• কানাইলাল জানা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রবিবাসরীয় প্রবন্ধ ১

জেলের জানলা

জেলর-এর চোখে কয়েদির হরেকরকমবা। কেউ দারুণ আঁকিয়ে, কেউ চান করে রোজ চৌবাচ্চা খালি করে দেয়, কেউ সৌরভ টিম থেকে বাদ গেলেই ডিপ্রেস্‌ড।

1
শেক্সপিয়রের ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকের সফল মঞ্চাভিনয় শেষে জেলবন্দিরা দর্শকদের বাহবা কুড়োচ্ছেন। ইতালীয় ছবি ‘সিজার মাস্ট ডাই’-এর দৃশ্য।

জামিন পেল শ্রীরামপুরের রাখি রাজওয়ার। কেসের ধারা দেখে জিজ্ঞেস করি, এ লাইনে কত দিন? সপাট জবাব, ‘২৪ পেরিয়ে ২৫-এ পা দিয়েছি।’ তা হলে কি ছিনতাই জীবনের রজতজয়ন্তী পালন করবে, না বাইরে বেরিয়ে একদম ছেড়ে দেবে? তখনও সপ্রতিভ উত্তর: ‘না না, এ লাইন আর ছাড়া যায় নাকি? সংসার বেড়েছে, ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখছে, স্বামী দেখে না।’ সোনাদানা কিছু জোটে? দুঃখের সঙ্গে জানায়, ট্রেনের মধ্যেই তো সব, তাই পুজোর ভিড়ে হয় টুকটাক।

কাবেরী বেদ, কুহেলি বেদ। দুজনকেই অনায়াসে ভাবা যায় বাংলা সিনেমায় নায়িকার ভূমিকায়। বংশপরম্পরায় সাপের খেলা দেখিয়ে রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে বাবা বেঁচে থাকতেই। এখন দুই বোনের পেশা পকেটমারি। যদি এক বোনের চোখে পড়ে সাড়ে বা অসাড়ে শুয়ে আছে কোনও মানিব্যাগ, চোখের ইঙ্গিতে চলে যাবে অন্য বোনের হাতে। কে সন্দেহ করবে সুন্দরীদের? এ বার বিস্তর টাকা নিয়েই তারা জেলে এসেছে, কারণ বাইরে কারও কাছে গচ্ছিত রাখলে ভয় ‘চুরির ওপর বাটপাড়ি’র।

আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। দুপুরে আমদানি ফাইলের মেট এসে খবর দিল: গতকাল যে ভদ্রলোক এসেছেন, খাবার ছুঁচ্ছেন না, অন্য ওয়ার্ডে যাবেন না, কেবল দেওয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদছেন। গিয়ে দেখি কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে। আমাকে দেখেই চিত্‌কার করে বললেন: কিছুই জানি না, ভাইবউয়ের অভিযোগে গ্রেফতার, অথচ আজ কলকাতার পুরভোট। কিছুতেই ভোটটা দেওয়া যায় না?

সত্তরের দশকে ভবানীপুরের কলেজপড়ুয়া শিবেন দত্ত। প্রেমিকার ‘বেইমানি’ না সইতে পেরে তাকে খুন করল। যাবজ্জীবন সাজা খাটতে এল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। কর্তৃপক্ষের নজরে এল তার মধ্যে বাস করে এক মস্ত আঁকিয়ে। তাকে যদি জেলে নতুন হওয়া আর্ট স্কুলের প্রশিক্ষক করে দেওয়া যায়? যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সে শুধু যে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের আবাসিকদের আঁকা শেখাত তা নয়, বহরমপুর, দমদম, মেদিনীপুরের মতো বড় বড় জেলেও আঁকা শেখাতে যেত। প্রথম বড় ধরনের ছবির প্রদর্শনী হয় পার্ক হোটেলে। মুনমুন সেন উদ্বোধন করেছিলেন। খুব সাড়া পড়েছিল, ছবিও ভাল বিক্রি হয়েছিল। সে বার বিক্রির টাকা প্রত্যেক শিল্পীর হাতে নগদ দেওয়া হয় রং-তুলি কেনার জন্য। কিন্তু তারা রং-তুলির জন্য যতটা না খরচ করল, অন্য ব্যাপারে বেশি।

দু’দশক পরে আইজি বি ডি শর্মার উদ্যোগে গড়া হল ‘প্রিজনার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড’। আবাসিকদের ছবি বিক্রির টাকা, অন্যান্য ছোটখাটো আয়ের সঙ্গে জমা পড়তে লাগল ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয়ের দরুন লক্ষ লক্ষ টাকাও। অনেক সংসারে এই ফান্ড এখন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। যে কয়েদি, সে তো সরকারি ব্যক্তি। তার থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু ধস নামে তার সংসারে। অনেক সময় ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বাবা-মা’র চিকিত্‌সা, বাড়ি মেরামত, মেয়ের বিয়ে, এ সবের জন্য এই ফান্ড থেকে টাকা পেয়ে তারা খুব উপকৃত হয়। এই ফান্ডকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এখনকার এডিজি ও আইজি অধীর শর্মা।

অঙ্কনপ্রতিভা এবং ভরপুর দুষ্টুমি নিয়ে জেলে এসেছিল সজল বাউরি। কিন্তু কোনটাতে সে এগিয়ে, বলা মুশকিল। প্রথম থেকেই ছবির ডাইমেনশন ও রঙের ব্যবহার দেখলে বিস্ময় জাগে। তেমনই দুষ্টু বুদ্ধিতেও। সে তখন দমদম জেলে। যে দিন তাকে জানানো হল, দেখা করতে এসে তার মা’কে আর কান্নাকাটি করতে হবে না, কারণ তার ফাঁসির সাজা মকুব হয়ে যাবজ্জীবন হয়েছে, শুনে ফুঁসে উঠল সজল: যাবজ্জীবন আবার কী? ক’দিন পরেই তো বেরিয়ে যাব। সত্যি সে বেরিয়েছিল। যখন মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে, হঠাত্‌ বেজায় অসুখের ভান করল, কৌশল করে কলকাতায় নীলরতন হাসপাতালে ভর্তি হল। সব রক্ষীর চোখ এড়িয়ে হাসপাতালের বাথরুমের ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়ে গেল!

কবি কল্যাণের কথাও কিছু বলতে হয়। মাঝেমধ্যে তার বাবা এসে আমাদের ধরতেন: ‘ছেলেটাকে আরও মাসখানেক রাখুন না!’ বলতাম, আমরা কাউকে কম বা বেশি রাখতে পারি না। বরং কোর্টে যান। সত্যিই দু-চার দিন পর কোর্টের পিয়নকে নিয়ে হাসতে হাসতে এলেন আমাদের মিষ্টিমুখ করাতে। কল্যাণকে আরও ১৫ দিন জেলে রাখার আদেশ দিয়েছে মহামান্য আদালত। সুদর্শন স্নাতক নিউ আলিপুরের কল্যাণ সঙ্গদোষে হেরোইন ধরেছিল। কিছুটা সেরে উঠলেও, পুরোপুরি সারেনি। আলিপুর সেন্ট্রালের মতো মডেল জেলে থেকে পুরোপুরি সেরে উঠবে, এ আশা তার বাবার ছিল। অবশ্য ড্রাগ নেওয়ার সময় এলে নেশাগ্রস্তদের যে জ্বালা ওঠে, তা মেটানো খুব কঠিন। এক বার বনগাঁ জেলে একটি ছেলে ভরদুপুরে এমন চিত্‌কার শুরু করল, অফিসের কাজকর্ম সব বন্ধ। এসডিও মিলন প্রামাণিকের নির্দেশ আছে, এমন ক্ষেত্রে পোস্তর খইল ভিজিয়ে জল খাওয়াতে। ভাবছি কী করা যায়, হঠাত্‌ চিত্‌কার বন্ধ। মেটকে ডেকে জানতে পারি, অত চিত্‌কারের মধ্যেও সাধন দেখতে পেল, দেওয়াল বাইছে টিকটিকি। বিদ্যুত্‌গতিতে চটি ছুড়ে দেওয়াল থেকে টিকটিকি পেড়ে এবং তা পুড়িয়ে চেটে-চেটে খেয়েই তার শান্তি।

এখন যার কথা বলব, তাকে মহাপাঠক বললেও কম বলা হবে। হাতকাটা দিলীপ। যখনই সে জেলে আসে, সঙ্গে থাকে ১০০টা বই! বেশির ভাগই উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে ভগীরথ মিশ্র, কর্তার সিংহ দুগ্গল থেকে ইসমত চুগতাই। দিলীপের সোজা হিসেব ৯০ দিনে পুলিশ চার্জশিট না দিতে পারলে জামিন পাবেই। অর্থাত্‌, ৯০ দিনে ১০০টি বই। জেলে সময় অফুরন্ত। সময় নষ্ট করা দিলীপের একেবারেই না-পসন্দ। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ভোটের আগে আগেই তার জেল হত। এক বার শীতকালেও প্রেসিডেন্সি জেলে তাকে দেখেছি। ভোর রাতের রাউন্ডে গিয়ে দেখি, সারা শরীর চাদরে মোড়া। সেলের উজ্জ্বল আলোয় নিচু হয়ে পড়ছে: নাসরিন জাহানের ‘চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার’। এমন মনোযোগ, যেন সকাল হলেই ফাইনাল পরীক্ষা। দুটো বইয়ের ওপর ঠেস দিয়ে বসেছে, অনেক অনুরোধে তাকে সরিয়ে দেখি রুণু গুহনিয়োগীর ‘সাদা আমি কালো আমি’ দু’খণ্ড!

ধনঞ্জয় যখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে এল, তার স্বভাবে এত বন্যতা ছিল যে প্রায় রোখাই যাচ্ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে শুধু শান্ত হয়ে গেল না, প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসের এক জন গুণমুগ্ধ পাঠক হয়ে উঠল। প্রায় প্রতি দিনই লাইব্রেরি থেকে একটি করে উপন্যাস নিচ্ছে আর পড়ে ফেলছে। এক বার এক সাংবাদিক এলেন ধনঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করতে। ধনঞ্জয় ভেবে কূল পায় না কী ভাবে অতিথি আপ্যায়ন করবে। তার উঠোনে ছিল লিকলিকে পেয়ারা গাছ, কখনও পেয়ারা পেড়ে দিচ্ছে, কখনও ডিব্বা থেকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছে, কখনও বা চা বানিয়ে দিচ্ছে। গল্প করছে, রেডিয়োয় গান শোনাচ্ছে, আবার সদ্য পড়ে শেষ করা বই হাতে দিয়ে দেখাচ্ছে কী চমত্‌কার উপন্যাস না ‘সিন্ধুপারের পাখি’? আর বার বার বলছে ‘কিছু খাওয়াতে পারলাম না।’

ধনঞ্জয়ের ফাঁসির দিন প্রথমে ঠিক হয়েছিল ’৯৩-এর মার্চে। কিন্তু এর পরেও যে সে ১১/১২ বছর বেঁচে ছিল, তার মূলেও এক জন আসামি। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী। সুমিত। সে শুধু ব্যাংক-ডাকাতির ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে বিক্রি করত আর জেল-পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখত, যার মূল প্রতিপাদ্য: কোনও কয়েদিকে খুব বেশি দিন জেলে আটকে রাখলে সে কী করে আরও খারাপ হয়ে যায়। সবার নজর এড়িয়ে ধনঞ্জয় সুমিত ঘোষালকে দিয়ে এমন পাকা ড্রাফ্ট পাঠিয়ে দিল রাষ্ট্রপতির কাছে, ফাঁসির আদেশ স্থগিত হয়ে গেল সে বারের মতো।

বর্ষাকাল। বহরমপুর সেন্ট্রাল জেল। জেল-হাসপাতালের রাস্তায় পড়ে আছে বড় বড় কালোজাম। মাড়িয়ে মাড়িয়ে জেল-হাসপাতালের দাওয়ায় উঠতেই দেখি দুজন তরুণ আবাসিক গল্পে মত্ত। তাদের বলি, গল্প না করে জাম কুড়িয়ে খেতে পারতে। আমার দিকে না তাকিয়ে তেজের সঙ্গে জানায় জাম-টাম খাওয়ার সময় নেই। আজকের মধ্যেই ছক তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ছক মানে?

ওরা ঝাঁজ নিয়ে বলে: ছক মানে স্যর হিসেব-নিকেশ। কালু মিয়া প্যারোলে গিয়ে আমাদের গ্রুপের এক জনকে খতম করে এসেছে। আমরাও ক’দিন প্যারোলে যাচ্ছি, ওদের গ্রুপের এক জনকে হাপিশ করে আসব।

আশির দশকের শেষে বর্ধমান জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে যাবজ্জীবন সাজা খাটতে এল নিমাই দে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এম.এ. পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দিয়ে জেলে ঢুকেছিল। আজ পর্যন্ত অমন শিক্ষার্থী আর দেখিনি। জেলে থেকে প্রথমে এম.এ. পার্ট টু পাশ করল। সবে কম্পিউটার চালু হয়েছে, কম্পিউটার শিখল। আর্ট স্কুলে ছবি আঁকা শেখা, প্রুফ দেখা, জেলে নতুন গড়ে ওঠা স্কুলে পড়ানো প্রতিটি কাজ সুন্দর ভাবে চালিয়ে গেল। সুশ্রী, চুপচাপ, প্রত্যেকের নির্দেশ মেনে-চলা ছেলেটিকে দেখে সব সময় ভাল লাগত। এমন গুণী ছেলের কাজের অভাব হওয়ার কথা নয়, সত্যিই সে ১৬/১৭ বছর জেল খেটে বেরিয়েই প্রাইভেট ফার্মে ভাল মাইনের চাকরি পেয়েছে। বিয়ে-থা’ও করেছে।

জেলে যদি কোনও আবাসিকের ক্যারিশমা আমাকে মুগ্ধ করে থাকে, সে হল হুব্বা শ্যামল। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বেশ কয়েক বার এসেছে-গিয়েছে। একাই থাকত একটি সেলে। মল্লবীরের মতো চেহারা। কালোকুলো, পেটে থলথলে চর্বি। তার নিশ্বাসে উড়ে যেত ধুলোবালি, গাছের পাতা। হাই সিকিয়োরিটির এই আসামি কোর্ট থেকে ফেরত আসত বেলা থাকতে থাকতেই। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। মাঝে মাঝেই তাকে অনুসরণ করতাম। দীর্ঘ সেল ব্লকের মাঝামাঝি জায়গায় সে থাকত। সহজে যে তার কাছাকাছি পৌঁছব, সে উপায় নেই। উঠোনের প্রথম দিকটায় হয়তো দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে মার্কিন সেন্টার হামলার ছেলেরা। ঢুকলেই ধরছে, ভারতীয় সংবিধান পড়তে চাই। কারাধ্যক্ষ কমলকুমার মুখোপাধ্যায়ের নাম করে বলি, তিনি তো আনিয়ে দেবেন বলেছেন, দরখাস্ত করে জানাও লেখক ও প্রকাশনীর নাম। তার পরেই হয়তো আড্ডা দিচ্ছে চিটিং কেসে প্রথম শ্রেণি পাওয়া গিয়াসুদ্দিন। তার বক্তব্য, আগামী সপ্তাহে দিল্লির তিনহাজারি কোর্টে তার কেসটা উঠলে সে নিজেই লড়তে চায়। আশ্বাস দিই, ল’ ডিগ্রি যখন আছে, নিজের মামলা নিজে লড়বে, সে তো খুব ভাল কথা। আমার চোখ কিন্তু স্থির হয়ে আছে বেশ কিছুটা দূরে লম্বা হাওদার শেষে একটি বড় চৌবাচ্চার দিকে। তখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়া দুজন পরীক্ষার্থী হুব্বা শ্যামলের কাছে-কাছে ঘুরঘুর করত। তাদের এক জন হুব্বাকে মাসাজ করবে আর খাবার ধরবে, অন্য জন চৌবাচ্চা ভর্তি করবে টলটলে জলে। আমি তারিয়ে তারিয়ে দেখতাম তার এই স্নানপর্ব। একটি লুঙ্গি পরে হুব্বা নাভিতে-পেটে-ঘাড়ে-পিঠে-মাথায় বালতির পর বালতি জল ঢেলেই যেত, বসে-দাঁড়িয়ে-শুয়ে। জল চলকে পড়ত চারপাশে, যেমন পদ্মপাতা থেকে পড়ে গোল-গোল বৃষ্টিদানা। একটি কিশোর ডুবে যাবে এমন একটি ভরা চৌবাচ্চা খালি হয়ে যেত কিছু ক্ষণের মধ্যে। তার হুংকারে অন্য কেউ সাহস পেত না ওই চৌবাচ্চায় হাত দিতে। আমি শুধু মনে মনে বলতাম: ওহে হুব্বা, এত নিরাপত্তা, এত আয়েশ তোমাকে কে দেবে, বাইরে গেলে?

পাঁচ হাজার টাকার জন্য উজ্জ্বল মণ্ডল হত্যার মতো জঘন্য কেসে জড়িয়ে পড়ে দীপঙ্কর দেব। রাজপুত্রের মতো দেখতে দীপঙ্কর বলিষ্ঠ কবিতা লিখত, ভিন্ন ধারার লেখাও পড়ত জেলের ভেতর। অফিসের নানা কাজ নিখুঁত সেরেও নিজেকে শৌখিন রাখত। শিক্ষিত ছেলে বলে বড় বড় জেলে তাকে মেডিসিন বিভাগে রাখা হত। দমদম জেলে যখন ছিল, বাগান তৈরি ও ফুল ফোটানোয় তার ধারেকাছে কেউ ছিল না। কিন্তু আমার সবচেয়ে মনে পড়ে পাগল ওয়ার্ডে তার শুশ্রূষা। নিরন্তর সেবায় এতটুকু ত্রুটি ছিল না। কোনও কোনও পাগলকে দিনে সাত বারও ওষুধ খাইয়েছে, একদম ঘড়ি দেখে। এতটাই ভালবাসা তাদের প্রতি। কারা এই সব পাগল? উদাহরণ দেওয়া যাক।

বিকেলে শ্রীকান্তকে যখন বলি, যাও মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, একটু খেলে এসো, সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর: খেলবই তো। এই যে বিশ্বকাপ ফুটবলে মারাদোনা হাত দিয়ে গোল করল, রেফারি কে ছিল? আমার কাকা। পরদিন সকালে যখন বলি, শ্রীকান্ত তুমি তো গতকাল গোবরা হাসপাতালে ডাক্তারবাবুকে আদৌ দেখাওনি, আজ কিন্তু অবশ্যই দেখিয়ে আসবে। এ বারও মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর: দেখাবই তো। নীলরতন সরকার কে? আমার দাদু।

অনেক দিন পর যখন দেখা হল, সেই সুপুরুষ দীপঙ্করকে চিনতে কষ্ট হল। কষ্ট হয়েছিল অনাদি মাহাতোকে চিনতেও, মেদিনীপুর সংশোধনাগারে যখন সে এল তার পাওনা বেতন (কনভিক্ট ওয়েজ) নিতে। ও আমার অ্যাটেনডেন্ট ছিল। হঠাত্‌ জামিন পেল। কয়েক মাস পরে গেটে দাঁড়িয়ে আমাকে বার বার ডাকছে, তবু চিনতে পারছি না। কেবল দীপঙ্কর বা অনাদি নয়, কয়েদিদের অনেকেই বাইরে বেরিয়ে সংসার চালানোর জন্য এত খাটাখাটনি করে যে নিয়ম করে খাওয়া-দাওয়া-বিশ্রাম কিছুই হয় না। তাই অনেকেই হারিয়ে ফেলে জেলে ধরে রাখা দেহসৌষ্ঠব।

গত সিকি শতাব্দীতে দুজন লোক আবাসিকদের নায়ক হতে পেরেছিলেন: রজার মিল্লা এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ’৯০ সালে যখন বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে, আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নাইট রাউন্ড দিতে এসে তা শেষ করা যে কী কঠিন কাজ ছিল! বিশেষ করে যে দিন ক্যামেরুনের খেলা থাকত। সবে বড় টিভি দেওয়া হয়েছে। রজার মিল্লার পায়ে বল পড়লেই প্রত্যেকটি ওয়ার্ড-এ সে কী উল্লাস আর চেঁচামেচি! এ-ওর ঘাড়ে লাফিয়ে উঠছে, যেন মিল্লা’র হয়ে ওরাই গোল করে দিয়ে আসবে। বলে রাখা দরকার, আপামর বাঙালি যখন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক, কেউ কেউ ইতালি বা জার্মানির, তখন আবাসিকরা কিন্তু সমর্থক আফ্রিকার কোনও এক দেশের। আসলে তাদের কাছে পায়ের শিল্প একটু কম হলেও চলবে, কিন্তু লড়াই চাই তীব্র।

১৯৯৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অবশ্য দৃশ্যপট বদলে গেল। তাদের এক মাত্র নায়ক ও নয়নের মণি তখন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ২০০৫ সালে মেদিনীপুর সংশোধনাগারে কোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্রাঞ্চে কাজ করতে থাকা শিক্ষিত আবাসিক জয় এতটাই মুষড়ে পড়ল, আর্জি জানাল, কোর্ট ব্রাঞ্চ থেকে যেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ কাজে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব। ‘দাদা’ যে ভারতীয় ক্রিকেট দল থেকে বাদ পড়েছে!

১৯৯১ সালের ২০ অগস্ট। সব ওয়ার্ডে রুটিন-মাফিক সার্চিং হয়ে গেলে অফিসঘরে ডেকে অধ্যক্ষ মণীন্দ্রনাথ মিত্র সাহেব রুদ্ধকণ্ঠে আমাকে বললেন: যান, কার্তিক আর সুকুমারের সঙ্গে একটু দেখা করে আসুন, তবে এখনই বলবেন না যে ভোর পাঁচটায় ওদের ফাঁসি। মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে পড়ি, কিন্তু পা সরে না। ক’দিন আগেই সুকুমারের বাবা-মা বহরমপুর জেল থেকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসে আমাদের এতই শাপশাপান্ত করে গেছেন যে তখন থেকেই ভারী হয়ে আছে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের পরিবেশ। পা টেনে টেনে অনেক কষ্টে পৌঁছনো গেল কনডেম্‌ড সেল-এ।

বালুরঘাটের ঘটনা। উঠোনের এক চিলতে জমি নিয়ে গন্ডগোল, ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে মার্ডার হল সুকুমার বর্মনের কাকার পরিবারের ছ’জন। রটনা হয়েছিল, গরু চুরি করতে এসে বাংলাদেশের ডাকাতরাই নাকি এই খুন করেছে। কিন্তু সুকুমারকে চাকরির টোপ দিয়ে

অসীম ধৈর্যের পরীক্ষায় বসে সত্য ঘটনা ধরে ফেলেন কলকাতার দক্ষ গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার রজত মজুমদার। বিনা পরিশ্রমে চাকরির টাকা নিতে নিতে একদিন বেফাঁস বলে ফেলে সুকুমার...

আমি কার্তিকের সেলে তার দরজার সামনে দাঁড়াতেই, পাশাপাশি দুজনেই বলে ওঠে: স্যর স্টে অর্ডার, স্টে অর্ডার চাই। আমাকে কোনও কথাই বলতে দিচ্ছে না। সুকুমারের আর্জি, পণ্ডিতমশাইকে আর এক বার ডাকা হোক, ক’দিন আগে তিনি কেন গীতাপাঠ করে জানিয়ে গেছেন এ জন্ম ত্যাগ করলে শিগগির লাভ হবে পুনর্জন্ম? এ বার এলে জিজ্ঞেস করবে দস্যু রত্নাকর কী ভাবে বাল্মীকি হয়েছিলেন এক জন্মে? তারাও পারবে। তাই আর্জি: ফাঁসি নয়, যাবজ্জীবন। লোহার গরাদে মাথা ঠুকে কাঁদতে কাঁদতে কার্তিক বলছে: টাকার অভাবে বউ দেখা করতে আসতে পারেনি স্যর, পরের ঘরে কাজ করে সংসার চালায়। সত্যিই, কোনও দিনই পাথেয় জোগাড় করে উঠতে পারেনি এই অভাগিনী, তাই স্বামীর সঙ্গে শেষ বারের মতোও দেখা হয়নি। বুক চাপড়ে হাহাকার করছে কার্তিক: সুকুমার তোর জন্য আমি গেলাম, আমার সংসার গেল। রেলিংয়ের ধুলো ধুয়ে আমার হাতে টপটপ করে পড়ছে কার্তিকের চোখের জল। তাদের সঙ্গে কত দিন কত কথা, আর কোনও দিন হবে না। ভারী পা নিয়ে যখন মিত্রসাহেবের অফিসে ফিরি, সুকুমারদের আইনজীবী পার্থ ভট্টাচার্য মেঝেতে বসে পড়েছেন, দু’হাতে মুখ ঢাকা, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, ‘পারলুম না, পারলুম না!’ এর আগে তিনি অন্তত দু’বার ওদের ফাঁসি স্থগিত করতে পেরেছিলেন। আজও তিনি বলছেন, ট্রাংক-কল’এ একটি স্টে অর্ডার এসেছে, কিন্তু সেটা মানবেন না মিত্রসাহেব। নাটা মল্লিক ও তার ছেলেকে ইতিমধ্যে আটকে রাখা হয়েছে অফিসে, যদি অত ভোরে না আসতে পারে!

সে রাতে এক হোটেল থেকে খাবার এল, কিন্তু রুচি নেই খেতে। সেই মুহূর্তে জেলের ভেতরের জীবন এবং আবাসনের জীবন মিলেমিশে একাকার। অলিখিত অরন্ধন। ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছি, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। চিড়িয়াখানার যে-সব মাছখেকো পাখি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ভেতর রাত কাটায় বাদাম গাছে, তারাও আজ অস্থির। থেকে থেকে ডানা ঝাপটাচ্ছে আর চেঁচিয়ে জেল মাথায় করছে। সারা রাত বসে আছি, চোখে ঘুম নেই। তিনটে বেজে গেল। এ বার আমাদের ভেতরে যাওয়ার প্রস্তুতি...

 

এই প্রচ্ছদকাহিনি কেমন লাগল? মন্তব্য করতে,
এই ফেসবুক পেজ-এ যান: www.facebook.com/anandabazar.abp

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন