স্মৃতির অতলে
অমিয়নাথ সান্যাল
৩৫০.০০, সিগনেট প্রেস

‘‘বিস্মৃতির সাগরের তলে স্মৃতির অনন্ত অতল, সুষুপ্তির মতো প্রশান্ত নীলিমা দিয়ে ঘেরা। অতীতের সন্ধানী ডুবুরি মন এখানে পৌঁছিয়ে দেখে এক আশ্চর্য অতল উজ্জ্বল হয়ে আছে আশার অবলুপ্ত স্বপ্ন নিয়ে।’’ সঙ্গীতবিদ ও সঙ্গীত সমালোচক অমিয়নাথ সান্যাল (১৮৯৫-১৯৭৮) তাঁর অসামান্য স্মৃতিগ্রন্থের ভূমিকা শুরু করেছেন এই ভাবেই। ১৯৫৩ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটিতে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বিস্ময়কর তিন জন সঙ্গীতগুণীর (উস্তাদ মৌজুদ্দিন, ফৈয়াজ্‌ খাঁ ও কালে খাঁ) আলেখ্য চিত্রিত, প্রসঙ্গত এসেছে আরও অনেকের কথাই। উস্তাদ বদল্‌ খাঁ-র শাগরেদদের অন্যতম ছিলেন অমিয়নাথ। উস্তাদ শ্যামলালজিকে কেন্দ্র করে হ্যারিসন রোডের বাড়িতে যে আসর বসত, সেখানে সঙ্গ পেয়েছেন বহু সঙ্গীতগুণীর। উস্তাদ মৌজুদ্দিন সম্বন্ধে অমিয়নাথের মন্তব্য, তিনি ‘‘রাগ-তাল জানেন না, শিক্ষাও করেননি, সরগমও সাধেননি। ঠিক যেমন হাঁসের বাচ্চাকে জলে ছেড়ে দিলে সে আপনি সাঁতার কাটে, খেলা করে, মৌজ্‌দিনও সেরকম গান করেন, রাগে ও তালে। পূর্বজন্মের সংসিদ্ধি ছাড়া এর আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে!’’ কিংবা উস্তাদ কালে খাঁ— ‘‘অনুভবের পরখে খাঁটি সোনা’’। উস্তাদ ফৈয়াজ্‌ খাঁ-র প্রসঙ্গেও ফিরে এসেছে সেই অনুভবের কথা— ‘‘সকলের মনের কথা তো আমি জানি না; জানবার স্পর্ধাও রাখিনে। আমি জানি মাত্র আমার মনের কথা, বুঝি মাত্র নিজের অনুভবের সুখ-স্মৃতি।’’ রসিকের সম্পদ অমিয়নাথের সেই অনুভবের বাঙ্ময় রূপ সুরেশ চক্রবর্তী সম্পাদিত সংস্করণটি নবকলেবরে পাঠকের কাছে ফিরে এল, এ বড় কম কথা নয়।

 

যে-জীবন আমার ছিল না
অরুণ চক্রবর্তী
২৫০.০০, স্ব-প্রকাশন (পরি: সারদা প্রকাশনী, কল-৯)

বয়েস যখন সতেরো, তখন বাড়ি থেকে পালানো। পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাবা এবং মা দু’জনেই জেলখাটা রাজনৈতিক কর্মী। বাড়িতে ভাইবোনেরা মেধাবী। সবার আশা এই কিশোরও সে রকম হবে এক দিন। কিন্তু দলছুট এই ছেলের চোখে অন্য এক স্বপ্ন। সে হবে— হবেই— সাংবাদিক। তাই পালিয়ে কলকাতায়। কপর্দকশূন্য সহায়সম্বলহীন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের গোড়া। ও পার বাংলায় আয়ুব শাহির পতন। এ পারে কমিউনিস্ট আন্দোলন। ঠাঁই শিয়ালদহ রেল কলোনির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে। পেট চালাতে দুধ, ম্যাগাজিন, আইসক্রিম হকারি, টিউশনি। কখনও বৃদ্ধদের খবরের কাগজ পড়ে শুনিয়ে কয়েক টাকা। এ কলেজ সে কলেজ ঘুরে ডিগ্রি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ও সাংবাদিকতায় এমএ। লক্ষ্য অটুট।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

এ দেশের বেশির ভাগের মতো নয়, পশ্চিমের সাংবাদিকের মতো নিজেকে শিক্ষিত করতে লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিতে গোগ্রাসে পাঠ। তলিয়ে যেতে যেতে সে কিশোর একদিন ‘যুগান্তর’ পত্রিকার কলামনিস্ট। এবং অবশেষে প্রাণসংশয় উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির রোজনামচা লিখে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় চাকরি। সত্তরোর্ধ্ব সেই অরুণ চক্রবর্তী লিখেছেন আত্মজীবনী। দিল্লিতে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টে অনেক দিন চাকরি অন্তে অরুণ এখন আবার তাঁর যৌবনের শহরে। অসুস্থ শরীরে বাইরে বেরোনো বন্ধ হলে কী হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এখন একজন ব্যস্ত কলমচি। তাঁর আত্মজীবনীর পাতায়-পাতায় এক দিকে যেমন বহমান সময়, অন্য দিকে তেমনই একজন মানুষের ‘হয়ে ওঠা’র কাহিনি।

 

গ্রাম্য উপাখ্যান/ রাজনারায়ণ বসু
সম্পাদক: অর্ণব নাগ
২০০.০০, পত্রলেখা

‘ভারতীয় জাতীয়তার পিতামহ’ রাজনারায়ণ বসুর (১৮২৬-৯৯) জাতি-সত্তায় ইতিহাসের, যাকে তিনি ‘অতীত পুরাবৃত্ত’ বলে চিহ্নিত করতেন, তার স্বতন্ত্র গুরুত্ব ছিল। ১৮৮৩-৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘সুরভী’ পত্রিকায় লেখেন তাঁর নিজের গ্রামজীবনের আখ্যান ‘গ্রাম্য উপাখ্যান’। এটি গ্রন্থবদ্ধ হয় তাঁর প্রয়াণের অনেক পরে, ১৯১৪ সালে। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান আর মৌখিক পারিবারিক ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে রচিত এই আখ্যানের মূল উপজীব্য ছিল বোড়াল গ্রামের (আখ্যানে ‘বাদল’ গ্রাম) অতীত গৌরব ও বর্তমান হীনাবস্থা নিয়ে আক্ষেপ এবং অবশ্যই অতীতের ভিত্তিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনাও। প্রত্ন-ভিত্তিতে বোড়ালের প্রাচীনত্ব প্রমাণে প্রয়াসী ছিলেন রাজনারায়ণ, পরে তার যাথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। শতবর্ষ পেরিয়ে এত দিনে বইটি সযত্ন সম্পাদনায় প্রকাশ পেল। সঙ্গে রয়েছে রাজনারায়ণের অপর রচনা ‘চল্লিশ বৎসর পূর্ব্বে বঙ্গদেশে ভ্রমণ বৃত্তান্ত’, যা প্রথম প্রকাশেও ছিল। সম্পাদক দীর্ঘ ভূমিকায় রাজনারায়ণের ইতিহাস-ভাবনা ও রচনার পরিপ্রেক্ষিত আলোচনার সঙ্গে পরিপূরক তথ্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে এতে ইতিহাসের উপাদান যথেষ্ট রয়েছে। পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে রাজনারায়ণের ‘আত্মীয় সভার সভ্যদিগের বৃত্তান্ত’, কন্যা লীলাবতী মিত্র রচিত রাজনারায়ণের চরিতকথা, বাংলা সাময়িকপত্রে রাজনারায়ণের রচনাপঞ্জি, তাঁর লেখা ও তাঁকে লেখা পত্রাবলির হদিশ, রাজনারায়ণ-চর্চার রূপরেখা ও বোড়ালের প্রাচীনত্ব নিয়ে বিভূতিভূষণ মিত্রের লেখা।