• 1
  • পথিক গুহ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

গিনিপিগ

বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য শিম্পাঞ্জিকে নৃশংস ফালাফালা করা হয়, মানুষের দেহেও চারিয়ে দেওয়া হয় ভয়াবহ রোগের বীজ। এই নিয়ে এখন আমেরিকা তোলপাড়।

1
স্ট্যানলি কুব্রিক-এর ‘আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’ ছবির দৃশ্য। এক্সপেরিমেন্ট চলছে।
  • 1

আমেরিকায় সদ্য জারি হয়েছে সরকারি নির্দেশ। ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হবে শিম্পাঞ্জিদের ওপর সব রকম পরীক্ষা। পশুপ্রেমীদের চেঁচামেচি বহু কালের। তাঁদের অভিযোগ: আমেরিকার নানা জায়গায় আলাদা করে রাখা হয়েছে যে ৭৫০ শিম্পাঞ্জি, পরীক্ষার জন্য তাদের ওপর নৃশংস অত্যাচার করেন বিজ্ঞানীরা। চিকিৎসা গবেষণায় সবচেয়ে বেশি অনুদান দেয় যে সংস্থা, সেই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেল্থ ২০১৩ সালে ঘোষণা করেছিল, খয়রাতি কমবে। গবেষকদের বলা হবে, আটকে-রাখা শিম্পাঞ্জিদের অভয়ারণ্যে ছেড়ে দিন। আর এ বছর জুন মাসে, সরকারি ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস-এর ঘোষণা, শুধু অভয়ারণ্যের বাসিন্দারাই নয়, আটকে-রাখা শিম্পাঞ্জিরাও বিপন্ন প্রজাতি। ওই ঘোষণার পরিণামেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা। শিকাগোয় লিংকন পার্ক জু-র এক কর্তা বলেছেন, ‘এটা শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণায় শেষের শুরু। বিজ্ঞানীরা দেওয়াল লিখন পড়তে পারছেন।’

সত্যিই তাই। বিজ্ঞানীদের মাথায় হাত। তাঁদের যুক্তি, জীবিত প্রাণিকুলে শিম্পাঞ্জিরা মানুষের ‘সবচেয়ে নিকট আত্মীয়’। সে সুবাদে মানুষের নানা রকম রোগভোগ, সে সবের ওষুধ বানানো, আর ওষুধের ক্ষমতা যাচাই— মায় মানুষের চিন্তাভাবনার মূলে তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের ভূমিকা জানতে— শিম্পাঞ্জির চেয়ে ভাল মডেল আর কিছু হয় না। শিম্পাঞ্জির দেহে পরীক্ষার পরিণামে মিলেছে শিশুদের খাওয়ানোর পোলিয়ো টিকা; জানা গেছে বিশেষ এনকেফ্যালোপ্যাথির সংক্রামক চরিত্র; পাওয়া গেছে হেপাটাইটিস বি-র ভ্যাকসিন; শনাক্ত হয়েছে হেপাটাইটিস সি-র মূলে দায়ী ভাইরাস। ১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাপী শিশুদের হেপাটাইটিস বি টিকাকরণ প্রকল্প চালুর পর ওই রোগের প্রকোপ কমেছে ৯৮%। হেপাটাইটিস সি, যার উপহার লিভারের স্থায়ী ক্ষতি, এমনকী ক্যানসারও, তার শিকার সারা বিশ্বে ১৭ কোটি মানুষ। এখনও মেলেনি ও রোগের ভ্যাকসিন, তবে একটা প্রতিষেধকের পথে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, চলেছে মানুষের দেহে তার ক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ। এ সব সম্ভব হয়েছে শুধু শিম্পাঞ্জির ওপর এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে। তা হোক, পশুপ্রেমীদের পালটা দাবি, মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে পেট কেটে বা মস্তিষ্ক চিরে ফালাফালা করে মারা হচ্ছে কত শিম্পাঞ্জি, তার হিসাব চাই।

হিসাব কে দেবে? চিকিৎসা গবেষণার প্রায় পুরোটা জুড়েই যে ও-রকম এক্সপেরিমেন্ট। শুধু কি পশু, মানুষও গিনিপিগ নয়? ১৯৪১ সালে আমেরিকান চিকিৎসক উইলিয়াম ব্ল্যাক দুগ্ধপোষ্য শিশুদের দেহে হারপিস রোগের ভাইরাস চালান করেছিলেন। পরীক্ষার ফলাফল সম্বলিত পেপার তিনি ছাপতে পাঠান ‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন’-এ। জার্নালের সম্পাদক ফ্রান্সিস রাউস সে পেপার ফেরত দেন এই বলে যে, ব্ল্যাক ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করেছেন। তা বলে রাউস ধোয়া তুলসীপাতাটি নন। তিনিই কিন্তু তাঁর জার্নালে ছেপেছিলেন আর এক পরীক্ষার রিপোর্ট। মিশিগানে এক মানসিক হাসপাতালে রুগিদের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়ার সমীক্ষা। এর নেতা ছিলেন তখনকার নামজাদা গবেষক টমাস ফ্রান্সিস, আর তার সহযোগী এক তরুণ। জোনাস সলক। হ্যাঁ, সেই বিজ্ঞানী, যিনি পরে পোলিয়ো ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে জগদ্বিখ্যাত। ১৯৬৩ সালে চেস্টার সাউথাম নামে এক গবেষক পরীক্ষা করতে নিউ ইয়র্কে এক হাসপাতালে অশক্ত রুগিদের দেহে গোপনে ক্যানসার কোষ চালান করে দেন। জানাজানি হতে মেডিক্যাল লাইসেন্সিং বোর্ড তাকে শাস্তি দেয়। তা সত্ত্বেও অনেক বিজ্ঞানী সাউথামের কাজ সমর্থন করেন। পরে ইনি  ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যানসার রিসার্চ’-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

বিজ্ঞান বনাম ন্যায়ের দ্বন্দ্বে হালফিলের প্রথম খবর যদি শিম্পাঞ্জির ওপর এক্সপেরিমেন্টে নিষেধাজ্ঞা, তবে দ্বিতীয় খবর এক মামলা। এক্সপেরিমেন্টের জন্য মানুষকে গিনিপিগ বানানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এবং ১০০ কোটি ডলারের মোটা ক্ষতিপূরণ দাবি! চাইছেন ৭৭৪ জন। আমেরিকান নন, ওঁরা গুয়াতেমালার নাগরিক। ওঁদের অভিযোগ তিন ভিলেনের বিরুদ্ধে। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, রকফেলার ফাউন্ডেশন এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী বহুজাতিক সংস্থা ব্রিস্টল-মায়ার্স স্কুইব। কাহিনিটা লজ্জাকর। নৃশংস।

১৯৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। যুদ্ধ মানে শুধু হাজার হাজার মৃত্যু নয়, পাশাপাশি দারিদ্র, বুভুক্ষা এবং বিজয়ী সেনার যৌন ক্ষুণ্ণিবৃত্তি। নানা মহাদেশ থেকে ঘরে ফিরছে আমেরিকান সেনা। মার্কিন প্রশাসন ঘোর চিন্তায়। যুদ্ধক্লান্ত সেনারা যে মজেছিল যৌন বিলাসেও। যদিও তাদের দেওয়া হয়েছিল পুস্তিকা এবং পতিতালয়ে ব্যবহার্য মলম-টলম, কিন্তু সে সবকে তারা পাত্তা দেয়নি বিশেষ। ফল? হাজার-হাজার সেনা ফিরেছে সিফিলিস, গনোরিয়া, স্যাংক্রয়েড ইত্যাদি অসুখ নিয়ে। এ বার ও-সব ছড়াচ্ছে তাদের বউদের মধ্যে। শিকার হচ্ছে সদ্যোজাত শিশুরাও। সমীক্ষা জানাল, ফি বছর নতুন করে যৌন রোগের শিকার হবে সাড়ে তিন লাখ মার্কিন সেনা!

তত দিনে কিন্তু আবিষ্কৃত হয়েছে পেনিসিলিন, যা কতক যৌন রোগ সারায়। কিন্তু সে তো রোগ হলে ওষুধ। উপশম নয়, চাই প্রতিষেধক। আছে নাকি এমন কিছু, যা আগে ব্যবহার করলে রোগ দেহে থাবা বসাবে না উদ্দাম যৌনাচার সত্ত্বেও? পেনিসিলিনই কি সেই প্রতিষেধক? উত্তর দিতে পারে এক্সপেরিমেন্ট। শ’য়ে-শ’য়ে, হাজারে-হাজারে মানুষের ওপর পরীক্ষা। কোথায় তা করা যায়? চাই এমন এক দেশ, যা হতদরিদ্র, অহর্নিশ আমেরিকার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। ফলত যার সরকার আমেরিকার তাঁবেদার, মার্কিন বিজ্ঞানীরা সেখানে মনের সুখে গোপনে চালাতে পারবেন পরীক্ষা, সরকার দেশের মানুষকে কিচ্ছুটি জানতে দেবে না। আর হ্যাঁ, সে দেশে পতিতাবৃত্তি হতে হবে আইনসিদ্ধ, অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না দেহোপজীবিনীদের জেলে ডেকে এনে যৌন সেবার ব্যবস্থাও। আছে তেমন দেশ এক। আমেরিকার ঘরের পাশেই। গুয়াতেমালা।

জুলাই ১৯৪৬। গুয়াতেমালায় হাজির হলেন অল্পবয়সি মার্কিন গবেষক জন কাটলার। পকেটে ১,১০,৪৫০ ডলারের প্রকল্প। সেই টাকা থেকে প্রথমে খয়রাতি। সেনা ব্যারাকে খেলাধুলোর নতুন সরঞ্জাম, জেলে দামি আসবাব, মানসিক হাসপাতালে নতুন-নতুন ওষুধ। তার পর... আসল কাজ। পতিতাপল্লির স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি থেকে জানা গেল, কে কে যৌনরোগে আক্রান্ত। যারা সুস্থ, হেল্‌থ চেক-আপের নাম করে তাদের ডাকা হল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেই সব বারবনিতার গোপনাঙ্গের চামড়ায় ঘষে দেওয়া হল নানা যৌন রোগের জীবাণু, যাতে তারা দ্রুত অসুস্থ হয়। এ বারে ব্যারাকে সেনাদের হাতখরচ বাড়িয়ে তাদের পতিতাপল্লিতে ঘন ঘন যাওয়ায় মদত। আর, বাড়তি রোজগারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌনকর্মীদের বেশি সংখ্যায় জেলে এবং মানসিক হাসপাতালে ডেকে আনা। যৌন সংসর্গে ইচ্ছুক পুরুষদের মানতে হবে ‘সামান্য’ এক শর্ত। তাদের গোপনাঙ্গে নিতে হবে (পেনিসিলিন বা অন্য কিছু রাসায়নিক পদার্থের) ছোট এক ইনজেকশন। অথবা চামড়া কেটে সেখানে ঘষে দেওয়া হবে ওষুধ। এ সব ‘নিয়ম’ কেন মানতে হবে, সে প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এক্সপেরিমেন্ট চলল অবাধে। কী তার নমুনা! সিফিলিস গনোরিয়া স্যাংক্রয়েডের পুঁজ-ইনজেকশন দেওয়া হল যৌনাঙ্গে, শিরদাঁড়ায়, এমনকী চোখের কোণে। রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, এক জন বারবনিতা ৭১ মিনিটের মধ্যে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়েছেন ৮ জন সেনার সঙ্গে! ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চালু পরীক্ষায় সেনা, জেলবন্দি এবং মানসিক রুগি মিলিয়ে গিনিপিগের সংখ্যা প্রায় ৫০০০। যৌন রোগের সংক্রমণ তাদের অধিকাংশের হলেও, ঘৃণ্যতম ঘটনা এই: সামান্য কিছু মানুষের চিকিৎসা হলেও, ওষুধ দেওয়া হল না বহু জনকে। যাতে রোগের প্রভাব বোঝা যায়। তাদের অনেকে মরল তিলে তিলে। অনেকের সন্তান জন্মাল দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে। লাভ? না, তা হল না কিচ্ছু। পেনিসিলিন যে যৌন রোগের প্রতিষেধক হতে পারে, তার প্রমাণ মিলল না পরীক্ষায়। শুধু কিছু নিরপরাধ মানুষ বহন করল এক গোপন পরীক্ষার অভিশাপ।

২০১০ সালে গোপনীয়তার ঢাকনা খুললেন ইতিহাসের অধ্যাপিকা সুজান রিভারবি। এক বই লেখার কাজে তাঁর কৌতূহল জাগে জন কাটলার সম্পর্কে। জানতে পারেন, দেশে ফিরে কাটলার কেউকেটা বনেন। চিকিৎসাবিদ্যা পড়াতেন পিট্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। মারা যান ২০০৩ সালে। কাটলারের ব্যক্তিগত নথি ঘাঁটতে সুজান হানা দিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে। নথি ঘেঁটে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। গবেষণা হতে পারে এমন নৃশংস! সুজান দীর্ঘ পেপার লিখলেন ‘জার্নাল অব পলিসি হিস্ট্রি’-তে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ল গুয়াতেমালা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা বসালেন তদন্ত কমিশন। ফাঁস হল সব। ‘নীতিনিয়মের বিবেকহীন লঙ্ঘন’-এর জন্য ক্ষমা চাইলেন ওবামা।

২০১১। গুয়াতেমালার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মামলা করলেন মার্কিন আদালতে। ওবামা প্রশাসনকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বিচারক খারিজ করলেন আবেদন। আমেরিকার বাইরে কৃতকর্মের জন্য দেশের সরকার দায়ী নয়। তাই ফের মামলা। বাদী ৭৭৪ জনের মধ্যে ৬০ জন ওই পরীক্ষার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। বাকিরা মৃত ভুক্তভোগীদের সন্তান। মার্কিন সরকারের বদলে মামলা এ বার দুই প্রতিষ্ঠান এবং এক কোম্পানির বিরুদ্ধে। বাদী পক্ষের অভিযোগ, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং রকফেলার ফাউন্ডেশন ওই ঘৃণ্য পরীক্ষায় ‘পরিকল্পনা, সাহায্য, প্ররোচনা এবং অর্থ’ যুগিয়েছিল। আর ‘ব্রিস্টল-মায়ার্স স্কুইব’-এর পূর্বতন কোম্পানি দিয়েছিল পরীক্ষায় ব্যবহৃত পেনিসিলিন। তিন বিবাদী মিলে এ বার দিক এক বিলিয়ন ডলার। করুক পাপের প্রায়শ্চিত্ত। মামলার ফল কী হবে কে জানে।

পুনশ্চ: গুয়াতেমালা থেকে দেশে ফেরার পর জন কাটলার বিশেষ দায়িত্ব পান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে পাঠায় ভারতে। যৌন রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসার পদ্ধতি ভারতীয় ডাক্তারদের শেখাতে। এ দেশে কাটলার গোপনে কোনও ‘কীর্তি’ স্থাপন করে গেছেন কি?

 

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন