সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আলোচনা

বিন্দুর অবস্থানে মূর্ত-বিমূর্ত

Painting
বিবর্তন: অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত রাজীব দেয়াশীর প্রদর্শনীর ছবি

সম্প্রতি রাজীব দেয়াশীর চিত্রশিল্পের প্রদর্শনী হয়ে গেল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। বহু বিশিষ্ট সম্মানে ভূষিত এই শিল্পী। অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাসে চিত্রিত ওঁর বিন্দুশিল্পের নানাবিধ জ্যামিতিক রূপকল্প অবশ্যই আমাদের ভাবায়। মূর্ত-বিমূর্ত, দেহবাদ আর অধ্যাত্মবাদের দোলাচলের মধ্যেই যেন এই বিন্দুর অবস্থান। সেই ভাবনাকে উপজীব্য করে এক অনিন্দ্যসুন্দর চিত্রমালা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। মানুষের জীবনের অস্তিত্ব ও চেতনার উন্মেষে তার উত্তরণ অনেকটাই বিন্দু থেকে সিন্ধুতে যাত্রার মতো। শিল্পীর মননে, এই বিন্দু যেন অসীম শক্তির কোনও মাঙ্গলিক প্রতীকী, অকস্মাৎ ধরা দেয় সীমা ও কালের তাৎক্ষণিক চৌহদ্দিতে। কায়া, ছায়া আর মায়ার এক দোদুল্যমান বেষ্টনীর মধ্যে এই বিন্দুর অক্লান্ত পরিগ্রহ। সৃষ্টিতত্ত্বের অন্বেষণে জড়তা থেকে প্রাণের অধিবেশন এবং চিন্তন-মননের সুগ্রন্থন আমাদের মানব সভ্যতার এক বিস্ময়কর বিবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থূল দেহতত্ত্বের বিন্দুরূপী কোষ বিভাজনের বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আমরা পাই প্রাণের বিবর্তনের এক বিচিত্র ইতিহাস।

দেহের সীমা লঙ্ঘন করে মহা জাগতিক যাত্রাপথে হয়তো বা তার মুক্তি ভূমি থেকে ভূমায়। মানুষের শরীর, মন ও সর্বোপরি আত্মার উদ্ভাবন কোনও সরল রৈখিক গতিপথে অতিক্রমণ নয়। ভাবা যেতে পারে, মাটির বুকে পত্র পুষ্পে শোভিত নাভি কমলের বীজবিন্দু থেকে তার প্রাণসঞ্চার, নানা দ্রবণ ক্ষরণ ও সংশ্লেষের মধ্য দিয়ে তার ধারণ ও বিস্তার, পরিণতি এবং পরিশেষে মহাশূন্যতায় নিষ্কৃতি লাভ। আবার কল্পনা করা যেতে পারে, ‘আত্মার সংস্কৃতি’ই যে শিল্প উৎকর্ষের শ্রেষ্ঠ ফসল, শিল্পী নানা অনুষঙ্গ দিয়ে সেটি বোঝাতে চেয়েছেন। সেই বিন্দু বিশেষের নানান কৌতূহলী জ্যামিতিক বিস্তার ও ক্রম বিবর্তন, পত্রপুষ্পের প্রতীকী বিন্যাস, রেখার জাদুস্পর্শ আমাদের শিহরিত করে, সম্মোহিত করে এক অলীক স্বপ্নজালে। শিল্পীর সঙ্গে সমান তালে আমরাও যেন অক্লেশে শামিল হই অনুধাবন করতে তার বিন্দু-বৃত্তান্ত।

সাদা কালোয় স্যুরিয়াল স্বপ্নময়তার এক অনবদ্য আস্বাদন আমাদের করিয়ে দেয় তাঁর ত্রিভুজ এবং উলটো ত্রিভুজের চিত্রসারি। সৃষ্টি-সৃজনের মূল প্রতিপাদ্য হিসাবে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন সার্থক রূপ পেয়েছে তাঁর এই পর্যায়ের আঁকা ছবিগুলিতে। শিল্পীর পেন্সিল লাইনিংয়ে আঁকা বুদ্ধ, মহাদেবের চিত্রণগুলি দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।

 

শমিতা বসু

 

