কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজুয়াল আর্ট বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বাৎসরিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে। শিরোনাম ‘রেখান্যাস ১৭’। শিল্পীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় খুবই সাধারণ বিষয় থেকে শুরু করে মানসিক বা আত্মিক উৎস থেকে বিকশিত ছবি এবং সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক অবস্থা সংক্রান্ত ছবি আঁকবার জন্য। এই প্রদর্শনীটি দেখলেই বোঝা যায় যে, শিল্পীরা কত পৃথক পৃথক ভাষা এবং রচনাশৈলী ব্যবহার করেছেন।

মলয়কুমার গায়েনের ছবি ‘অভ্যন্তরীণ জায়গা’। ঘরের মধ্যে জায়গাগুলোকে কেটে কেটে নানা বর্ণ ব্যবহার করে সুন্দর একটা রূপ সৃষ্টি করেছেন। যেটি না বিমূর্ত চিত্র, না সেটি বাস্তবায়িত চিত্র। তাঁর অপর একটি ছবি ‘আমার প্রতিবেশ’। চিত্রকর্মটি মজাদার। বিশ্বামিত্র দাসের ইনস্টলেশন-এর শিরোনাম ‘শিরোনামবিহীন’। সুতো দিয়ে, মাটি দিয়ে অ্যাক্রিলিক দিয়ে সৃষ্ট এই কাজটি আকর্ষণীয়। সুশোভন শীলের ‘সংকট অনিশ্চয়তা’ বিশাল কাজ। শিল্পী উপাদান সংগ্রহ করেছেন প্লাই, প্লাস্টিক, ধাতু থেকে। একটি জলের ট্যাঙ্কের গায়ে বহু কল বসানো। মানে জলের অপচয় হচ্ছে। অমিতকুমার পালের কাজ ‘স্বপ্নে রক্ত’। শিল্পীর ভাষায় তিনি যখন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন, সেটি তখন ছবির আকার নেয় এবং তা থেকে রক্ত নিঃসরণ হয়। সুখেন্দু কুণ্ডুর দুটি প্রতিকৃতি মিশ্র মাধ্যমে করা। একটি প্রতিকৃতি শিল্পীর নিজের ছবি বলেই মনে হয়।

এ ছাড়াও অংশগ্রহণ করেছেন ঝিলিক মণ্ডল, স্বরূপ হালদার, সূর্যশেখর রায়চৌধুরী, পীতম ঘোষ, গৌতম দাস, সুমন রানা, অহনা সেন, শিবেশ্বর রায়, রকি মজুমদার, সনু তিরকি, অর্পিতা দাস, শান্তনু জানা, পাপড়ি বসু ও সুমন বিশ্বাস।

শমিতা বসু

 

সুরে-সুরে, স্মৃতিচারণায়

প্রাচ্যের ঐতিহ্যপ্রবণতা এবং প্রতীচ্যের যুক্তিধর্মিতা তাঁর সংগীতভাবনায় স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছিল। বিপ্রতীপ দুই ভাবসূত্রকে একটি গ্রন্থিতে বেঁধেছিল তাঁর সেতার। তিনি প্রয়াত সেতারবাদক সুব্রত রায়চৌধুরী। সম্প্রতি আইসিসিআর-এ বিশেষ এক সংগীতময় সন্ধ্যায় স্বনামধন্য এই সেতারবাদকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করল ‘সোহিনীমোক্ষ ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন’। সুরে-সুরে, স্মৃতিচারণায় শিল্পী সুব্রত রায়চৌধুরীর স্বকীয় সাংগীতিক ভাবনার স্পর্শ পেলেন শ্রোতারা।

এই অনুষ্ঠান কয়েকটি পর্বে বিন্যস্ত ছিল। শুরুতেই দেখানো হল শ্রীরায়চৌধুরীকে নিয়ে অডিয়ো-ভিসুয়াল একটি প্রেজেন্টেশন। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিরোমন্থনে ধরা দিলেন সংগীতশিক্ষক শ্রীরায়চৌধুরী। পরবর্তী পর্যায়ে যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করলেন তাঁর তিন শিষ্য— মাটিয়াস ভোল্টার,  ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী এবং জোনাথন মেয়র। তবলায় তাঁদের সহযোগিতা করেছেন সঞ্জীব পাল।

সুরবাহারে রাগ ইমন বাজিয়ে শোনালেন মাটিয়াস ভোল্টার। সংক্ষিপ্ত সুরবিস্তারে ইমনের রূপ ফুটিয়ে তুললেন তিনি। পরবর্তী শিল্পী ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী সেতারে বাজিয়ে শোনালেন রাগ আভোগী। ঝাঁপতালে একটি বন্দিশ পরিবেশন করলেন তিনি। ইন্দ্রজিতের সেতারবাদন বেশ ভাল। পরিমিত বিস্তারে রাগরূপ ফুটিয়ে তুললেন তিনি। শিল্পী জোনাথন মেয়র শোনালেন কাফি রাগে তিনতালের একটি কম্পোজ়িশন। তাঁদের শেষ নিবেদন ছিল রাগ মালকোষ। সংক্ষিপ্ত আলাপের পর একতাল ও তিনতালে নিবদ্ধ কিছু বন্দিশ শোনালেন। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মিলিত শৈলী ধরা পড়ছিল এই ত্রয়ীর বাজনায়। আলাপে, সুরবিস্তারে গুরুজির দেখানো পথেই হাঁটলেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানের অন্যতম শিল্পী ছিলেন তরুণ প্রজন্মের বিশিষ্ট সরোদবাদক আমান আলি খান। সুরে-সুরে শ্রদ্ধেয় ‘সুব্রতজেঠু’কে স্মরণ করলেন তিনি। আমানের সরোদবাদনের আগে উস্তাদ আমজাদ আলি খান প্রেরিত বার্তায় ধরা দিলেন অন্য এক সুব্রত রায়চৌধুরী। উস্তাদজি জানালেন, তাঁর সংগীতজীবনের সুদীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছিলেন শ্রীরায়চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর পিতা উস্তাদ হাফিজ আলি খানের সুযোগ্য শিষ্য ছিলেন সুব্রতবাবু। এই স্মৃতিচারণার পথ বেয়েই শুরু হল আমানের সরোদবাদন। সে দিন সুরের মাধ্যমেই স্মৃতিভার মোচন করলেন তিনি। বাজিয়ে শোনালেন রাগ মারোয়া। দীর্ঘ আলাপের পর ধামার তালে নিবদ্ধ একটি কম্পোজ়িশন শোনালেন। ধ্যানী শিল্পীর মতো মারোয়ার রাগবিস্তারকে পরিপূর্ণতা দিলেন আমান। ঋষভ এবং ধৈবতের শৈল্পিক প্রয়োগে চমৎকার আবেশ তৈরি হয়েছিল। মারোয়ার বৈচিত্রময় চলন সাবলীল ভাবে ফুটে উঠছিল সরোদের মূর্ছনায়। পরবর্তী রাগ কেদারও দুই মধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছিল। আমানের শেষতম নিবেদন ছিল হংসধ্বনি। একতালে গতিময় একটি কম্পোজিশন শোনালেন তিনি। তাঁকে তবলায় যথাযোগ্য সহযোগিতা করেছেন শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

অনুষ্ঠানের সর্বশেষ পর্বে সুব্রত রায়চৌধুরীর সেতারটি তুলে দেওয়া হল আমান আলি খানের হাতে। তাঁদের পারিবারিক বাসগৃহ ‘সরোদঘর’-এর সংগ্রহশালায় সেটি সংরক্ষিত থাকবে।

চিত্রিতা চক্রবর্তী

ছবি: সুমন বল্লভ