সরস্বতীচন্দ্র’ নামটাই এতদিন শুনে এসেছি। উনিশ শতকের শেষ পর্বে লেখা, গাঁধীপূর্ব গুজরাতি মানসের মুখ্য প্রতিভূ। উপন্যাস। এ বার তার প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের ইংরেজি অনুবাদ পড়লাম। অনুবাদ করেছেন ত্রিদীপ সুরহুদ। কোনও ভারতীয় ভাষা থেকে এমন সাবলীল অনুবাদ খুব বেশি দেখিনি। বলা বাহুল্য, এর মূলানুগত্য নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা আমার নেই। তবে আখ্যান যে ভাবে টেনে রাখে, তাতে মনে হয় না অনুবাদ পড়ছি। ত্রিদীপ সুরহুদকে সাধুবাদ, আমাদের মতো অ-গুজরাতি ভাষার পাঠকদের এই গুজরাতি ক্লাসিক পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁর করা এর বাকি দুই খণ্ডের অনুবাদ প্রকাশের পথে।

সরস্বতীচন্দ্রের লেখক গোবর্ধনরাম মাধবরাম ত্রিপাঠী (১৮৫৫-১৯০৭)। তাঁর বাহান্ন বছরের জীবনের একটা অংশ জুড়ে আছে এই উপন্যাসের রচনা। এর চার খণ্ড বেরোয় যথাক্রমে ১৮৮৭, ১৮৯২, ১৮৯৮ ও ১৯০১-এ। প্রতি খণ্ডের এক স্বতন্ত্র পরিসর আছে এবং সেই অনুযায়ী নামও: যথাক্রমে ‘‘বুদ্ধিধনের ‘কারভার’ তথা প্রশাসন’’, ‘গুণসুন্দরীর আত্মীয়কুটুম্ব তথা সংসারযাত্রা’, ‘রত্ননগরীর রাজধর্ম’, ‘সরস্বতীচন্দ্রের স্বপ্নপ্রয়াণ ও সিদ্ধিলাভ’। এই উপন্যাস মহাকাব্যের মতোই পরিব্যাপ্ত। এর প্রথম দু’খণ্ডের দু’টি ভূমিকা লিখেছিলেন গোবর্ধনরাম, একটি ইংরেজিতে অন্যটি গুজরাতিতে। কেন প্রবন্ধ না লিখে উপন্যাস লিখলেন, তার কারণ বলছেন ইংরেজি ভূমিকাতে, আর গুজরাতি ভূমিকাতে বলছেন উপন্যাসপাঠের ধরন-ধারণ নিয়ে কিছু কথা। এটা স্পষ্ট যে, তিনি নেহাত কল্পলোকের গল্প বলে মনোরঞ্জন করছেন না, পাঠকদের মনে দাগ কাটতে চাইছেন।

সরস্বতীচন্দ্র। গোবর্ধনরাম মাধবরাম ত্রিপাঠী, ১ ও ২ খণ্ড,
ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, যথাক্রমে ৫৯৫.০০ ও ৪০০.০০।

তখনও কোম্পানির কাল। দেশীয় রাজ্যসমূহে স্বশাসন চলছে, তবে তা ইংরেজ ‘রেসিডেন্ট’-এর অনুমোদনসাপেক্ষ। কিন্তু সেই স্বশাসনের স্বরূপ নিয়েও গোবর্ধনরাম কম ভাবিত নন। তাঁর প্রথম খণ্ডের মূল বিষয়ই ‘শাসন’। সুবর্ণপুর তার প্রধানমন্ত্রী শঠরাই-এর (ব্যক্তিনাম প্রায় সর্বত্রই এখানে অর্থদ্যোতক) শঠতায় ও দৌরাত্ম্যে অস্থির; চতুর্দিকে দুর্নীতি ও ব্যভিচার, ক্ষমতার আস্ফালন, এবং শিষ্টের দমন ও দুষ্টের পালন। এই খণ্ডের নায়ক বুদ্ধিধন কোনও দুষ্কৃতীবিনাশে অবতীর্ণ হননি, তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও হৃতগৌরব (তাঁর পূর্বপুরুষ একদা সুবর্ণপুরের প্রশাসক ছিলেন) পুনরুদ্ধার তাঁকে প্রণোদিত করেছে। আর যে কৌশলে, যে ছলনায়, যে অনিষ্ক্রম্য ব্যূহরচনা করে তিনি শঠরাইকে হারালেন, তা অবশ্যই কৌটিল্য বা মাকিয়াভেল্লির সমর্থন পেত। এই পুরো প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখবার এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ আমাদের দিয়েছেন লেখক। তা নবীনচন্দ্র, সুবর্ণপুরে আগন্তুক ও ঘটনাচক্রে বুদ্ধিধনের অতিথি। তার আগমনেই এই খণ্ড তথা উপন্যাসের আরম্ভ— ‘নিদাঘশেষে এক দিন একজন অশ্বারোহী পুরুষ’-এর মতো তা দৃঢ়সংকল্প নয়, স্মৃতিভারাতুর ও বিষাদগ্রস্ত। এই নবীনচন্দ্রই আমাদের নায়ক সরস্বতীচন্দ্র,  যে তার বিমাতাচালিত বাবার উপর রাগ করে, বিপুল বিত্তের উত্তরাধিকার ছেড়ে দিয়ে, সর্বোপরি তার বাগ্‌দত্তা ও প্রেমাস্পদা কুমুদসুন্দরীকে পরিহার করে নিরুদ্দেশ প্রব্রজ্যা নিয়েছে। আর আমাদের নায়িকা কুমুদসুন্দরীর প্রেম অনির্বাণ, যদিও সে এখন বিবাহিত ও বুদ্ধিধনেরই পুত্রবধূ। গ্রহবৈগুণ্যে অন্তরিত নায়ক-নায়িকার এই সন্নিপাত রোমান্সসম্মত, কিন্তু তার অনুক্রম বাস্তবতাবিমুখ নয়। নবীনচন্দ্রে তার প্রেমাস্পদের প্রতিভাস সে মাঝে মাঝে দেখছে বটে, তবু স্বামী প্রমাদধনের  প্রতি তার অনুরাগ অটুট (যদিও তার নামের যাথার্থ প্রমাণে প্রমাদধন খুব দেরি করবে না)। যখন নায়ক ও নায়িকার অবশেষে দেখা হল, তখন অপার প্রেম বুকে নিয়েও তাদের দূরত্ব বাড়ল বই কমল না। বুদ্ধিধনের অভিষেকের প্রাক্‌কালেই প্রস্থান হল নবীনচন্দ্রের। আর তাতেই শেষ হল প্রথম খণ্ড— এক ধূলিধূসর গো-শকটের যাত্রী হয়ে ভাঙা-ভাঙা ঘুমের মধ্যে কুমুদের স্বপ্ন দেখতে দেখতে সুবর্ণপুর ছেড়ে চলল সরস্বতীচন্দ্র। তার শেষ তলিয়ে  যাওয়ার স্বপ্ন থেকে তাকে উদ্ধার করল শেলি-র প্রমিথিউস আনবাউন্ড-এর তিন স্তবকের স্মৃতি। (ওই একই স্মৃতি ফিরে আসবে দ্বিতীয় খণ্ডেও, যখন সরস্বতীচন্দ্র অরণ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।)

কবিতা গোবর্ধনরামের গদ্যের এক উপকরণ। মাঝে মাঝেই তাঁর প্রিয় ইংরেজি ও সংস্কৃত পদাবলি তাঁর গদ্য থেকে উচ্ছ্রিত হয়ে উঠছে, অনেক সময় তাঁর নিজের রচনাও। এবং প্রায়শই গান। সেই সঙ্গে তাঁর অধ্যায়শীর্ষেও আছে উদ্ধৃতি, যেমন কপালকুণ্ডলা-য় ছিল। আসলে, তিনি লিখছেন এক ‘সাহিত্যিক’ রীতি, যা পূর্বসূরিদের বয়ানঋদ্ধ। অন্য দিকে, গোবর্ধনরাম শিক্ষার, বিশেষত স্ত্রীশিক্ষার পূজারি। শ্বশ্রুগৃহে কুমুদ যেন-বা এক বিস্ময়— এত বিদ্যা তার আয়ত্তে, তার গলায় এত গান! এর উৎস অবশ্যই তার পিতৃগৃহ (গোবর্ধনরাম কি তাঁর আপন কন্যা লীলাবতীকে কী ভাবে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, তার কথাই ভাবছেন?)। আর স্ত্রীশিক্ষা প্রসঙ্গে আমাদের অবশ্যই প্রথম প্রকৃত মালয়ালম উপন্যাস ইন্দুলেখা-র কথা মনে পড়বে, যা ১৮৮৯-এ বেরোয়। আবার, লেখক-পাঠকের যে সম্পর্ক আমরা সরস্বতীচন্দ্র-তে দেখি (লেখক মাঝে মাঝে সরাসরি পাঠকের সঙ্গে কথা বলেন, যেন সে কাহিনির খেই না হারায় বা কোনও বিষয়ে বিশেষ মনোনিবেশ করে), তা ইন্দুলেখা-তেও আছে। এই লেখক-পাঠক-সংবাদ কি ভারতীয় উপন্যাসে শুরু হয়েছিল দুর্গেশনন্দিনী-তে?

সরস্বতীচন্দ্র দ্বিতীয় খণ্ডের নাম যদিও ‘গুণসুন্দরীর আত্মীয়কুটুম্ব তথা সংসারযাত্রা’, তার অনেকটাই প্রথম খণ্ডের অনুবৃত্তি।  দৃশ্যপট সুবর্ণপুর থেকে সরিয়ে রত্ননগরী-সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে। সরস্বতীচন্দ্রদের গো-শকটে  ডাকাত পড়ল এবং ঘটনাচক্রে তার আহত অবস্থায় রাত নামল এক বনের কোলে। এবং সেখান থেকেই তার চেতনাহীন দেহ উদ্ধার করে নিয়ে গেল সুন্দরগিরি মঠের সাধুরা। অন্য দিকে, সেই ডাকাতদেরই কুমুদ-হরণের (প্রথম খণ্ডের শেষেই আমরা শুনেছিলাম, সে মা গুণসুন্দরীর কাছে যাবে) প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তের এক আকস্মিক আক্রমণে তার খরস্রোতা সুভদ্রায় নিমজ্জন  ঘটল। আখ্যান শেষ হচ্ছে এই বলে: ‘সাধুরা সরস্বতীচন্দ্রকে বয়ে নিয়ে গেল। নদী কুমুদকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তাদের পথ আলাদা, কিন্তু অন্তিম গন্তব্য এক। অনেকের দৃষ্টি তাদের পশ্চাদ্‌ধাবন করল, অনেকে তাদের খুঁজতে লাগল। কিন্তু সেই অনেকে কেবল বিধাতার অভিপ্রায় নিয়ে জল্পনাই করতে পারল।’

দ্বিতীয় খণ্ডের মুখ্য বিষয় শুধু গুণসুন্দরীর গুণকীর্তন নয়, একান্নবর্তী পরিবারের গুণাগুণ বিচারও। একান্নবর্তিতার দায়িত্ব বোঝাতে হয়তো একান্ত দাম্পত্যের প্রতিতুলনা কার্যকরী। অন্তত এই কাহিনিতে যেখানে গতানুগতিকতার চিত্রণ অপেক্ষা মানসতার  প্রতিফলন বেশি জরুরি। কিন্তু এমন তো নয় যে একান্তবর্তিতা মন্থন করে খালি অমৃতই উঠছে, গরল নয়। গোবর্ধনরামের বাস্তবতা কি আমাদের শরৎচন্দ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়? তবু এক বিরাট ও জটিল সংসারের হাল ধরে থাকার অভিজ্ঞতা গুণসু্ন্দরীকে দিয়েছে তাঁর বর্তমান মমতাময়ী মাতৃরূপ। গুণসুন্দরী কি পাশ্চাত্য সমাজে সম্ভব, এই প্রশ্ন না তুলেও যেন তার এক উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন গোবর্ধনরাম।

তবে, তাকে উনিশ শতকের কুললক্ষণ বলব কি না জানি না, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বৈষম্য মাঝে মাঝেই উঁকি দিয়ে যাচ্ছে গোবর্ধনরামের মনে। শিক্ষার যেমন সংস্কৃত আছে, তেমনই ইংরেজিও আছে। কিন্তু তার বর্ণসংকর ঠিক কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অন্তত এক বার দ্বিধান্বিত দেখি এই যুগল শিক্ষার অধিকারী সরস্বতীচন্দ্রকে। সমাজে নারী-পুরুষের ভেদ-অভেদ নিয়ে খানিক গোরা-বিনয়ের মতো তর্কেরও এক অবকাশ পাই এখানে। বস্তুত, প্রাচীন ভারতের আদর্শ সঞ্চরণে কখনও কখনও কেমন রক্ষণশীল লাগে গোবর্ধনরামকে। অথচ শেলির প্রমিথিউস আনবাউন্ড তো তাঁকে দিশা দেয়। গ্যোয়টের ফাউস্ট-এর কথাও তাঁর মনে থাকে। ইত্যাদি ইত্যাদি আধুনিকতা বনাম ঐতিহ্যের দ্বন্দ্ব গোবর্ধনরামে কী নিষ্পত্তি পায়, কিংবা আদৌ কোনও নিষ্পত্তি পায় কি না, তা জানব না, যতক্ষণ না তাঁর উপন্যাসের বাকি দুই খণ্ডের অনুবাদ পড়ি।