নৃত্য-ছন্দে তিন দিন

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স ও ডোভার লেন মিউজিক অ্যাকাডেমির যৌথ উদ্যোগে আইসিসিআর-এ আয়োজন করা হয়েছিল তিন দিনের শাস্ত্রীয় নৃত্যানুষ্ঠানের। শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল ডান্স।’ প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে প্রথমেই যিনি কত্থক নৃত্যে মন জয় করে নিলেন, তিনি হলেন তৃণা রায়। ‘শ্রাবণ কে ঋতু আয়ি রে সজনিয়া...’ গানটির সঙ্গে শিল্পীর নৃত্যে যে ভাবের প্রকাশ ঘটেছে তা অতুলনীয়। সাবর্ণা সাহা শুরু করলেন ওড়িশি নৃত্যে ‘জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথগামী’ বিষ্ণুবন্দনা দিয়ে। পরের উপস্থাপনা ছিল ‘নবদুর্গা’। অপুর্ব নৃত্যভঙ্গিমা।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে ভরতনাট্যম ও কুচিপুরি দুটি বিশিষ্ট নৃত্যশৈলী এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের দুটি নির্দিষ্ট নৃত্য বিভাগ। দুটি ধ্রুপদী নৃত্যেরই নিজস্ব বিশিষ্ট ধারা আছে, যার একের সঙ্গে অপরের মিল নেই। দুই ভিন্ন ধারার নৃত্যশৈলীকে যুগল নৃত্যে উপস্থাপিত করা বেশ কঠিন কাজ। যা সম্ভব করেছেন ‘নীলামানা সিস্টার্স’ দ্রৌপদী পারভিন ও পদ্মিনী কৃষ্ণাণ। দ্রৌপদী পারভিন ভরতনাট্যমের ছন্দোবদ্ধ পদক্ষেপ, হস্তমুদ্রা, বিশিষ্ট নৃত্যভঙ্গিমা ও ভাবের অভিব্যক্তি সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পদ্মিনী কৃষ্ণান কুচিপুড়ির লাস্যময়ী ভঙ্গিমা যে ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে।

শেষে ছিল কত্থক নৃত্যআঙ্গিকে আলোকপর্ণা গুহর নৃত্য ও তাঁর সংস্থা ‘পুষ্পক ডান্স অ্যাকাডেমি’র নৃত্য প্রদর্শন। আলোকপর্ণা ও সংস্থার ছাত্রীরা পরিবেশন করলেন বিভিন্ন ঋতুর রূপ ‘ঋতু চতুষ্ঠায়’। প্রিয়বিরহে কাতর রাধার রূপটি আলোকপর্ণা সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সম্মিলিত নৃত্যে ছিলেন রণিতা, বাপান, দেবজিৎ, শ্রেয়সী, পৌলমী প্রমুখ।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ছিল শুভজিৎ দত্তের ভরতনাট্যম। পরে ‘বর্ণম’ ও ‘তিল্লানা’ পরিবেশন করলেন। ভাল লেগেছে মা যশোদা ও বালক শ্রীকৃষ্ণের ‘মাখন চুরি’ উপাখ্যান। তাঁর নৃত্য, তাল, লয়, দক্ষ পদবিন্যাস ও হস্তমুদ্রার উপর যতটাই তাঁর মুনশিয়ানা, ততটাই মুগ্ধ করে তাঁর অভিনয় ক্ষমতা। পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘নার্তেশ্বর কালচারাল’ সংস্থার নৃত্যশিল্পীদের ওড়িশি নৃত্য প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এ দিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল পণ্ডিত বিরজু মহারাজের সুযোগ্য পুত্র দীপক মহারাজ পরিবেশিত কত্থক নৃত্য। দীপক শুরু করলেন ‘মহাদেব শিব শম্ভু’ শিবস্তুতি দিয়ে। তাঁর পরিবেশনায় তবলা লহড়ার সঙ্গে তাল-নির্ভর কত্থক নৃত্য পদ্ধতিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিন তালের সঙ্গে দক্ষ পদবিন্যাস খুবই চিত্তাকর্ষক ছিল। ‘পরণ’ অংশে বাদকের বোল উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ের তালে জবাব দেওয়া প্রশংসনীয়। এক-একটি বন্দিশ, সওয়াল-জবাব, ঠুমরির সঙ্গে তাঁর অভিনয়গুণে সমৃদ্ধ নৃত্য, পরিবেশিত চক্রধার সেই সন্ধ্যায় দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছিল। ‘গৌড়ীয় নৃত্য ভারতী’র নৃত্যশিল্পীরা ‘চৌত্রিশ অক্ষর কালীস্তব’ দিয়ে তাঁদের নৃত্যানুষ্ঠান শুরু করেন। অংশ নিয়েছিলেন অয়ন, সৌম্য, রঞ্জিমা, পারমিতা, সহেলি, রচনা, জয়ন্ত, কৌশিক, সায়ন্তিকা, শতাব্দী ও মণিকিরণ।

উৎসবের শেষ দিনের শিল্পী অন্বেষা চক্রবর্তী পরিবেশিত শিববন্দনা, তাল ধামার ও তিন তালে নৃত্য প্রশংসনীয়। এর পরে কুচিপুড়ি নৃত্যশিল্পী টি রেড্ডি লক্ষ্মী শুরু করলেন ‘দুর্গাস্তোত্রম’ দিয়ে। দ্বিতীয় উপাস্থাপনায় ছিল মহাভারতের উপাখ্যান যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। যা প্রশংসার যোগ্য। উৎসবের শেষ শিল্পী ছিলেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের পুত্রবধূ সুজাতা মহাপাত্র। লাবণ্যময়ী নৃত্যভঙ্গিমা, ছন্দোময় পদক্ষেপ এবং অপূর্ব ভাবের অভিব্যক্তি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর উপস্থাপনায় ছিল ‘বর্ষা’ এবং ‘পল্লবী’। পরিকল্পনায় কেলুচরণ মহাপাত্র, সঙ্গীতে ছিলেন ভুবনেশ্বর মিশ্র। শিল্পীর শেষ পরিবেশনায় ছিল ‘মোক্ষ’।

জয়শ্রী মুখোপাধ্যায়

 

অনুষ্ঠান

সুজাতা সদনে ‘অন্বেষা’র অনুষ্ঠানে শুরুতেই সুপ্রকাশ মুখোপাধ্যায় শোনালেন ‘পাগল হাওয়া’ গানটি। পরে সৌমি রায়ের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে আরও দুটি গান শোনালেন সুপ্রকাশ। এ ছাড়াও গান শোনালেন রুমা চট্টোপাধ্যায়, দীপক ঠাকুরতা, রত্না মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যাশ্রী দত্ত, দীপশ্রী সিংহ প্রমুখ।

 

রবীন্দ্রসদনে পিকাসো আর্ট অ্যান্ড কালচার আয়োজন করেছিল ঈশিতা দাস অধিকারীর একক কবিতার আসর ‘থাকো তুমি হৃদয় জুড়ে’। রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতার নির্বাচিত অংশ শুনিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু। পরে শোনালেন ‘মেঘদূত’, ‘দুই বিঘা জমি’, ‘ঝুলন’। দেবেশ ঠাকুর, জয় গোস্বামী, বুদ্ধদেব বসু, শুভ দাশগুপ্তের কবিতাও শোনালেন শিল্পী।

 

শিশির মঞ্চে সাহানার অনুষ্ঠানে গাইলেন মৌসুমী কর্মকার, জয়তী ভট্টাচার্য, সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। কবিতা শোনালেন দেবাশিস মিত্র, উষসী সেনগুপ্ত প্রমুখ।

 

শিশির মঞ্চে ‘একুশে আন্তরিক’ আয়োজন করেছিল ‘প্রেম সুধা রসে’। শিল্পীরা ছিলেন মধুমিতা বসু, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, চন্দ্রাবলী রুদ্রদত্ত, পারমিতা কর বিশ্বাস। আবহ সিতাংশু মজুমদার ও আশিস ঘোষের।

 

শিশির মঞ্চে কলাভৃৎ আয়োজন করেছিল ‘বিরাজ সত্য সুন্দর’। অংশ নিয়েছিলেন অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কোহিনুর সেন বরাট, তড়িৎ সরকার প্রমুখ। শুরুতেই সংবর্ধনা দেওয়া হয় পার্থ ঘোষ ও মলয় রায়কে। শেষে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘আনন্দভৈরবী’। পরিচালনায় ছিলেন অনুশীলা বসু।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন