্ধের সংকলন ‘আন্দোলন রাজনীতি মানবাধিকার’ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের লেখাগুলি নিঃসন্দেহে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। গো-রক্ষকদের তাণ্ডব, গো-মাংসের রাজনীতি, লাভ-জিহাদ থেকে শুরু করে শর্মিলা চানুর লড়াই, বিনায়ক সেনের বিচার— নানা বিষয়ে ভেবেছেন সুজাত (বোধিসত্ত্ব, ১৫০.০০)।

‘জানি না কি মরণ নাচে/ নাচে গো ওই চরণ-মূলে?’ রবীন্দ্রনাথের শরৎকালের একটি গানের একটি লাইন এটি। সে ঋতুতে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক কোনও কোনও বিপর্যয়ের আবছা স্মৃতি যেন মৃত্যুর অনুষঙ্গ নিয়ে আসে কবির গানের কথায়, এমনটাই মনে হয়েছে গৌতম চৌধুরীর। ছ’বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি রবীন্দ্র রচনাবলির গান খণ্ড আর অখণ্ড গীতবিতান-এর গভীরে ঢুকে বহুকৌণিকতায় খুঁজে গিয়েছেন রবীন্দ্রগানের পাঠবস্তুর বিশাল পরিসর। সম্পূর্ণ সাধু গদ্যে রচিত অবাক আলোর লিপি (অক্সফোর্ড, ৩৯৫.০০) নতুন ভাবে ভাবাবে পাঠককে।

অশোককুমার মুখোপাধ্যায় তথ্যকে রচনাগুণে সত্য করে তুলতে জানেন। তাঁর লিখনগুণে চরমপন্থী আন্দোলনের নায়ক, নকশাল আন্দোলনের বিপ্লবীরা এর আগেই বাংলা উপন্যাসের বিষয় হয়ে উঠেছেন। তাঁর অবিরাম জ্বরের রূপকথা (দে’জ, ৩৫০) সেই ধারারই রচনা। এ বার বিষয় ‘চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নীতির ক্রম-বিবর্তন’। ১৮৬০ থেকে পরবর্তী একশো বছরের সমাজ ইতিহাস তুলে ধরেছে এই কাহিনি। দ্বারিকানাথ, কৃতীন্দ্রনাথ, পুণ্যেন্দ্রনাথের কাহিনি শুধু নয় এ কাহিনি মধুমাধবীরও। মধুমাধবী প্রতিশ্রুতিসম্পন্না কবিরাজ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা ধারা, সামাজিক বিধি-নিষেধের টানাপড়েনে এ বাঙালির নতুন চিকিৎসা-দর্পণ।

আমরা বাস করছি এক নতুন ভারতে। সে ভারত শাসককে রাষ্ট্রের সঙ্গে এক করে দেখে, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে না। সাম্প্রদায়িকতা তার কাছে স্বাভাবিক। এক দিকে নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এই চেহারা, অন্য দিকে সে চেহারা দেখে দু’এক কণা লজ্জা। অমিতাভ গুপ্ত সোজাসাপ্‌টা লেখায় তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে এই অবস্থাটাই তুলে ধরেছেন (লজ্জাটুকুই ভরসা/ নরেন্দ্র মোদীর ভারত। আনন্দ, ৩০০.০০)। এই মুহূর্তের জরুরি পাঠ। 

১৯৪২ সালে ‘প্রেম’ নামে তাঁর প্রথম উপন্যাসের একটি অংশ প্রকাশ পায় ‘শনিবারের চিঠি’তে। নারীর নিজস্ব জগতের সেই ছবিতে তোলপাড় হয়েছিল সাহিত্যসমাজে। সমকালকে বার বার চ্যালেঞ্জ করেছেন গিরিবালা দেবীর কন্যা বাণী রায় (১৯১৮-৯২)। লিখেছেন গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ ও রম্যরচনা। সুদক্ষিণা ঘোষের সম্পাদনায় এ বার সেই বিস্মৃত লেখিকার রচনাবলীর প্রথম খণ্ড (উপন্যাস) প্রকাশিত হল (এবং মুশায়েরা, ৫০০.০০)।

যৌনতা যে বহুমাত্রিক, শুধু বিপরীত লিঙ্গের প্রতি নয়, সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণও যে স্বাভাবিক যৌনতা, এই কথাটা সমাজ বুঝেও বুঝতে চায় না। তারই ফল অবদমন, বিকৃতি, হিংস্রতা। এবং, অসম্ভব সব কষ্ট। আমার যৌনতা (ঈপ্সিতা পালভৌমিক ও সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত। গুরুচণ্ডা৯, ১১০.০০) বইটিতে রয়েছে তেমনই ১৭টি লেখা। যন্ত্রণার কথা, প্রেমেরও। মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে বইটি।