• 1
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রিফিউজি

পৃথিবী জুড়ে এখন শরণার্থীর ঢল। সেই থিমে, আমাদের ফ্ল্যাশব্যাক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শ’য়ে শ’য়ে মানুষ শিকড় উপড়ে চলে এসেছিলেন এই বাংলায়। সঙ্গে কয়েকটা পুঁটলি, আর অনেকটা আতঙ্ক, কান্না। সেই ডানাভাঙা সময়ের কথা, তাঁদেরই কলমে।

1
এটা অবশ্য ১৯৪৮ সালের ছবি। কিন্তু রিফিউজিদের এই ছবি কি কখনও বদলায়?
  • 1

৭ জুলাই ১৯৭১। ভারত আর বাংলাদেশ— দু’দেশের সীমানায় একটা মজা খাল, কচুরিপানা বোঝাই। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তাতে ইট-খোয়া ফেলে ফেলে কয়েকটা বাঁধ দিয়েছিল। শ’য়ে শ’য়ে লোক পার হচ্ছে রোজ। ও দিকে জুলাই মাসের বৃষ্টি। বাঁধগুলো বৃষ্টিতে গলে জলার তলায় বসে গেছে। আমি গলাজল পেরিয়ে এ পারে এসে উঠলাম। সঙ্গে বাবা, স্ত্রী সুধা, ছ’বছরের ছেলে নান্টু, চার আর দেড় বছরের দুটি মেয়ে শেলি ও লিলি। আর রয়েছে আমার চার ছাত্রছাত্রী: বলাই, সুভাষ, ছবি ও মঞ্জু। তারা সরাসরি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। একটা বড় অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় আমরা দাঁড়ালাম। সুভাষ একটু ফাঁকা জায়গার ও-পাশে ভারতের জাতীয় পতাকা দেখিয়ে বলল, এর পরেই বাগদা বাজার। আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন থমকে গেল। হঠাৎ মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘অজস্র মৃত্যুরে লঙ্ঘি—’। আবদুল কাদিরের লেখা পঙ্‌ক্তিটির পরের অংশটা আর মনে পড়ছিল না। কিছু ক্ষণ পরে মনে পড়তেই চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘অজস্র মৃত্যুরে লঙ্ঘি হে নবীন, চল অনায়াসে— মৃত্যুজয়ী জীবন উল্লাসে।’ সবাই তখন অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
দক্ষিণ বরিশালে আমাদের আটঘর-কুড়িয়ানা বিল এলাকার প্রায় চার বর্গকিলোমিটার জায়গায় সবই ছিল পেয়ারা বাগান। পাক সেনাবাহিনীর মেজর মুর্তাজা তিনখানা গানবোট আর সাত-আটখানা লঞ্চ বোঝাই করে মারণাস্ত্র এবং শ’তিনেক পাক সেনা নিয়ে এসে এলাকাটাকে ঘিরে রেখেছিল। আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার পর আমরা স্থানীয়রা আর অন্যান্য জায়গা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় আড়াই লাখের মতো লোক সেই বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পাক সেনারা রাজাকারদের সঙ্গে বাগান কাটতে শুরু করল। সবাই মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম।
তারিখটা এপ্রিলের ১৪ কি ১৫ হবে। বাগানে আমাদের ট্রানজিস্টরগুলোতে বেজে উঠল, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনিপ্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।’ প্রতিটা ট্রানজিস্টরের কাছে ছোট বড় মেয়েপুরুষের ভিড়। আগের দিন রাতেই আকাশবাণী কলকাতার ‘সংবাদ বিচিত্রা’য় গানটা প্রথম বাজানো হয়েছিল। পরে জেনেছিলাম, গানটা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা, শিল্পী অংশুমান রায়। পেয়ারা বাগানের বিল এলাকা থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে রাতের অন্ধকারে আমরা বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বৃষ্টির মধ্যে শ’য়ে শ’য়ে লোক চলছে। শুধু কাদা, কোনও পথের চিহ্নই নেই। বাবা হোঁচট খেতে খেতে দাঁড়িয়ে গেলেন, স্ত্রী বসে পড়লেন কাদার মধ্যে। ও দিকে সন্ধ্যা নামছে। হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা শব্দ। দেখি একটা গরুর গাড়ির চাকা গাড্ডায় পড়ে গেছে। গাড়োয়ান ‘এই হট্ হট্’ বলে গরুর পিঠে পাচনির বাড়ি মারছে। ডান দিকের গরুটা মুখ থুবড়ে নেতিয়ে পড়ল কাদার মধ্যে। গাড়োয়ান লাফ দিয়ে নীচে নেমে গরুর মাথাটাকে দু’হাতে তুলে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওরে আমার লালি রে, তুই আমারে ছাইড়া চইলা গেলি, মা?’

থকথকে কাদায় পা আর চলছিল না। সুভাষকে ডেকে বললাম, তোরা চলে যা, আর পিছনে তাকাসনে। ও ধমকে উঠল, ‘অমন হা-হুতাশ করলে চলবে? ওই তো সামনে বাগদা বাজারে আলোগুলো জ্বলে উঠছে!’

ব্রজেন মল্লিক, আর এন টেগোর রোড

 

সালটা ১৯৭২-’৭৩ হবে। মধ্যপ্রদেশের কুরুৎ ক্যাম্প। ধু ধু প্রান্তর। যত দূর চোখ যায়, কোনও লোকবসতি নেই। সার দিয়ে তৈরি হয়েছে মুলিবাঁশের বেড়া আর টিনের ছাউনি দেওয়া অসংখ্য ঘর। এক কামরার। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হিন্দু রিফিউজি ক্যাম্প। আমরাও সে ক্যাম্পের বাসিন্দা। আমার বয়স তখন চার কি পাঁচ।

আমাদের ছোট্ট পরিবার— বাবা, মা ও আমি। বাবা ছিলেন ক্যাম্পের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। বাস্তুহারা মানুষগুলো মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে মেতে উঠত, আর বাবার কাছে আসত সালিশি করতে। ইংরেজিতে বাবার দখল ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চিঠিপত্র চালাচালি বা কথাবার্তার সমস্ত দায়িত্ব ছিল তাঁর।

এই বে-ঘর মানুষগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি করে ফেলল বাজার। স্থাপন করল স্কুল। সে স্কুলে পড়তাম আমিও। ব্লকে ব্লকে তৈরি হয়ে গেল চপ-ফুলুরির দোকান। গৃহস্থ ঘরের শান্ত, স্নিগ্ধ গৃহবধূ হয়ে গেল চপ-ফুলুরির নিপুণ কারিগর।

রিফিউজিদের বাজার বেশ জমে উঠল। তারাই সে জমজমাট বাজারের ক্রেতা এবং বিক্রেতা। সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো যে যে ভাবে পারে, মাথা তুলে দাঁড়াবার মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আমার বাবা, জীবিকা অর্জনের জন্য একমাত্র শিক্ষকতা ছাড়া যাঁর আর কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না, তিনিও বাস্তুহারাদের সেই বাজারে এক মনিহারি দোকানের পসরা সাজিয়ে বসলেন। মা-ও ছিলেন সে ব্যবসায় বাবার সহকর্মী। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন সমাজসেবিকা। ক্যাম্পের কারও শরীর খারাপ হলে, কোনও বাচ্চা অসুস্থ হলে, অমনি ডাক পড়ত মায়ের। ফলে সব সময় মা’কে আমার পাওয়া হত না।

এক দিন সকাল ন’টা কি দশটা নাগাদ বাবা ঘরে নেই। শুধু মা আর আমি। সমস্ত ক্যাম্প জুড়ে যেন এক আতঙ্কের ঝড় বয়ে চলেছে। মা ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাইরে কী হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না। শুধু শুনছি ধুপধাপ দৌড় আর ভারী বুটের শব্দ। কিছু ক্ষণ পরে প্যাট প্যাট শব্দ শোনা গেল। মা-ও উৎকণ্ঠায় জানলা একটু ফাঁক করলেন। আমাদের ঘরের পিছনে একটা কচুবন ভর্তি জলাজমি আর রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে মধ্যবয়সি এক রোগা মানুষ রিকশা চালিয়ে চলেছে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে। রিকশার পাদানিতে বেশ ক’টি মৃতদেহ। সমস্ত রাস্তায় তাদের তাজা রক্তের ফোঁটা। মা আমাকে কোলে চেপে বললেন, ‘বাইরে তাকাস না।’ একটু পরে দেখলাম, চার জন মানুষ বাঁশে ঝুলিয়ে আর একটা মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে। তার গুলিবিদ্ধ গলার ওপর নড়তে থাকা মাথাটা সামনের বাঁশ থেকে ঝুলছে। পা দুটো পিছনের বাঁশ থেকে হাঁটুর নীচ থেকে ঝুলছে। মা জানলার ফাঁক পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন।

বড় হয়ে বুঝেছিলাম, সরকার পক্ষের সঙ্গে দাবিদাওয়া নিয়ে রিফিউজিদের লড়াই চলছিল। সরকার পক্ষের বন্দুক-রাইফেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল ঢিল-দা-বঁটি-হাতা-খুন্তি। তারই ফল, সঙ্গীদের নিষ্প্রাণ দেহ। মানুষগুলো তাদের সঙ্গীদের দেহ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। এর পর বেশ কয়েক দিন ধরে চলেছিল পুলিশ কুকুর-সহ ভারী বুটের অভিযান। এবং শুনেছিলাম, বহু দূরের কোনও এক পরিত্যক্ত ইঁদারার মধ্যে রিফিউজিরা তাদের সঙ্গীদের দেহগুলোর গলায় পাথর বেঁধে ডুবিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তার হদিশ পেল সরকার পক্ষ এবং সেগুলো তুলেও নিয়ে গেল। এর পর সমস্ত ক্যাম্পটাকে বিভিন্ন ভাবে ভাগ করে ট্রান্সফার করা হয় লরিভর্তি করে। মনে আছে, অসহায় মার-খাওয়া মানুষগুলো তাদের সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে ট্রাকে চেপে আবার নিরুদ্দেশ যাত্রা করল। আমরাও এসেছিলাম, মধ্যপ্রদেশের আর একটা ক্যাম্পে। তার পর গল্প গড়িয়েছিল অন্য খাতে।

অলকানন্দা সমাদ্দার, ঠাকুরপুকুর

 

আমাদের গ্রাম ব্রাহ্মণগাঁও থেকে উত্তর দিকে মাঠ, চাষের জমি এবং কয়েকটি গ্রামের পর বুড়িগঙ্গা নদী। নদী পেরোলে ঢাকা। ২৬ মার্চ ১৯৭১। রাত আটটা-ন’টা নাগাদ ঢাকা এবং আশপাশের অঞ্চল থেকে কামান, গুলির আওয়াজ শোনা গেল। আগুনরঙা উত্তর দিগন্ত। আমি তখন খুব ছোট। দেখলাম, বাবা, দাদা ও পাড়ার বড়রা সে সব দেখছেন,  চোখেমুখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ। শুনলাম, পাক সেনারা ঢাকা শহরে বাঙালিদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

পর দিন সকাল হতেই দেখি, উত্তর দিক থেকে মাঠ পেরিয়ে দলে দলে নারী পুরুষ শিশু মাথায় আর হাতে করে বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে গ্রামে ঢুকছে। আমাদের বাড়ির পাশেই প্রাইমারি আর হাই স্কুল। দলে দলে মানুষ এসে আশ্রয় নিল সেখানে। এর পর যত দিন যেতে লাগল, আতঙ্কিত মানুষের ভিড় বাড়ল গ্রামে। অনেকে পরিচিত ও আত্মীয়দের বাড়িতে এসে উঠল। আমাদের বাড়িতেও আশ্রয় নিল দূর সম্পর্কের কয়েক জন আত্মীয়। তবে বাচ্চাদের মনে ভয়ডর নেই। অনেক বাচ্চা একসঙ্গে হওয়ায় হুটোপুটি চলছে জোর কদমে। এ দিকে দেশে রাজনৈতিক গন্ডগোলের কারণে স্কুল অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পড়াশোনার কোনও চাপ নেই। শুধু খেলা আর খেলা।

আমাদের বাড়ির পুব দিকে বুড়িগঙ্গার ও-পারে ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ শহর। প্রায় সন্ধ্যায় ও-দিক থেকে গুলির আওয়াজ শুনতাম। বড়রা বলতেন, পাক সেনারা বাঙালি ইস্টার্ন রিজার্ভ পুলিশ ধরে এনে মাথা মুড়িয়ে, হাত পিছমোড়া করে বেঁধে, নদীর তীরে সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারত। বিরলভাগ্য দু’এক জন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে পাশের গ্রামে আশ্রয় নিতেন।

বড়রা বলতেন, আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান পাকপন্থী হওয়ায় তাঁর সুপারিশে (এ অঞ্চলে হিন্দু অধিবাসী বিশেষ ছিলেন না) পাক সেনারা এ গ্রামে হামলা চালায়নি। ক’মাস পর এক দিন জোর গুঞ্জন, আজ রাতে নাকি পাক সেনারা গ্রাম আক্রমণ করবে। নদীতীরে পাক সেনা বোঝাই একটা জাহাজকে নোঙর করতে দেখেওছে অনেকে। গ্রামের সবাই রাতের অন্ধকারে চাষজমির ওপর দিয়ে হাঁটা দিল, সবাই জলশূন্য একটা বিশাল পুকুরে আশ্রয় নিলাম। সারা রাত ভয়ংকর দুশ্চিন্তায় কাটার পর ভোরে খবর এল, জাহাজটা চলে গেছে। ঘন কুয়াশার কারণেই নাকি ওটা ওখানে নোঙর ফেলেছিল।

কিছু দিন পর, চেয়ারম্যান হাত তুলে নিলেন। তিনি আর কাউকে বাঁচাতে পারবেন না। আমরা গ্রাম ছেড়ে রওনা হলাম, সঙ্গে সামান্য জিনিসপত্র ও টাকাপয়সা। বিক্রমপুরে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। তার পর এক দিন শুনলাম, দেশ স্বাধীন হয়েছে। ফিরে এলাম। আমাদের সম্পত্তি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন এক মুসলিম দম্পতি।

তবে, সব ফেলে সেই চলেই আসতে হল, ’৭৮-এ।   

অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর

 

আমি খুলনা জেলার রাড়ুলি গ্রামের জমিদার বাড়ির উত্তরাধিকারে বেড়ে ওঠা কিশোরী। বাবা শিক্ষক, কখনওই পশ্চিমবাংলায় আসতে চাননি। বলতেন, সাতপুরুষের বাস্তুভিটে ছেড়ে আমি কখনও যাব না। বাবার সেজো জ্যাঠামশাই ছিলেন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলেই বাবা পড়াতেন। কিন্তু ১৯৭১-এ দেশে প্রচণ্ড যুদ্ধ বেধে গেল। খানসেনারা এগিয়ে আসতে লাগল। ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা পড়লেন বিপদে। মা তখন তাঁর দিদিকে আমাদের দেখাশোনা করার জন্য রেখে বিরাটিতে ওই দিদিরই ছেলেদের বাড়িতে এসেছেন, রুগ্ণ ছোট ছেলের চিকিৎসা করানোর জন্য। যুদ্ধের খবর পেয়ে তিনি পাগলের মতো বর্ডারে ছোটাছুটি করতে থাকেন। আমরা আসব কী! গ্রামে তখন মাৎস্যন্যায়ের মতো অবস্থা। এক দিনে চোদ্দোটা খুন হল।

অবশেষে বাবা একটা নৌকোর ব্যবস্থা করতে পারলেন।

ভিটেমাটি ছেড়ে এসে, এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই। হাসনাবাদের রিফিউজি ক্যাম্প।

কালো কাপড়ে ঢাকা সেই নৌকো পর দিন সন্ধেবেলায় হাসনাবাদের ঘাটে এসে লাগল। স্টেশনে এসে দেখি, অসংখ্য রিফিউজি। ট্রেনে ওঠা যাচ্ছে না। শেষ ট্রেন ধরে মাঝরাতে বারাসত এলাম। রাতটুকু বারাসত প্ল্যাটফর্মে থেকে ভোরের প্রথম ট্রেনে এলাম বিরাটি। মা কেঁদেকেটে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নেওয়া হল। আমরা বড় চার ভাইবোন স্কুলে ভর্তি হলাম।

বাবা যে অল্প টাকাপয়সা আনতে পেরেছিলেন, তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে লাগল। মা বললেন, লজ্জা করে লাভ নেই। লবণহ্রদে ইন্দিরা সরকার যে চাল-ডাল দিচ্ছে, তা-ই আনতে হবে। এখনকার সল্টলেক তখন কোথায়! বালিভর্তি মাঠ শুধু, মাঝে রাস্তা। কিছু কিছু বাড়ি তৈরি হচ্ছে। বড় বড় পাইপ ফেলা। তার মধ্যেও রিফিউজিরা থাকে। উল্টোডাঙা স্টেশন থেকে চার মাইল হেঁটে পৌঁছই ক্যাম্পে। দেখি, অসংখ্য তাঁবু পড়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। অস্থায়ী শৌচাগার, দুর্গন্ধ। ব্লিচিং পাউডার, ফিনাইল দেওয়া হয়েছে। শিশুরা কাঁদছে। মিশনারি নানেরা ঘোরাফেরা করছে। চাল-ডাল, গুঁড়ো দুধ ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা লম্বা সাপের মতো লাইন। বর্ডার স্লিপ দেখিয়ে নিতে হত। ক্যাম্পে না-থাকা রিফিউজিদের প্রথমে এক দিন অন্তর, পরে সপ্তাহে এক দিন করে অনেকটা চাল-ডাল ইত্যাদি দেওয়া হত। সাত-আট মাস ধরে এটাই ছিল আমাদের জীবনধারণের প্রধান রসদ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মনে মনে জ্যামিতির থিয়োরেম, ইতিহাসের পড়া আউড়ে যেতাম। স্কুলে বাঙাল উচ্চারণের জন্য প্রথমে সহপাঠীদের খোঁচা খেলেও পরে ক্লাসে প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য কদর পেলাম।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হল। এখানে আয়ের কোনও উপায় না থাকায় স্কুলপড়ুয়া চার ছেলেমেয়েকে এ দেশে রেখে বাবা-মা ছোট তিন শিশুসন্তান নিয়ে ফিরে গেলেন বাংলাদেশে। শুরু হল আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই। বাবা টাকা পাঠাতেন। কিন্তু যোগাযোগের কারণে, তা নিয়মিত ছিল না। দাদা আর আমি টানা টিউশনি করতাম। টিউশনির টাকায় কলেজের মাইনে, বইপত্তর, এমনকী খাওয়ার খরচও চলত। মা পাসপোর্ট করে প্রায়ই আসতেন আমাদের দেখাশোনা করার জন্য। বাবাও আসতেন মাঝে মাঝে। ও দেশের সম্পত্তি কিছুই বিক্রি করতে পারেননি। আইনি বাধা ছিল। মায়ের গয়না বিক্রির টাকায় আমাদের ছোট্ট একতলা একটা বাড়ি হল।

সত্তরের দশকের একেবারে শেষে স্নাতক হওয়ার বছরেই দাদা পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যাল-এ চাকরি পেল, আর পরীক্ষা দিয়ে রাইটার্সে চাকরি পেলাম আমি। তার পরই পুরো পরিবার এ দেশে পাকাপাকি ভাবে আসে। ক’বছর পর মেজো ভাইও সরকারি চাকরি পায়। বাবা কিন্তু মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ছাড়া কখনও এ দেশে থাকেননি। বলতেন, কী একটা দেশভাগ হল! বলতেন, দেখ, আমি আমার জন্মভূমিকে ভারত, পূর্ব পাকিস্তান আর বাংলাদেশ— এই তিনটে নামে দেখলাম।

শিখা রায়চৌধুরী সেনগুপ্ত, বিরাটি

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন